বৃহস্পতিবার, জুন ২০

গণ্ডীর খেল ভেঙেই মেগান হয়ে ওঠেন আত্মনির্ভর এক নারী

চান্দ্রেয়ী সেনগুপ্ত

বর্ণবৈষম্য পাশ্চাত্য সভ্যতায় যথেষ্ট রয়েছে – এই যুগেও। বিশেষ করে মার্কিন রাজ্যে ‘ব্ল্যাক কমিউনিটি’র সঙ্গে তো তা বিশেষ প্রকট।

মার্কেল ও ডোরিয়া র‍্যাগল্যান্ডের একমাত্র সন্তান মেগানের জন্ম ১৯৮১ সালের ৪ অগস্ট ক্যালিফর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে, কানোগা পার্ক অঞ্চলে। পুরো নাম – রেচেল মেগান মার্কেল। শহরতলির এই উপত্যকার বেশির ভাগ বাসিন্দা শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। মেগানের বাবা, টমাস মার্কেল ককেশীয় আর মা ডোরিয়া র‍্যাগল্যান্ড আফ্রিকান। মিশ্রবর্ণের মেগানকে ছোটবেলা থেকে বহুবার বর্ণ বৈষম্যের অপ্রিয় পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে। মেগান এক সাক্ষাৎকারে তার শিশু বয়েসের একটি ঘটনার কথা বলেন যা তাঁর মনে বিশেষ ভাবে দাগ কেটেছিল। মিশ্রবর্ণের হওয়ায় তাঁর গায়ের রঙ তাঁর মায়ের তুলনায় অনেকটাই পরিষ্কার। মেগানের মনে পড়ে তিনি একদিন মায়ের হাত ধরে রাস্তায় হাঁটছিলেন। এমন সময় এক পথচারী এসে তাঁর মা, ডোরাকে, জিজ্ঞেস করে, তুমি কি এই ছোট মেয়েটির পরিচারিকা?

মেগানের মায়ের চোখ জলে ভরে গিয়েছিল। মৃদুস্বরে মা জানিয়েছিলেন যে মেয়েটি তাঁর গর্ভজাত সন্তান। প্রশ্ন ও প্রশ্নকর্তার নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে কোনওরকম ধারণা হওয়ার বয়স মেগানের তখনও হয়নি। কিন্তু সেদিন তার মায়ের দুঃখে খুবই কষ্ট পেয়েছিল ছোট্ট মেয়েটি।

এর পরেও, বড় হওয়ার সাথে সাথে এ রকম আরও অনেক অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে। শুধু বাইরেই নয়। বাড়ির ভিতরেও। মেগানের বাবার প্রথম স্ত্রী শ্বেতাঙ্গিনী। ফলত সন্তানেরাও হোয়াইট আমেরিকান বলে পরিচিত ছিল সমাজে। এই শ্বেত পরিবারের অন্তর্ভুক্ত কখনওই হতে পারেননি মেগান- গণ্ডির বাইরে থেকেছেন তিনি। ছোট বয়সে যাওয়া-আসা থাকলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে, ওই যোগাযোগটুকুও শিথিল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তিনি তাতে বিমর্ষ হয়ে গুটিয়ে যাননি। বরং ঠিক তার উল্টো। তিনি তাঁর পরিবারের ইতিহাসের মধ্যে, তাঁর নিজের মধ্যে বৈশিষ্ট্য খুঁজে নিতে শিখেছেন। এই তালিমের পিছনে অবশ্য মেগানের মা-বাবারও যথেষ্ট অবদান ছিল।

বাবা টমাস ছিলেন তৎকালীন আমেরিকান টেলিভিশনের লাইট ডিজাইনার। ‘ম্যারেড…উইথ চিলড্রেন’ এবং ‘জেনারেল হস্‌পিটাল’  নামে দুটি সিরিয়ালে আলোর কাজ করে, তিনি বিশেষ সুনাম অর্জন করেছিলেন। ২০১৩ সালে মেগান একটি আমেরিকান পত্রিকাকে জানান, ম্যারেড… উইথ চিলড্রেন সিরিয়ালটি চলাকালীন বহুবার তিনি স্কুলের পর সোজা শ্যুটিংয়ের সেটে চলে যেতেন বাবার কাছে। স্কুল ইউনিফর্মে ইম্যাকুলেট হার্ট ক্যাথলিক স্কুলের মতো অভিজাত স্কুলের ছাত্রীর, টেলিভিশন সিরিয়ালের সেটে ঘুরে বেড়ানো খুবই অপ্রত্যাশিত। কিন্তু মেগানের খুব ভালো লাগত সেই দুনিয়া। তখনকার বিখ্যাত নায়ক-নায়িকাদের অত কাছ থেকে দেখা, তাঁদের সঙ্গে সচ্ছন্দে মেলামেশা, প্রচুর পরিমাণে চকোলেট সব কিছুই শিশুমনকে মোহিত করত। তখন থেকেই ছোট্ট মেয়েটির ইচ্ছে ছিল যে সে বড় হয়ে অভিনেত্রী হবে।

এই সময় দিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। একবার স্কুলে একটি ফর্ম ভর্তির প্রয়োজন ছিল এবং ফর্মের এক অংশে জানাতে হবে কে কোন জাতিভুক্ত। ফর্মে উল্লেখিত জাতিগুলোর মধ্যে থেকে সবচেয়ে প্রযোজ্যটি বেছে নিতে হবে। মেগান পড়েছিল ধন্দে। ককেশীয়ান, আফ্রিকান, হিস্প্যানিক… কোনওটাই তো ওকে সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করে না। এই নিয়ে শিক্ষিকাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ককেশীয়ানের পাশে টিক্‌ মার্ক দিতে, কারণ মেগানকে দেখলে আফ্রিকান মনে হয় না। মেগান এই উত্তর মেনে নিতে পারেননি। তিনি কী ভাবে তাঁর মায়ের অস্তিত্ব জীবন থেকে মুছে দেবেন? ফর্মের ওই অংশটি সেদিন তিনি ফাঁকা রেখে দিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে তাঁর বাবাকে এই ঘটনার কথা জানালে বাবা বলেন – ‘ইফ দেয়ার ইজ নো বক্স টু টিক্‌ হুইচ ডিফাইনস্ ইউ কারেক্টলি, দেন ড্র ইয়োর ওন বক্স’। বাবার এই উপদেশ তিনি মেনেছেন। নিজেকে করে তুলেছেন সপ্রতিভ আত্মনির্ভর এক নারী। সমাজের প্রচলিত গণ্ডি ভেঙ্গে স্বমহিমায় নিজের পরিচয় গড়েছেন।

গণ্ডির খেলা কিন্তু সমাজের সব স্তরেই – এমনকী রাজপরিবারেও। তবে সেটা সম্পূর্ণ উল্টো – গণ্ডির কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে দমবন্ধকরা পরিস্থিতি  ……(ক্রমশ)

লন্ডনবাসী ডঃ চান্দ্রেয়ী সেনগুপ্ত পেশায় শিশুচিকিৎসক। সেন্ট মেরি’স হাসপাতালে কর্মরতা। চান্দ্রেয়ীর জন্ম ও শিক্ষা প্রধানত কলকাতায়। পেশায় চিকিৎসক হলেও তাঁর নেশা সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি, যার অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। নির্বাক চলচিত্র যুগের অভিনেতা চারু রায়ের দৌহিত্রী তিনি।  তিনি লন্ডনে গড়েছেন এক নাট্যদল, ইস্টার্র্ন থেস্‌পিয়ান্স। যেটি মননশীল মৌলিক নাটক পরিবেশন করে ইংল্যান্ডে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ‘রয়েল ওয়েডিং’ নিয়ে তাঁর রচনা সাগরপারের রূপকথা।

Leave A Reply