মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১
TheWall
TheWall

 মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকা দু’বছরের ‘হোপ’ আজ জীবনের ট্র্যাকে উসেইন বোল্ট

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

রূপাঞ্জন গোস্বামী

আফ্রিকা। গহন অরণ্য, ভয়ঙ্কর জীবজন্তু, রুক্ষ মরুভূমি ও উপজাতি অধ্যুষিত এক সুবিশাল অঞ্চল, যাকে ভূগোলের বই চেনায় ডার্ক কন্টিনেন্ট বা অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ হিসেবে। ১৫ শতাব্দী থেকে ইউরোপীয় বণিক ও ঔপনিবেশিকরা আফ্রিকা দখলের অভিযান চালায়। ১৯ শতকে পুরো আফ্রিকাই চলে গিয়েছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, ইতালি, জার্মান ও হল্যান্ডের দখলে।

ইউরোপীয়দের হাত ধরে আফ্রিকায় এসেছিল খ্রিস্টান ধর্ম। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ এর মধ্যে আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশ, বিদেশি হানাদারদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করলেও আফ্রিকায় থেকে গিয়েছিল খ্রিস্টান ধর্ম। খ্রিস্টান ধর্মকে জনপ্রিয় করার জন্য  কিছু ধর্মপ্রচারক এক ভয়ানক উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

আমাদের দেশ ভারতবর্ষের মতোই আফ্রিকার সমাজজীবনেও বট গাছের শিকড়ের মতো ঢুকে আছে নানান কুসংস্কার, তুকতাক, জাদু টোনা, বান মারা, ঝাড়ফুঁক মতো অবৈজ্ঞানিক  ও বর্বর রীতিনীতি। আফ্রিকার সমাজজীবনে মিশে থাকা এইসব কুসংস্কারের সুযোগ নিয়ে এই শতকের প্রথম দশকে ধর্মপ্রচারকরা খ্রিস্টান ধর্মের সঙ্গে সুকৌশলে মিশিয়ে দিয়েছিলেন আফ্রিকার চিরাচরিত কালাজাদু বা ব্ল্যাক ম্যাজিক।

আফ্রিকার কালাজাদু

ধর্ম ও কুসংস্কারের সেই বিষাক্ত মিশ্রণ সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছিল আফ্রিকার শত টুকরো হয়ে থাকা সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা  অশক্ত মানুষগুলো ওপর। এই সব সমাজের বদ্ধমূল ধারণা, তাদের সম্প্রদায়ের দুর্ভাগ্য, রোগ ও মৃত্যুর জন্য দায়ী কোনও মানুষ।

গ্রামে আসে খ্রিস্টান ওঝা, গুনে বলে দেয় গ্রামের কে ‘ডাইনি’,কার ভেতরে ‘অশুভ শক্তি’ আছে, কে কালাজাদু করে গ্রামের সর্বনাশ করছে। এক্ষেত্রে ওঝার কথাই চুড়ান্ত বলে মানা হয়। ডাইনি ঘোষিত মানুষটিকে আফ্রিকাতে সবচেয়ে ঘৃণা করা হয়।ওঝারা একবার চিহ্নিত করলে, নিরপরাধ অসহায় মানুষগুলির ওপর অত্যাচার চরমে ওঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই  নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, প্রতিবন্ধী, অ্যালবিনো, অপুষ্ট ও অনাথ শিশুরা ওঝার বা গ্রাম্য ষড়যন্ত্রের বলি হয়।

আফ্রিকার ওঝা

 শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে মর্মান্তিক

তারা শারীরিক ভাবে নিজেদের রক্ষা করতে পারেনা বা পালাতে পারে না। তাই ‘ডাইনি’ বলে ঘোষিত শিশু সহজেই পরিবার ও সমাজের ক্রোধের শিকার হয়। না হলে শিকার হয় ওঝার বর্বর ঝাড়ফুঁকের। ওঝারা বিভিন্ন ধরনের নোংরা জিনিস খাইয়ে, উপোস করিয়ে, আগুনের ছ্যাঁকা দিয়ে শিশুটির শরীর থেকে অশুভ আত্মা তাড়াবার চেষ্টা করে।

চেষ্টা করে ওঝা সফল না হলে মৃতপ্রায় শিশুটিকে অনেক সময় মেরেও ফেলা হয়। অনেকসময় রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় যাতে  শিশুটি খেতে না পেয়ে নিজে থেকে মারা যায়।

২০০৯ সালে খবর মেলে নাইজেরিয়ার  ৩৬ টি রাজ্যের মধ্যে আকোয়া আইবোম  ও ক্রস রিভার রাজ্য দুটিতে গত এক দশকে ১৫০০০ শিশুকে  পরিত্যাগ করা হয়েছে ডাইনি অপবাদ দিয়ে। এর মধ্যে ১০০০ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

ছোট্ট শরীরে ওঝার অত্যাচার

ঘটনাটি ভয়াবহ আকার ধারণ করায়  UNICEF , United Nations High Commissioner for Refugees, Save the Children and Human Rights Watch  প্রভৃতি সংস্থাগুলি আফ্রিকার প্রত্যেকটি দেশকে সতর্ক করছিল। কিন্তু সমস্যাটি কমেনি বরং মহামারির আকার ধারণ করেছিল।

শিশুগুলিকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন দেশের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন টিম পাঠায় আফ্রিকাতে। সেভাবেই নাইজিরিয়ায় গিয়েছিলেন ডেনিস সেচ্ছাসেবী আনজা রিংগ্রেন লোভেন ও তাঁর স্বামী ডেভিড ইমানুয়েল উমেন। যিনি ছিলেন নাইজিরিয়ান।

আনজা রিংগ্রেন লোভেন ও তাঁর স্বামী ডেভিড ইমানুয়েল উমেন

 ৩১ জানুয়ারি, ২০১৬

দক্ষিণপূর্ব নাইজেরিয়ার উইও এলাকায় এরকমই এক ‘ডাইনি’ শিশুর খবর পেয়ে আনজা লোভেন ও তাঁর স্বামী তাঁদের   African Children’s Aid Education and Development Foundation (ACAEDF) টিম নিয়ে গিয়েছিলেন শিশুটিকে উদ্ধার করতে। ৩১ জানুয়ারি বিকেলে এক ঘিঞ্জি মফস্বলের রাস্তায়  লোভেন দেখতে পান সেই কঙ্কালসার শিশুকে। যাকে ডাইনি বলে পরিত্যাগ করেছে তার পরিবার আর সমাজ।

পা টেনে টেনে শিশুটি অতিকষ্টে তার দেহটিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে জঞ্জাল ফেলার জায়গার দিকে। পরিবার ও সমাজ পরিত্যক্ত শিশুটির থাকার জায়গা ওটাই। দৌড়ে গিয়ে শিশুটির সামনে দাঁড়ান লোভেন। জলের বোতলের ছিপি খুলে বোতলের মুখটা শিশুটির মুখে লাগিয়ে দেন। হাতে দেন বিস্কুটের প্যাকেট। বড় বড় চোখ নিয়ে চকচক শব্দে জল খেতে থাকে শিশুটি।

সেই শিশুটি আর লোভেনের প্রথম দেখার মুহূর্ত

একবছর ধরে ওই জঞ্জালের মধ্যে নিঃসঙ্গ অবস্থায় বাঁচছিল, ঠিক মতো কথাও বলতে না পারা শিশুটি। খোলা আকাশের নীচে একটা নোংরা ভিজে কম্বলের তলায় কাটিয়ে ফেলেছিল একটা আস্ত শীত। শীতবস্ত্র ছাড়াই। কেউ হয়ত দয়া করে কম্বলটি দিয়ে গিয়েছিল। সমাজে একঘরে হওয়ার ভয়ে এর থেকে বেশি কিছু করতে পারেনি সে

গাড়ি থেকে সব সরঞ্জাম নিয়ে নেমে পড়েছিল লোভেনের টিম। জল গরম করে তাতে জীবাণুনাশক সাবান ও জেলি মিশিয়ে শিশুটিকে স্নান করিয়ে নরম তোয়ালেতে মুড়ে গাড়িতে তোলা হয়েছিল। লোভেনরা জানতেন শিশুটি বাঁচবে না। তবুও তাঁরা শিশুটিকে বাঁচাবার  শপথ নিয়েছিলেন গাড়িতে বসে। লোভেনের হাতের পাতায় পর পর এসে পড়েছিল সহকর্মীদের হাত।

স্নান করানো হচ্ছে শিশুটিকে

শিশুটি কার তা নিয়ে মুখ খুলতে চায়নি সমবেত জনতা। তারা চাইছিল এলাকা থেকে এই অশুভ আত্মা দ্রুত বিদায় হোক ।  অভিজ্ঞ লোভেন বুঝেছিলেন শিশুটির অমানুষিক জীবনীশক্তি ক্রমশ হার মানতে শুরু করেছে। তার আয়ু আর বেশি দিন নেই।

কারণ শিশুটি কুকুর বিড়ালদের সঙ্গে খাবারের যুদ্ধে এঁটে উঠতে পারত না। বেশিরভাগ সময়ে না খেয়ে থাকত, না হলে কুকুর বিড়ালের না ছোঁয়া খাবার খেত। এছড়া চরম আবহাওয়া, নোংরা পরিবেশ ও দূষিত জল থাবা বসিয়েছে তার শরীরে। শোচনীয় অপুষ্টি, ফিতা কৃমি, আলসার, ডায়েরিয়া, তীব্র জলশূন্যতা, সারা শরীরে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকঘটিত ইনফেকশন, সব কিছুই ছিল ওইটুকু শরীরে।

গাড়িতে মৃতপ্রায়  শিশুটি

কেয়ার সেন্টারে শিশুটি ফ্যালফ্যাল করে দেখছিল লোভেনকে 

লোভেনকে দেখে মায়ের কথা মনে পড়ছিল কিনা কে জানে। যে মা ন’মাস গর্ভে ধরে, পৃথিবীর আলো দেখিয়ে, মৃত্যুর হাতে  তাকে একলা ছেড়ে দিয়েছিল। শিশুটি একটুও কাঁদছিল না, হয়ত কাঁদতেই শেখেনি। হয়ত নিজেকে মানুষ ভাবতেই শেখেনি সে। নিজেকে বিড়াল কুকুরের সমগোত্রীয় ভাবত হয়ত।

লোভেন দু’বছরের শিশুটির নাম রেখেছিলেন ‘হোপ’। কারণ তখনও লোভেনের মনে সামান্য আশা ছিল, তাঁরা শিশুটিকে বাঁচাতে পারবেন ও শিশুটি বাঁচার জন্য লড়বে। যেভাবে সে একবছর ধরে লড়ে যাচ্ছিল জঞ্জালের মধ্যে। খোলা আকাশের নীচে। এরপর শুরু হয়েছিল শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য লোভেনের লড়াই। বাঁচার লড়াই শুরু করেছিল ছোট্ট হোপও।

নতুন মায়ের কোলে ‘হোপ’

সেই দিন সন্ধ্যায় ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছিলেন লোভেন

পোস্ট করেছিলেন শিশুটির সঙ্গে  দেখা হওয়ার মূহূর্তটির ছবি। নগ্ন,পরিত্যক্ত, মৃত্যুর প্রতীক্ষা থাকা মুমূর্ষু শিশুটির ছবি কয়েক মিনিটের মধ্যে ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায়। পৃথিবীর সবকটি সংবাদপত্রের শিরোনামে ও টিভি চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজে উঠে আসে হোপ ও লোভেনের ছবি।

বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে হোপকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য আসতে শুরু করে অর্থ সাহায্য। চিকিৎসা শুরু হয়ে গিয়েছিল তার আগেই। লোভেনদের অবাক করে চিকিৎসায় সাড়া দিতে শুরু করেছিল হোপ। মাত্র আটমাসের মধ্যে সেরে উঠেছিল হোপ, নির্দয় সমাজের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড হেলায় নস্যাৎ করে।

উদ্ধার করার আটমাস পরে হোপের ছবি

এই আট মাস লোভেনের সংস্থার কর্মীরা স্বেচ্ছায় রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে, পালা করে হোপের পাশে রাত জাগতেন। লোভেন তাঁর ব্লগে লিখেছিলেন, “দ্রুত বাড়ছে হোপ, মিষ্টি দেখতে হচ্ছে সে, হোপকে আমরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, হয়ত নিজের চেয়েও।”

২০১৬ সালে জার্মানির ‘উম’ ম্যাগাজিনের বিচারে  the most inspiring person of the year 2016 হয়েছিলেন আনজা লোভেন, বারাক ওবামা ও পোপ ফ্রান্সিসকে পিছনে ফেলে।

৩০ জানুয়ারি, ২০১৭

লোভেন ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন আরেকটি ছবি। উদ্ধারের ঠিক একবছর পর তোলা হোপের ছবি। সেই ছবিটিতে তিন বছরের হোপকে চেনাই যাচ্ছে না। পরনে জাম্পার, সাদা স্নিকার, কালো স্কুল ব্যাগ। সেই সপ্তাহে হোপ তার স্কুল জীবন শুরু ছিল। সেদিনও স্কুলে যাওয়ার আগে হোপকে জল খাইয়ে দিয়েছিলেন লোভেন। ঠিক একবছর আগে যেভাবে খাইয়ে দিয়েছিলেন।

একবছর আগের ‘হোপ’ এবং ঠিক একবছর পরের ‘হোপ’

সেদিনও দুনিয়া স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল, আগের ছবিটিও একই সাথে লোভেন পোস্ট করায়। পরমুহূর্তেই সারা বিশ্ব আনন্দে মেতে উঠেছিল। বিশ্বের সব সংবাদমাধ্যমের হেডলাইনে আবার উঠে এসেছিল মৃত্যুকে হারিয়ে জীবনে ফেরা হোপ।

দানের টাকায় জমি কিনেছিলেন লোভেন

ইকেত নামের জায়গাটিতে কেনা জমিতে তৈরি করেছিলেন ‘ডাইনি’ বলে পরিত্যক্ত  শিশুদের জন্য একটি শেল্টার ও চিকিৎসাকেন্দ্র। এলাকাটির নাম আজ Land of Hope। সেখানে  হোপ এবং আরও ৩৫ জন ছেলে মেয়ে থাকে।

লোভেন ও তাঁর সহকর্মীদের আদর ভালোবাসায় পেয়ে মাথায় দ্রুত বেড়ে উঠছে হোপ। আজ সে ভালো খেতে পাচ্ছে। মাথার ওপর একটা ছাদ পেয়েছে। একটা সুন্দর মা পেয়েছে। খুশি আছে হোপ। খুব মজা করছে, স্কুলে যাচ্ছে। অবসর সময়ে সে ছবি আঁকছে। কয়েকদিন আগেই লোভেন জানিয়েছেন, “হোপ এখন স্কুলে ১০০ মিটার দৌড়ে চাম্পিয়ন।”

এই মাসেই তোলা হোপের ছবি

১০০ মিটার ইভেন্টে  ভবিষ্যতের অলিম্পিক চাম্পিয়নকে হোপের মধ্যে দেখতে পাচ্ছে নাইজেরিয়া। ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যৎ বলবে। আপাতত জীবনের ট্র্যাকে উসেইন বোল্টের গতিতে ছুটতে শুরু করেছে হোপ। লোভেনের কথা মিলিয়ে দিয়ে। হোপ জীবনযুদ্ধে জেতার পর লোভেন বলেছিলেন, “Where there is love there is hope।”

Share.

Comments are closed.