শুক্রবার, নভেম্বর ১৫

‘মিম হইতে সাবধান, ওরা বিজেপির বি-টিম’: দলকে পাখি পড়ানোর মতো বোঝালেন  মমতা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: নিজামের শহর হায়দরাবাদ থেকে রাজার শহর কোচবিহার—পা রেখে ফেলল মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল-মুসলিমিন!

হরিয়ানা-মহারাষ্ট্রে বিধানসভা ভোটের সঙ্গেই উপ নির্বাচন হয়েছিল বিহারের কিষাণগঞ্জে। তার পর গত ২৪ অক্টোবর ভোট গণনায় দেখা গিয়েছিল, ড্যাং ড্যাং করে বাংলা লাগোয়া কিষাণগঞ্জ জিতে নিয়েছে মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল-মুসলিমিন তথা মিম। দ্য ওয়ালে-এ সেদিনই লেখা হয়েছিল,‘তৃণমূলের চিন্তা বাড়িয়ে মিম খাতা খুলে ফেলল বিহারে।’

বস্তুত সেই দ্য ওয়াল-লিখনই সত্যি হল। দলের সব বিধায়ক-সাংসদদের নিয়ে কোর গ্রুপের বৈঠক ডেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খোলাখুলিই জানিয়ে দিলেন, ‘মিম’ থেকে সাবধান, ওরা বিজেপি-র বি-টিম। গেরুয়া শিবিরই ওদের টাকা পয়সা দিচ্ছে। কোনও ভাবেই ওদের জমি ছাড়া চলবে না।

তৃণমূল ভবনে দিদি যখন এ কথা বলছেন, ওদিকে মিম কিন্তু ততক্ষণে নেমে পড়েছে মাঠে। কিষাণগঞ্জের সাফল্যের পর সবে দু’সপ্তাহ হয়েছে, কোচবিহার জুড়ে দেখা গেল মিমের সদস্য হওয়ার জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে হোর্ডিং পড়েছে। তাতে মিম সুপ্রিমো তথা হায়দরাবাদের সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়েসির বিরাটাকার ছবি। নীচে লেখা ‘ইনতেজার অব খতম, মিশন ওয়েস্ট বেঙ্গল!’

কোচবিহারে মিম-এর পোস্টার

এখন প্রশ্ন, তৃণমূলের চিন্তা কেন?

কট্টর মুসলিমদের দল হল মিম। ব্রিটিশ জমানায় হায়দরাবাদে জন্ম নিয়েছিল মিম। ১৯২৭ সালে হায়দরাবাদের নিজাম ওসমান আলি খানের পৃষ্ঠপোষকতায় নওয়াজ খান কিলেদার এই দল গড়ে তুলেছিল। নিজামের অনুগামী দল হিসাবেই তারা পরিচিত ছিল। স্বাধীনোত্তর কালে হায়দরাবাদ আসন থেকে বহুবার লোকসভায় জিতেছে মিম। কিন্তু এখন দাক্ষিণাত্যের সীমানা পার করে মিম মহারাষ্ট্র, বিহার সহ বিভিন্ন রাজ্যে পা জমানোর চেষ্টায় নেমে পড়েছে তারা।

এ দিকে বাংলায় তৃণমূলের অন্যতম মজবুত ভোট ব্যাঙ্কও তো সংখ্যালঘুরাই। এখন মিম যদি বলে, এরপর ‘মিশন বাংলা’, দিদির চিন্তা হবে না! হাওড়া, হুগলি, মুর্শিদাবাদ, দুই চব্বিশ পরগনায় ইতিমধ্যেই তলে তলে সংগঠন গোছানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে দক্ষিণ ভারতের এই দল। কিন্তু কোচবিহারে একেবারে ঢাকঢোল বাজিয়ে নিজেদের সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করে দিল ওয়েসি বাহিনী।

কোচবিহারের তৃণমূল নেতারাও মিম নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ গোপন করেননি। তৃণমূলের কোচবিহার জেলা সভাপতি তথা রাজ্যের মন্ত্রী বিনয় কৃষ্ণ বর্মন জানিয়েছেন, বিষয়টির প্রতি তারা সব দিক থেকে নজর রাখছেন।

কোচবিহারে লাগানো মিমের প্রচার হোর্ডিং-এ একটি ফোন নম্বরও দেওয়া হয়েছে। যে নম্বরে ফোন করার পর ফোন ধরেছিলেন জনৈক রমজান রহমান। তিনি জানিয়েছেন, লক্ষ্য একুশের ভোট। বিধানসভা ভোটকে পাখির চোখ করেই সংগঠন গোছাচ্ছেন তাঁরা। একইসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসেই কলকাতায় আসবেন ওয়েসি। তখনই আনুষ্ঠানিক ভাবে তৈরি হবে মিমের বাংলা ইউনিট।

পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূল হয়তো সত্যিই বড় বিপদের গন্ধ পাচ্ছে। আর তার বাস্তবতাও রয়েছে। লোকসভা ভোটে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলার শাসকদল। অনেকের মতে, বাংলায় যে সিপিএমকে হারানো যায়, এটা যেমন তৃণমূল প্রমাণ করে দিয়েছিল, ঠিক তেমনই উনিশের ভোটে বিজেপি বাংলায় প্রমাণ করেছে তৃণমূলকেও হারানো যায়। তৃণমূলের অশ্বমেধ থেমেছে। লোকসভায় ৩৪ থেকে নেমে এসেছে ২২টি আসনে। কিন্তু এর মধ্যেও এমন আসন আছে, যেখানে সুতোর ব্যবধানে জিতেছে শাসকদল। যেমন আরামবাগ আসন। দু’হাজারের কম ভোটে জিতেছেন তৃণমূলের অপরূপা পোদ্দার। কিন্তু সেই আসনের বুথ স্তরের ফলাফল দেখলে দেখা যাচ্ছে, হিন্দু এলাকায় যেমন বিজেপির রমরমা, তেমন সংখ্যালঘু এলাকায় তৃণমূলের দাপট। এরকম আসনে যদি মিম উড়ে এসে জুড়ে বসে তা হলে কী হবে সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে।

বাংলায় যে এ বার মেরুকরণের ভোট হয়েছে তা মেনে নিয়েছেন অনেকেই। ভোটের ফল ঘোষণার দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট বলেছিলেন, “টোটালটা হিন্দু-মুসলমান হয়েছে।” একই সঙ্গে বলেছিলেন, “যে গরু দুধ দেয়, আমি তার লাথিও সহ্য করতে পারি!” বিশদ ব্যাখ্যা না করলেও দিদি কী বলতে চেয়েছিলেন তা বাংলার মানুষের বুঝতে অসুবিধে হয়নি। তৃণমূলের এক নেতা এ দিন বলেন, মিম কট্টর মুসলিম দল হলেও, ওদের সঙ্গে বিজেপির একটা অদৃশ্য বোঝাপড়া আছে। যার উদ্দেশ্য, মুসলমান প্রার্থী দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ভোট কেটে বিজেপির সুবিধে করে দেওয়া। একে কংগ্রেস-সিপিএম কৌশলগত জোট করে তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোট কাটতে চাইছে। তার উপর মিমও থাবা বসালে তৃণমূলের জন্য তা উদ্বেগের বইকি!

Comments are closed.