উনিশে কুর্নিশ জানান এই নারীদের, সাহসের ডানায় যাঁরা আকাশ ছুঁয়েছেন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ বছরটায় যেন অচলায়তন ভাঙার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন তাঁরা। কেউ উড়িয়ে দিয়েছেন সামাজিক বাধা, কেউ মুছে দিয়েছেন লিঙ্গবৈষম্যের বেড়াজাল। কেউ আবার শারীরিক ভাবে দগ্ধে গিয়ে ছেড়েছেন যুদ্ধের ময়দান, কেউ ধর্মীয় গোঁড়ামির চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন তুলে মনে করিয়ে দিয়েছেন, এটা ২০১৯ সাল! আসুন, বছরের শেষ দিনে জেনে নিই তাঁদের কথা।

    শবরীমালার বিজয়মালা পরলেন বিন্দু ও কনক

    দেবতা ব্রহ্মচারী। তাই তাঁর মন্দিরে ঢুকতে পারবেন না পঞ্চাশ বছরের কম বয়সী মহিলারা। কয়েক দশকের এই কুপ্রথা ভেঙে শেষ অবধি কেরলের শবরীমালা মন্দিরে ঢুকলেন দুই মহিলা। ২০১৯ সালের শুরুয়াতে এই ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে তাঁরা জানিয়েছিলেন, অবশেষে স্বপ্ন সফল হল।

    মন্দিরে ঢোকা নিয়ে সারা কেরলের পরিস্থিতি যখন অগ্নিগর্ভ, তখন চরম সাহসের সঙ্গে, কালো পোশাক পরে, মধ্যরাতের অন্ধকারে, মন্দিরে ঢুকে দেবতার কাছে প্রার্থনা করে এসেছিলেন কান্নুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা বিন্দু আম্মিনি এবং সরকারি কর্মচারী কনকদুর্গা। দু’জনের বয়সই চল্লিশের কোঠায়।

    বিন্দু বলেন, “আমি জানতাম আমার প্রাণের ভয় আছে। কিন্তু তারপরেও আমি মন্দিরে যেতে চেয়েছিলাম। কারণ এটা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার।” কনকদুর্গা বলেন, “আমরা যা করেছি তার জন্য আমরা গর্বিত। আমাদের দেখে আরও অনেক ঋতুমতী মহিলা মন্দিরে যাওয়ার কথা ভাববেন।” এর পরেও অবশ্য সামাজিক ভাবে কম অপমান ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়নি তাঁদের। প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে থেকেছেন তাঁরা। সয়েছেন নিয়মিত হুমকি। কিন্তু তবু দমেননি একটি বারও।

    ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং লিঙ্গবৈষম্যকে ভেঙেচুরে দিয়েছে এই দুই সাহসিনীর লড়াই।

    সেনাবাহিনীর গর্ব: আকাশে শৈলজা, সাগরে শিবাঙ্গী

    এই বছরেই অগস্ট মাসে ভারতীয় বায়ুসেনার প্রথম মহিলা অফিসার এবং গাজিয়াবাদের হিন্ডন এয়ারবেসের প্রথম মহিলা ফ্লাইট কম্যান্ডার হিসেবে কাজে যোগ দেন শৈলজা ধামি। দক্ষ পাইলট, ফ্লাইং ইনস্ট্রাকটর এবং ফ্লাইট কম্যান্ডার। উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ হিন্ডন বায়ুসেনা ঘাঁটির চেতক হেলিকপ্টার ইউনিটের প্রথম মহিলা কম্যান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। হিন্ডন এয়ারবেস শুধু ভারতেরই নয়, এশিয়ার অন্যতম বড় বায়ুসেনা ঘাঁটি।

    লুধিয়ানার মেয়ে শৈলজার স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার। গত ১৫ বছর ধরে বায়ুসেনার উইং কম্যান্ডার হিসেবে কাজ করছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘হেলিকপ্টার ওড়ানো আমার কাছে গাড়ি চালানোর থেকেও সহজ। কারণ সামনে কোনও ট্র্যাফিক থাকে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার।’’ শৈলজা এখন এক সন্তানের মা। পরিবার ও পেশা, দু’দিকই সমান ভাবে সামলাতে পারেন বায়ুসেনার এই দক্ষ অফিসার।

    এ বছরের শেষে দেশের নৌবাহিনীর পাইলটের দায়িত্বে হাতেখড়ি হয়েছে আরও এক কন্যার। তিনি লেফটেন্যান্ট শিবাঙ্গী। ২ ডিসেম্বর নৌসেনার পাইলটের আসনে বসেন শিবাঙ্গী। ভারতীয় নৌসেনার প্রথম মহিলা পাইলট হিসেবে দায়িত্বভার তুলে নেওয়ার পরে শিবাঙ্গী বলেন, “অনেক বড় সিদ্ধান্ত। এই দায়িত্ব পেয়ে আমি গর্বিত। দেশের সম্মান রক্ষা করব।”

    বিহারের মুজফফরপুরের বাসিন্দা শিবাঙ্গী পড়াশোনা করেছেন ডিএভি পাবলিক স্কুল থেকে। ইঝিমালায় ভারতীয় নৌবাহিনীর অ্যাকাডেমি থেকে ২৭ এনওসি প্রশিক্ষণ নিয়ে নৌসেনার এসএসসি পাইলট হিসেবে যোগ দিলেন শিবাঙ্গী। সাদার্ন ন্যাভাল কম্যান্ডে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তিনি।

    বায়ুসেনার ও নৌসেনার অন্দরে এভাবেই রাজত্ব করে চলেছেন দুই ভারতীয় কন্য়া। কঠিন এক লিঙ্গবৈষম্যের পাহাড় টপকেছেন তাঁরা।

    উন্নাওয়ে দগ্ধে মরেছেন এক তরুণী, লড়ছেন আরও এক

    পুলিশি হিসেব অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত শুধু উন্নাওতেই ৮৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। যৌন হেনস্থার অভিযোগ দায়ের হয়েছে ১৮৫টি। স্থানীয়দের মতে, অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে উত্তরপ্রদেশের উন্নাও। এই উন্নাওয়েরই মেয়ে তাঁরা দু’জন।

    প্রথম জন বছর তিনেক আগে ধর্ষিত হয়েছিলেন তৎকালীন বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গারের হাতে। আইনি বিচারের পথে লড়তে গিয়ে তাঁকে হারাতে হয়েছে বাবাকে, কাকিমাকে, বোনকে। তিনি নিজে ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখে পড়ে শয্যাশায়ী। লড়াই থামাননি তবু। শেষমেশ যাবজ্জীবন কারাবাস ঘোষণা হয়েছে সেঙ্গারের বিরুদ্ধে।

    দ্বিতীয় জনের অবশ্য সে সৌভাগ্য হয়নি।

    ২০১৮ সালের ৫ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ে এই তরুণীকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল শুভম এবং শিভম দ্বিবেদী নামের দুই যুবকের বিরুদ্ধে। এলাকায় প্রভাবশালী দ্বিবেদী পরিবারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে বারণ করেছিলেন সকলে। কিন্তু বছর তেইশের মেয়েটি নাছোড় ছিলেন। পুলিশে অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু নানা টালবাহানার পরে সে অভিযোগ দায়ের হতে গড়িয়ে গিয়েছিল ২০১৯ সালের মার্চ মাস। অভিযোগের পরে গ্রেফতারও হয়েছিল অভিযুক্তরা।

    শেষমেশ শুনানির দিন নির্ধারিত হয়েছিল, ডিসেম্বর মাসের ৫ তারিখ। তত দিনে জামিন হয়ে গিয়েছে অভিযুক্তদের। তরুণী ভেবেছিলেন, দেরিতে হলেও বিচার পাবেন তিনি। আস্থা রেখেছিলেন আদালতের উপর। তাই ওই দিন ভোর চারটের সময়ে মা-বাবার সঙ্গে তিনি রায়বরেলি যাচ্ছিলেন, ধর্ষণ মামলার শুনানিতে উপস্থিত থাকতে।

    কিন্তু লড়াকু তরুণী তখনও ভাবতে পারেননি, কী অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। জামিনে মুক্ত অভিযুক্তরা রেল স্টেশনে এসে নির্জন ধানখেতে টেনে নিয়ে যায় তরুণীকে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে, গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় শরীরে! জলন্ত অবস্থায় এক কিলোমিটার ছুটে গিয়ে লোকালয়ে পৌঁছে স্থানীয় মানুষের সাহায্যে নিজেই পুলিশে খবর দেন তিনি। পুলিশ এসে উদ্ধার করে লখনউয়ের হাসপাতালে ভর্তি করে তাঁকে। ততক্ষণে শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছে তাঁর। শুক্রবার রাতে অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে, দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে উড়িয়ে আনা হয় তাঁকে।

    অভিযুক্ত শুভম ও শিবমের সঙ্গে ছিল শুভমের বাবা রাম কিশোর ও তাদের দুই আত্মীয় হরিশঙ্কর এবং উমেশ বাজপেয়ী। এই পাঁচ জনের নামই পুলিশকে জানিয়েছেন তরুণী।

    দু’দিন পরে থেমে যায় লড়াই। এক জন ধর্ষিতা, বিচার প্রার্থী, পুলিশের কাছ থেকে যাঁর বহু আগে থেকে নিরাপত্তা পাওয়ার কথা ছিল, তাঁর জীবন চলে যায়। যাদের সর্বোচ্চ সাজা পাওয়ার কথা ছিল, তাদেরই হাতে তাঁকে খুন হয়ে যেত হল প্রকাশ্যে!

    উন্নাওয়ের এই দুই তরুণীর লড়াই যেন নাড়িয়ে দিয়েছে ২০১৯ সালকে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে লড়াইই চলছে, তার দুই পথিকৃৎ যেন এই দুই নারী।

    ধর্মীয় গোঁড়ামির চোখে চোখ রেখে আইনের পথে সাহসী পদক্ষেপ

    ইশরাত জাহান আদতে বিহারের মেয়ে হলেও বিবাহসূত্রে হাওড়া পিলখানার বাসিন্দা। এই বছরে সুপ্রিম কোর্টে তিন তালাক প্রথার বিরুদ্ধে আবেদন জানিয়েছিলেন যে পাঁচ জন তালাকপ্রাপ্ত নারী, তাদের মধ্যে এক জন এই ইশরাত।সুপ্রিম কোর্ট তাৎক্ষণিক তিন তালাক অথবা তালাক- এ-বিদ্দাত প্রথাকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে তা নিষিদ্ধ করে রায় ঘোষণা করেছিল ২২শে অগস্ট। আইনি জয় পেলেও ইশরাতের আসল লড়াইটা শুরু হয় তার পরে।

    প্রাক্তন স্বামীর আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে পাড়াপড়শি সকলেই নানা ভাবে আক্রমণ করে ইশরাতকে। সামাজিক বাবে বয়কটও করা হয় তাঁকে। কেটে দেওয়া হয় বিদ্যুৎ সংযোগ। এক সন্তানকে নিয়ে রীতিমতো প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে একা থাকেন ইশরাত। তবু তিনি হার মানেননি। উল্টে প্রশ্ন তোলেন, কেউ যদি নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করে সেটা কি খারাপ কাজ? তিন তালাকের বিরুদ্ধে লড়াই করা ইশরাত জাহান বলেন, “আমি তিন তালাক বিলের পক্ষে বা মুসলিম মহিলাদের উপরে অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সব পক্ষকেই সমর্থন করি। আদতে সব দলই মুসলিম মহিলাদের অধিকারের পরিপন্থী।

    এ লড়াই মনে রাখবে মুসলিম মহিলা সমাজ। এ লড়াই পাথেয় হবে নারীবাদের কাণ্ডারীদের।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More