সোমবার, ডিসেম্বর ৯
TheWall
TheWall

মেডিক্যাল শাটডাউন জারি রাজ্য জুড়ে, এই নিয়ে তিন দিন! ডাক্তাররা আক্রান্ত নানা প্রান্তে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: এনআরএস এবং তাকে কেন্দ্র করে সমস্ত সরকারি হাসপাতালে বন্ধ পরিষেবা। অচলাবস্থা কাটার কোনও লক্ষণই নেই। কী হবে রাজ্যের নানা প্রান্তের হাজার হাজের সাধারণ রোগীর? উত্তর একটাই, ভোগান্তি।

ঠিক এর উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে, এই নিয়ে ১৯৪। চিকিৎসক নিগ্রহের সংখ্যাটা এখানেই পৌঁছেছে শেষ দু’বছরে। তাই আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের তরফে প্রশ্নগুলোও ধারালো এবং সঙ্গত। পরিষেবা বন্ধ ছাড়া আর কী ভাবে জোরদার আন্দোলন বা প্রতিবাদ হতে পারত! নিরাপত্তার অধিকার কি চিকিৎসকদের নেই!

এই দ্বন্দ্ব নিয়েই কেটে গেল আজ তিন দিন। সমাধান? নেই। রফাসূত্র? বেরোয়নি। দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। তদন্তের আশ্বাস দিয়ে বিক্ষোভ তুলে নেওয়ার অনুরোধ এসেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে। কিন্তু সে সবই প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনকারী চিকিৎসকেরা। তাঁদের দাবি, নিরাপত্তা যত ক্ষণ না নিশ্চিত করা হচ্ছে তত ক্ষণ তাঁরা এই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। কাজে ফিরবেন না। ফের মার খাওয়ার এতটুকু সম্ভাবনা যেখানে থেকে যাবে, তাঁরা স্টেথোস্কোপ নামিয়ে রাখবেন তাঁরা। পেশার স্বার্থে নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করতে আর রাজি নন তাঁরা।

কিন্তু এর সমাধানের বদলে, বরং সারা রাজ্য জুড়ে দাউদাউ করে ছড়াচ্ছে ক্ষোভের আঁচ। গত কাল দিনভর বর্বর গুন্ডামি দেখেছে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ। স্থানীয় গুন্ডাদের আক্রমণের মুখে জরুরি পরিষেবা চালু রাখাও সম্ভব হয়নি সেখানকার চিকিৎসকদের পক্ষে। রাতে মালদা মেডিক্যাল কলেজে আন্দোলনকারী ডাক্তারদের উপরে হামলা চালায় বহিরাগত দুষ্কৃতীরা।

আরও পড়ুন: ধর্নারত ইন্টার্ন এবং জুনিয়র ডাক্তরদের উপর চড়াও রোগীর পরিজনরা, রণক্ষেত্র মালদা মেডিক্যাল কলেজ

চিকিৎসকদের এই কর্মবিরতি তথা আন্দোলনের শর্ত ছিল, সমস্ত হাসপাতালের ওপিডি এবং অন্যান্য কাজ বন্ধ থাকলেও, হাসপাতালগুলির জরুরি পরিষেবা চালু থাকবে। কিন্তু সেটা বহু জায়গাতেই ছিল না। কোথাও দুষ্কৃতীদের তাণ্ডবে সম্ভব হয়নি, কোথাও কোথাও বন্ধই ছিল এমার্জেন্সির গেট। এরই মধ্যে কোনও কোনও জায়গায় অসম্ভব চাপের পরিস্থিতিতে দিনভর জরুরি পরিষেবা চালু রেখে গেছেন চিকিৎসকদের একাংশ।

এ সবের মধ্যেই অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এর রেসিডেন্ট ডক্টর্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে গত কাল জারি করা হয় একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি। জানানো হয়, আন্দোলনের পাশে আছে তারা। এই সমর্থনের সঙ্গে সঙ্গেই এনআরএসের এই আন্দোলন কিন্তু জাতীয় স্তরে পৌঁছে গেল বলে মনে করছেন অনেকেই।

যদিও এনআরএসের আন্দোলন বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হওয়ার পথে আগেই এগিয়েছে। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সির মতো বিশ্ববিদ্যালয় পাশে দাঁড়িয়েছে আন্দোলনের। এসেছেন সিনিয়র চিকিৎসকেরাও। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদেরও আনাগোনা দেখা গেছে ধর্নামঞ্চে। সোশ্যাল মিডিয়ার একটা বড় অংশে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে আন্দোলনের সপক্ষে।

বস্তুত, বারুদের স্তূপ হয়েই ছিল এ রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থা। অপেক্ষা ছিল স্ফুলিঙ্গের। এনআরএসের জুনিয়র চিকিৎসক পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের উপর গুন্ডাদের নৃশংস আক্রমণ সেই কাজটাই করল। গোটা রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিল। গত দু’বছরে ১৯৩টি ডাক্তার বা চিকিৎসা কর্মীর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার ক্ষোভ ছিলই। সেই সঙ্গে ছিল, রাজ্য পুলিশের অবাস্তব দাবি, একটিও নাকি আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি! এ সবের পরে সোমবার রাতে এনআরএসের ঘটনা যেন ভেঙে দিল ধৈর্য্যের সমস্ত বাঁধ।

আরও পড়ুন:  আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান, কাতর আর্তিতে ভরছে এনআরএস! মুখ্যমন্ত্রী আসুন, দাবি সকলের

এক বৃদ্ধ রোগীর মৃত্যু, তার বাড়ির লোকের তরফে চিকিৎসকদের নিগৃহীত হওয়া, দেহ ফেরত নিতে গিয়ে বচসা, চিকিৎসকদের কাছে রোগী পরিবারের ক্ষমা চাওয়ার দাবি, এবং এই সবের মাঝে আচমকা শ’দুয়েক গুন্ডা ট্রাকে করে হাসপাতালে ঢুকে পড়ে নির্মম ভাবে জুনিয়র ডাক্তারদের উপর নৃশংস সশস্ত্র আক্রমণ। সোমবার রাতে এনআরএস হাসপাতালের এই চরম নিন্দনীয় ঘটনায় প্রতিবাদে মুখর চিকিৎসকেরা। চলছে ধর্না, বিক্ষোভ। এনআরএসের গণ্ডি ছাড়িয়ে গোটা শহরের সব ক’টি হাসপাতালে ছড়িয়েছে ক্ষোভের আঁচ। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা রাজ্যের নানা প্রান্তের সরকারি হাসপাতালগুলি থেকে খবর এসেছে, অবস্থান-বিক্ষোভে বসেন জুনিয়র চিকিৎসকেরা।

আরও পড়ুন: মৃত্যুকে ছুঁয়ে ফিরলেন পরিবহ, নিজে মুখেই জানালেন ‘ভালো আছি’

এই পরিস্থিতিতে গতকাল এনআরএস হাসপাতালের অধ্যক্ষ আন্দোলনরত তিন-চারজনকে নিয়ে বৈঠক করতে চাইলেও,কর্মবিরতিতে থাকা ডাক্তাররা সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য দফতরে বৈঠকের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর কোনও আলোচনা নয়, কেবল নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হোক– দাবি উঠেছে আরও তীব্র ভাবে।

জুনিয়র চিকিৎসকদের দাবি, যে ভয়ঙ্কর চাপের মুখে রোগী সামলাতে হয় তাঁদের, পরিকাঠামোর যে তীব্র খামতি– এ সমস্যাগুলো না মেটালে পরিস্থিতি বদলাবে না। আন্দোলনকারী এক চিকিৎসকের কথায়, “একটা ওযার্ডের গড়ে ১৫০ রোগী সামলাচ্ছেন দু’জন চিকিৎসক। পর্যাপ্ত পরিষেবা না পেয়ে ফের তাঁদের উপরেই হামলা করছেন রোগীর পরিবার। অনেক সময়ে জীবনদায়ী নানা ওষুধ মেলে না হাসপাতালে। সেগুলো কিনতে বললেই শুনতে হচ্ছে, ‘সরকার তো ফ্রি বলেছে চিকিৎসা, কেন টাকা দিয়ে ওষুধ কিনব!’ সন্দেহের মুখে পড়তে হচ্ছে চিকিৎসকদের।”– এই পরিস্থিতি আর কত দিন চলবে, প্রশ্ন তাঁদের।

এবং তাঁদের তীব্র অভিযোগ, দু’ট্রাক ভর্তি লোকের মধ্যে থেকে পাঁচ জনকে গ্রেফতার করাটা আদৌ যথেষ্ট নয়। তাঁরা আরও জানান, আন্দোলনের পথ বদলানোর প্রশ্নই ওঠে না। তাঁদের একটাই দাবি, নিরাপত্তা চাই। সেই সঙ্গে সোমবার ডাক্তার পেটানোর ঘটনায় জড়িত গুন্ডাদের গ্রেফতার করার পরে চার্জশিট দেখাতে হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে যে পুলিশরা ব্যর্থ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে হবে। এবং একই সঙ্গে, গোটা পরিকাঠামোয় বদল আনতে হবে।

আরও পড়ুন…

দাবি না মিটলে অবস্থান উঠবে না, সাফ জানিয়ে দিলেন ডাক্তাররা

Comments are closed.