সোমবার, এপ্রিল ২২

গুটি কাটা প্রজাপতির রূপকথা

মনীষা পৈলান

অ্যাসিড ভিকটিম। ক্ষতবিক্ষত মুখ। অসমান ত্বক। চামড়া গুটিয়ে যাওয়া ছোট ঘোলাটে চোখ। অনেক কিছু তড়বড় করে বলতে চাওয়া, ভাঙতে চাওয়া, লড়তে চাওয়া তরুণী।

আর উল্টো দিকে

 

সাম্য কার্ফা

আন্তর্জাতিক মানের আবৃত্তি শিল্পী। সুদর্শন। ভরাট গলার স্বর। সৃষ্টিসুখের নেশায় আচ্ছন্ন। নতুন কিছু তৈরি করার চেষ্টায় ডুবে থাকা, শান্ত, সুখী যুবক।

দু’জনের দেখা হওয়ার কথা ছিল না, হল। কাজের সূত্রে। ‘অসুন্দর’-তরুণীর ভিতর থেকে সুন্দরকে ছেনে, তাকে সুরে-তালে-ছন্দে বেঁধে, নতুন এক সৃষ্টি করলেন শিল্পী যুবক। সৃষ্টির নাম, “থাপ্পড়”। সে সৃষ্টি ইউটিউবের মাধ্যমে সামনে আসার পরেই কুড়িয়ে নিল দর্শক-শ্রোতাদের অগাধ ভালবাসা।

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

এর পরে ফোন-মেসেজে আসা ভালবাসা-ঝড় সামলানোর দু’দিন পরে মুখোমুখি হলেন তাঁরা। আড্ডা মারলেন, দ্য ওয়ালের দফতরে। ভাগ করে নিলেন, ‘কুৎসিত’ রাজকন্যার গল্প। ২০১৫ সালে, পাড়ার যুবকের দ্বারা অ্যাসিড হামলায় আক্রান্ত জয়নগরের তরুণী মনীষা পৈলানের সঙ্গে বেহালার আবৃত্তিশিল্পী সাম্য কার্ফার সেই মুখোমুখি আড্ডা শুনলেন, তিয়াষ মুখোপাধ্যায়।

 

সাম্যতা হলে! তোমার তো এখন দারুণ ব্যাপার! দু’দিনে ছ’হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে গেল ‘নায়িকা’ মনীষা!
মনীষা: নায়িকাই বটে। সে রকমই মনে হচ্ছে নিজেকে। (খিলখিলে হাসি) ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। আয়নার সামনে দাঁড়াতাম বারবার। মাধুরী দীক্ষিতকে কপি করতাম। ওঁর মতো হাঁটা, ওঁর মতো কথা বলা, ওঁর মতো হাসি… খুব চেষ্টা করতাম। চাইতাম ওই রুপোলি জগতটায় পৌঁছতে। খুব চাইতাম, নায়িকাদের মতোই স্বনির্ভর হবো।

সাম্যতার চেয়ে কম কী! কম লোক চিনেছে নাকি! তুমি তো স্টার!
মনীষা: ঠিকই। গত এক বছরে, আর বিশেষ করে এই ভিডিও রিলিজ়ের পরে গত দু’দিনে… কম ভালবাসা তো পাইনি। পাইনি কম ভরসা। কম পড়েনি খ্যাতিরও। সাহস জোগানোর মানুষের অভাব হয়নি। কিন্তু তবু সাহসি হতে পারছি কই! ভয়কে জয় করতে পারছি কই!

সাম্যকেন, ভয় কেন?
মনীষাকারণ কী বলি… আমার সঙ্গে যেটা ঘটেছে, সেটা একটু ব্যাখ্যা করে বলতে হয় তা হলে। আসলে সকলের কাছেই বিষয়টা খুব একরৈখিক। এটাই সকলে বারবার জেনেছেন,সেলিমের (মনীষার ‘প্রেমিক’ হতে চাওয়া পাড়ার যুবক) বিয়ের প্রস্তাব আমি প্রত্যাখ্যান করায়, ও আমায় অ্যাসিড ছুড়ে মারে। আসলে তা নয়। মোটেই তা নয়। এর অনেক আগে থেকেই আমি শুনতাম,আমি খুব ‘বাড়’ বেড়েছি। চার দিক থেকে শুনতাম। শুনব না-ই বা কেন। নিম্নবিত্ত এবং রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের অল্পবয়সি মেয়ে। বাবা সবজি বিক্রি করেন। আর আমি, আর পাঁচটা মেয়ের মতো বিয়ের জন্য ঘরে বসে প্রস্তুতি নেওয়ার বদলে, আমি তখন কম্পিউটার শিখছি। স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস করছি। বিউটিশিয়ান কোর্স করছি। নার্সিং ট্রেনিং নিচ্ছি। একটা চাকরির জন্য মরিয়া হয়ে দৌড়চ্ছি। কী ‘বাড়’ বলো তো! আসলে আমি চাইনি, বিয়ে করে পড়ে পড়ে মার খেতে অথবা ফিরে আসতে। যে কোনও মানুষেরই আর্থিক নিরাপত্তা অনেকটা জোর বাড়ায়।

সাম্যএই বাড় ভাঙতেই কি…
মনীষা: হ্যাঁ। এই বাড়ের বিরুদ্ধে জমে ওঠা প্রতিহিংসার আগুনেই ঘি পড়েছিল, আমি সেলিমকে রিফিউজ করায়। এই ‘স্পর্ধা’ মেনে নিতে পারেনি ওরা। অন্য কোনও ভাবে দমানোর উপায় ছিল না, তাই এ ভাবে… আমায় অনেকেই বলতো, ‘এত বাড়ছিস, কোনও দিন না কিছু হয়ে যায়’। আমি হাসতাম। কখনও ভাবিনি, কোনও দিন কিছু হওয়ার মধ্যে অ্যাসি়ডে পুড়ে যাওয়াটাও আছে।

সাম্যএখন এত পরিচিতি তোমার, এত মানুষের অনুপ্রেরণা… এখন তো আরও অনেক বেশি ‘বাড়’ বাড়ছে।
মনীষাহ্যাঁ, এটাই ভয়। এই  কারণে যদি কাল আবার আমার উপর কোনও হামলা হয়, যদি আমার বাড়িতে কোনও বিপদ নেমে আসে, তা হলে আমি বাঁচতে পারব তো? এত পরিচিতি,এত ভালবাসা, এত ভরসা পাচ্ছি। কিন্তু নিরাপত্তা কি পাচ্ছি? এই চিন্তা নিয়েই রোজ ঘুম থেকে উঠি আমি, দিনভর লড়াই করি, রাতে ঘুমোনোর সময় ফের ভাবি। বাঁচব তো?

সাম্যআচ্ছা, এই যে লড়াই… এই লড়াইয়ের গল্পটা একটু বলবে?
মনীষালড়াই আপাতত একটাই। সেলিম আর ওর দলবল ধরা পড়ুক। ওরা ঘুরে বেড়াচ্ছে চোখের সামনে। ঘটনার পরে দু’বছর ধরে অপেক্ষা করে গ্রেফতার হয়েছিল ওরা। দশ দিনের মাথায় জামিন! তার পরে যে কে সেই। বরং আরও বেশি বিক্রম নিয়ে, বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় ওরা। অথচ আমি আজও জয়নগরে গেলে মুখ নিচু করে বাড়ি ঢুকি। আজও আমি আশপাশ থেকে শুনতে পাই, “নিশ্চয় মেয়েটার দোষ ছিল কিছু।”

সাম্যএটা তো নতুন নয়, যে কোনও বিষয়ে, সে অ্যাসিড হামলা হোক বা ধর্ষণ, ভিকটিমকে দোষারোপ না করলে সমাজের দায়িত্ব সম্পূর্ণ হয় না!
মনীষাধর্ষণ বলতে মনে পড়ল! তখন সদ্য ঘটেছে ঘটনাটা। আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে। দু’চোখে ব্যান্ডেজ বাঁধা। সারা শরীরে জ্বলন। যাঁরা দেখতে আসতেন, ওই আত্মীয়-প্রতিবেশীরাই আর কী… তাঁরা কত কী বলতেন! কী হল, কেন হল, হওয়ারই ছিল এই সব। তখনই এক জন বলেছিলেন, ‘শুধু অ্যাসিড মেরেছে, রেপ করেনি?’ পরে এমনটা অনেক বার শুনতে হয়েছে ঠারেঠোরে, কিন্তু তখন সদ্য ওই সময়ে, হাসপাতালে শুয়ে এমনটা শোনা….

সাম্যএখন তোমার চিকিৎসা কত দূরে দাঁড়িয়ে? কী বলছেন ডাক্তারেরা?
মনীষা
: চিকিৎসা হচ্ছে। বেশ ভাল হচ্ছে। সরকারি এবং বেসরকারি, দু’জায়গাতেই। উন্নতিও হচ্ছে আমার। কিন্তু এই পরিষেবাটা পেতে আমায় অনেকটা পথ পেরোতে হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের অ্যাক্ট অনুযায়ী, কোনও অ্যাসিড ভিকটিম দেশের সরকারি বা বেসরকারি যে কোনও হাসপাতাল, নার্সিংহোমে বিনামূল্যে চিকিৎসা পেতে বাধ্য। অথচ আমায় চেন্নাই থেকে ফিরে আসতে হয়েছে টাকার অঙ্ক শুনে। কলকাতার নামকরা নার্সিংহোমও ফিরিয়ে দিয়েছে। একটা সময় এতটাই হতাশ লাগত, বেপরোয়া হয়ে ভাবতাম, যেভাবে হোক টাকা জোগাড় করে চিকিৎসা শুরু হোক। কসমেটিক সার্জারি নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু চোখটা বাঁচানো জরুরি ছিল। আমি অনেক লড়ে, অনেক চেঁচিয়ে চিকিৎসার এই নিরাপত্তাটা আজ পেয়েছি। কিন্তু সবাই তো আমার মতো এতটা লেগে থাকতে পারে না!

সাম্য: সরকারি সাহায্য কিছু? ক্ষতিপূরণ তো মিলেছে?
মনীষাহ্যাঁ। তিন লাখ টাকা। কিন্তু শুধু এই আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে রাজ্য সরকার হাত তুলে নিতে পারে না। আমি দাঁতে দাঁত চেপে মামলা লড়ে যাচ্ছি, সেলিমের শাস্তির জন্য। আমি মনে করি, আমার একমাত্র ক্ষতিপূরণ সেটাই। বেঁচে থাকলে তো আমি এমন অনেক তিন লাখ রোজগার করে নিতে পারব! সে জোর আমার আছে, সে যোগ্যতাও আমি রোজ অর্জন করছি। মাত্র তিন লাখ টাকা কী করে এত বড় ক্ষতির পূরণ হতে পারে! অপরাধীর শাস্তি ছাড়া আর কিচ্ছু চাই না আমি, কিচ্ছু না।

সাম্যএখন ঝড়ের মতো পেরোচ্ছে সময়টা, বুঝতে পারছি। এর পরে কী করবে তুমি? কী চাও?
মনীষা: ঘটনার পরে কিন্তু থামিনি আমি। ঘটনার ঠিক আগেই গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়েছিল সদ্য। এখন মাস্টার্সও করছি। সেটাও শেষ করে ফেলব। তার পরে একটা চাকরি চাই। এত দিন এমনটাই চাইতাম। কিন্তু এখন আর একটু বেড়েছে চাওয়ার পরিধি। আমার মত কত অ্যাসিড ভিকটিম হতাশায়, যন্ত্রণায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। সকলের জন্য কাজের ব্যবস্থা করতে চাই। আগরায় আমি দেখেছি, শুধু অ্যাসিড ভিকটিম মেয়েরাই ক্যাফে চালাচ্ছে। আমরা কি পারি না এমন কিছু করতে? খুব চাইছি আমি।

সাম্য: এ তো গেল কাজ। আর ব্যক্তিগত জীবন? ভালবাসো কাউকে? প্রেম-বিয়ে এসব… কিছু মনে হয়?
মনীষা: কেন হবে না? সবই হয়, আর পাঁচটা মেয়ের মতোই। আমি একটু স্বাধীনতা চেয়েছিলাম, সে জন্য আজ এই অবস্থা। আমার আগামী কোনও সম্পর্কে এই স্বাধীনতাটুকুই সব চেয়ে জরুরি। সময়ের সঙ্গে তেমনটা এলে নিশ্চয় গ্রহণ করব। আমার লড়াই তো পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে।

সাম্যআর এই যে এত কিছু, এ জন্য যে এতটা লড়াই, এতটা পথ পেরোনো… কী মনে হয়, সহজ তো নয়।
মনীষা: না। সহজ তো কারও জন্য কোনও কিছুই নয়। হয়তো আমার জন্য একটু বেশি কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়। এতটা পেরেছি, বাকিটাও পারব। শুরু কোনও কিছুই সহজ নয়। আমি যে দিন প্রথম মুখ খুলে প্রকাশ্যে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সহজ ছিল না।

সাম্যহ্যাঁ, আর এখন তো তুমি মুখ খোলা নিয়ে রীতিমতো ক্যাম্পেনিং করছো। অনেকের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছ, এই চামড়াসর্বস্ব সমাজের বিরোধিতা করছো প্রকাশ্যে।
মনীষা
: হ্যাঁ। অনেকটা মনের জোরে আমি মুখের ওড়না সরিয়েছি, চিরকালের জন্য। কিন্তু সেই মনের জোরটা সমাজেরও আছে তো, যে আমার মনের জোরকে মেনে নেবে? কুঁকড়ে না গিয়ে, ভয় না পেয়ে, ঘেন্না না করে, প্রশ্ন না করে, চামড়া দিয়ে আমায় না মেপে, স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারবে তো?

 

আড্ডা শেষ হয়। ভিউ বেড়ে চলে “থাপ্পড়”-এর। আরও অনেকটা আলোর ঝলকানি এসে পড়ে মনীষার ঝলসানো মুখে। এগিয়ে আসে অসংখ্য ভরসা, আশ্বাস, কুর্নিশ। মনীষাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে হতাশা ঝেড়ে উঠে বসেন বহু তরুণী। শরীরের যন্ত্রণা চেপে, সমাজের বাঁকা দৃষ্টি এড়িয়ে, হাজার প্রশ্মবাণে বিদ্ধ হতে হতে লড়াই চালিয়ে যায় মনীষা। আর দাপট বেড়ে চলে, অপরাধী সেলিমের।
দিনের মাথা চাড়া দেয় মনীষার নিরাপত্তার প্রশ্ন।

 

পড়ে নিন এটাও: কৃষ্ট-সুরের খ্রিস্ট-কথায় শহরকোলে সম্প্রীতি

Shares

Leave A Reply