ম্যান অব দি ইয়ার

১৪

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রাজনীতির ধরন ধারন অনেকটা সিনেমার মতো। কিছুদিন অন্তর অন্তর একটা করে নতুন হিরো ওঠে। তাকে নিয়ে নাচানাচি শুরু হয়। আগে যে হিরো ছিল, সে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।

২০১৪ থেকে ভারতের রাজনীতিতে হিরো ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু ২০১৯ সালটা অমিত শাহের। মোদীকে পিছনে ফেলে তিনি এখন জাতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় তারকা।

ব্যাপারটা প্রথমবার বোঝা গিয়েছিল এবছরের ১৭ মে। তখন লোকসভা ভোটের কয়েক দফা শেষ। আরও দু’-এক দফা বাকি। হঠাৎ শোনা গেল, যাঁকে গত পাঁচ বছরে সাংবাদিকরা কোনও প্রশ্ন করার সুযোগ পাননি, সেই নরেন্দ্র মোদী আস্ত একটা সাংবাদিক বৈঠক করতে চলেছেন। রিপোর্টাররা তো অবাক! মোদীর হল কী?

প্রেস কনফারেন্সে যা ঘটল তাতে রিপোর্টাররা আরও তাজ্জব হলেন। মোদীর মুখে শোনা গেল শুধু একটা কথা, পার্টি চিফ ইজ সুপ্রিম। অর্থাৎ বিজেপি সভাপতি যা বলবেন, তাই শেষ কথা। বাকি সময় তিনি চুপ করে বসে রইলেন। যা কিছু প্রশ্ন ছিল, জবাব দিলেন অমিত শাহ একা। এই প্রথমবার সাংবাদিকদের মনে হল, অমিত শাহের তুলনায় মোদী নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছেন।

দ্বিতীয়বারের মোদী মন্ত্রিসভায় অমিত হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দলের শীর্ষ পদটিও রইল তাঁর দখলে। তাঁকে সাহায্য করার জন্য নিযুক্ত হলেন জগৎপ্রকাশ নাড্ডা।

এইবার একের পর এক খুব বিতর্কিত বিল আসতে শুরু করল সংসদে। সারা দেশ দেখল অমিত শাহের ক্যারিশমা। মোদীকে দেখাই যাচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একা রাজ্যসভায় পেশ করছেন ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির প্রস্তাব। প্রত্যাশামতো বিরোধীদের প্রশ্নবাণ উড়ে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে। সভার অধিবেশন ভণ্ডুল করার চেষ্টা হচ্ছে। একা দাঁড়িয়ে সব সামলাচ্ছেন অমিত শাহ। শেষটায় বিল পাশ করিয়েই ছাড়লেন।

বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবারের বরাবর দাবি করে এসেছে, জম্মু-কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা লোপ করতে হবে। সঙ্ঘীদের সেই স্বপ্ন পূরণ করলেন অমিত। সে বড় কম কথা নয়।

দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে মোদী সরকার আরও কয়েকটি বিতর্কিত বিল পাশ করিয়েছে। তার মধ্যে আছে তথ্যের অধিকার আইনের সংশোধন, ইউএপিএ-র সংশোধন এবং তিন তালাক সংক্রান্ত বিল। সবশেষে এল নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল। রাজ্যসভায় এনডিএ-র সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তা সত্ত্বেও কী করে এমন বিতর্কিত বিলগুলো পাশ হয়ে গেল?

ওখানেই তো অমিত শাহের জাদু।

মার্কিন মুলুকের নামজাদা কাগজ ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ তাঁর নাম দিয়েছে, ‘দি ইনভিজিবল প্রাইম মিনিস্টার’। এমনি এমনি ওই নাম দেয়নি। অনেকেরই বিশ্বাস, মোদীরও যা অসাধ্য, তা পারেন একা অমিত শাহ।

দীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেননি। পারার কথাও নয়। ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বিতর্কেরা এসে জোটে। অভিযোগ, তিনি তোলাবাজির র‍্যাকেট চালাতেন। মানুষ খুনের অভিযোগও আছে তাঁর নামে। সোহরাবুদ্দিন শেখ নামে এক ব্যক্তি ও তার স্ত্রী কৌসর বাইকে খুনের ঘটনায় তিনি ছিলেন পয়লা নম্বর সন্দেহভাজন। ইশরাত জাহান নামে ১৯ বছরের এক তরুণীকে অপহরণ ও খুনের মামলা ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। পাছে তিনি সাক্ষীদের ভয় দেখান, সেজন্য একসময় গুজরাতে তাঁর ঢোকা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।

আরও একবার অভিযোগ উঠেছিল, অমিত শাহ বিজেপির সভাপতি হওয়ার পরে তাঁর ছেলে জয় শাহের কোম্পানির টার্নওভার নাকি বেড়েছে ১৬ হাজার গুণ।

কিন্তু তিনি অমিত শাহ। নিন্দুকদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে জানেন। বুক বাজিয়ে বলে দেন, দেশ জুড়ে এনআরসি হচ্ছেই। কখনও ‘ঘুসপৈঠিয়াদের’ উইপোকার সঙ্গে তুলনা করেন।

ক্ষুরধার বুদ্ধি, শীতল আবেগহীন মন ও ঝুঁকি নেওয়ার সাহস, এই তিনে মিলে তিনি ২০১৯-এর ম্যান অব দি ইয়ার।

তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে তো কিছু নেই। সিনেমার সঙ্গে যেমন রাজনীতির অনেক মিল আছে, পার্থক্যও আছে কিছু। ফিল্মে যে অভিনেতা হিরো সাজে, সে সাধারণত ভিলেন সাজে না। কিন্তু রাজনীতিতে যে হিরো, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই ভিলেন হয়ে ওঠে। ইন্দিরা গান্ধীর মতো প্রতিভাময়ী নেত্রীও এই পরিণতি এড়াতে পারেননি।

২০১৯-এর শেষে এনআরসি ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে জনরোষ ফুঁসে উঠছে। অমিত শাহ দুটো ব্যাপারেই খুব অগ্রণী। তিনি কি পারবেন প্রতিবাদীদের দাবড়ে চুপ করিয়ে দিতে। যদি না পারেন, হয়তো তাঁকেই বিদায় নিতে হবে। যাই হোক না কেন, ২০২০ সালের অনেকটা সময় জুড়ে তাঁকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে জাতীয় রাজনীতি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More