ন্যানো, একটি স্বপ্নের মৃত্যু

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শমীক ঘোষ: দশ বছর। দশ বছরের মাথাতেই শেষ হয়ে গেল ন্যানো গাড়ির সব স্বপ্ন।

জুন মাসে সানন্দের ন্যানো ফ্যাক্টরিতে তৈরি হয়েছে মাত্র একটা গাড়ি। তাঁর আগের মাসে অবশ্য উৎপাদন হয়েছিল ২৭৫টা। নয় নয় করে রফতানিও হয়েছিল ২৫টা। ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, ২০১৯ এই বন্ধ হয়ে যাবে ন্যানোর উৎপাদন।

জানা যাচ্ছে, ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া প্রচেষ্টা হিসাবে বিদ্যুৎ চালিত গাড়িতে পরিণত করার কথা ভাবা হচ্ছে ন্যানোকে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সে গুড়েও বালি। কারণ বিদ্যুৎ-চালিত গাড়ি তৈরির প্রযুক্তি এখনও খুব দামি। তার সঙ্গে সস্তা গাড়ির ধারণা মূর্তিমান বিরোধাভাস।

অথচ দশ বছর আগে? কত ঢক্কানিনাদ। কত আলোচনা। কত পর্যালোচনা। কত আলোড়ন।

একটা গাড়ি কারখানাকে নিয়ে রাজনৈতিক বাদানুবাদ শেষ অবধি পরিণত হয়েছিল রাজ্য রাজনীতির পালাবদলে।

বাংলার সমাজের সব স্তরে তখন স্পষ্ট মেরুকরণ। গ্রামের কৃষিনির্ভর জনতা বলছে, শিল্পের জন্য চাষের জমি দেব না। শহুরে শিক্ষিত চাকরি প্রার্থীর বক্তব্য, শিল্প না হলে চাকরি হবে কি করে?

দলের ‘শিল্পবিরোধী’ তকমা ঘোঁচাতে বদ্ধ পরিকর বাম নেতারা তখন বলছেন, হবেই কারখানা। কেউ রুখতে পারবে না। এমনিতেই সরকারি কোষাগার ফাঁকা। রাজ্যের অর্থনৈতিক হাল ফেরাতে দরকার বড় শিল্প ।

বিরোধীরা যতই বলুন, সামান্য ক’জনের তো চাকরি হবে ওই কারখানায়।  পাল্টা যুক্তি তৈরিই ছিল ন্যানোপন্থীরা। হোক না সামান্য ক’টা চাকরি। কিন্তু তার সঙ্গে যে অনুসারী শিল্প তৈরি হবে, তার থেকে নতুন চাকরি তো হবে। সঙ্গে বদলে যাবে গোটা এলাকার অর্থনীতি।

এই অর্থনীতির লোভে, আগে ভাগেই ওই অঞ্চলে ব্রাঞ্চ খুলে ফেললেন, দেশের প্রথম সারির একটা বেসরকারি ব্যাঙ্ক। শুধু সাধারণ নাগরিকদের ব্যাঙ্কিং পরিষেবা দেওয়াই লক্ষ্য নয় তাঁদের। উদ্দেশ্য তার থেকেও বড় কিছু। টাটা ন্যানো আর অনুসারী শিল্পকে মোটা টাকার কর্পোরেট ঋণ দেওয়া।

কৃষি বনাম শিল্পের রাজ্য জুড়ে তরজায় থেমে রইল না টাটাও। সিঙ্গুরে জমি দিতে ইচ্ছুক চাষীদের মধ্যে থেকেই বেছে নিলেন তরুণদের। জোর কদমে শুরু হয়ে গেল তাঁদের প্রশিক্ষণ। কারখানায় চাকরি হবে তাঁদের।

জমিরক্ষার আন্দোলন দানা পাকতেই ঢুকে পড়লেন জাতীয় রাজনীতির কুশীলবরাও।

পশ্চিমবঙ্গে সমস্যা? গুজরাটে এসো। সানন্দে এক টাকায় জমি দিচ্ছি। নিজের শিল্প বান্ধব ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করতে এমনই বলেছিলেন তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

সেই গুজরাট মডেলের বলে বলীয়ান হয়েই আজ তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

কত স্বপ্ন! অথচ মাত্র দশ বছরেই মুখ থুবড়ে পড়ল সেই সব। অনুসারী শিল্প হল কি না হল, সে হিসাব দিল না কেউ। কিন্তু উঠতে বসল ন্যানো গাড়ি।

এর কারণ কিন্তু গাড়ি শিল্পে সামগ্রিক মন্দা নয়। ২০০৯ সাল থেকে এখন অবধি দেশে ব্যক্তিগত গাড়ি বিক্রির গ্রাফ শুধুই উঠছে।

এই বছরের জুন মাসেই দেশের প্যাসেঞ্জার গাড়ির উৎপাদন বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। কমার্সিয়াল ভেহিকেলে ৪২ শতাংশ। আর এই দেশে সব থেকে বেশি জনপ্রিয়তা টু-হুইলারের ক্ষেত্রে ২২ শতাংশ।

দেশের এক নম্বর গাড়ি উৎপাদক সংস্থা মারুতি সুজুকির গাড়ি উৎপাদন বেড়েছে ৪০ শতাংশ। গত সপ্তাহেই এই কোম্পানি ঘোষণা করেছে, আগামী দু’বছরে শুধু গুজরাটের প্ল্যান্টেই তাঁরা তৈরি করবে প্রায় সাড়ে সাত হাজার গাড়ি।

বাকি সবাই পারল। কিন্তু ন্যানো পারল না।

আসলে স্বপ্ন দেখেছিলেন রতন টাটা। টু-হুইলার কেনা মধ্যবিত্তের হাতে মাত্র এক লাখ টাকার বদলে তিনি তুলে দেবেন তাঁদের স্বপ্নের চাবিকাঠি – আস্ত একটা গাড়ি।

ভেবেছিলেন, এই স্বপ্নের গাড়ি কিনতে দৌড়াবে দেশের আমজনতা। দেশের সব মধ্যবিত্তের থাকবে ন্যানো।

স্বপ্ন তো ছিল। কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার ভিতটাই ছিল নড়বড়ে।

কম দামে চার চাকার গাড়ি বানাতে গিয়ে টাটার ডিজাইনাররা ভাবেননি যে শেষ অবধি পণ্যটাই নিম্ন মানের হয়ে যাচ্ছে। নড়বড়ে একটা ধাতুর খোপ, গাড়ি হিসেবে কিনবে না সাধারণ মানুষ। তার ওপর দেখা গেল গাড়িতে আগুন ধরে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনাও আছে।

তাছাড়া মধ্যবিত্তের গাড়ির স্বপ্ন তো শুধু গাড়ির স্বপ্ন নয়। চার চাকা গাড়ির মালিক হওয়া তো তার কাছে পাড়া, প্রতিবেশী, পরিবারের কাছে সাধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার প্রমাণ।

যে গাড়ি প্রথম দিন থেকেই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে, শুধু যাতায়াতের সুবিধার জন্য সেই গাড়ি কিনবেন কেন তাঁরা? তা ছাড়া পাল্লা দিয়ে তো বাড়ছে জ্বালানির দামও।

সিঙ্গুর থেকে সানন্দে যাওয়ায় ‘এক লাখ টাকার গাড়ি’র দামও গেল বেড়ে।

এক দশকে সেই স্বপ্ন মরে গেল। একই সঙ্গে এক দশকে বদলাল সঙ্ঘও।

সেদিনের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এখন রাজনৈতিক সন্ন্যাসে।

সেদিনের বিদ্রোহী বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন ক্ষমতার মসনদে।

সেদিনের দু’জনের তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ ভুলে এখন মমতা দেখতে যান অসুস্থ বুদ্ধবাবুলে।

বুদ্ধবাবুকে ঘিরে থাকা বুদ্ধিজীবীদের বৃহদাংশ এখন ভোল পালটে করে  মমতার কাছাকাছি।

আর এই এক দশকে বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বেশ বুঝে গেল চাকরি খুঁজতে রাজ্যের বাইরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই কোনও।পশ্চিমবাংলার শিল্পায়ন, অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সমস্ত স্বপ্ন এখন্ম, এই এক দশক পরে এখন ভীষণ ছোট্ট। ভীষণ নড়বড়ে। ঠিক ন্যানোর মতোই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More