ভাঙা পায়ের প্লাস্টার কেটে বাড়ির পথে হাঁটছেন অভিবাসী শ্রমিক ভ্রমরলাল, মনের জোরেই জয় করেছেন ভয়

মধ্যপ্রদেশের পিপরিয়া শহরে দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক ছিলেন তিনি। বাড়ি সুদূর রাজস্থানে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাঝরাস্তায় কাঁচি হাতে বসে এক যুবক। বাঁ পায়ের নীচের অংশটা জুড়ে সাদা প্লাস্টার। কাঁচি দিয়ে প্রাণপণে প্লাস্টারটি কাটার চেষ্টা করছেন তিনি। এখনও অেক পথ হাঁটতে হবে, প্লাস্টার থাকলে অসুবিধা। তাই এই সিদ্ধান্ত। লকডাউনে অভিবাসী এক শ্রমিকের এমনই ছবি সামনে এল সোমবার।

কয়েক দিন ধরেই ভিন্ রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের দলে দলে ফিরতে দেখা গেছে নানা শহর থেকে। কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে মালবাহী ট্রাকে চেপে বসেছেন, কেউ বা মাইলের পর মাইল পথ হেঁটেছেন। কোনও হবু মায়ের পেটে সন্তান, কোনও বাবার কাঁধে চড়ে আছে ছোট্ট শিশু। কারও সঙ্গে বা বৃদ্ধা মা। সঙ্গে সকলেরই বাক্স-পুঁটুলি। চোখেমুখে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক। পেটে খিদে। সারা শরীরে ক্লান্তি। আচমকা লকডাউনে তাঁদের রোজগার বন্ধ, থাকার জায়গা নেই, তাই তাঁরা কাতারে কাতারে ফিরে যাচ্ছেন তাঁদের গ্রাম-দেহাতের বাড়িতে।

তাঁদেরই একজন ভ্রমরলাল। মধ্যপ্রদেশের পিপরিয়া শহরে দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক ছিলেন তিনি। আচমকা লকডাউনে রোজগার বন্ধ হয়েছে তাঁর। বাড়িতে টাকাও পাঠাতে পারছেন না। ফেরা ছাড়া উপায় নেই। অথচ বাড়ি সুদূর রাজস্থানে। সেখানেই এই আতঙ্কের মধ্যে গ্রামের বাড়িতে একলা রয়েচে তাঁর পরিবার। তাই ফেরার পথ ধরেছেন ভ্রমরলাল। যাই হয়ে যাক, বাড়ি তিনি ফিরবেনই।

এদিকে কয়েক দিন আগেই বাঁ পায়ের তিনটে আঙুল আর গোড়ালিতে চোট পেয়েছেন তিনি। হাড় ভেঙেছে একাধিক প্লাস্টার করতে হয়েছে পা। ওই অবস্থাতেই রওনা দেন রাজস্থানের দিকে। প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার পথ যেতে হবে। মধ্যপ্রদেশে একটা গাড়ি পেয়ে যান, তাতেই প্রথম ৫০০ কিলোমিটার পথ এগিয়ে আসেন। তার পরে আর কিছু না পাওয়ায় বাকি ২৪০ কিমি পথ হেঁটেই বাড়ি ফিরবেন বলে ঠিক করেন। কিন্তু প্লাস্টার পায়ে কি হাঁটা যায়? তাই মাঝরাস্তায় বসে পড়েন প্লাস্টার কাটতে। সেই সময়েই সংবাদমাধ্যমের চোখে পড়ে যান তিনি।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ যাতে না বাড়ে, সে জন্য দেশব্যাপী লকডাউন জারি হয়েছে ২৪ মার্ত থেকে। আপাতত ২১ দিনের লকডাউন শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। কারণ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন সংক্রামক করোনাভাইরাসতে স্টেজ থ্রি-তে পৌঁছনো থেকে রুখতে পারে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। সেই কারণেই এই আপৎকালীন লকডাউন। সমস্ত অফিস, কলকারখানা, দোকানপাট, নির্মাণকাজ বন্ধ হয়েছে রাতারাতি।

এই অবস্থায় ভিন্ রাজ্যে থাকা শ্রমিকরা কী করবেন, কোথায় যাবেন, কেউ বলে দেয়নি। ফলে অভাবে হোক বা আতঙ্কেই হোক, বাড়ি ফেরার কথাই ভেবেছেন সকলে। কাজ না থাকলে অচেনা রাজ্যে জীবনধারণ করাই কঠিন। আবার ফেরার পথও কার্যত বন্ধ। এই অবস্থাতে অনেককেই কাজের জায়গা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। তাই বাড়ি ফেরার পথ ধরেছেন তাঁরা। অনেকেই পার করেছেন দীর্ঘপথ, অনেকেই আটকে গেছেন মাঝপথে।

আতঙ্ক আর অসহায়তায় আক্রান্ত এই শ্রমিকদেরই মুখ ভ্রমরলাল। যিনি ভাঙা পা নিয়েও, শুধু মনের জোরে বাড়ির পথে হেঁটে চলেছেন একটানা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More