শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

মাংস-সব্জির পুর, ভাসন্ত মিট বল, স্বাদকোরকে তুফান তুলছে ‘মাস্টার ডিমসাম’

চৈতালী চক্রবর্তী

মোমোর উৎপত্তি কী ভাবে হল, এই নিয়ে যদি জোর তর্ক বাঁধে তাহলে কোন দেশ জিতবে সে কথা জানা নেই, তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই স্বাদু পদের রন্ধন শৈলীই নেপাল, তিব্বত, ভুটান ঘুরে ভারত ছুঁয়ে উঁকি মেরেছিল চিন দেশেও। চিনা পদ ‘বাওজি’ এবং ‘জিয়াওজি’র মতোই পেটে পুর ঠাসা মোমোরই সহোদরের আলতো আদর যিনি জিভে ঠেকাননি, তাঁকে তো ছুটতেই হবে যে কোনও চিনা রেস্তোরাঁয়। নুডলসের প্রতিটি পাকে অভিজ্ঞ চিনা শেফের তারিফ করতে করতে জমাটি সান্ধ্য আসর বসানোর মধ্যেই যেন হারানো প্রেম ফিরে পায় বাঙালি।

মোমো-নুডলস থেকে সুয়ে মাই—চিনা স্ন্যাকস থুড়ি ডিমসাম-এর স্বাদ পেতে তাই বাঙালি ভিড় জমায় রেস্তোরাঁয়, টেরেটি বাজারে চিনা গলির আনাচ কানাচে।

হংকং স্টাইল জিওজা

আজকের কলকাতার যে কোনও চিনা রেস্তোরাঁতে ঢুকলেই মালুম হবে, ভিন্ ঘরানার রান্নাকে নিজের জিভের চাহিদামাফিক আত্মীকরণের ট্র্যাডিশন এখনও বহাল। ডিমসামের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। সাম্বাল সসে রান্না গ্রিলড ফিশ বলে যে পুরুষ্টু মৎস্যখণ্ডটি আপনার পাতে এল, তার মধ্যে হুবহু দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার ঘ্রাণ খুঁজতে যাওয়ার মানে হয় না। নুডলসের স্যুপে ডুবে থাকা মিট বল চপস্টিকে জড়াজড়ি করে যখন স্বাদকোরকে তুফান তোলে, তখন তার ঠিকুজি-কুষ্ঠি নিয়ে কোন বেরসিক মাথা ঘামাবে!

মেটাবল স্টিক নুডলস স্যুপ

সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের বিবেকানন্দ পার্কে ‘মাস্টার ডিমসাম-এর স্টোরে পা রাখলে ঠিক এমন অনুভূতিই হবে যে কোনও ভোজন রসিকের। একই সঙ্গে নানা রকম ডিম সামের সুঘ্রাণ যেন নিমেষের মধ্যে উড়িয়ে নিয়ে যাবে চিনের কোনও নামজাদা রেস্তোরাঁ পাড়ায়।

স্টিমড বাও

স্টিমড বাওয়ের স্বাদ লেগে থাকতেই যখন পর্ক সুয়ে মাই পাতে এসে পড়বে তখন তাতে চিনা গন্ধ আছে, তা থাই ডেলিকেসি, সেই নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামাবার দরকার নেই।

চিনা হেঁসেলের টানে মাস্টার ডিমসাম-এ খেতে এসে বাঙালি তাই চাখছে সয়াস্নাত চটপটা হংকং স্টাইল জিওজা। মাংসের বা সব্জির পুরে পুষ্ট জমজমাট মোমো। নুডলস স্যুপে সব্জির সঙ্গে হাত ধরে ভেসে থাকা পুরুষ্টু মিট বলের স্বাদ অগ্রাহ্য করার নয়। দক্ষিণ

 

মিটবল স্টিক

চিনের স্পেশাল ডাম্পলিং থুড়ি ব্লেন্ড করা সব্জির সঙ্গে মিহি মাংসের (বিশেষত পর্ক) পুর কোনও এক নাম না জানা সসের সঙ্গে মাখামাখি হয়ে রসনায় ঝড় তুলছে। খাস থাইল্যান্ডের স্মৃতি মাখা ঝালঝাল থাই ডাম্পলিং-ও বাঙালির জিভে খুলছে।

ডিমসাম নামেই যেন রয়েছে জাদু। হৃদয়ের ছোঁয়া। চিনা ভাষায় ‘ডিম’ মানে হল স্পর্শ আর ‘সাম’ মানে হৃদয়। দুয়ে মিলে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক অনুভূতি। নামের সঙ্গে সঙ্গে এই ডিমসামের ইতিহাসেও রয়েছে হৃদয়ের স্পর্শ। ফেলে আসা সময়ের টান।

মোমো

এক সময় সিল্ক রুটে দিয়ে যে ব্যবসায়ীরা যাতায়াত করতেন তাঁদের কাছে পরিচিত শব্দ ছিল ‘ইউম চা’ (Yum Cha)। অর্থাৎ পথশ্রমের ক্লান্তি নিমেষের মধ্যে গায়েব হত এক পেয়ালা গরম চায়ে। সিল্ক রুটের আনাচ কানাচেই তাই ছিল এমনই চায়ের ঘুপচি দোকান। তবে, শুধু চায়ে পথিকের মন ভরে না। তার সঙ্গে চাই মুখরোচক খাবারও। পেটও ভরবে, মনও হবে

সুয়ে মাই

ওন টন

চাঙ্গা। খুচরো খিদে মেটাতে দোকানিরা বানাতে শুরু করলেন গরম, ক্রিসপি সব খাবার যাকে আধুনিক মানুষ স্ন্যাকস বলে থাকেন। চায়ের সঙ্গে হাতে উঠে আসা এমনই সব খাবারের নাম ডিমসাম।

পরবর্তীকালে এই ধারাকে ধরে রাখতেই চিনের গুয়াংঝউতে খুলল ডিমসামের নানা রেস্তোরাঁ। খাবারের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে হ্যাংআউটের আদর্শ জায়গা। হংকং-এ একসময় ডিমসাম খেতে ভোর পাঁচটায় রেস্তোরাঁয় ঢুঁ মারতেন পথচারীরা। ভোরের শরীরচর্চা সেরে এক চাপ চায়ের সঙ্গে ডিমসাম দিয়েই শুরু হত প্রাতরাশ। ধীরে ধীরে প্রাতরাশ থেকে ডিমসাম জায়গা করে নিল সান্ধ্যভোজ, এমনকি ডিনার টেবিলেও। এই বিপুল চাহিদা মেটাতে সিঙ্গাপুর থেকে নিউ ইয়র্ক— বিশ্বের নানা প্রান্তে জনপ্রিয় হয়ে উঠল ডিমসামের স্টোর।

থাই ডাম্পলিং

কলকাতায় প্রথম এই ট্রাডিশনকে বয়ে নিয়ে আসার কারিগর দু’জন মানুষ। দেবাদিত্য এবং শিলাদিত্য চৌধুরী। কলকাতার ‘আউধ ১৯৫০’ এবং ‘চ্যাপ্টার ২’ খোলার পিছনেও এই দুই ভাইয়ের পরিশ্রম রয়েছে। সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোজন রসিকদের চাহিদা মেটাতে খোলা থাকবে মাস্টার ডিমসাম-এর দরজা। অভিজ্ঞ শেফ পিটার চিন রয়েছেন এই ডিমসাম তৈরির দায়িত্বে। শিলাদিত্য এবং দেবাদিত্যের থেকে জানা গেল, অগস্টের মধ্যে কলকাতা জুড়ে এমন আরও ১৫টি মাস্টার ডিমসাম-এর স্টোর খুলতে চলেছে। আগামী বছরে সেই সংখ্যা দাঁড়াবে কুড়িতে। কলকাতা এখন ডিমসাম-ময়। পেটুক বাঙালির ভোজন-বিলাসের নতুন ঠিকানার নামই ডিমসাম।

Comments are closed.