কৃষিকাজে ন্যানোপ্রযুক্তি প্রয়োগের বাস্তবতা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

নিশীথ কুমার দাশ

এ কথা ঠিক যে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদাকে সামাল দিতে গত শতকে সবুজ বিপ্লবে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগুলো এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তবে বিপ্লবে ব্যবহৃত অত্যধিক মাত্রায় রাসায়নিক, সেচের জল ও কৃষি উপকরণ দূষণের মাধ্যমে পরিবেশকে বিপন্নও করে তুলেছে।

সময় যত গড়িয়েছে সবুজ বিপ্লবের হাতিয়ার কৃষি উপকরণগুলোর প্রয়োগে কৃষিতে ফলনবৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কম হচ্ছে। কৃষি ক্রমে অলাভজনক শিল্পে পরিণত হচ্ছে। অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে মূল্যবৃদ্ধি। এছাড়াও বর্তমান কৃষি অধিকতর উপকরণ ব্যবহারে আশানুরূপ সাড়া না মেলায় এক সংকটাপন্ন অবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে সবুজ বিপ্লবের উচ্চ উপকরণনির্ভর শস্য উৎপাদন প্রযুক্তিগুলো চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে না। পরিবর্তিত জলবায়ুতে রোগের প্রদুর্ভাব ও অজৈব রাসায়নিক উপাদানের কারণে ফসল উৎপাদন যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেইসঙ্গে বাড়ছে দেশের জনসংখ্যা, বাড়ছে খাদ্য চাহিদা। দিনকেদিন কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। এই চাহিদার পথ ধরে কৃষিতে নানা সময়ে এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। কৃষি হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর। স্বভাবতই ফসল উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের স্বার্থে একদিকে শস্য বহুমুখীকরণ, পুষ্টি সমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন, অপরদিকে বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং লাভজনক কৃষি ও দক্ষ প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে গবেষণায় কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ন্যানো প্রযুক্তি একটি সম্ভবনাময় ও কার্যকরী কৌশল হিসেবে উঠে এসেছে। এক মিটারের একশো কোটি ভাগের এক ভাগকে বলা হয় এক ন্যানোমিটার। সেজন্য ন্যানো কণাগুলিকে আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। এমন কি মাইক্রোস্কোপ দ্বারাও দেখা যায় না। তাই ন্যানো প্রযুক্তি গবেষনায় ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ আবশ্যক হয়। আর এই ন্যানো মিটার স্কেলে প্রয়োজনমত নির্দিষ্ট আকার-আকৃতির ন্যানো কণা তৈরি ও পরিচালনা করার প্রযুক্তিকে ন্যানো প্রযুক্তি বলা হয়।

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত যুক্তরাষ্ট্রের পদার্থবিদ রিচার্ড ফিলিপস ফাইনম্যানকে ন্যানো প্রযুক্তির জনক বলে বিবেচনা করা হয়। বাস্তবে দেখা যায়, এ প্রযুক্তি ইলেক্ট্রনিক্স সার্কিট, ওষুধ শিল্প, শক্তি উৎপাদন, জৈবপ্রযুক্তি ও কৃষিক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ণে অবদান রাখতে সক্ষম। এছাড়াও চিকিৎসা বিজ্ঞানে, বিশেষত ক্যানসার-সহ জটিল রোগ নির্নয় ও নিরাময় এবং জীববিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার আশা সঞ্চার করেছে। তাই ন্যানো প্রযুক্তিকে একুশ শতকের একটি সর্বাপেক্ষা কার্যকর প্রযুক্তির শিরোপা অর্জন করেছে।

যাই হোক, ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ দশ থেকে দশ হাজার ন্যানোমিটার মাত্রার বস্তুকণা যা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ক্রিয়াশীল হয় তাকে ন্যানো কণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষিকাজের বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঈপ্সিত ফল লাভ করেছে। কৃষি বিজ্ঞানীরা মনে করেন প্রাথমিক পর্যায়ে ফসলের রোগ নির্ণয়, জাতভিত্তিক পুষ্টি চাহিদা নির্ণয়, পুষ্টি আহরণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, পোকামাকড় দমনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ন্যানো সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহন করা যায়। কৃষিজমিতে ও কৃষি পরিবেশে ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্তকরণ ও শোধনসহ ন্যানো প্রযুক্তির সার, কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে উপকরণ দক্ষতা অর্জন সম্ভব হয়।

সম্প্রতি ব্যাক্টেরিয়া ও ছত্রাকজনিত রোগ দমনে সূর্যালোকে পুনর্নবীকরণযোগ্য জীবাণু প্রতিরোধী ন্যানো উপাদান গঠন বাস্তবায়িত হয়েছে। এইসব কণাসমূহ দিনের আলোয় দক্ষতার সঙ্গে ক্রিয়াশীল অক্সিজেন প্রজাতি সৃষ্টি করে রোগজীবাণুকে প্রতিরোধ করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি ব্যবস্থায় কীটাণু দমনে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণে সহায়ক হয়। কৃষি গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে ব্যবহৃত পঞ্চাশ শতাংশের বেশি ও কীটনাশকের পঁচানব্বই শতাংশের বেশি নানাভাবে উদ্দিষ্ট জায়গা ভিন্ন অন্যত্র, জীব ও পরিবেশে অপচয় হয়। প্রচুর কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আমাদের জীববৈচিত্র ও মানবস্বাস্থ্য আজ হুমকির সম্মুখীন। পরিবেশবান্ধব ন্যানো প্রযুক্তি ব্যাবহার করে কীটনাশকের সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব।

এও দেখা গেছে একটা নির্দিষ্ট পরিমান ধান উৎপাদন করতে যে বিপুল পরিমান জল অপচয় হয় তার মূল কারণ অদক্ষ কৃষি উপকরণের ব্যবহার। স্বাভাবিক ভাবেই ফসল উৎপাদন খরচ যেমন ভীষণ ভাবে বাড়ছে, তেমনি ভূগর্ভস্থ জলের অপব্যয় হয়ে চলেছে। এর ফলে অব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ সেই জলে মিশে পরিবেশকে বিপন্ন করে তুলছে। বলাই বাহুল্য, এসব মোকাবিলায় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ন্যানো প্রযুক্তির গবেষণা ও প্রয়োগের উপর নজর দেওয়া একটি সময়োপযোগী প্রয়াস। পাশাপাশি ন্যানো ফার্টিলাইজার এমন একটি সার যেখানে ফসলের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানকে অনেক কম মাত্রায় এবং এক সাথে মিশিয়ে উপাদানগুলোকে নিবিড় করে একত্রীকরণ করা হয়। ফলে স্থায়িত্ব বেড়ে যায়। আকারে ছোট হওয়ায় বীজের ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে এই কণা বীজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে পারে। ফলে উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।

এ সবের জন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে এবং বিষয়বস্তুতে ন্যানো প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং দেশে কৃষি গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোয় ন্যানো প্রযুক্তির অবস্থান নিশ্চিত করা সমীচীন বলে অনুভূত হচ্ছে। প্রসঙ্গত আর একটি বিষয় সামনে আসে, সেটা জৈব রাসায়নিক সার। আমাদের জমিগুলো প্রতিনিয়ত চাষবাসের কারণে নিবিড় হয়ে যাচ্ছে। গাছের সুষম বৃদ্ধির জন্য মাটির নীচে অক্সিজেন এবং মাটি ফাঁপা হওয়া দরকার। জৈব সার ব্যবহার করলে যেমন একদিকে মাটি ফাঁপা করবে। আর এক দিকে জলধারণ ক্ষমতা বাড়াবে। সেই সঙ্গে শিকড়ের সক্ষমতা বাড়াবে এবং গাছের যে সমস্ত উপাদান দরকার হয় তা সঠিকভাবে সরবরাহ হবে। বস্তুত দেখা যায় যে এই জৈব সার ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা বাড়ে। অন্য সার প্রয়োগের পর এই সারগুলো গাছ নিতে পারে। তাতে ফসলের ফলন অনেক বৃদ্ধি পাবে।

পরিশেষে বলা যায় ন্যানো প্রযুক্তি এবং জৈবসারের সম্মিলিত ব্যবহার কৃষি শিল্পকে সমৃদ্ধ এবং আকর্ষণী করে তুলতে পারে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More