বুধবার, জুন ১৯

রঙে-গল্পে দেওয়াল ভরে যুদ্ধ-ক্ষত ঢাকছেন তরুণী, রুখতে পারেনি তালিবানি অ্যাসিডও!

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

মাথায় বেগুনি রংয়ের হিজাব পরে বসে রয়েছে মেয়েটি। এক মনে বাজাচ্ছে পিয়ানো। তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের জল। মহাশূন্যের মাঝে তাকে ঘিরে আছে এক ঝাঁক নীল রঙা আকাশচুম্বী বাড়িঘর। তার নীচ দিয়ে ছুটে চলেছে গাড়ি। মেয়েটির অবশ্য কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই এ সবে। চরম ব্যস্ত, অশান্ত এক সময়ের বুকে বসে বাজিয়ে যাচ্ছে সে। সে যেন একই সঙ্গে শক্তিশালী, অরক্ষিত, মার্জিত, সৃজনশীল এবং বিচ্ছিন্ন। দেখে মনে হয়, কারও প্রতি তার আহ্বান নেই। কেবল একমনে নিজের অনুভূতিকে সৃজনশীল, মুক্ত ও শান্তিপূর্ণ ভাবে নিজের কাছেই প্রকাশ করছে সে। তবে সে কী বাজাচ্ছে, তা অবশ্য শোনা যাচ্ছে না। কারণ এই পুরোটাই একটা হাতে আঁকা ছবি। তবে সে ছবির দিকে দু’দণ্ড চেয়ে থাকলে যেন স্পষ্ট কানে আসে, পিয়ানোর রিড থেকে ভেসে আসছে শান্তির সুর। সংহতির সুর। দীর্ঘ যন্ত্রণার শেষে যেন এক ফালি সুরের প্রলেপ দিচ্ছে মেয়েটি।

এ ছবির নাম ‘সিক্রেট’। এ ছবি আপনার চোখে পড়বে, আফগানিস্তানের রাজধানী, কাবুলের একটি দেওয়ালে। হাতে আঁকা ছবি। আর একটু খুঁটিয়ে ছবিটি দেখলে আপনি দেখতে পাবেন, যে দেওয়ালে ছবিটি আঁকা, সে দেওয়ালে রয়েছে বেশ কিছু গর্ত। গুলির দাগ। যুদ্ধের নিশান। এ দেওয়াল বা এ ছবি একলা নয়। সারা কাবুলেই বুলেট আর বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত দেওয়ালগুলো এভাবেই ক্যানভাস হয়ে উঠেছে নানা রকম ছবির। কেউ যেন নানা রঙ ছড়িয়ে শান্তি আঁকতে চেয়েছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর জুড়ে।

তিনি শামসিয়া হাসানি। এক জন পথচিত্র শিল্পী হওয়ার পাশাপাশি, তিনি কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। গত কয়েক বছর ধরে, কাবুলের ক্ষতবিক্ষত দেওয়ালগুলোয় নানা উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করে তিনি তুলে ধরেছেন যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের নির্মমতাকে। প্রলেপ দিয়েছেন সেই ক্ষতয়। একই সঙ্গে শামসিয়ার ছবির চরিত্রগুলির বেশির ভাগই নারীপ্রধান। ঐতিহ্যবাহী আফগান সাজপোশাকে অন্য এক নারীবাদের নির্ঘোষ তাঁদের।

রাস্তার পাশের বাড়িঘর, রাস্তা, রেলস্টেশন, দেওয়ালের গায়ে গ্রাফিতি আঁকার প্রচলন পুরনো। কিন্তু আফগানিস্তানে বুলেট-বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত দেওয়ালে ক্যানভাস করে সেখানে রং ছড়িয়ে দেওয়া, আফগানিস্তানের মতো রক্ষণশীল একটি দেশের কোনও মহিলার পক্ষে রীতিমতো দুঃসাহসিক

কারণ দূর থেকে দেখলে কাজটা যতটা সহজ ও সুন্দর মনে হয়, কাবুলের রাস্তায় ছবি আঁকার বিষয়টি কিন্তু মোটেই ততটা সহজ নয়। তা-ও আবার কোনও মহিলার পক্ষে। স্প্রে-পেন্টের বোতল হাতে একটি গ্রাফিতি আঁকার জন্য বড়জোর ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় পান তিনি। কারণ তত ক্ষণে কুকথা ও গালাগালিতে ভরে যায় তাঁর আশপাশ। এমনকী পাথর ছুড়েও মারা হয়েছে তাঁর গায়ে। কখনও গ্রাফিতি শেষ করতে পারেন, কখনও আবার অর্ধেকটাও শেষ হয় না। তবে এ সব নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তা নেই শামসিয়ার। তিনি বলছিলেন, “যখন কেউ তাঁর অভিব্যক্তি প্রকাশের অস্ত্র হিসেবে শিল্পকে ব্যবহার করতে শুরু করবে, তখন এইটুকু ঝঞ্ঝাট তাঁকে সামলে নিতেই হবে।”

ঝঞ্ঝাট অবশ্য খুব সামান্য ছিল না। তালিবানদের অন্যতম ঘাঁটি বিশ্বের অন্যতম রক্ষণশীল এলাকায় রান্নাঘরের কাজ ছাড়াও মেয়েরা যে আরও বেশি কিছু করতে পারে, এমন ধারণাই যেন অপরাধ ছিল। সেই ‘অপরাধেই’, ২০০৮ সালের নভেম্বরে, আফগানিস্তানের কান্দাহারে শামসিয়ার মুখে সন্ত্রাসীদের অ্যাসিডে ঝলসে যায়। প্রসঙ্গত, ১৯৯৬-২০০১ অবধি ক্ষমতায় থাকাকালে তালিবানেরা নারীশিক্ষাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দেয়।

অ্যাসিড আক্রান্ত হওয়ার পরে কাবুল এবং ভারতের নয়া দিল্লির হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে শামসিয়া সুস্থ হন। তবে ক্ষত রয়েই গেছে। সমস্যা থেকে গেছে চোখে। অ্যাসিডের ক্ষত অবশ্য হারাতে পারেনি মনের ভেতরের তীব্র আর অদম্য শক্তিকে। ফের ঘুরে দাঁড়িয়ে, হাতে রং নিয়ে দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন শামসিয়া।

শামসিয়ার জন্ম ১৯৮৮ সালে, ইরানের রাজধানী, তেহরানের একটি আফগান পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি উৎসাহ ছিল তার। মেয়ের আঁকাআঁকির বিষয়ে উৎসাহও দিতেন শামসিয়ার মা-বাবা দুজনই। আজ থেকে বছর ১৫ আগে, তেহরানে শামসিয়া যখন ক্লাস নাইনে পড়ছে, তখনই পরিবারের সঙ্গে আফগানিস্তানে চলে আসতে হয় তাকে।

তবে মুশকিলটা শুরু হল এখানে আসার পরে। সে সময় আফগানিস্তানের কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছবি আঁকা নিয়ে কোনও উৎসাহ ছিল না। বিশেষ করে মেয়েদের হাতে স্কেচ বুক— এ বিষয়টা সমাজে মোটেই ভাল ভাবে দেখা হতো না। কিছু দিন পরে ফের ইরানে চলে যান শামসিয়া, ছবি আঁকা শিখবেন বলে। কিন্তু এক জন আফগানি হওয়ার কারণে তিনি সেখানে চারুকলায় ভর্তির অনুমতি পাননি।

ফের কাবুলে ফিরে কেটে যায় কয়েক বছর। শামসিয়ার বয়স তখন ১৬। কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্র্যাডিশনাল পেন্টিং নিয়ে পড়ার সুযোগ পান তিনি। যদিও এক জন মেয়ে হিসেবে সেই সুযোগ পাওয়া মোটেই সহজ হয়নি তাঁর পক্ষে। তবু নিজের জেদ আর প্রতিভার জোরে সেখানে ভর্তি হন তিনি। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং এক সময়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

এর পরে ২০১০ সালে, কাবুলে একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আর্ট ক্যাম্পে অংশ নেন শামসিয়া। সেখানেই বিভিন্ন বিদেশি শিল্পীর নানা মাধ্যমের কাজ সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। আর সেই সবের মধ্যে গ্রাফিতি আর্টের সঙ্গে বিশেষ ভাবে একাত্ম বোধ করেন শামসিয়া। খুঁজে পান নিজের ভাবনা প্রকাশের নতুন পথ।

সেই শুরু। তার পর থেকেই পথে পথে ছবি এঁকে চলেছেন শামসিয়া। আর সেই ছবিগুলোয় ফুটে উঠছে শান্তি আর আশার বার্তা। এই কাজের মধ্যে দিয়েই আফগানিস্তানের এক অন্য দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার আশা রাখেন শামসিয়া। সেই দৃষ্টিভঙ্গি সৌন্দর্য আর শিল্পকে প্রাধান্য দেয়, যুদ্ধ ও হিংসাকে নয়।

শামসিয়া বলেন, “আমি তুলির আঁচড়ে মানুষের মন থেকে যুদ্ধের সব যন্ত্রণার স্মৃতি মুছে দিতে চাই। তবে মানুষের মনের নাগাল আমার নেই। তাই মানুষ যে দেওয়াল রোজ দেখেন, সেই দেওয়ালেই আমি ফুটিয়ে তুলতে চাই তাঁদের মনের ইচ্ছে।”

কিন্তু কেবল যুদ্ধস্মৃতি মুছে দেওয়াই নয়, নারীশক্তিও তাঁর ছবিগুলোর অন্যতম বিষয়বস্তু। শামসিয়া বলেন, “আমি ছবিতে মেয়েদের শক্তি ও আনন্দ তুলে ধরি। আমার কাজে নানা ধরনের মুভমেন্ট চোখে পড়বে সকলের। আমি এ সব কাজের মধ্য দিয়ে দেখাতে চাই, যে আফগান সমাজের মহিলারা নতুন এবং শক্তিশালী চেতনা নিয়ে ফিরে এসেছেন। তাঁরা নতুন চিন্তাধারার মহিলা, যাঁদের পূর্ণ শক্তি আছে এবং যাঁরা নতুন করে পথ চলতে চান।”

প্রতি দু’তিন মাস অন্তর শামসিয়া নতুন নতুন গ্রাফিতি তৈরি করেন। আফগানিস্তানে আর্ট গ্যালারি নেই। কিন্তু পরিত্যক্ত দেয়াল অসংখ্য। আর তাই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের কাছে শিল্পকে ব্যাপক আকারে পৌঁছে দিতে এই গ্রাফিতি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

শামসিয়ার আঁকা গ্রাফিতিগুলোর মধ্যে তিনটি সিরিজ রয়েছে। সিরিজগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন তিনি নিজেই। ওই তিনটি সিরিজের নাম হল– সিক্রেটবার্ডস অফ নো নেশন এবং ওয়ান্স আপন আ টাইম।

সিক্রেট সিরিজের ছবিটিতে বেগুনি হিজাব পরা মহিলা পিয়ানো বাজাচ্ছে।

‘বার্ডস অফ নো নেশন’ সিরিজের ছবি সম্পর্কে শামসিয়া বলেন, “পাখিরা প্রতিনিয়ত খাবার আর আশ্রয়ের খোঁজে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ছুটে বেড়ায়। তাদের কোনও জাতীয়তা নেই, কারণ তারা যে কোনও নিরাপদ জায়গাতেই স্বস্তি খুঁজে পায়। এমনটা আমি আফগান জনগণের মাঝেও দেখতে পাই। শান্তি আর নিরাপত্তার খোঁজে তারা এক দেশ থেকে আর এক দেশে ছুটে বেড়ায়। মানুষগুলোকে দেখে আমার মনে হয়, পাখিদের মতো তাদেরও কোনও জাতীয়তা নেই।”

‘ওয়ান্স আপন আ টাইম’ সিরিজের ছবিটির নামকরণ হয়েছে গল্প বলার প্রথাগত পদ্ধতি থেকেই। “এই ছবিতে আমি যে নারীর গল্প বলতে চেয়েছি, তিনি একই সঙ্গে অতীত ও বর্তমানে বিরাজমান। তিনি সুখহীন পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন এবং সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে বসেছেন। বাইরে থেকে ভেতরকে দেখছেন তিনি। ছবিতে সাদা-কালো রংয়ের শহরের দৃশ্য অতীতের প্রতিনিধিত্ব করছে। আর ওই নারীকে রঙিন দেখানো হয়েছে, বর্তমানের প্রতিনিধি হিসেবে।”– বলেন শামসিয়া।

যুদ্ধ থামে না পৃথিবীতে। বন্ধ হয় না গুলির শব্দ। বোমারু বিমান থেকে গোলাপ-চকলেট পড়ার স্বপ্ন কবিতা-গানেই আটকে যায়। আর এই সব কিছুর মাঝে নিজের বিশ্বাস ও চেতনার রঙে আত্মবিশ্বাসের তুলি ডুবিয়ে একের পর এক ছবি এঁকে চলেন শিল্পী শামসিয়া। শান্তির স্বপ্ন বোনেন দেওয়াল জুড়ে, জীবন জুড়ে।

Comments are closed.