বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৮

আমেরিকায় এসে আমার মেয়ে মরে গেল, গুয়াতেমালান মায়ের কথা শুনে ডেমোক্র্যাট সেনেটরের চোখে জল

দ্য ওয়াল ব্যুরো : আর কয়েক মাস পরেই আমার মেয়ের দু’বছরের জন্মদিন ছিল। তার আগেই সে মরে গেল। খুব ধীরে ধীরে যন্ত্রণা পেয়ে মরল। এইভাবে মেয়ের মৃত্যুর কথা বর্ণনা করলেন ২১ বছরের মা ইয়াসমিন জুয়ারেজ। তিনি গুয়াতেমালা ছেড়ে আমেরিকায় এসেছিলেন বেআইনিভাবে। অনুপ্রবেশকারীদের আটকে রাখার জন্য আমেরিকায় এক ধরনের বন্দিশিবির আছে। সেখানেই স্থান হয়েছিল তাঁর। সঙ্গে ছিল ২১ মাসের মেয়ে মেরি। বন্দিশিবিরে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার ঠিকমতো চিকিৎসা হয়নি।

২০১৮ সালের মে মাসে ইয়াসমিন মুক্তি পান। তার কিছুদিন পরেই মেরি মারা যায়। বুধবার ইয়াসমিন শুনিয়েছেন, বন্দিশিবিরে অনুপ্রবেশকারীদের কী শোচনীয় অবস্থার মধ্যে থাকতে হয়।

ইয়াসমিন বন্দি ছিলেন টেক্সাসের ডিল্লে অঞ্চলে। বন্দিশিবির পরিচালনা করে ইমিগ্রেশান, কাস্টমস অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট। ইয়াসমিনের কথা শুনে ডেমোক্র্যাটিক জনপ্রতিনিধি আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্তেজকে কাঁদতে দেখা যায়।

ইয়াসমিন হাউস ওভারসাইট অ্যান্ড রিফর্ম কমিটির সামনে জবানবন্দি দেন। তাঁর কথায়, আমরা ভেবেছিলাম, গুয়াতেমালা থেকে আমেরিকায় পালিয়ে এলে, অনেক সুন্দর, নিরাপদ জীবন কাটাতে পারব। কিন্তু তার বদলে চোখের সামনে মেয়েকে মরে যেতে দেখলাম।

ইতিমধ্যে মানবাধিকার কর্মীরা বন্দিশিবিরগুলিকে অমানবিক বলে বর্ণনা করেছেন। সরকারের একাংশও তার বিরুদ্ধে সরব। ইয়াসমিন বলেছেন, সারা বিশ্বের জানা উচিত, বন্দি শিবিরগুলির মধ্যে শিশুরা কী অবস্থায় থাকে।

মেয়ের মৃত্যুর জন্য আমেরিকার সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ইয়াসমিন। তাঁর দাবি, মেয়ের মৃত্যুর জন্য ৬ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

মেয়ের অসুস্থতার বর্ণনা দিয়ে ইয়াসমিন বলেন, ডিল্লের বন্দি শিবিরে মেরি খুব কাশছিল। সেই সঙ্গে ডায়রিয়াও হল। বন্দি শিবিরে আরও অনেক অসুস্থ শিশু দেখেছি।

ইয়াসমিনের কথায়, মেরি একাই যে অসুস্থ ছিল তা নয়। অনেক শিশুকেই দেখেছি খুব অসুস্থ। তাদের চোখ লাল। ভীষণভাবে কাশছে।

মেরিকে নিয়ে তিনি বন্দিশালার ডাক্তারখানায় গিয়েছিলেন। সেখানে চিকিৎসকের সহকারী বললেন, তার শ্বাসনালিতে ইনফেকশন হয়েছে। তাকে মধু ও টাইলিনল খেতে দিলেন। কিন্তু তাতেও মেরির অসুখ সারল না। দিন দিন তার শরীর খারাপ হয়েই চলল।

কিছুদিন পরে ইয়াসমিন ও তাঁর কন্যা বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেলেন। নিউ জার্সিতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হলেন ইয়াসমিন। মেয়েকে ফের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে শিশুটির শরীর এত খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, চিকিৎসায় কোনও ফল হয়নি।

জীবনের শেষ ছ’টি সপ্তাহ মেরি কাটিয়েছিল হাসপাতালে। যেদিন সে মারা যায়, ঘটনাচক্রে সেদিন ছিল মাদার্স ডে। আগের দিন মেরির ছোট্ট হাতের ছাপ কাগজে তুলে রেখেছিলেন নার্সরা। মেয়ের মৃত্যুর পরে সেই ছাপ দেওয়া হল ইয়াসমিনকে। তিনি বলেছেন, মাদার্স ডে-তে আমাকে চমৎকার গিফট দিয়েছিল।

মিশিগানের জনপ্রতিনিধি রশিদা তলাইব বলেন, তিনিও প্যালেস্তিনীয় অভিবাসী পরিবারের মেয়ে। সজল চোখে তিনি আমেরিকার কঠোর অভিবাসন নীতির সমালোচনা করেন। আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে বন্দিশিবিরগুলি নিয়েও তিনি সরব হন।

তিনি বলেন, আমাদের আইন দরকার নেই। আমাদের সরকার নৈতিকতা। আমাদের প্রশাসনের বোঝা উচিত, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। অথচ মানবাধিকারের আদর্শের ভিত্তিতেই আমাদের প্রশাসন গড়ে উঠেছে।

তিনি সব শেষে বলেন, আমরা এমন একটা প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা কখনও ভুলবে না আমরা তাদের কী ক্ষতি করেছি।

Comments are closed.