বুধবার, অক্টোবর ১৬

‘আবকি বার, ট্রাম্প সরকার’, মোদীর মুখে স্লোগান আর বুকে ডোনাল্ড! দোস্তি দেখল দুনিয়া

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কথায় বলে, কূটনীতিতে শরীরের ভাষাও অর্থবহ হয়ে ওঠে। দুই রাষ্ট্রনেতার করমর্দন, আলিঙ্গনের উষ্ণতা দিয়ে মাপা যায় পারস্পরিক বন্ধ সম্পর্কের গভীরতা।

তা হলে একে কী বলবেন?

কানায় কানায় পূর্ণ হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়াম। পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি অনবাসী ভারতীয়র সমাগম। আবেগ উৎসাহের ঢেউ খেলে যাচ্ছে গ্যালারিতে। আর তারই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পরস্পরের হাত শক্ত করে ধরে, মাথার উপর উঁচিয়ে তুলে, ফ্লোরের কিনারা বেয়ে হেঁটে চলেছেন।

অভূতপূর্ব!

৭২ বছর হল দেশ স্বাধীন হয়েছে। ভারত-মার্কিন কূটনৈতিক সম্পর্কের বয়সও অর্ধ-শতবর্ষ পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এ যাবৎ এ দৃশ্য কেউ দেখেননি। ইন্দিরা গান্ধীর জমানায় নয়, অটল বিহারী বাজপেয়ীর জমানায় নয়, এমনকী মনমোহন-ওবামার বন্ধু সম্পর্কে অপার উষ্ণতা থাকলেও এই নাটকীয়তা একেবারেই ছিল না।

রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে আমেরিকায় গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর এই সফরেই বৈঠক হবে। সেই সঙ্গে মোদী তাঁর স্বকীয় রাজনৈতিক কেতায় এ বার হিউস্টনে অনাবাসী ভারতীয়দের উদ্দেশে বক্তৃতার জন্য সময় দিয়েছিলেন। তাতে যোগ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন ট্রাম্প।

প্রাথমিক ভাবে সে ঘোষণাতেই আন্দাজ করা গিয়েছিল, রবিবার ভারতীয় সময়ের রাত ৯ টার পর টেক্সাসে এক বড় ঘটনা ঘটতে চলেছে। কিন্তু এটা আন্দাজ করা যায়নি, পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্কের এক নয়া মাইলফলক বসাতে চলেছেন ট্রাম্প-মোদী। যে মঞ্চে একে অপরকে প্রশংসায় শুধু ভরিয়ে দিলেন না, প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। হিউস্টনের মঞ্চের ব্যাকড্রপে লেখা থাকল, ‘শেয়ারড ড্রিমস, ব্রাইট ফিউচার্স!’ ট্রাম্পকে সামনে রেখে মোদী বললেন, “উই আর এমিং হাই, উই আর অ্যাচিভিং হাইয়ার!”

আপ্লুত ট্রাম্পও। পঞ্চাশ হাজার আমেরিকান ভারতীয়কে আশ্বাস দিয়ে বললেন, “আপনারা আফ্রিকান আমেরিকান বা হিসপিয়ান আমেরিকানরাও আমাদের পরমাত্মীয়। দেশের নাগরিক। আপনাদের জন্যই আমার সরকার ভাল স্কুল, ভাল স্বাস্থ্য পরিকাঠামো সুনিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু বেড়া টপকে কাউকে আমরা ঢুকতে দেব না। আপনারাই আমেরিকার স্বপ্ন পূরণের শরিক।”

সন্দেহ নেই এই দৃশ্যের মধ্যে কোথাও না কোথাও জাতীয়তাবাদের আবেগ গুঁজে দেওয়া রয়েছে। হাজারো মাইল দূরে এ দেশের মাটিতে পা রেখে টিভির পর্দায় যাঁরা এ ছবি দেখেছেন, তাঁদের মনে হওয়াই স্বাভাবিক, এ তো ইতিহাস রচনা করলেন নরেন্দ্র মোদী। এ তো অভাবনীয়। অনেকটা সেই ইসরো স্পিরিটের মতোই।

তবুও আতসকাচের তলায় ফেলে পর্যবেক্ষকরা অন্য ভাবেও দেখছেন। আমেরিকায় নির্বাচন আসন্ন। মোদীর মঞ্চে চলে এসে ভারতীয় আমেরিকানদের কি রাজনৈতিক ভাবে পাশে পাওয়ার চেষ্টা করলেন না ট্রাম্প! মোদী কি তাঁকে সেই সুযোগ করে দিলেন না? নইলে কেন বললেন, “আব কি বার ট্রাম্প কি সরকার?”

আবার এই দৃশ্য এই জাতীয়তাবাদের আবেগ কোথাও না কোথাও ঘরোয়া রাজনীতিতে মোদীর জনভিত্তিকেও তো মজবুত করল। অর্থাৎ পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নাটকীয়তার মধ্যে দুই রাষ্ট্রনেতার রাজনৈতিক তাগিদ প্রকট ভাবেই ধরা পড়েছে।

তা হলে কি কূটনীতি নেই?

কূটনীতিকদের মতে, তা-ও রয়েছে ভরপুর। পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমেরিকাকে পাশে পাওয়ার আগ্রহ নয়াদিল্লির বরাবরই রয়েছে। তা থাকাটা স্বাভাবিক। সেই সহযোগিতার ভিত আরও মজবুত করতে চাইলেন মোদী। সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্য রয়েছে ট্রাম্পেরও। সেই সঙ্গে বেজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য লড়াইয়ে নয়াদিল্লিকে পাশে চায় ওয়াশিংটন। তা ছাড়া পারস্পরিক বাণিজ্য স্বার্থ তো রয়েছেই।

সন্দেহ নেই এই দৃশ্য দেখে উদ্বেগ উৎকন্ঠার স্রোত বয়ে যাচ্ছে ইসলামাবাদ-লাহৌরেও।

Comments are closed.