‘আমি এক ভাল মানুষকে হারিয়েছি, আমার সন্তান ভাল বাবাকে হারাল!’ বিচার চেয়ে বললেন জর্জ ফ্লয়েডের স্ত্রী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: জর্জ ফ্লয়েড একজন ভালো মানুষ ছিলেন। তাঁর কন্যাসন্তানের জীবনের সবচেয়ে দামী জিনিসটা ছিনিয়ে নিয়েছেন ওই পুলিশ অফিসার। এর সুবিচার করতেই হবে।– মিনেপলিসে সাংবাদিক বৈঠকে আবেগপ্রবণ হয়ে এমনটাই বললেন মৃত জর্জের স্ত্রী রক্সি ওয়াশিংটন। পাশে বসা ছোট্ট মেয়ে জিয়ানাকে দেখিয়ে রক্সি জানিয়েছেন, তার জীবন থেকে সবচেয়ে দামী জিনিস ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফ্লয়েড আর তাঁর সন্তানকে বেড়ে উঠতে দেখতে পাবেন না। এত বড় ক্ষতির বিচার চান তিনি।

জর্জ ফ্লয়েড। এই মুহূর্তে মার্কিন মুলুকের তথা সারাবিশ্বের অন্যতম আলোচিত এক নাম। যে নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে বহু মানুষের চোখের সামনে ভেসে উঠছে নিষ্ঠুর ও কদর্য এক ভিডিও। সে ভিডিওয ফ্লয়েডকে মাটিতে ফেলে, হাঁটু দিয়ে দীর্ঘ সময় তাঁর ঘাড় চেপে ধরে রেখে হত্যা করছে এক পুলিশ। নিদর্শন রাখছে আরও এক নৃশংস কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার।

ফ্লয়েডের খুন সারা আমেরিকাকে পথে নামিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে তাঁর সঙ্গে ঘটা এই অন্যায়। এ খুন দেখে ভয়ে শিউরে উঠেছেন প্রতিটা মানুষ। তবে এই ভয়াবহতা দিয়ে ফ্লয়েডকে বিশ্ববাসীর কাছে স্মরণীয় করে রাখতে চান না তাঁৎ পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা চান, মানুষ যেন ফ্লয়েডকে মনে রাখে একজন অসাধারণ বাবা হিসেবে, একজন ভাল মানুষ হিসেবে।

George Floyd with his baby daughter Gianna : pics

জর্জ ফ্লয়েডের জীবন আদতে ছিল খুব অনাড়ম্বর, কিন্তু সুখে স্বস্তিতে ভরা। তাঁর একমাত্র মেয়ে জিয়ানার বয়স মাত্র ছয় বছর। সে এখনও ঠিকমতো বুঝতেও পারেনি, আদতেই কী ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেছে তার জীবনে। বাবা আর ফিরে আসবে না, এটুকুই হয়তো বুঝেছে এই কয়েক দিনে।

জিয়ানার মা রক্সি ওয়াশিংটন চান, মানুষ জানুক ওই পুলিশ অফিসাররা তাঁর কাছ থেকে কোন মানুষটিকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন। কারণ, দিন শেষে ওই মানুষগুলো পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরে যাবে, সুখে দিন কাটাবে। জিয়ানার বাবা খুব ভাল মানুষ ছিলেন। তবু জিয়ানা তাঁকে পেল না জীবনে। এ যন্ত্রণা রাখার জায়গা নেই রক্সির। দেশ-কাল-রাজনীতি-বৈষম্যের ঊর্ধ্বে, এই নিজের মানুষ হারানোর যন্ত্রণা তাঁকে পাথর করে দিয়েছে।

রক্সি বলেন, “ছোট্ট জিয়ানার বাবা তো আর ফিরে আসবে না। জিয়ানার বড় হওয়া, লেখাপড়া শিখে মানুষ হওয়া কিছুই তার দেখা হবে না। পৃথিবীর সবকিছু চলবে, কেবল জিয়ানার জীবনে জর্জ আটকে থাকবে ছয়টি বছরে। জিয়ানার ছোট্ট আঙুল ধরে আর হাঁটা হবে না জর্জের। ওর কোনও সমস্যায় পাশে থাকবে না সে, পাহাড়ের মতো আগলে রাখবে না মেয়েকে। আর জিয়ানা, এ জীবনে তার বাবা আর থাকবে না।”

সত্যিই! এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হয় একটা মানুষের জীবনে! জিয়ানার মায়ের কথায় যেন বুক ভেঙে গেছে সকলের। প্রতিবাদ ভুলে চোখ মুছেছেন তাঁরা।

আমেরিকার মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে আফ্রিকান-আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েডকে গত ২৫ মে গ্রেফতার করতে গেছিল পুলিশ। সেখানেই তাঁর উপর অকথ্য নির্যাতন করেন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডেরেক চাওভিন। প্রাক্তন বাস্কেটবল খেলোয়াড় ফ্লয়েডের মৃত্যু হয় সে অসহ্য নির্যাতনে। পরে এক প্রত্যক্ষদর্শী ১০ মিনিটের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে দিলে, চাওভিনের কীর্তি সামনে আসে। দেখা যায়, গলায় হাঁটু চেপে ধরায় ফ্লয়েড বারবার কাতর স্বরে বলছেন, ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না।’

ভিডিওটি ভাইরাল হলে চাওভিনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। মিনেসোটা থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো আমেরিকায়। বিশ্বের নানা প্রান্তে বাড়ছে ঝড়। তবে জর্জের পরিবারের অন্তর কেবলই পুড়ছে প্রিয়জন হারানোর ব্যথায়।

Mother of George Floyd's daughter: 'He will never see her grow up'

জর্জদের পারিবারিক আইনজীবী ক্রিস স্টুয়ার্ট বলেন, “জর্জকে হত্যা করার যে ভিডিও আমরা সবাই দেখেছি, তা ভয়ংকর। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমরা আর এখ দফা হিংসাও দেখলাম রাষ্ট্রের তরফে। আবার মানুষের হৃদয়ের সৌন্দর্যও দেখলাম। তাঁরা জর্জের জন্য রাস্তায় নেমেছেন, তাঁরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এর বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এটা এমন নয় যে মানুষ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আর বিক্ষোভে দাঁড়িয়ে গেল। এটা এখন মানুষের ভবিষ্যতের বিষয়। জীবনের লড়াই। সন্তানের কাছ থেকে বাবাকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জন হারিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে এত মানুষ জেগে উঠেছেন। দেশের একটা বড় পরিবর্তন দেখলাম আমরা।”

তবে এ পরিবর্তন কি আদৌ কাঙ্ক্ষিত ছিল, এমন প্রশ্নও তোলেন স্টুয়ার্ট। তিনি বলেন, “আমরা কি এমনটা দেখতে চেয়েছিলাম? আমরা তো চেয়েছিলাম আমাদের সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ দেখতে। জিয়ানার বেড়ে ওঠা দেখতে চেয়েছিলাম আমরা। মেয়েটা কিছুদিনের মধ্যে লম্বায় আমায় ছাড়িয়ে যাবে। বাবা থাকবে না ওর পাশে। আমরা এ হত্যার বিচার চাই।”

George Floyd's Daughter Gianna Video: Says 'Daddy Changed The ...

জিয়ানার মা রক্সি ওয়াশিংটনও এ হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান। তিনি বলেন, “অন্যরা কী ভাবছে, তা নিয়ে আমি ভাবি না। আমার মেয়ে জিয়ানাকে দেখলেই বোঝা যায় ওর বাবা কত ভাল মানুষ ছিলেন। আমি ভাল মানুষের খুনের বিচার চাই।”

একদিকে প্রতিবাদের আগুন, অন্যদিকে প্রিয়তম জনকে এভাবে হারানোর বেদনা। আমেরিকা জুড়েও যখন বড় একটা প্রতিবাদী ঝড়, অন্য দিকে ৩৮ স্ট্রিট অ্যান্ড শিকাগো অ্যাভিনিউ ভরে রয়েছে মোমবাতির নরম আলোয়। বহু মানুষের দেওয়া ফুল, কার্ড উপচে পড়ছে সেখানে। শত শত মানুষের ভেজা চোখের প্রার্থনা গুনগুন করছে শ্রদ্ধায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More