লংমার্চ, রাজপথ ও সাক্ষীগোপাল

ভুখা পেট, ক্ষত পায়ে পথ হাঁটতেই হবে। এই রাজপথে রাতে শুয়ে থেকে আবার সকালে পথ চলতে হবে। পথের ক্লান্তি সরিয়ে মৃত সন্তানের দেহ দাহ করতে তাকে গ্রামের শ্মশানটি পর্যন্ত হাঁটতেই হবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মনোজ কুমার

    “The outstanding faults of the economic society in which we live are its failure to provide for full employment and its arbitrary and inequitable distribution of wealth and incomes.” –JOHN MAYNARD KEYNES, BRITISH ECONOMIST (1883-1946)
    টেলিভিশন দেখছিলাম আমার চার বছরের মেয়েকে নিয়ে কয়েকদিন আগে। হঠাৎ ভেসে উঠল এক সদ্যকিশোরীর মুখ। জীর্ণ, বিবর্ণ। কত অব্যক্ত ইতিহাসের সাক্ষী যেন। ছত্তিসগড়ের মাত্র ১২ বছর বয়সের ওই কিশোরী ১০০ কিমি পথ পায়ে হেঁটে এসে বাড়ি থেকে ১১ কিমি দূরেই হারিয়ে গেল মহাশূন্যে। মা-বাবার একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও যার শৈশব জঠরের আগুনের বলি হয়েছে, যার বাল্য কেটেছে অপরের করুণায়, তার অকালমৃত্যু নিয়ে সাত-আট লাইন খরচ করেছে মিডিয়া। ব্যাস! সেটাই যথেষ্ট মনে হয়েছে! তার মতো শৈশব-বাল্য-কৈশোর বলি দিয়েছে এমন পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা হাজার-হাজার, লাখো লাখোও হতে পারে! কারণ কেউ জানেন না ভূ-ভারতে এমন কত পরিযায়ী শ্রমিক আছেন, যাদের দিনলিপি এই সেদিনও পর্যন্ত গেরস্থের অন্দরমহল পৌঁছায়নি। আমরাই কতজনই বা জেনেছি তাদের এই দুর্দশার গাথা। এতদিন ধরে তারা ছিলেন শুধু তাদের ‘কাজের মাঝে’। তাদের অবস্থা ছিল ঠিক এক ‘বায়বীয় পদার্থের মতো’, তাদের অস্তিত্ব শুধু অনুভবে, ইমারতের উচ্চতায়, রাজপথের পিচ্ছিলতায়, আর খনি-গহ্বরের অন্ধকারের আওয়াজে। সভ্যতায় স্বীকৃতি শুধু ‘ওরা কাজ করে’। ভুলে গিয়েছি দৈবাৎ ওদের সঙ্গে আমাদের জীবনের পার্থক্য ঘটেছে, সেটা লেখাপড়ার কারণেই হোক, জন্মস্থানের কারণেই হোক কিংবা অন্য অনেক সুযোগের ব্যবহারের কারণেই হোক।

    সারা পৃথিবীতে কোথাও মানুষে-মানুষের দ্বন্দ্বজনিত মৃত্যু প্রায় হচ্ছে না। খুন ও ধর্ষণ পত্রিকার পাতা ভরছে না। মানুষের এখন গভীর অসুখ। তাই সবাই একযোগে সার্স-কোভ-২ অণুজীবকে কেবল মারতে চাইছেন। তার জন্য কত প্রচেষ্টা। কেউ টেস্ট কিট বানাচ্ছেন, কেউ মুখাবরণ, কেউ করছেন জিন ম্যাপিং আবার কেউ ইঁদুরের ওপর তাদের টিকা কেমন সফল হয়েছে সেটা জানাতে ব্যস্ত, কেউ আবার মানুষের ওপর তা প্রয়োগের প্রক্রিয়া জানাতে ব্যস্ত। মানবজাতি যেন উত্তাল সমুদ্দুরে একটুকরো খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছে।

    আপাত জনশূন্য এ গ্রহের নিরাপদ আস্তানায় বসে অধিকাংশ ঘরবন্দি পৃথিবীর মানুষ অন্তর্জালের মাধ্যমে এক দৃশ্য দেখে ফেলেছেন-– এ গ্রহেরই তাদের মতোই কিছু মানুষ হঠাৎই এক জনশূন্য রাজপথে মিছিল করে পথ হাঁটছেন। কই কদিন আগেও তো এদের দেখা মেলেনি, না বাস্তবে না বোকাবাক্সের পর্দায় উচ্চকিত আলোচনায়। তারাই আজ লংমার্চে। সংহত-সমবেত। আর আমরা সেই দর্শনে নিমগ্ন। এর ব্যাপ্তি ব্যক্তি পরিসরের বাইরেও সমবেতে আকীর্ণ। যা ব্যাপ্ত, বোকাবাক্সে, অন্তর্জালেও।

    “Time makes room/ for going and coming home/ and in time’s womb/ begins all ending.” মৃত্যুর চেতনার মধ্যে এই খণ্ড খণ্ড দৃশ্য কখনও হয়ে ওঠে জীবন হারানোর একটা গতিশীল রিলে দৌড়। মন্থর সে দৃশ্য-গতি। পৃথিবীর এই কালান্তক সময়ে সমবেত দেখে যাওয়া এই লংমার্চের দৃশ্যাবলি অতএব আমাদের জন্য অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল, গোটা রাষ্ট্র যখন বেবাক ভুলে গেল এই ‘পরিযায়ীদের’ অস্ত্বিত্ব, লকডাউন ঘোষণাকালে। আমরা সাক্ষী থাকছি। মন্থর দিনাবলি, ক্যামেরা, এপিক্যাল ট্র্যাজিক প্লট, দার্শনিকের মতো বোকাবাক্সের কথামালা এবং খণ্ড খণ্ড মুহূর্তের।

    দৃশ্য এক
    ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে থালা-বাসন বাজিয়ে লকডাউন শুরু হওয়ার কয়েকদিনের মাথায় নাগরিকগণ নিশ্চিন্তে গৃহবন্দি হয়েছেন। রাস্তা, পথঘাট শুনশান। মানুষ জানালায় বসে পাখির গান শুনছেন। ফেসবুকে উদ্ভট সব কাণ্ড করছেন যা কস্মিনকালে করেননি, আগামীতেও করবেন না। এমন সময় দেশের রাজপথে, হাইওয়েতে হাজার হাজার পিলপিলে পিঁপড়ের মতো, ‘হীরক রাজার দেশের’ খনিশ্রমিকের মতো মাটি ফুঁড়ে কিছু সারি সারি অবয়ব, এরা কারা? বুদ্ধিজীবীরা বললেন, তথ্য নেই। কতজন বাইরে কাজ করতে যান? তথ্য নেই। কতজন ফি-বছর ফেরেন? তথ্য নেই। সব অজানা। অজানা তাদের অস্তিত্বও?

    দৃশ্য দুই
    ঘরে রুটি নেই, সঙ্গে জল নেই। জল বা রুটি কেনার পয়সা নেই। নেইয়ের তালিকায় জীবন-পাতা ভরা। রাস্তার পাশের ঘাসের বয়সী কচি শিশুরা ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। কেউ কেউ মাঝে মাঝে ফুঁকে নিচ্ছেন বিড়ি। এতে নাকি খিদে কম পায়– অশীতিপর কাজরী বাঈ বললেন। উনিও পথ হাঁটছেন।

    দৃশ্য তিন
    সংবাদপত্রে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে ভারতে দলবেঁধে পিঁপড়ের মতো মানুষ হাঁটছে, মাথায় বোঝা, কোলে বাচ্চা। লটবহর। অপরিচ্ছন্ন পোশাক, অশক্ত শরীর। গাড়ি নেই, ঘোড়া নেই, পরিবহণের ব্যবস্থা নেই, সরকারের অনুদান নেই, এখনও নেই রিলিফের ডাল-ভাত। কয়েকজন ঠেলা করে খিচুড়ি নিয়ে এসেছিলেন প্রথম কয়েকদিন, তারপর– অনেক লোকের লাইন…। কয়েকদিন পর কেটে পড়েছেন তারাও। কোথায় চলেছেন এরা?

    অদৃশ্য জীবাণুর হাত থেকে বাঁচতে ঘরে দোর দিয়েছি আমরা। আর চকচকে, পিচ্ছিল রাস্তায় পিচের মতো বয়ে যাচ্ছেন ওরা। জনস্রোত। কাজহীন, খাদ্যবিহীন, ঘরবিহীন ভারত রাজপথে, দেশ সমাজের উদ্বৃত্ত, বাড়তি এরা কারা? টেলিভিশনের পর্দার মতো এই চলমান জনগণ। কাজের থেকে উৎখাত হওয়া এই শ্রেণিরা মূলত আমাদের দেশের মজুরদের সারি। এ তাদেরই মিছিল। একদিন কাজের খোঁজে, বাঁচার তাগিদে যারা গাঁও-গেরাম থেকে এসেছিলেন শহরে, ঝুপড়িতে, কলকারখানায়, বস্তিতে। তুলেছিলেন জীবনের জয়গান। আজ তারা বাঁচার তাগিদে ঘরমুখী। দুটো সময় যেন বিপ্রতীপ। শহরের কাজ হারিয়ে, আশ্রয় হারিয়ে, খাবার-সঞ্চয় ফুরিয়ে ফেলে ফের গ্রামের দিকে শরণার্থীর দল।

    ‘একটাও পয়সা নেই হাতে। কোনও মতে পেটে গামছা বেঁধে রয়েছি। সবাইকে মিনতি করছি, একটু আমাদের কথাটা ভাবুন’, বলছিলেন গুজরাতের সুরাত শহরে কাজ করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের এক শ্রমিক মুহম্মদ সেকেন্দার শেখ। বাড়ি মুর্শিদাবাদ। দিল্লি, মুম্বাই, গুজরাত বা দক্ষিণ ভারতে কাজ করতে যাওয়া কয়েক লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক সেইসব জায়গায় আটকে পড়েছেন। কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলি তাদের আর্থিক অনুদান এবং খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের বিষয়ে আশ্বস্ত করলেও সেসব সাহায্য তাদের কাছে এখনও পৌঁছায়নি। চেষ্টা চলছে। টেলিভিশনে বিরতি নিলেন উপস্থাপক।

    দৃশ্য চার
    আবার রাত হয়, জানলায় এসে দাঁড়ায় ভোর। টিভি-মোবাইল খুলে বসি। দেখি মজুররা সেই হাঁটছেন। এরা কাজ হারিয়েছেন। এদের মালিক কিংবা ম্যানেজার এদের কথা ভাবেননি, নাকি ভাবতে চাননি। জানি না। এই দুনিয়াভর লকডাউনের সময় রাস্তায় শুয়ে থাকার আস্তানাও তাই বাতিল। এদের কারও কোথাও কোনও গাঁ আছে, সেখানে তাদের ওপর একান্তই নির্ভরশীল কিছু বুভুক্ষু মুখ আছে। বাচ্চা, বস্তা, একান্তই টুকিটাকি জিনিসপত্র মাথায় মাইল মাইল হেঁটে পৌঁছতে হবে সেখানে। মজুররা তাই পথ হাঁটছেন। তারা জীবাণুর কথা বলছেন না। খিদে, পথ হাঁটা, আর বাড়িতে থাকা খালি পেটগুলোর কথা বলছেন। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি– দিনরাত এক করে রাস্তায় হাঁটতে থাকা এই অপরিচ্ছন্ন, রুগ্ন, পথশ্রান্ত মানুষগুলো কখন নিজেরাই পরিবর্তিত হয়ে ভাইরাস হয়ে গেছেন। ‘এই আপদগুলো আবার জীবাণু ছড়িয়ে দেবে সর্বত্র’, ভেসে আসে পড়শি বউদির উদ্বেগ। কেউ শুনে নিয়েছিল তা হয়তো। তাই রাজপথে সমবেত সকলকে উবু করে বসিয়ে আরশোলার মতো স্প্রে করা হচ্ছে তাদের গায়ে ব্লিচ মিশ্রিত জীবাণুনাশক। তাদের হাতগুলো নমস্কারের ভঙ্গিতে তখনও জড়ো। হায় রে দুর্ভাগা দেশ!

    দৃশ্য পাঁচ
    মহারাষ্ট্র থেকে ১০ জন যুব-শ্রমিক সাইকেল চালিয়ে নিজেদের গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। তারা প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন। মধ্যপ্রদেশের সীমানা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। প্রচণ্ড সূর্যের আলো এবং ক্লান্তির কারণে তাদের এক সঙ্গী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, তারপর সব থেমে যায়। চিকিৎসার আগেই তার মৃত্যু হয়। একইভাবে, পঞ্জাব থেকে আলিগড়ের পথে হাঁটতে থাকা এক শ্রমিক গ্রেটার নয়ডায় ক্ষুধায় প্রাণ হারিয়েছিলেন। মুম্বই থেকে কত অসহায় শ্রমিক সাইকেলের সাহায্যে ওড়িশা পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন। ভেবে দেখুন এইরকম কঠিন যাত্রার সময় তারা অবশ্যই প্রচুর বাধা ও সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন। বহু স্থানেই পুলিশ লাঠিপেটা করেছিল। এটাও ঠিক যে, পথে কিছু মানুষ এই সমস্ত দরিদ্র শ্রমিকদের খাবার এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করেছিলেন। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে গেলেও কই ভুলতে পারছি সেই কিশোরীর মুখ! মেয়েও তো পাশে বসে, না, তবুও তো ভুলতে পারছি না।

    দৃশ্য ছয়
    ধৈর্য ধরুন। দয়া করে কয়েকটা দিন ধৈর্য ধরুন, বলেছিলেন রাষ্ট্রীয় অভিভাবকরা। ক’দিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার পর– মোট সাইত্রিশ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এদের চারজন অবশ্য লরিচাপা পড়েছেন। একজন পথশ্রম ও ক্ষুধায় সন্তান হারিয়েছেন। আপাতত বইছেন শিশুর লাশ। কিন্তু লংমার্চে আছেন। বাড়ি পৌঁছে মৃতদেহটিকে দাহ করতে হবে তো! ঘটনা কর্নাটকের।

    দৃশ্য সাত
    চেন্নাইতে কাজ করতে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার একদল শ্রমিক। সারাদেশে লকডাউন হয়ে যেতে পারে, এমন একটা আশঙ্কা করে ২২ তারিখের জনতা কারফিউয়ের আগেই তারা ট্রেন ধরেছিলেন বাড়ির উদ্দেশে। কোনও মতে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন, কিন্তু যেহেতু ভিনরাজ্য থেকে এসেছেন, তাই ডাক্তার তাদের বাড়িতেই কোয়ারেন্টাইনে থাকার উপদেশ দিয়েছিলেন।
    ‘আমাদের বাড়ির অবস্থা এমন নয় যে, আলাদা ঘরে থাকতে পারব। আবার এই পরিস্থিতিতে গ্রামের মানুষ বা পরিবারের অন্যদের কোনও বিপদ হোক তাও চাইনি। তাই গ্রামের বাইরে একটা বড় গাছে মাচা বেঁধে আমরা সাতজন থাকছিলাম। দিন ছয়েক ওইভাবেই ছিলাম। গ্রাম থেকে খাবার দিয়ে যেত। সংবাদ প্রচার হতে সরকারি কর্মকর্তারা জানতে পারেন। তারা এখন একটা শিশু বিকাশ কেন্দ্রতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। জল, খাবার– সব সরকারই দিচ্ছে।’ বলছিলেন দিন ছয়েক মাচা বেঁধে গাছের ওপরে আশ্রয় নেওয়া এক পরিযায়ী শ্রমিক বিজয় সিং লায়া।

    দৃশ্য আট
    অণুজীবের সংক্রমণে সন্ত্রস্ত মানুষ আজ ঘরবন্দি। জনশূন্য লোকালয়ের রাস্তায়, রাজপথে, খেলার পার্কে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে হরিণশিশুরা, দু’সপ্তাহ আগের জনাকীর্ণ সৈকতে আজ নিশ্চিন্তে খেলে বেড়াচ্ছে উধাও হয়ে যাওয়া ডলফিনের ঝাঁক, কোচবিহারের রাস্তায় বেরিয়েছে তিন শাবক সমেত বাঘিনী, সমুদ্রতটে নিশ্চিন্তে অলিভ রিডলেদের প্রজনন, দিঘার সমুদ্রতট আবার ভরে গিয়েছে অধুনালুপ্ত লাল কাঁকড়ায়, মুম্বইয়ে দেখা যাচ্ছে ফ্লেমিঙ্গোদের জলকেলি করতে। বিশ্বজুড়ে মানুষেরা বাড়িয়ে দিচ্ছেন সহানুভূতির হাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সর্বাধিক বৃহৎ এ সংকটে এখনও পর্যন্ত মানুষ মানুষকে বাঁচাতে চাইছে।
    শুধু অন্ত্যজ, শ্রমিক-মালিকের লাভ খতিয়ানের সম্পর্ক ধ্রুবকের মতো অক্ষুন্ন রয়ে গিয়েছে। সব ‘বাদ’ তাদের বরবাদ করে দিয়েছে।

    দৃশ্য নয়
    গুরুগ্রামে শ্রমিকদের রেখে দেবার জন্য ‘বিশেষ সভা’ করল সে রাজ্যের সরকার। সম্প্রতি এক রাজ্য আবার গোটা ট্রেন বাতিল করে দিল মালিকদের শ্রমিকদের না ফেরানোর আবেদনে সাড়া দিয়ে। কোথাও কোথাও ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর লাঠিপেটা করেছিল পুলিশ। কী যেন চেয়েছিলেন ওরা? বুভুক্ষু শ্রমিকরা শুধু ঘরে ফিরতে চেয়েছিলেন। পরিযায়ীদের জন্য বিভিন্ন সরকার হেল্পলাইন, ওয়েবসাইট, চ্যাটবট, অ্যাপ করেছে। সেখানে মিলবে সুরাহা। কতজন সেটার সুবিধে নিতে পারবেন? সম্প্রতি এক সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, ৬২ শতাংশ জানেন না অন্তর্জাল কী, কী হয় তাতে, কীভাবে হেল্পলাইন ব্যবহার করতে হবে। বাকি ৩৮ শতাংশ, যারা ব্যবহার করবেন, এদের মধ্যে ২২ শতাংশ ইউটিউব, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ করেন, কিন্তু কীভাবে আবেদন করতে হবে, কীভাবে কী করতে হবে সে নিয়ে কোনও ধারণাই নেই। সম্প্রতি আর এক সমীক্ষায় জানা যায়, ৯৬ শতাংশ কোনও রেশন পাননি। ১১,১৬৯ জনের ওপর সমীক্ষায় জানা যায় তাদের ৮৭ শতাংশের পকেটে ২০০ টাকাও নেই। অগত্যা দৈবই ভরসা।

    দৃশ্য দশ
    লং কাট। লংমার্চ চলছে। ক্লান্ত শ্রমিকদের দল, সারাদিন তীব্র-দহন, প্রখর রৌদ্র উপেক্ষা করে চলেছেন। চলেছেন সঙ্গে শুকনো রুটি, চিঁড়া নিয়ে। পথ জানা নেই, বাস নেই, ট্রেন নেই, ট্রাম নেই। সেই ভেবেই রেললাইন দিয়ে চলেছেন সবাই। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় ভাসছে পথ-প্রান্তর। ক্লান্ত শরীর খুঁজে নেয় রেললাইনের আশ্রয়। গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন যখন জগৎ-চরাচর তখন ভোরে ক্লান্ত বিধ্বস্ত ১৬ জন শ্রমিকদের শরীরের ওপর দিয়ে ছুটে গেল আস্ত একটা ট্রেন। ট্রেনে চেপে বাড়ি ফেরার বদলে ট্রেনের চাকা তাদের ওপর দিয়েই চলে গেল! ট্রেনের চাকা নাকি কালের চাকা! টুইটার কি দেহ বয়!

    সর্বহারার দ্বন্দ্ব-– অতঃপর
    জীবন ও জীবিকার এই সাপ-লুডো খেলায় গুলিয়ে যাচ্ছে সব। নাকি গুলিয়ে দেয়া হচ্ছে? এই মহামারীর দিনে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মীরা সচেতন করছেন, বলছেন, হাত ধুয়ে জীবাণুমুক্ত থাকতে। ‘ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন’ ক্যাম্পেন চলছে। অনলাইনে পাঠ, কবিতা, গান, রামায়ণ-মহাভারতের খিচুড়ি পরিবেশিত হচ্ছে, এতদসত্ত্বেও শ্রমিকরা রাস্তায় কেন? এই প্রশ্নে অনেকে বলছেন, তারা ‘..র’ শ্রেণিবিশেষ। বলেই জিভ কেটেছেন। না দোষ তাদের নয়, হতেই বা যাবে কেন। বলেছেন বেশ করেছেন। সামাজিক অসাম্য ও মানসিক অসাম্যকে হাটে এনে ফেলেছেন। কদর্য শ্রেণিবৈষম্যে ভরা ভারতীয় সমাজে মানবিক চেতনার শেষবিন্দুতে দাঁড়িয়ে, রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে কালেক্টিভ কোরাসে নির্লজ্জ শ্রেণি-সচেতন গণমাধ্যমে শ্রমিকরা অব-মানব ছাড়া আর কী! কুনাট্যে আর কী নামাবলি লাগে! মনে পড়ে যাবে– নাৎসিরা ইহুদিদের ইঁদুর বলেছিল, রুয়ান্ডা জেনোসাইডের সময় হুতুরা টুটুদের বলেছিল, আরশোলার জাত। আমেরিকার স্লেভওনাররা আফ্রিকানদের বরাবর অব-মানুষ ভেবেছে। ডেভিড লিভিংস্টোন বলছেন– এই যে অবমূল্যায়ন ও শ্রেণি বা বর্গকরণ করা, তা আসলে খুব জরুরি। কারণ এর ফলেই দ্রুত হিংসা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় একটি লক্ষ্য-গোষ্ঠীর দিকে। দোষারোপ চলবে।

    প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরা, বন্যা হলেও মানুষ চলমান হয়। মানুষ যখন ভাত পায় না এবং বদলে তাদের ছবি তুলতে যাওয়া নির্লজ্জ ক্যামেরা তাক করা মানুষদের চিবিয়ে খায় না– তখন ঠিক কী ঘটে এবং কারা তা ঘটানোর জন্য দায়ী থাকেন? ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, ইচ্ছাকৃত অবহেলা এসবই ক্ষুধা সূচক এরই খাবার।
    মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে এই পোড়া দেশে লকডাউন করা হল। পরিযায়ীরা যথেষ্ট সময়ই পেলেন না, তার আগেই কাজ খোয়ালেন, আস্তানা খোয়ালেন ও পরিবহণহীন দেশে ভুখাপেটে মাইল মাইল হাঁটতে বাধ্য হলেন। অথচ আগাম সতর্কতা, আপৎকালীন পরিবহণ, আপৎকালীণ ভাতার ব্যবস্থা করে ফেলাই যেত, হাতে ছিল জনধন যোজনা-মোবাইল-আধার সংযোগ। বিমা, খাদ্যসুরক্ষার আইন, একশো দিনের কাজ– এসবই সমাধান এবং তা করে ফেলাও কঠিন নয় বলে মনে করেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞরা। চাইলেই দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ বা মহামারীতে মানুষের হঠাৎ কর্মহীনতার জন্য যে ক্ষুধার নির্মাণ হচ্ছে, তা রুখে দেওয়া যায় বলে ভাবেন অর্থনীতিবিদ ও ক্ষুধা নির্ণয় বিশেষজ্ঞরা। শুধু চাই, পরিকল্পিতভাবে ফুড কর্পোরেশনের গুদামে জমানো খাদ্যশস্যের আপৎকালীন সুষম বণ্টন। খাদ্যশস্যের বণ্টনের সঙ্গে দিনমজুরদের হাতে তুলে দিতে হবে নগদ অর্থ। দুর্ভিক্ষের ইতিহাস বলছে– দেশে দেশে ধরিত্রীর ভাঁড়ারে খাদ্য মজুত থাকে যথেষ্টই, শুধু ক্ষুধার্তের ঘরে তা পৌঁছয় না।

    ঘরে খাবার না থাকলে মানুষ রাস্তায় নামবে। নামবেই। কখনও তার অভিমুখ চেহারা নেবে রিভার্স মাইগ্রেশনের। কখনও তা হবে অপ-তথ্যের, ব্যর্থ পরিকল্পনার। এই পথহাঁটা তাই এক যুদ্ধ। টিকে থাকার জন্য। রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং মানবতার হুঁশ ফেরানোর জন্য। অতএব মানুষ হাঁটবে। তা সে খিদেয় হোক, মহামারী, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হোক, কিংবা জলবায়ু বা যুদ্ধ বা হিংসার কারণেই হোক। আসলে তা শ্রমিক বনাম মালিক রাজনীতিরই বিষয়। আমরা সুবিধাভোগীরা নিজ নিজ বারান্দা ও জানালা থেকে সে পদচারণা দেখব, তা ঠিক না, আসলে দেখতে বাধ্য থাকব, কেন না আমরা সবাই সে মুনাফার রাজনীতি নির্মাণের অংশীদার।

    তাদের ক্ষোভ তো আসমুদ্রহিমাচল কাঁপিয়ে দিচ্ছে না। কারণ তারা অসংগঠিত। যখন তারা নিজেরাই ক্লান্ত, শ্রান্ত অন্যের ওপর নির্ভরশীল তখন তারা তাদের দাবি কী করে রাখবেন? হাজার বছর ধরে, দেশে দেশে ভুখা মানুষ পথ হাঁটবেন তাই। স্থান-কাল যাই হোক না কেন, পাত্ররা থেকে যাবেন, আর আমরা সাক্ষীগোপাল হয়েই কাটিয়ে দেব গোটা একটা জীবন। না ভুল বললাম, আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে সাক্ষীগোপাল হতে এই অমানবিক দৃশ্যের।

    ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তেই তাই ছড়িয়ে পড়েছেন তারাও, পলেস্তারা খসা ঠাসিঠাসি ঘরের ভিতর থেকে বাহিরে, বৃহৎ শহরের পলিথিনের ছাউনি দেওয়া ঘরের গহ্বর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের খোলা ঘরের দিকে। শুধু ছাউনির পার্থক্য। কেউ কেউ সর্ব অর্থে সর্বহারা। সেখানের অবস্থাও তথৈবচ। তবুও সেটা ঘর। আশ্রয়, নিজের বলতে যতটুকু বোঝায় আর কী! পরিযানের পথের উলটো পিঠে, উলটো পথে। কত শত পোশাকি নামে তারা পাতায় পাতায় জায়গা করে নেবেন ইতিহাসের চর্চায়, অর্থনীতির আস্তানায়, পিএইচডির থিসিসে। কিন্তু বেমালুম সরকারি গাইডলাইনে তারা উবে গিয়েছিলেন লকডাউন ঘোষণার সময়। শুধু রাজপথে তাদের ম্লান মুখ, মলিন বসন ক্যামেরায় বন্দি হয়ে অন্তর্জালে ছড়িয়ে পড়তেই আমরা আর অমলিন থাকতে পারলাম না, হাঁটা শুরু করতেই তাদের সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হল, কেউ আবার ঘুপচি ঘরে ফেরত পাঠালেন, কেউ আবার পাঠালেন কোয়ারেন্টাইনে। তাই রাজপথ সরে গেল পায়ের নীচ থেকে, আশ্রয় দিল জঙ্গল। আর সেই জঙ্গল পথেই ফিরছিল মেয়েটি।

    যে ভাইরাস ঘাতক জীবন নিয়ে নেয়, সারা পৃথিবীকে স্তব্ধ, চলচ্ছক্তিহীন করে রেখে দেয়, সেই ভাইরাসকে কর্মক্ষমহীন করে দিতে পারে এমন প্রতিষেধকের খোঁজ চলছে দেশ-দুনিয়ার ল্যাবরেটরি জুড়ে। কিন্তু এই শ্রমিকরা যাদের সংখ্যা আইএলও-র মতে চার কোটি। ঠিক দেখেছেন– হ্যাঁ, চার কোটি বা তার বেশি, তারা প্রমাণ করেছেন তাদের লংমার্চের মাধ্যমে যে, সকল জীবাণু আর অসুখ অপেক্ষা ক্ষুধাই অতিশয় ঘাতক ভাইরাস। সে ভাইরাস শ্রেণিহীন, ধর্মহীন, বর্ণহীন। মানুষের জীবনের রেশনহীন, পানীয়হীন, শয়ন-শয্যাহীন রাজপথে সেই ক্ষুধাই একমাত্র লংমার্চ। মৃত্যুভয়ও কোন ছাড়। ভারতে ১৯ কোটির বেশি লোক এখনও অভুক্ত বা অর্ধভুক অবস্থায় ঘুমতে যান।
    বেঁচে আছি কি? কেন?

    কারা যেন বলেছিল, রাজপথে নিয়ন আলোয় রাতভর কারা জেগে থাকে? ইঁদুর, আরশোলা আর মজুরেরা। তারা স্থায়ী বা অস্থায়ী। হয়তো কারখানার মজুর বা মাটি কোপানোর। রাস্তার নিয়নেরা যেন আনেকটাই নিষ্প্রভ। বোবা কান্নায় ভেঙে পড়তে পড়তে মাইলফলকরা পাথর হয়ে গিয়েছে। আমরা কি বেঁচে আছি?

    বাজারে মাইক্রোফোনে বাজছে, ‘ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন’। বাজারের এককোণে বসা এক অশীতিপর বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন এসেছ?’ ‘সরকারবাবুরা চাল দেয়, আটা দেয় সত্য, কিন্তু তেল লাগে, লবণ লাগে, হলুদ লাগে, কাঠ লাগে রাঁধতে। ঘরে কলা গাছের থোড় কেটে ও কলা বেচে যা পাব তা দিয়ে তেল-নুন কিনব। ভয় করলে দিন চলে?’ ওঃ, তা হলে– এই সচেতনতার পাঠ-বোধ? দোষ শুধু ওর নয়, এই বোধহীনতার অংশীদার আমিও। কেমন করে গরিব না খেয়ে বা আধপেটা খেয়ে, মৃত্যুকে ভয় না করে ঘর ছাড়তে বাধ্য হন, পরিবারের টানে পথ হাঁটেন, কে কাকে দু’টি খেতে দেবেন, কার চাল নেই, নুন ফুরিয়েছে, কার অথর্ব বাবা বসে আছেন, কার অসুস্থ মা বসে আছেন, আধাবস্তা চালে তার মাসাধিক কেটেছে, তিনি তো পথ হাঁটবেনই। তাকে তো ভুখা পেট, ক্ষত পায়ে পথ হাঁটতেই হবে। এই রাজপথে রাতে শুয়ে থেকে আবার সকালে পথ চলতে হবে। পথের ক্লান্তি সরিয়ে মৃত সন্তানের দেহ দাহ করতে তাকে গ্রামের শ্মশানটি পর্যন্ত হাঁটতেই হবে।

    বাঁকা-নজরে গরিব ও শ্রমিকদের দেখতে দেখতে গজরাতে থাকেন একজন, বিনি পয়সায় চাল-আটা পাচ্ছে, ঝুড়ি-কোদাল নিয়ে মাঠে গেলে ২০২ টাকা, বাচ্চা হলে টাকা, অঙ্গনওয়াড়ির খিচুড়ি থেকে মিড-ডে মিলের ডাল-ভাত, স্কুলে গেলে বই-জুতো, জামা-সাইকেল, কন্যাশ্রী-রূপশ্রী এত পেয়েও যায় কেন? কে যেতে বলেছিল?
    উন্নয়নের যে মডেল আমাদের হাতের নাগালে ও যা চর্চিত, তা তৈরি হয়েছিল প্রাকৃতিক প্রতিশোধের অভিজ্ঞতাহীন সময়ে– সে পুঁজিবাদী বা মার্ক্সবাদী যাই হোক না কেন। এখনকার জীবনযাত্রায় মানুষ অভ্যস্ত হয়ে ওঠার আগেই আমরা যদি জানতাম পরিবেশের সংকট বিষয়ে, সেই অনুসারে কাজও করতাম, তা হলে আজ জীবনটাই হয়তো অন্যরকম হত। তার মানে এই নয় যে, লংমার্চ থাকত না, হয়তো থাকত কিন্তু বিকল্প চিন্তার পরিসরে তারাও থাকতেন, তাদের কষ্টগুলোও থাকত। আর সেটার সমাধানও থাকত। সেই শিক্ষা থেকে তৈরি হত আগামীর পথ। উত্তর এক অর্থনীতিবিদের। অতিমারী কেটে উঠবে নতুন ভোর, আশা ছাড়া গতি নেই। শ্রমিকদের। আমারও।
    “Ill fares the land, to hastening ills a prey,
    Where wealth accumulates, and men decay.”
    –OLIVER GOLDSMITH, ANGLO-IRISH WRITER (1730-1774)

    * সদ্যপ্রকাশিত বিশ্বব্যাঙ্কের ‘পভার্টি অ্যান্ড শেয়ার প্রসপারিটি’ বা ‘দারিদ্র্য ও সমৃদ্ধির অংশীদার ২০১৮’ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের পাঁচটি দেশেই পৃথিবীর মোট গরিবের অর্ধেক গরিব মানুষ বাস করেন। এই দেশগুলো হল ভারত, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, ইথিওপিয়া এবং বাংলাদেশ।
    ঋণ- অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, Ursula K Le Guin’s Hymn to Time

    (মতামত লেখকের নিজস্ব।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More