বুধবার, জানুয়ারি ২৯
TheWall
TheWall

খাবার নেই, জল নেই, আকাশ নেই! কয়েক হাজার কিলোমিটার উড়ে এসে বিপন্ন অতিথিরা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পশ্চিমের ঐ পাখিরা সব কোথায় গেছে চলে/ গেছে কোথায় সাইবেরিয়া, ফিরবে নাকি মানুষ পোড়া বন্ধ হলে…

২০০২ সালে গুজরাত দাঙ্গার আবহে সমীর চট্টোপাধ্যায়ের এই গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। বড় দরদ দিয়ে গেয়েও ছিলেন গায়িকা লোপামুদ্রা মিত্র। কিন্তু তার এত বছর পরে যেন অন্য এক আঙ্গিকে ধরা দিচ্ছে সেই গান। পশ্চিম নয়, দেশের পূর্ব প্রান্তের পাখিরা সত্যিই চলে যাচ্ছে রোজ। তবে মানুষ পোড়ার জন্য নয়, গোটা প্রকৃতিই তো পুড়ছে দূষণে। যার জেরে শীতের দিনে দিশাহারা পরিযায়ী পাখিরা। সংখ্যায় অস্বাভাবিক হারে কমে যাচ্ছে তারা। যারা আসছে, তারাও রীতিমতো বিপন্ন।

কয়েক বছর আগেও শীতের দিনে কলকাতা ও আশপাশের বেশ কিছু জায়গায় প্রচুর পরিযায়ী পাখির দেখা মিলত। সুভাষ সরোবর, রবীন্দ্র সরোবর, চিড়িয়াখানা, তারাতলার নেচার্স পার্ক, ভিক্টোরিয়া, সাঁতরাগাছি ঝিল তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য।  এই সব জায়গায় সাইবেরিয়ান ক্রেন, গ্রেটার ফ্লেমিঙ্গো, রাফ, ব্যাক উইংড স্টিল্ট, কমন টিল, পেলিকান, স্টারলিং ব্লু থ্রোট-সহ নানা ধরনের পাখি আসত সাইবেরিয়া-সহ বিশ্বের নানা শীতল প্রান্ত থেকে। এখনও আসে। তবে তাদের সংখ্যা অনেকটা কমেছে।

শীতকালে সাইবেরিয়ার মতো জায়গায় এত ঠান্ডা পড়ে যে সেখানে পাখি বা অন্য জন্তুদের বেঁচে থাকাই দায় হয়ে যায়। এই ঠান্ডা থেকে বাঁচতে তারা অপেক্ষাকৃত কম ঠান্ডার জায়গায় চলে আসে তারা। এমনই হয়ে আসছে বছরের পর বছর। এই সময়ে ঘর ছেড়ে পরিযায়ী হয় তারা। শীতটুকু আরামে কাটিয়ে, ফিরে যায় দেশে। শুধু সাইবেরিয়া নয়। চিন, জাপান, রাশিয়ার বিভিন্ন অংশ, আফগানিস্তান, রোমানিয়া, মঙ্গোলিয়া, স্লোভাকিয়া থেকেও এই পাখিরা ভারতে আসে।

তাই শীত এলেই পরিযায়ী পাখিতে ভরে যেত রাজ্যের বেশ কিছু অঞ্চল। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই ছবিটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। ঋতুচক্রের হিসেব মেনে শীত এলেও, তারা আর আসছে না তেমন ভাবে। পরিবেশকর্মীরা এবং পাখি বিশারদেরা এ জন্য শহরের জীবনকেই দায়ী করেছেন। দায়ী করেছেন মানুষের মাত্রাছাড়া ঔদ্ধত্যকে। শহর ও শহরতলির বুকে ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বড় বড় বাড়ির সংখ্যা। বাড়ছে, ধুলো দূষণ। বাড়ি বেশি মানে মানুষও বেশি, মানুষ বেশি মানে গাড়ি বেশি। হাওয়ায় মিশছে আরও বেশি ডিজ়েলপোড়া বিষধোঁয়া। সেই সঙ্গে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা মোবাইল টাওয়ারগুলির রেডিয়েশন পাখিদের শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। মৃত্যুও হচ্ছে বহু পাখির।

তবে শুধু আকাশ আর বাতাস নয়। শহরের জলেও মারাত্মক হারে বেড়েছে দূষণের মাত্রা। শুধু পানীয় জলই নয়, জলাশয়গুলিতেও মারাত্মক দূষণ রয়েছে। বিভিন্ন নর্দমার দূষিত জল ঝিলের জলে গিয়ে মিশছে। সেই জল পান করে মারা যাচ্ছে পশুপাখি। কলকারখানার আুটলেট নির্দ্বিধায় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে নদীতে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ঝিলে পড়েছে প্রোমোটারদের থাবা। আবর্জনা ফেলে ঝিল বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

শুধু শহর বা শহরতলি নয়। ঝাড়গ্রাম জেলার গোপীবল্লভপুরের ঝিল্লি পাখিরালয় এবং বেলপাহাড়ির খাঁদারানি ঝিলেও প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসত এক সময়ে। কিন্তু গত দু’বছরে দুই ঝিলেই পাখি আসা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছে। এর অন্যতম কারণ, ওই এলাকাগুলো পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হওয়া। ফলে শীতকালে জমজমাট পিকনিক হয় এ সব এলাকায়। সাউন্ড বক্স বাজিয়ে হুল্লোড় চলে। ফলে নিরিবিলি পছন্দ করা পাখিরা বিরক্ত হয়। স্থানীয় মানুষদের পর্যবেক্ষণ, ঝিল্লি পাখিরালয় ও বেলপাহাড়ির খাঁদারানি ঝিলে গত দু’বছরে বালি হাঁস এবং খড়িহাসের ঝাঁক আসা অনেক কমে গিয়েছে। ঝিল্লি পাখিরালয়ের আর একটি সমস্যা, বোটিং। এই ঝিলে পর্যটকদের জন্য প্যাডেল বোটের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে পরিযায়ী পাখিরা সুস্থির থাকতে পারে না। এছাড়াও পিকনিকের থালা-গ্লাস, খাবারের উচ্ছিষ্ট জলে ফেলে দেন অনেকে। ফলে জল খারাপ হয়ে যায়। মারা যায় অনেক জলজ প্রাণী। কমে যায় গেঁড়ি-গুগলির সংখ্যা। ফলে পাখিরা ঠিক মতো খাবার পায় না। আবার ওই দূষিত জলে থেকে বা খেয়ে অনেক পরিযায়ী পাখির মৃত্যুও হয়।

একই অবস্থা সাঁতরাগাছি ঝিলেও। দূষণ কমাতে গত বছরেই সাঁতরাগাছি ঝিল পরিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছিল পরিবেশ আদালত। আর আদালতের নির্দেশে পরিষ্কার করতে গিয়ে সব কচুরিপানা ঝিল থেকে তুলে ফেলেছিল হাওড়া পুর নিগম। সেই বার পরিযায়ীর দল বসার জায়গা না পেয়ে, খাবার না-পেয়ে, ঝিল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এ বার একেবারে উলটপুরাণ! পানার বাড়বাড়ন্তে এমন হাল ঝিলের, যে আবারও ফিরে যাচ্ছে পাখিরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নভেম্বরের গোড়া থেকেই কিছু পাখি আসতে শুরু করেছিল সাঁতরাগাছি ঝিলে। কিন্তু কচুরিপানা ভরা ঝিলের কোথাও বসতে না-পেয়ে ফিরে যাচ্ছে তারা।

কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ আকাশপথে পাড়ি দিয়ে পরিযায়ী পাখিরা তাদের পছন্দের জায়গায় এসে খাবার পায় না, প্রায়ই দেখে তাদের চিরচেনা জলাভূমির অস্তিত্ব মুছে গিয়েছে। তখন সেই পরিযায়ীদের যে কী অবস্থা হয়, তা ভেবে দেখার অবকাশ এই দ্রুতগতির মানবসভ্যতা রাখেনি। ফলে পরিযায়ীদের প্রতিকূল জীবনের কোনও সমাধানও নেই সেখানে।

Share.

Comments are closed.