বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫

অ্যাপেই রূপকথা লিখছেন তরুণী: বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবসে বার্তা, ‘বিশেষ’ সঙ্গী প্রত্যেকের জন্য জরুরি

Spread the love

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ওঁরা ‘অক্ষম’। ওঁরা ‘পিছিয়ে পড়া’। ওঁরা আর পাঁচ জনের চেয়ে ‘আলাদা’। তাই ওঁদের সব কিছুই ‘স্পেশ্যাল’। কিন্তু এই স্পেশ্যালে যতটা করুণা, দয়া বা অনুগ্রহের ছায়া পড়ে, ততটা ছায়া পড়ে না ভালবাসা বা সহানুভূতির। ওঁদের বেঁচে থাকা একটু সহজ করতে অনেকেই হয়তো সক্রিয় হন। ওঁদের অধিকারবোধ নিয়ে সরব হন। কিন্তু এ সবই বেঁচে থাকর জন্য। কিন্তু ভাল থাকা? বেঁচে থাকলেই তো ভাল থাকা হয় না! অথচ আমাদের বাঁচার জন্য ভাল থাকা জরুরি। তা হলে ওঁদের কেন নয়?

এই ভাবনা থেকেই অনন্য হয়ে উঠেছেন কল্যাণী খোনা এবং শঙ্কর শ্রীনিবাসন। বিশেষ মানুষগুলোর জীবন আরও একটু বিশেষ করে তোলার জন্য প্রায় নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন এঁরা। তৈরি করেছেন একটি ম্যাচ মেকিং অ্যাপ, যার মাধ্যমে বিশেষ ভাবে সক্ষম প্রতিবন্ধী মানুষেরা খুঁজে পাবেন জীবনসঙ্গী। অ্যাপের নাম, ‘ইন্কলাভ’। ভেঙে বললেন, ইনক্লুডিং লাভ। ভালবাসার আওতায় ইনক্লুডেড সকলে। সক্কলে।

ইন্কলাভের প্রতিষ্ঠাতা কল্যাণী খোনা ও শঙ্কর শ্রীনিবাসন।

বস্তুত, প্রতিবন্ধী শব্দটাই একটা আপত্তির জায়গা বলে মনে করেন এই ক্ষেত্রের কর্মীরা। তাঁদের বক্তব্য, এই মানুষগুলির জীবনে কোনও কিছুই না-পারা নয়, বরং তাঁদের পারাগুলি খানিক আলাদা। বিশেষ। স্পেশ্যাল। তাই গত কয়েক বছর ধরেই প্রতিবন্ধী শিশুর বদলে স্পেশ্যাল চাইল্ড শব্দবন্ধটি অধিক জনপ্রিয়, গৃহীতও। কিন্তু খাতায়-কলমে এই সমস্ত হলেও, আসল প্রতিবন্ধকতা যে সমাজেরই, তা প্রমাণ হয়ে যায় বারবার। নিজ ক্ষেত্রে বারবার সাফল্যের নিদর্শন রাখার পরেও, তাই বিশেষ মানুষদের গা থেকে মোছে না প্রতিবন্ধী ট্যাগ।

কিন্তু কল্যাণী-শঙ্করের এই অ্যাপ এবং তার ব্যবহারিক প্রয়োগ শুধু যে ট্যাগ ঘুচিয়েছে তাই নয়, বরং আর পাঁচ জন মানুষের জীবনের স্বাভাবিক চাওয়া-পাওয়াগুলোর স্বাদ বড় আনন্দের সঙ্গে আস্বাদন করিয়েছেন তাঁদের। বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রতিটা স্পেশ্যাল মানুষের জন্য স্পেশ্যাল সঙ্গী রয়েছে। খুঁজে নিতে জানলে সত্যিই একটা স্পেশ্যাল সম্পর্কের উপহার পেতে পারেন প্রত্যেকে। কাজটা সহজ ছিল না। আজ থেকে বছর দুয়েক আগে যখন প্রথম এ কাজে হাত দিয়েছিলেন দুই আনকোরা তরুণ-তরুণী, তখন ভাবতেও পারেননি সাফল্য আর আনন্দ এভাবে আসবে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম এই অ্যাপ লঞ্চ করে।

বছর কয়েক আগে জনপ্রিয় বলিউড মুভি বরফি দেখিয়েছিল, ভালবাসতে জানলে ফিকে হয়ে যায় সমস্ত বাধা। প্রতিবন্ধকতারা পিছু হঠতে বাধ্য মানুষের বিশ্বাসের কাছে। কল্যাণীও বিশ্বাস করেছিলেন এমনটাই। বুঝেছিলেন, ভালবাসা খুঁজে দেওয়ার মতো ভাল কাজ আর হয় না। তা-ও যদি হয় এই বিশেষ মানুষগুলোর জন্য, তবে তা তাদের সব চেয়ে বড় উপহার হতে পারে।

কল্যাণী বলেন, “আমাদের প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল, অ্যাপটি এমন ভাবে তৈরি করা, যাতে প্রতিটা মানুষ এই অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। যাঁরা চোখে দেখতে পান না তিনিও যেন ‘দেখতে’ পান এই অ্যাপের কার্যকারিতা। যিনি কানে শুনতে পান না, তাঁর জন্যও রাখা হয় বিশেষ উপায়। আমরা এটা এমন ভাবে তৈরি করতে চেয়েছিলাম, যাতে অক্ষমতা যেমনই হোক, এটা ব্যবহার করতে কাউকে অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে না হয়।”

ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে অ্যাপের। দুয়েক জন মানুষ পছন্দের সঙ্গী-সঙ্গিনী খুঁজে ডেটে যেতে শুরু করেন। পরস্পরের সঙ্গে পরিচিত হন। বিয়েও হয় এই অ্যাপের মাধ্যমে।

এর পরেই ইন্কলাভের ছাতা আরও একটু বড় করেন কল্যাণীরা। অনলাইন অ্যাপ ছাড়াও, প্রতি মাসে নিয়মিত অফলাইন মিট করার প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করেন। ‘সোশ্যাল স্পেস’ নামের এই প্রোগ্রামে ইচ্ছুক মানুষেরা একসঙ্গে হতে পারেন, সামনাসামনি কথা বলতে পারেন একে অপরের সঙ্গে। বিনিময় করতে পারেন নিজের নিজের কথা।

“কারণ অনেকেই বলছিলেন, সঙ্গী খুঁজে তো পেয়েছি, ডেটে কোথায় যাব? এমন কোনও জায়গা তো নেই, যেখানে ‘আমরাও’ সুন্দর সময় কাটাতে পারি। কোনও কফিশপে হুইল চেয়ার নিয়ে ঢোকার মতো টয়লেট নেই, কোনও রেস্তরাঁর কর্মীরা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝেন না। কী ভাবে নিজেদের মধ্যে সুন্দর সময় কাটাব আমরা। এই সব প্রশ্নগুলো পেতে শুরু করা পরেই এই অফলাইন মিটের কথা ভাবি আমরা।”– বললেন কল্যাণী।

দিল্লি, জয়পুর, গুরগাঁও, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু– ইত্যাদি শহরে এই প্রোগ্রাম হয়েছে বেশ কয়েকটি। শারীরিক বাধার কথা মাথায় রেখে এমন জায়গা বাছা হয়, যেখানে তাঁদের পৌঁছতে বা অংশ নিতে কোনও অসুবিধার মুখে না পড়তে হয়।
এই দু’বছরে ইনক্লোভের মাধ্যমে যোগাযোগ করে সংসার পাতার গল্পের সংখ্যা নেহাত কম নয়। অনেকেই আবার চুটিয়ে প্রেম করছেন, শিগ্গিরিই বিয়ে করবেন। কল্যাণীর দাবি, “এখন দেশের ছোট-বড় মিলিয়ে ৩০০টি শহরের ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ এই অ্যাপ ব্যবহার করছেন। আমাদের পরিসর, পরিবার বড় হচ্ছে ধীরে ধীরে।”

যেমন অর্পণ আর অঞ্জলি। বছর খানেক আগে এই অ্যাপেই একে অপরকে খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁরা। আজ তাঁদের দাম্পত্য রীতিমতে মুগ্ধতা ছড়ায় আশপাশের মানুষের মনে। অঞ্জলি বলছেন, “এ সব অ্যাপের ওপরেই কোনও দিন ভরসা ছিল না আমার। তার ওপর এরকম বিশেষ অ্যাপ যে আদৌ হতে পারে, ভাবিনি। কোনও দিন এটাও ভাবিনি যে জীবনসঙ্গী খুঁজে পাব। সব কিছু বদলে গেল একটা ক্লিকে! যে জীবনকে প্রতিটা মুহূর্তে অভিশপ্ত মনে হতো, একটা সম্পর্ক সে জীবনকে রঙিন করে তুলেছে। ইন্কলাভের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, অর্পণকে খুঁজে দেওয়ার জন্য।”

অঞ্জলি ও অর্পণ।

এত কিছুর জন্য মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ কল্যাণী। মুম্বইয়ের কলেজছাত্রী হিসেবে একটি পাহাড়ে ট্রেক করতে গিয়েছিলেন কল্যাণী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন, এবং ভেবেছিলেন বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষেরা এই পাহাড়ে ঘোরার আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকবেন! সেই শুরু ভাবনার। পাহাড় ঘোরার আনন্দ না হোক, তাঁদের জীবনের আনন্দের সন্ধান শুরু করেছিলেন সেই ১৭ বছর বয়সেই। টাকা ছিল না। ছিল অদম্য মনের জোর আর পরিশ্রম করার ক্ষমতা। অনন্ত স্বপ্ন দেখতে পারার জেদ। এই স্বপ্নের সঙ্গেই মিলেছিল শঙ্করের সাপোর্ট। শেষমেশ কল্যাণী মাত্র তেইশে পৌঁছে তৈরি করে ফেলেন এই অ্যাপ।

এখন কী করতে চান কল্যাণী? তিনি বলছেন, “আমরা অদূর ভবিষ্যতে এমন একটা সিস্টেম তৈরি করব, যাতে ভিডিও কলিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক আলাপটুকু সারতে পারেন ওঁরা। কিন্তু অনেকের কাছেই সেটা সহজ হবে না, বিশেষ করে যাঁরা কথা বলতে ও শুনতে পারেন না। কিন্তু ওঁরা কী ভাবে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের ব্যবহার করতে পারবেন ভিডিও কলে, তার উপায় বার করতে টেকনোলজি নিশ্চয় পারবে। সেটা করিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।”

দেখে নিন ইন্কলাভের টুকরো ভিডিও।

কল্যাণী বিশ্বাস করেন, টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে করা যায় না এমন কাজ বিশ্বে বিরল। নিজে বাণিজ্যের ছাত্রী হলেও, প্রযুক্তি নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছেন কল্যাণী। এবং ঠিক করেছেন, এ প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ওই বিশেষ মানুষগুলোর জন্য ভাল ভাবে বেঁচে থাকার, জীবনের আনন্দ খুঁজে পাওয়ার নতুন দিগন্ত খুলে দেবেন তিনি।
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবসে এমনই অঙ্গীকার ইন্কলাভের। তাই কল্যাণী বলছেন, “ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ একা থাকতে বাধ্য নয়। বিশেষ সঙ্গী প্রত্যেকের জন্য জরুরি।”

Shares

Comments are closed.