শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

প্রয়াত ‘কুকিং স্টার’ মাসতানাম্মা: খোলা মাঠে, উনুন জ্বেলে, দেশি রান্নায় মাতিয়েছিলেন ইউটিউব

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স হয়েছিল ১০৭। কুঁচকে গিয়েছিল চামড়া। ম্লান হয়েছিল দৃষ্টিশক্তি। তাতে কী! এতটুকু ভুল হতো না আন্দাজে। সারা গ্রামকে রেঁধে খাওয়ানোর সময় এতটুকু নড়চড় হতো না স্বাদে। আর সেই রান্নার ভিডিওই ইউটিউবে আপলোড করে রীতিমতো ‘স্টার’ হয়ে উঠেছিলেন অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুরের বৃদ্ধা মাসতানাম্মা। মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া অনুরাগী মহলে।

দু’বছর আগের কথা। মাসতানাম্মা সে দিন বেগুন-কারি রাঁধছিলেন গ্রামের একটি অনুষ্ঠানে। তাঁর রান্নার হাত বরাবরই মুগ্ধ করেছে খাদ্যরসিকদের। তিনি ভাল রান্নার জন্য যতটা না পরিচিত ছিলেন, তার চেয়েও বেশি পরিচিত ছিলেন নানা রকম রান্না জানার জন্য। সেই দিনের সেই বেগুন-কারি রাঁধার সময়ে কোনও বিশেষ কারণ ছাড়াই তা ভিডিও-বন্দি করেছিলেন মাসতানাম্মার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়, লক্ষ্মণ।

এর পরে ভিডিওটি ইউটিউবে আপলোড করতেই ম্যাজিক। খুব দ্রুত প্রায় এক লক্ষ মানুষ দেখে ফেলেন সেই ভিডিও। বিজ্ঞাপনও আসে বেশ কিছু। এর পরেই লক্ষ্মণ এবং আর এক আত্মীয় রেড্ডি– দু’জনে মিলে খুলে ফেলেন নতুন ইউটিউব চ্যানেল, কান্ট্রি ফুড। বিভিন্ন রকমের অপ্রচলিত, গ্রামীণ রান্নার ভিডিও আপলোড করতে থাকেন তাঁরা। রাঁধুনির ভূমিকায় সেই মাসতান্নাই। প্রত্যেকটা রান্না হতো নিখাদ দেশি পদ্ধতিতে। খোলা আকাশের নীচে, অনেক মানুষের খাওয়ার মতো পরিমাণে।

দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে চ্যানেলটি। বাড়তে থাকে মাসতানাম্মার পরিচিতি, সুখ্যাতি। বৃদ্ধার সহজাত স্নেহ, শেখানোর সহজ পদ্ধতি, এবং তাঁর রান্নার মেঠো গন্ধই বেশি করে মন টেনে নেয় দর্শকদের। বাড়তে থাকে তাঁর অনুরাগীর সংখ্যাও। ১২ লক্ষেরও বেশি মানুষ সাবস্ক্রাইব করেন তাঁর চ্যানেল। তিনি হয়ে ওঠেন, ইউটিউবের বৃদ্ধতম ‘কুকিং স্টার’।

নানা রকম নতুন নতুন রান্না খুব সহজে করে দেখাতেন বৃদ্ধা। সে কোনও সামুদ্রিক মাছের পদই হোক, বা ভেড়ার আস্ত মাথা, বা তরমুজের খোলায় চিকেন। অন্ধ্রের নিজস্ব মশলা ব্যবহার করে তাঁর রাঁধা মুচমুচে মুরগি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। হালের চিলিচিকেনও খুব সহজে রাঁধতে শিখিয়েছিলেন তিনি। আর এই প্রতিটা রান্নার উপকরণ ছিল ঘরোয়া। হয় স্থানীয় বাজার থেকে, নয় জঙ্গল থেকে নিজেই নিয়ে আসতেন তিনি। রাঁধার আগে সবজিপাতির খোসা ছাড়াতেন নিজের হাতে, নখ দিয়ে। মশলা বা প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপকরণ দেয়ার বাঁধাধরা কোনও নিয়মও নেই তার রেসিপিতে। চোখের আন্দাজেই সব কিছু দেন তিনি।  খাবার পরিবেশন হতো কলাপাতায়।

মাস ছয়েক ধরে বন্ধ ছিল নতুন ভিডিও আপলোড। অনুরাগীরা খোঁজ নিতে শুরু করলে জানতে পারেন, অসুস্থ রয়েছেন তিনি। শেষমেশ একটি নতুন ভিডিও প্রকাশ করা হয় চ্যানেলের কর্ণধার লক্ষ্মণ ও রেড্ডির তরফে, তাতে দেখা যায় মারা গিয়েছেন মাসতানাম্মা। তাঁর শেষযাত্রায় সামিল হয়েছেন গ্রামবাসীরা। দেখুন সেই ভিডিও।

স্থানীয়রা বলছেন, একটি একাই থাকতেন বৃদ্ধা। নিজের মতো দিন কাটাতেন রান্নাবান্না নিয়ে। ব্যস্ত থাকতেন নতুন নতুন পরীক্ষা নিয়ে। নিজের কাজ নিয়ে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। তার ছাপই পড়ত প্রতিটা ভিডিওয়। এই সব মিলিয়েই ইউটিউবের ইতিহাসে বড় জায়গা করে নিলেন মাসতানাম্মা।

বৃদ্ধতম ইউটিউবার হিসেবে তিনি মারা গেলেও, তাঁর কাজগুলি অমর হয়ে রয়ে গেল ইন্টারনেটে।

Shares

Comments are closed.