শনিবার, এপ্রিল ২০

মানুষটা নেই, কিন্তু তাঁকে ঘিরেই আজ ‘মিলন’মেলা যাদবপুরে

অনিমেষ বৈদ্য

সে সব কিছু দিন ছিল আমাদের। না ছিল চাকরি, না ছিল গতে বাঁধা একঘেয়ে জীবন, না ছিল অফিস ফেরত বিমর্ষ রাত। ছিল যাদবপুর, ছিল ক্যাম্পাস, ছিল অবারিত গান-গল্প-আড্ডা। আর ছিল মিলনদা।

সালটা ২০০১। রামকৃষ্ণ মিশনের ঘেরাটোপ থেকে এসে ভর্তি হলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলা বিভাগে। আমার কাছে সব অর্থেই ক্যাম্পাস মানে মিলনের ক্ষেত্র। মিশনের চার দেওয়াল ছেড়ে এসে অবারিত নিশ্চিন্তপুরের আদিগন্ত মাঠ। আর সেই মাঠের কেন্দ্রবিন্দু হল মিলনদার ক্যান্টিন। আমরা যারা ক্লাসরুমের থেকেও বেশি করে ‘ক্যাম্পাসে’ ভর্তি হয়েছিলাম যাদবপুরে এসে, তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জুড়ে গেল একটা নাম। মিলনদা।

ক্যান্টিনে মিলনদা

যাদবপুরে আমাদের সময়ে ক্যাম্পাসের আকাশ এত বেশি করে ঢেকে যায়নি কংক্রিটের আড়ালে। এখন মিলনদার ক্যান্টিনের উল্টো দিকে বিরাট বড় এক দালান। কিন্তু আমাদের ছাত্রাবস্থায় মিলনদার ক্যান্টিনের সামনে রাস্তার ওধারে ছিল একতলা একটি বিল্ডিং। মিলনদার ক্যান্টিনের সামনে বেঞ্চিতে বসে আমরা আড্ডা মারতে মারতে দেখতাম গলে যাওয়া গোধূলি আলোর মন কেমন করা আকাশ। পড়ন্ত বিকেলের ছায়া পড়ত আমাদের চায়ের কাপে। ক্যান্টিনের ভিড় একটু কমে থাকলে মাঝে মাঝে মিলনদা এসে হাজির হতেন সেই আড্ডায়। গল্প বলতেন আরও পুরনো যাদবপুরের, সেই তখনকার ক্যাম্পাসের। মনে পড়ে, শীতকালে মিলনদার ক্যান্টিনের সামনে মিলনের ঘাসে ঢাকা লনে আড্ডা বসতো গানের। শীতের আদুরে রোদে পিঠ দিয়ে এক একটা বিকেল কাটিয়ে দিতাম আমরা গানে গানে, দোতারার সুরে। বিকেলের শেষে হঠাৎ হঠাৎ দেখা যেত সিগারেট হাতে হাজির মিলনদা।

মিলনদার সঙ্গে আড্ডা মারার সেরা সময় ছিল সকাল বেলা। এমন অনেক দিন কেটেছে, যে সারা রাত না ঘুমিয়ে ভোর ভোর চলে এসেছি ক্যাম্পাসে। সেই সময়টা ছিল মিলনদার সঙ্গে আড্ডা মারার সেরা সময়। সেই আড্ডা থেকেই মিলনদাকে জেনেছি আর একটু বেশি করে। শুনেছি, ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় তাঁর চলে আসার গল্প, তাঁর জীবন সংগ্রামের গল্প। ওপার বাংলায় চট্টগ্রামে ছিল মিলনদার বাড়ি। সেখানে কেটেছে তাঁর শৈশব, কৈশোর। বাংলাদেশ আর চট্টগ্রামের কথা বলতে বলতে মিলনদা হারিয়ে যেতেন নস্টালজিয়ার আঁকাবাঁকা পথে। সিগারেটের ধোঁয়া যেন কর্ণফুলী হয়ে বয়ে যেত তাঁর চোখের সামনে।

সেই মুহূর্তের মিলনদাকে দেখলে মনে হত ঋত্বিক ঘটকের কোনও এক দেশভাগের নায়ক, যার চোখে-মুখে খেলা করছে ফেলে আসা দেশের ছায়া। এক বার বাংলাদেশ গিয়েছিলাম। যাব শুনেই মিলনদা একটাই আবদার করেছিলেন। মিলনদার কৈশোর যে সিগারেটের ব্র্যান্ডের ধোঁয়ায় চিনেছিল প্রথম নিষিদ্ধতার স্বাদ, সেই ব্র্যান্ডের এক প্যাকেট সিগারেট যেন নিয়ে আসি। নিয়ে এসেছিলাম। এক প্যাকেট সিগারেট যে এমন ফিরে পাওয়া হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জন হয়ে উঠতে পারে তা সে দিন জানলাম। আসলে তো শুধু সিগারেটের প্যাকেট নয়, তার সঙ্গে লেগে ছিল ওপার বাংলার হাওয়া, মিলনদার ফেলে আসা শৈশব-কৈশোর স্মৃতি।

শেষযাত্রায় যাদবপুরে

এমনই এক সকালে মিলনদার থেকে শোনা একটা লাইন বহু বার বহু জায়গায় বলেছি। আমার এক আত্মীয় ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। মিলনদা জানতেন সে বিষয়ে। দেখা হলেই খোঁজ নিতেন। সেই আত্মীয়ের মৃত্যু হওয়াতে মিলনদা বলেছিলেন, এই পৃথিবীতে মৃত্যু বিষয়টা আসলে আশ্চর্যের নয়, আশ্চর্য হল বেঁচে থাকাটাই। আজ মিলনদার মৃত্যুর খবর শুনে মনে পড়ে গেল তাঁরই বলা সেই কথাটা। নাহ্, আশ্চর্য হইনি মৃত্যুতে। শুধু আশ্চর্য হচ্ছি এত এত ভালোবাসা নিয়ে একটা মানুষের চলে যাওয়া দেখে।

যাদবপুর থেকে সেই কবে পাস করে বেরিয়ে এসেছি আমরা। কত দিন কত বন্ধুর সঙ্গে কথাও হয় না আর। সকলেই ব্যস্ত প্রত্যেকের গতিশীল সময়ের মধ্যে। তবু শুধু মিলনদার মৃত্যু ঘিরেই এতগুলো ফোন এল, ফোন করলাম পুরনো ক্যাম্পাস বন্ধুদের। মিলনদার ক্যান্টিনে যেমন আমাদের মিলন হত, আজ মিলনদা না থেকেও ফের একবার মিলিয়ে দিলেন কত দিন যোগাযোগ না থাকা কাজের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের। মানুষটা নেই, কিন্তু তাঁকে ঘিরেই যেন আজ ‘মিলন’মেলা যাদবপুরে।

আমরা যারা পাস করে বেরিয়ে গিয়েছি ক্যাম্পাস থেকে, যারা আজ ক্যাম্পাসে এলে থতমত খাই অচেনা নতুনের ভিড়ে, তাদের জন্য আছে শুধু ক্যাম্পাসের ঝিল, নোনা ধরা বিল্ডিং দেওয়াল, রাস্তায় ঝরে পড়া রাধাচূড়া। আর ছিল মিলনদা। কত কত দিন আগে পাস করে চলে যাওয়া প্রতিটি মুখ মনে রাখতেন তিনি। ক্যান্টিনের সামনে এসে দাঁড়ালেই আর মনে হতো না যে, এই ক্যাম্পাসে আমার কোনও জায়গা নেই নতুনদের ভিড়ে। মনে হত, এই ক্যাম্পাস আজও ঠিক আমার, আগের মতোই। মিলনদা ছিলেন সেই গাছ, যে গাছের নীচে এই অসময়েও ছায়া পেতাম আজকের খেলায় বাতিল হয়ে যাওয়া সেই পুরনো আমরা।

ক্যাম্পাসে গাছের মৃত্যু হয়, তার উপরে জন্ম নেয় নতুন নতুন কংক্রিট। মিলনদার মৃত্যুও আমার কাছে একটা গাছের মৃত্যুর মতো। যে গাছ এত বছর ধরে দিয়ে এসেছে আমায় মমতা এবং ভালোবাসার ছায়া, যে গাছ দিয়েছে আমায় এক আপন করা আশ্রয়।

সেই গাছের মৃত্যু হল, আর সেই মৃত গাছের উপরে জন্ম নিল এক বিরাট মন খারাপ আর শূন্যতার দালান।

লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ থেকে ২০০৬ সালে স্নাতকোত্তর এবং তার পরে মানবীবিদ্যা চর্চা কেন্দ্রে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কর্মরত।

Shares

Leave A Reply