মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

ব্লগ রোডহেড/ ৩ – হাল্লা চলেছে যুদ্ধে

এই নিবন্ধের সব ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। পৃথিবী নামক গ্রহের কাহারও বা কাহাদেরও  চরিত্রের সহিত  মিলিয়া গেলে লেখক ও “দ্য ওয়াল” দায়ী নহে। তাহা নিছকই কাকতালীয় ঘটনা বলিয়া  বিবেচিত হইবে। সুতরাং পাঠকরা লেখাটিকে  গুল্প (হ্যাঁ, গল্প নয়। গল্প আর গুলের মিশেল, গুল্প) ভাবিয়া পাঠ করিলে প্রশান্তি লাভ করিব। আর ‘পড়ল কথা সবার মাঝে, যার কথা তার গায়ে বাজে’ প্রবাদটি মানিয়া যদি কেহ যদি গায়ে মাখিয়া লহেন, তাহাতে  এই শর্মার কিছুই করণীয় নাই।  

রূপাঞ্জন গোস্বামী

গঙ্গাসাগরে, কুম্ভমেলায়, লোকে সাধু সঙ্গ করতে যান। আমারও তেমন সুযোগ হয়েছে প্রায় তিরিশ বছর হিমালয়ের পথে পথে বিভিন্ন অভিযাত্রীর সঙ্গ লাভ করা। তাঁদের অভিজ্ঞতা আমাকে মন্দাকিনীর স্রোতধারার মতো পুষ্ট করেছে, মানে আমার উড়নচণ্ডী পাহাড়ি মনে পুষ্টি জুগিয়েছে। কত দেশের, কত বর্ণের, কত ধর্মের মানুষ। হিমালয়ের পরেই আমার দ্বিতীয় পছন্দ হিমালয়ে বসবাস করা মানুষজন এবং তৃতীয় পছন্দ হিমালয়ে পথে চরকিবাজি করতে থাকা উদ্দেশ্যহীন বাউণ্ডুলেরা। যাঁদের কোনও পাহাড়ের চূড়া ছোঁয়ার চাপ নেই। কয়েক খেপে তেরো-চোদ্দ হাজার টাকা নিজের কষ্টার্জিত উপার্জন থেকে বার করে হিমালয়কে ছুঁয়ে আসেন, বছরে এক-দু’বার। হিমালয়কে দ্বিতীয় মা মনে করেন। মায়ের কাছে পৌঁছে কেউ হাপুস নয়নে কাঁদেন। কেউ পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠেন। কেউ বিনা মিউজ়িকে উদ্দাম নৃত্য শুরু করে দেন। হ্যাঁ, আমার এরকম ক্ষেপা, বাউন্ডুলে  ট্রেকারদের সঙ্গ খু্ব খু্ব খু্ব ভালো লাগে।

তার মানে এই নয় যে পর্বতারোহীদের সঙ্গ আমার ভালো লাগে না। খুবই ভালো লাগে। পর্বতারোহণ সম্পর্কে  কত কিছু জানতে পারি, শিখতে পারি। পর্বতারোহীদের মতো যদি আমার  কলজের জোর থাকতো, হিমালয়ের  আরও কিছু দুর্গম জায়গা দেখার সৌভাগ্য হতো। তাই ভালো লাগার মাত্রায় উনিশবিশ হলেও, ট্রেকাররা আমার কাছে সামান্য বেশি পছন্দের। না, পর্বতারোহী না হতে পারার আক্ষেপে নয়। ট্রেকারদের সঙ্গে কথা বলে একটু বেশি  আরাম পাই, একটু বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি বলে।

পর্বতারোহণ বিশাল ব্যাপার এবং  শ্রেষ্ঠতম  অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস। তাই পর্বতারোহীরাও পুরোদস্তুর ক্রীড়াবিদ। অনেকে সারা বছর জিম বা অনান্য শারীরিক কসরৎ করে থাকেন। হাই ক্যালরি খাবার ও এনার্জি ড্রিংকস খান। পর্বতারোহীদের কারও কারও মেজাজ আবার খুবই উচুঁ তারে বাঁধা থাকে। সামান্য কথাতেই ব্লিজার্ড হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রায়। আবার অনেকে অসম্ভব রকমের নম্র ও ভদ্র। কেউ কেউ (আবার বলছি কেউ কেউ) আবার ট্রেকার বা পাহাড়প্রেমীদের নিম্নবর্ণের ও অচ্ছুৎ বলে মনে করেন। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন সব কিছু, এমনকী নিজের ফ্রেটারনিটির পর্বতারোহীদেরও।
মুম্বই সঙ্গীত জগতের দুই কিংবদন্তী কণ্ঠশিল্পীর সম্পর্কে শোনা যায় তাঁরা নাকি অত্যন্ত প্রতিভাময় দুই শিল্পী বাণী জয়রাম ও সুমন কল্যাণপুরকে উঠতে দেননি। পর্বতারোহী মহলের কোনও কোনও জায়গায় এ রকমই  আক্ষেপ শুনেছি। এই দশকের তথাকথিত বিখ্যাত দু’জন পর্বতারোহী নাকি অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন পর্বতারোহীকে  উঠতে দেননি। সত্যাসত্য যাচাই করার ক্ষমতা ও অধিকার আমার নেই। তবে অভিযোগটা পুরনো ও অনেকের মুখ থেকে শোনা।

হিমালয়ের বিভিন্ন  পর্বতশৃঙ্গ আরোহণের দাবি, ও তা নস্যাৎ করার পাল্টা দাবি নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছে বহু দিন ধরে। সম্প্রতি বেশ কিছু জায়গায় এক পর্বতারোহীর সাম্প্রতিক আটহাজারি শৃঙ্গ আরোহণের সমর্থনে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও, আমি লিখিনি একটি লাইনও। কারণ, সঠিক তথ্য হাতে না আসায় লিখতে চাইনি। আমার কেন জানি না মনে হয়, প্রতিবেশী পাহাড়ি রাষ্ট্রটিতে শৃঙ্গ আরোহণে ম্যানিপুলেশন হয়। এজেন্সিগুলিই  নিয়ন্ত্রণ করে পাহাড়ি রাষ্ট্রটির পর্বতারোহণের রূপরেখা। আমাদের প্রতিবেশী দেশেও দেখুন, বিভিন্ন খ্যাতনামা পর্বতারোহীর শৃঙ্গ আরোহণের দাবি নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছেই এবং বিতর্ক হওয়ার যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য কারণও আছে।
আরোহণ না করে আরোহণ-সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়াটা গোয়েবলসে্র থিওরি-নির্ভর কপিবুক স্কোয়্যারকাট হতে পারে। কিন্তু দেবতাত্মা হিমালয়ের দরবারে এটা করা পাপ। কিন্তু আজকাল পাপ-পুণ্যের তোয়াক্কা কে-ই বা করে। অনেকে ভাবে দিনের শেষে স্কোরবোর্ডই শেষ কথা বলবে। কিন্তু, এক গামলা দুধে এক ফোঁটা চোনা পুরো দুধকে নষ্ট করার ক্ষমতা রাখে। তেমনই একটি মিথ্যা শৃঙ্গ আরোহণের দাবি, অতীতের  অসংখ্য শৃঙ্গ আরোহণের পালক মুকুট থেকে উপড়ে নিতে থাকে। এটা সকলের ক্ষেত্রে, সব খেলার ক্ষেত্রে, সব পরীক্ষা, সব পেশার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বর্তমানে কিছু লোকের (সংখ্যায় কম) কাছে পর্বতারোহণ পাবলিক একজ়ামিনেশনগুলোর মতো। পাশ করার জন্য যা খুশি করতে রাজি। একবার লাগাতে পারলেই পরবর্তীকালের জন্য আর চিন্তা নেই। গায়ে সারা জীবনের মতো পড়ে থাকবে প্রচারের আলো ও মানিব্যাগে স্পনসরের পয়সা। একবার কেল্লা ফতে করে দিতে পারলে, পরের পয়সায় নিঃখরচায় আরোহণের পর আরোহণ করে যাওয়া। কলার তুলে ঘুরে বেড়ানো, বই লেখা, সভা সমিতি আলোচনাসভায় গুরুত্বপূর্ণ আসন গ্রহণ করা।  এই নিয়ে  রেষারেষিও লাগে সেয়ানে সেয়ানে। এর স্পনসর অন্য কেউ তুলে নিচ্ছে, ওর স্পনসর আরও কেউ হাইজ্যাক করে নিচ্ছে। তবে একটা কথা বুঝেছি, পর্বতারোহণের সঙ্গে জড়িত অনেকেই আজ সুখী নন। অনেক পোড়খাওয়া কৃতী পর্বতারোহী জীবন সায়াহ্নে এসে পর্বতারোহণকে এই অবস্থায় দেখে খুবই মনোকষ্টে আছেন। তবে, এত নেতিবাচক পরিস্থিতিতেও আমার কিন্তু মনে হয়, অনেক পর্বতারোহণ সংস্থা ও বেশ কিছু পর্বতারোহী,  প্রচারের আলো থেকে অনেক দূরে অসীম নিষ্ঠায় নিজেদের কাজ করে যাচ্ছেন। নতুন নতুন ছেলে মেয়ে উঠে আসছেন, যাঁদের উপর আমরা ভরসা রাখতেই পারি। যাঁরা কোনও কথায় কান না দিয়ে, কোনও বিতর্কে না ঢুকে, শুধু পর্বতারোহণ নিয়েই ভেবে চলেছেন।

আমার সঙ্গে  অতীতের ও বর্তমানের অনেক পর্বতারোহীর আলাপ ছিল, আছে, হচ্ছে ও হবেও। আমাকে নিয়ে একটি মজাদার  জনশ্রুতি তৈরি রয়েছে। আমি কোনও বিশেষ পর্বতারোহীর পেটোয়া প্রতিবেদক (সেই পর্বতারোহীকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন, যে তিনি জীবনে আমাকে চোখে দেখেছেন কি না)। কারণ, অন্য একটি পত্রিকায় (বর্তমানে আমি সেই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত নই) সেই পর্বতারোহী সম্পর্কে আমার একটি প্রতিবেদন। সেই প্রতিবেদনে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ পর্বতারোহীদের মতে  পশ্চিমবঙ্গের সর্বকালের অন্যতম সেরা পর্বতারোহী বলা হয়েছিল।
পাঠকেরা হয়তো জানেন, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত প্রতিবেদকের প্রতিবেদন প্রয়োজন মতো পরিমার্জনের সম্পূর্ণ অধিকার থাকে কর্তৃপক্ষের। এবং সেলিব্রিটি সাংবাদিক বাদ দিয়ে প্রায় সকলের প্রতিবেদনই অল্পবিস্তর কাটাছেঁড়া বা শব্দের সংযোজন-বিয়োজন হয়েই  থাকে। সেই পরিমার্জন যে সব সময় প্রতিবেদকের পছন্দসই হবে, তা নয়। কিন্তু আর্থিক চুক্তিতে থাকা প্রতিবেদক সেটা মানতে বাধ্য। আমি গৌরকিশোর ঘোষও নই, বা এম জে আকবরও নই, যে আমার লেখায় হাত পড়বে না। অতএব কাকের বাসায় কোকিল ডিম পেড়ে গেলেও কাকের সেই ডিমে ‘তা’ দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না, দায়ভার বহন করতেই হয়। বারবার বাসা পাল্টালেও কোকিল থাকবেই।

আমার অবস্থাও একই রকম। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাকে নিয়ে করা পোস্ট আমাকে ট্যাগ করেন অনেকে, ইনবক্স করেন। কিছু বলি না, রাগও করি না, কারণ ওঁরা শুধুই প্রতিবেদনটা পড়েছেন ওঁদের ওপর রাগ করব কোন যুক্তিতে, কোন অধিকারে। মনে করুন কোনও একটি দেশের এক জন পুলিশ ভোট দেন যে দলকে, হয়তো সেই দলের বিরুদ্ধেই লাঠি চালান ঊর্ধ্বতন  কর্তৃপক্ষের আদেশে। তাঁর লাঠির আঘাতে মাথা ফাটে যে সমর্থকের, তাঁর রক্ত সবাই দেখতে পান। পুলিশের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের খবর ক’জন রাখেন। আসলে দিনের শেষে সবাইকেই চাল-ডাল-তেল-নুনের খবর নিতে হয়। এই জন্য হয়তো জোটে গালাগাল, কিন্তু সংসারের অনেকগুলো পেটও তো ভরে। তাই মাঝবয়েসে এসে লেখার প্রশংসায় একটুও উৎফুল্ল হই না বা সমালোচনাতে একটুও ভেঙে পড়ি না। কারণ আমি জানি, দুটোই ক্ষণস্থায়ী। এই শিক্ষাই আমাকে দিয়েছে হিমালয়। তবে এই সুযোগে আমি জানিয়ে দিই আমার চোখে (হ্যাঁ, এবার আমার চোখে) ভারতের  সেরা দুই পর্বতারোহীর নাম। এক জন হলেন নন্দু জয়াল, অপর জন অসীম মুখোপাধ্যায় এবং সেরা বিদেশী পর্বতারোহী হলেন জুরেক(Jerzy Kukuczka)। একান্তই ব্যক্তিগত মতামত।

আমি দেখেছি আমার কোনও লেখা তাঁর মতের বিরুদ্ধে গেলে অনেক পুরোনো পাহাড়ি বন্ধুকে গোঁসা করে কথা বন্ধ করে দিতে। কোনও এক সময়ে আমাকে উপহার দেওয়া স্লিপিং ব্যাগ ফিরিয়ে নিতে। কিন্তু আমার কিছু করার থাকে না। আমি একমাত্র আমার কলমের কাছে দায়বদ্ধ। আর কারও কাছে  নয়। তাই আমার বাসা পাল্টানো চলেছেই। লেখার নিরপেক্ষতার জন্যই, আমি আমার লেখার সাবজেক্ট হতে পারেন এমন ব্যক্তিদের  সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলি না। পরিচয়টা রেখে দিই ফোনের ওপারেই, বড়জোর রাস্তাঘাটে, অনুষ্ঠানে,  হাই-হ্যালো অবধি। আজ যাঁর কৃতিত্বের প্রশংসা করছি, কালকেই হয়তো তাঁর সমালোচনা আমার কলমেই উঠে আসবে। তাই কাজের সম্পর্ককে ভুলেও নিজের জীবনবৃত্তে আনি না। আমার কলম চালাবে একমাত্র আমার মন, অন্য কেউ নয়। আমার ফেসবুক প্রোফাইলে একটা কবিতা গোছের কিছু আছে, আমার লেখা। আপনাদের জন্য এখানে দিলাম।

যদি ভাবো কাড়বে কলম, ভুল ভেবেছো,
এ কলম কলম তো নয়, মেশিনগান।
জেনেশুনে মৌচাকেতে ঢিল মেরেছো,
বুলেটের আঘাত দেবে, আজ স্লোগান।

এটা পড়ে, কেউ চলতি ভাষায় আমাকে পালিশ করে বলেছেন আমি মাকু(বামপন্থী)। কেউ ইনবক্সে  বলেছেন আপনি মাকু না, আপনি ডাকু(দক্ষিণপন্থী)। কিন্তু পাঠক, আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকে  আমার মগজের LTM-এ(long term memory)। মাথা থেকে ঠিক সময়ে নেমে আসে বুথের বোতামে। কিন্তু কলমের অবস্থানে, আমি কিন্ত প্রথম থেকেই আছি নিজ পন্থায়, নিজ পথে এবং হিমালয়ের হিমেল সুদীর্ঘ  ছায়ায়। সেই সমতট পত্রিকা থেকে পাহাড় নিয়ে আমার লেখা শুরু। লেখা নিতেন আমার স্যার মনোজ রায়চৌধুরী, কারেকশন করতেন বৌদি অরুণিমা রায়চৌধুরী। সন্দেশ পত্রিকার সেই  বিখ্যাত ‘তোমাদের অরুণিমাদি’।
তবে আমার লেখায়  অনিচ্ছাকৃত, ভুল হয়ে যায় কদাচিৎ, আমারই অসতর্কতায়। ভুল স্বীকার করে নিই নিঃসংকোচে। পাহাড় আমাকে শিখিয়েছে ভুল স্বীকার করাটা অগৌরবের নয়। যেমন শৃঙ্গ আরোহণ করতে না পারাটাও অগৌরবের নয়। আরোহণ না করে আরোহণ দাবি করাটা অগৌরবের।

এবার দেখুন সাধারণ বা গড়পড়তা  ট্রেকারদের। সারা বছর জিমে যাওয়া নেই। দামী ইকুইপমেন্ট বা গিয়ার নেই (লাগেও না)। স্পনসরের চাপ নেই। এজেন্সিকে সামিট সার্টিফিকেটের জন্য তেল মারা নেই। এজেন্সিকে নতুন ক্লায়েন্ট জোগাড় করে দিলে কমিশনের গল্প নেই। মিডিয়াকে তুষ্ট রাখার ছক নেই। শৃঙ্গ আরোহণ প্রমাণ করার দায় নেই। কোনও কিছু গোপন করার প্রয়াস নেই। শুধু নেই আর নেই। গুপীগাইন বাঘা বাইনের শুন্ডিরাজ্যের  স্বেচ্ছাচারী মন্ত্রী  জহর রায়ের মতো জিজ্ঞেস করুন, “ট্রেকারদের তাহলে কী আছে!”
গুপ্তচরের ভূমিকায় অভিনয় করা চিন্ময় রায়ের আবেগে উত্তর পাবেন, গাঢ় নীল আকাশের নীচে দুধ সাদা হিমালয় আছে। খেটে খাওয়া পাহাড়ির দাঈয়ের জুম চাষের খেত আছে। সবুজ, ঠাসবুনট ঘাসে মোড়া সুন্দরী মিডো আছে। উচ্ছল যৌবনা ঝর্না আছে। উত্তুঙ্গ গিরিপথ আছে। হাড়কাঁপানো বাতাস আছে। প্রাগৈতিহাসিক শ্যাওলা ধরা ম্যাপল আছে। পুরোনো রুকস্যাক আছে। তালিমারা হান্টার আছে। সমবয়সী ক্যামেরা আছে। সব চেয়ে বড় কথা অতি সাধারণ কিছুর মধ্যে অসাধারণ খুঁজে দেখার চোখ আছে। অতলস্পর্শী ক্রিভাসের মতো  হৃদয় আছে, যেটা অচেনা মানুষকে এক লহমায় আপন করে নেয়। হিমালয় এঁদেরই পরম মমতায় বুক পেতে দেয়। এবং এঁরা মাকে দেখে বিহ্বল শিশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়েন হিমালয়ের বুকে।

হাল্লা চলেছে যুদ্ধে, মানে পর্বতারোহণে। যাচ্ছেন জোংরি দিয়েই। দশ বারো জনের দল, সঙ্গে খান পঁচিশ পোর্টার, ততোধিক ইয়াক ঠাসা লটবহর। ইয়াকসামে থাকাকালীন  ইয়াকসামের দুবদি মনাস্ট্রিতে এই টিমটিকেই দেখেছিলাম খাড়া পথে দৌড়ে উঠতে। ভারী ভারী বিদেশী ব্যাকপ্যাক, ওয়েস্ট পাউচ, ওয়াকিং স্টিক, ব্র্যান্ডেড অ্যাডভেঞ্চার গগলস আঁটা মুখগুলো উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। দলে তিন জন মহিলাও আছেন। সঙ্গে দার্জিলিংয়ের শেরপা। হইহল্লায় মাতলো সারা দিন ঝিমিয়ে থাকা জোংরি। কমলা রঙে টেন্টগুলো ক্যাম্পসাইটে ফুটে উঠলো ব্রহ্মকমলের মতো। একটু দূরে আমাদের জলপাই রঙের পুরনো টেন্টটা যেন দাঁত বার করে হাসছে। যেন আমাকে  বলছে, জীবনে কিনতে পারবে না ওই ফুল। আমাকেই তোয়াজ করে, ন্যাপথলিন মেরে, অ্যান্টিফাংগাল স্প্রে মেরে গুছিয়ে রাখতে হবে। ওখান থেকে চলে এসো বলছি। টেন্ট টেন্টকে ঈর্ষা করে? নাকি আমার মতো পুরোনো বিশ্বস্ত সঙ্গীর সঙ্গ হারানোর ভয়, কে জানে। আমার আদুরে টেন্টের কাছে গিয়ে পরম মমতায় হাত বোলাই। দূর পাগল, ওসব রাজা-রাজড়াদের সাজে। আমার এক জীবনের জন্য তুই-ই যথেষ্ট।

জোংরিতে  ট্রেকারদের ভিড় আছে। বেলা পড়ে আসছে। কোনও কোনও ট্রেকার  জোংরি টপে সূর্যাস্ত দেখার জন্য উঠে যাচ্ছেন। জোংরি টপে সুন্দর একটা বাঙ্কার ছিলো, হয়তো এখনও আছে। যেখানে খিচুড়ি,  স্লিপিংব্যাগ, ক্যারিম্যাট ও জল নীচ থেকে নিয়ে গিয়ে রাত কাটিয়ে আসতাম, ফাঁকা থাকলে। ভোরের প্রথম সূর্যের আলোয় দেখব হিমালয়ের অনির্বচনীয় রূপমাধুরী।  সূর্যের রশ্মিপাতে কী ভাবে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে পাণ্ডিম(৬৬৯১মি), কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮৫৮৬ মি), কাবরু  ডোম (৬৬০০মি), কাবরু  নর্থ (৭৩৩৮মি), কাবরু সাউথ( ৭৩১৭মি), রাতং (৬৬৭৯মি), কোকতাং (৬১৪৭মি), ফ্রে পিক(৫৮৩০মি), কাংলা-কাং (৫৫৬০মি)। হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম, অ্যানালগ ক্যামেরার শাটার টিপতে ভুলে গিয়ে।
যাহোক, উৎসাহী ট্রেকাররা ইতিমধ্যে ভিড় করে পর্বতারোহীদের দলটিকে দেখছেন, আমরাও দেখছি। এঁরা শৃঙ্গের মাথায় উঠবেন। কোন শৃঙ্গ জানি না, তবে চলন বলন দেখে মনে হচ্ছে সাধারণ পর্বতারোহী নন এঁরা। ট্রেকারদের অস্তিত্ব নিয়ে আদৌ চিন্তিত নয় দলটি। নিজেদের মধ্যে গম্ভীর গলায় কথাবার্তা বলছে। হাসিতে ফেটে পড়ছে।মনে পড়ে গেলো ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমায় বাঘারূপী রবি ঘোষের সেই বিখ্যাত ডায়ালগ, ‘কী দাপট’!

পাহাড়ে মাউন্টেনিয়াররা প্রথম শ্রেণীর নাগরিক। শেরপা, পোর্টার থেকে টি হাউস, হোটেল, হোমস্টে সবাই সমীহ করেন, বিশেষ সম্মান দেন মাউন্টেনিয়ারদের। বীরপুজো হয়তো। জোংরিতে সাড়া পড়ে গেছে, বিভিন্ন গ্রুপের পোর্টাররা হাওয়া। সবাই জড়ো হয়েছে পর্বতারোহী দলের কিচেন টেন্টে। দলটি কোন শৃঙ্গ আরোহণ করতে যাচ্ছে, কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা হচ্ছিল খু্ব। কিন্তু দাপট দেখে সাহস হচ্ছে না। টিমটার সঙ্গে থাকা শেরপা ও পোর্টারগুলোও কলার তুলে শিশ মারতে মারতে যাতায়াত করছিলো। একসময়, সুন্দরী জোংরিতে ঝপ করে সন্ধ্যা নেমে এল। ট্রেকার মাউন্টেনিয়ারেরা যে যার টেন্টে কি ট্রেকার্স হাটে  ঢুকে গিয়েছেন। কমলা টেন্ট থেকে গান ভেসে আসছে, “মেরি স্বপ্নকি রানি কব আয়েগি তু, আয়ি রুত মস্তানি কব  আয়েগি তু’। বড় বড় তারার আলোয় ভাসছে জোংরি। পরিবেশটা ভারি ভাল লাগছে। টেন্টের ভেতর ঢুকতে ইচ্ছা করছে না। ঠিক এই সময় মাথায় হেডল্যাম্প লাগিয়ে বেরোলেন হাল্লার রাজা। দুপকেটে হাত ঢুকিয়ে তারা ভরা আকাশের দিকে তাকালেন। সঙ্গের দু’-তিন জন শেরপা ততক্ষনে একটা ছোট্ট ফোল্ডিং  টেবিল ও আর কয়েকটা  ক্যাম্বিসের চেয়ার নিয়ে এসেছে। কিচেন টেন্ট থেকে বড় ফ্লাস্কে চা বা কফি এলো, সঙ্গে স্ন্যাকস জাতীয়  কিছু। সবাই বসে পড়েন টেবিলটা ঘিরে।  গভীর আলোচনা হচ্ছে নিজেদের মধ্যে। কী বলছে শুনতে পাচ্ছি না। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি হেডল্যাম্পের নীলচে সাদা  রশ্মির সঙ্গে  ফ্লাস্কের কফির ধোঁয়া খেলা করছে। আমার টেন্টের ভেতরে বাপ্পা আর নন্দন, দু’জনে প্রেমে ল্যাং খেয়ে মহিলাকুলের প্রতি বিষোদগার করতে ব্যস্ত।
লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরালাম। কুড়ি ফুট দূরের হেডল্যাম্প আমার দিকে ঘুরে গেলো লাইটারের আগুন দেখে। আলোচনা বন্ধ, কেউ একজন উঠে আসছে আমার দিকে। কিন্তু আমি যেখানে সিগারেট খাচ্ছি তার ধারে কাছে টেন্ট নেই। আগুনের ফুলকি উড়ে টেন্টে পড়ার ভয় নেই। যাহোক লোকটা এলো, নেপালী শেরপা গোছের, বেশ লম্বাও। বললো “ফুট চলো ইহাঁসে”! বললাম, কিঁউ!  উত্তর এল, “ঝাপ্পর খানেকি ইরাদা হ্যায় কেয়া?”
হাল্লার রাজা ঠায় আমার দিকে হেডল্যাম্পটা ঘুরিয়ে আছেন। আমাকে উনি চেনেন না, কিন্তু আমি তো ওঁকে চিনি। রাতবিরেতে কে চড় খেতে যাবে? ভালোয় ভালোয় ফিরে গেলাম টেন্টে। আমার মনে হলো গডফাদার সিনেমায় আল পাসিনো আর তাঁর মাফিয়া বাহিনীকে দেখলাম তারা ভরা রাতে হিমালয়ের পটভূমিকায়।

পরের দিন সকাল সকাল আমরা তিন জন এগিয়ে গেলাম গোচালার পথে। আজকের গন্ত্যব্য থানসিং(১২৯০০ ফুট)। পাণ্ডিমের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে হাঁটছি। পাণ্ডিম শৃঙ্গটিকে  আমার খু্ব ভাল লাগে। শৃঙ্গের  মাথায় একটা বরফের কার্নিস পাণ্ডিমকে সব শৃঙ্গের  থেকে আলাদা করে রেখেছে। পাঁচ ঘন্টার ট্রেক, উতরাই দেখলেই পুলক জাগে। পাহাড়ে উতরাই দেখে উৎফুল্ল হবার কিছু নেই। কারণ হিমালয়ের দিকে  এগোতে থাকা অবস্থায়  উতরাই মানেই সামনে চড়াই। কিন্তু যতটুকু উতরাই ততটুকু সময়ের আনন্দ। হাঁটুর ও পায়ের পেশির বিশ্রাম। আমি একটু আস্তে হাঁটি, তাই বাপ্পা ও নন্দন এগিয়ে গিয়েছে পারমিশন নিয়ে, প্রেক-চুতে দেখা হবে জানিয়ে। আগে এসেছি কয়েক বার, তাই পথ হারানোর চিন্তা নেই। একটু পরেই অনেক অভিযাত্রী এই পথে এসেও পড়বেন।
ঘন্টা দুয়েক হাঁটার পর রাস্তার পাশে বসে আছি। দেখা মিলল জোংরির দিক থেকে আসা তিন জন অভিযাত্রীর। হলুদ জ্যাকেট আর জলপাই রঙের কার্গো ট্রাউজার্স পরা হাল্লার রাজা আসছেন। সঙ্গে দু’জন শেরপা। বেশ স্পিডেই আসছেন। আমার কাছে এসে থমকে দাঁড়ালেন। ভয় পেলাম, আবার কী করলাম! ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়ালাম। হাল্লার রাজা আমার নীলচে সস্তার উইন্ডচিটার আর কালো ট্র্যাকস্যুট কম্বিনেশনটা চিনতে পেরেছেন। আমার পিঠে হাত রেখে হাসতে হাসতে বললেন, ‘সরি’। তারপর আমার হাত থেকে জলের বোতলটা টেনে নিলেন। পারমিশন না নিয়েই। কাঁধে হাত রেখে এক লিটারের ভর্তি বোতলটা প্রায়  নিঃশেষ করে ফেললেন। আমাকে আরও চার ঘন্টা হাঁটতে হবে, সে খেয়াল না রেখেই। তার পর আমার পিঠে উৎসাহ দেওয়ার ভঙ্গিতে চাপড় মেরে বললেন, “গোচালা যাচ্ছেন, বাঃ!”
এই না হলে রাজা! উনি কোথায় যাচ্ছেন আমি জানতে পারলাম না, উনি জেনে ফেলেছেন আমি কোথায় যাচ্ছি। আমার পিঠে আবার চাপড় মেরে আর একটিও বাক্যব্যয় না করে আমাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলেন হাল্লার রাজা। ভ্যাবলার মতো এক বার রাজাকে দেখি একবার জলের বোতলকে। ঠিক সেই সময় আমার মনের ভেতর কে যেন অবিকল রবি ঘোষের গলায় বলে উঠলো,
“বাপ রে, কি দাপট”।

(লেখক নিজেকে বোহেমিয়ান,বাউন্ডুলে, উড়নচন্ডী  এইসব বিশেষণে অভিহিত করতে ভালোবাসেন।হিমালয়কে হৃদয়ের গভীরতায় মাপেন, উচ্চতায় নয়।)

Shares

Leave A Reply