মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

মোদীর উচিত সঙ্কটের কথা স্বীকার করা, টানা কয়েক বছর ধরে চলতে পারে মন্দা: সতর্কবাণী মনমোহনের

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সম্প্রতি একটা ঝুটো খবর রটে গিয়েছিল বাজারে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নাকি দেখা করতে গিয়েছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের সঙ্গে। দিল্লি থেকে সেই গুজব কলকাতা অবধি এসে পৌঁছেছিল।

সে যা-ই হোক। বৃহস্পতিবার অর্থনীতির আসল ছবিটা মোদীকে দেখাতে চাইলেন মনমোহন।

মোদী-মনমোহনের সাক্ষাৎ কিন্তু হয়নি। হিন্দু বিজনেস লাইন এবং দৈনিক ভাস্কর পত্রিকায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। আর তাতেই মোদী সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থা নিয়ে তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছেন সেই তিনি, যাঁকে মৌন-মোহন বলে এক সময় কটাক্ষ করত বিজেপি।

সাক্ষাৎকারে মনমোহন পষ্টাপষ্টিই বলেছেন, “অন্য রকম একটা সঙ্কটে ঢুকে পড়ছি। দীর্ঘমেয়াদী মন্দা গ্রাস করতে চলেছে দেশকে। যা এক টানা কয়েক বছর ধরে চলবে। এই সঙ্কট যেমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গঠনগত কারণে তৈরি হয়েছে, তেমনই এটা চক্রাকারে ফিরে আসবে বলেই আমার আশঙ্কা।” তাঁর কথায়, এই সঙ্কট থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রথমে স্বীকার করতে হবে, ‘হ্যাঁ সঙ্কট তৈরি হয়েছে!’

অর্থনীতির মন্দাগ্রাস নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অবশ্য এখনও একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার যে সব পদক্ষেপ করেছে, তা নিয়ে যা বলার তা অর্থমন্ত্রীই বলেছেন। বরং সরকারের একশো দিনের পূর্তি নিয়ে প্রচারে ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী।

মনমোহন এ দিন ঠিক সেই জায়গাতেই আঘাত করতে চেয়েছেন। বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী খবরের কাগজের হেডলাইন ম্যানেজ করা ছেড়ে প্রকৃত সমস্যার দিকে তাকান। স্রেফ রাজনীতি করে, টুকরো কিছু ব্যবস্থা নিয়ে এই সঙ্কটের মোকাবিলা সম্ভব নয়। এ জন্য স্ট্রাকচারাল রিফর্ম অর্থাৎ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গঠনগত সংস্কার প্রয়োজন। এমন আমূল সংস্কার দরকার যা রাতারাতি প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।

মনমোহন বরাবরই সংস্কার পন্থী। নব্বইয়ের দেশকে অর্থনৈতিক উদারিকরণের পথে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনিই। পরবর্তী কালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও তিনি সংস্কারের পথে হাঁটতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তখন সমস্যা ছিল। ইউপিএ সরকারের প্রথম মেয়াদে সরকারের চালিকাশক্তি ছিলেন বামেরা। তাঁরা পিছন থেকে টেনে ধরেছিলেন। পরে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারে বড় শরিক দল ছিল তৃণমূল। খুচরো ব্যবসায় প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি হোক বা ভর্তুকি কমানোর মতো বিষয়ে– তাঁরাও পিছনে টেনে ধরেছিল মনমোহন সরকারকে।

মোদীর সেই সমস্যা নেই। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে বিজেপি-র। মনমোহনও সেই কথাই বলেছেন। তাঁর কথায়, “এক বার নয়, পর পর দু’বার ওরা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। আমি সেই সুযোগ পাইনি”।

এ সব কথা বলার পাশাপাশিই মন্দা মোকাবিলায় কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাওয়াইয়ের কথা বলেছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।

জিএসটি তথা পণ্য পরিষেবা কর সহজ করতে হবে

মনমোহন বলেন, পণ্য পরিষেবা করের বাস্তবায়ন হল একটা গঠনগত সংস্কার। আমিও এর পক্ষে ছিলাম। কিন্তু মোদী সরকার তাড়াহুড়ো করেছে তা নিয়ে। নোটবন্দির ক্ষত ব্যবসায়ী শুকিয়ে উঠতে পারেননি, তার মধ্যেই নতুন ঘা দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। তাঁর কথায়, জিএসটি-র হার কমিয়ে গোটা প্রক্রিয়া যত দ্রুত সহজ করা যাবে ততই মঙ্গল। তাতে স্বল্প মেয়াদে সরকারের যদি রাজস্ব ঘাটতি হয়, তা-ও আচ্ছা।

বাজারে টাকার জোগান বাড়াতে হবে

মনমোহন আরও বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে মিশিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ মন্দ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, এটা কি সে জন্য সঠিক সময়। এখন অগ্রাধিকার দিতে হবে বাজারে নগদের জোগান বাড়ানোর উপর। সেই সঙ্গে নন পারফর্মিং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট জরুরি।

গ্রামে চাহিদা বাড়ানোর চেষ্টা করা

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মতে, সামগ্রিক ভাবে বাজারে চাহিদা কমেছে। এবং চাহিদা কমছে বলেই শিল্পোৎপাদনও কমছে। গ্রামে যাতে চাহিদা বাড়ে এবং মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে সেজন্য কৃষি ক্ষেত্রের উপর নজর দিতে হবে। বিশেষ করে কৃষি বিপণনের উপর গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে। কৃষি পণ্য রফতানির সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো

মনমোহনের কথায়, গত কয়েক বছর ধরে দেশে কর্মসংস্থানের হার খুবই কম। সরকার এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজের কাজ হয়নি। কারণ, যে শিল্প ক্ষেত্রগুলিতে কর্মসংস্থানের বেশি সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে সেগুলিতে পৃথক ভাবে নজর দেওয়া হয়নি। বস্ত্র, রিয়েল এস্টেট, ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রকে আরও উৎসাহ দিতে হবে।

নতুন রফতানি বাজারের সন্ধান করা

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর কথায়, আমেরিকা ও চিনের মধ্যে যে বাণিজ্যিক সংঘাত শুরু হয়েছে, তার প্রভাব ভারতের রফতানি বাণিজ্যের উপর পড়তে বাধ্য। তাই সরকারের উচিত নতুন রফতানির নতুন বাজারের সন্ধান করা। যাতে রফতানি বাণিজ্য মার না খায়।

মনমোহনের এই কথাগুলি বলার মধ্যে অবশ্যই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। সনিয়া গান্ধী সেই কারণেই তাঁকে ইদানীং আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বারবার বিবৃতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছেন অশীতিপর মনমোহনকে। কারণ, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টতই বোঝানোর চেষ্টা করছেন, অর্থনীতি ম্যানেজ করা মোদীর কাজ নয়। শুধু রাজনীতিটাই জানেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।

তিহাড় জেলে বসেই মনমোহনকে সমর্থন জানিয়েছেন প্রাক্তন অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পি চিদম্বরম। টুইট করে তিনি মোদী সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ শোনার জন্য। কারণ দেশের অর্থনীতি শোধরানোর জন্য বিরোধীদের তরফে এর থেকে ভালো পরামর্শ কেউ দেবেন না বলেই জানিয়েছেন তিনি।

Comments are closed.