শনিবার, ডিসেম্বর ১৪
TheWall
TheWall

মধ্যরাতের অপারেশন সফল, তবুও সব্যসাচী আতঙ্ক তৃণমূলে

শঙ্খদীপ দাস

কলকাতা হাইকোর্টে তাঁর নৈতিক জয় হল। তার পরেই তাঁর মনে পড়ে গেল বিবেকানন্দ-নেতাজি-র ত্যাগের কথা। এবং আর বিলম্ব না করে বৃহস্পতিবার বিকেলেই তিনি বিধাননগর পুরসভার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দিলেন।

সব্যসাচী দত্ত কি এতোই সুবোধ বালক? তৃণমূলের হজম হচ্ছে না। বরং এক উদ্বেগ যেতে না যেতেই আরেক উদ্বেগ যেন জাঁকিয়ে বসেছে তৃণমূলে,– সব্যসাচী এ বার কী করবেন?

সে প্রশ্নের উত্তর সন্ধানের আগে জানতে হবে ভোটাভুটি পর্যন্ত না গিয়ে বিষ্যুদবারই কেন ইস্তফা দিয়ে দিলেন সব্যসাচী?
পিছনে তাকালে দেখা যাচ্ছে, বুধবার সন্ধ্যার গোটা অপারেশন! কর্নাটকের থেকে কম ছিল না সল্টলেক। কালীঘাটে যেন কন্ট্রোল রুম খুলে রেখেছেন দিদি। কখনও ফোন করছেন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে। কখনও বা বিধাননগর পুরসভার চেয়ারপার্সন কৃষ্ণা চক্রবর্তীকে। ঘন ঘন ফোন যাচ্ছে আইনমন্ত্রী মলয় ঘটকের কাছেও। কারণ, বিকেলে হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেছে, কিন্তু রায়ের প্রতিলিপি রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত আপলোড হয়নি ওয়েবসাইটে। ফলে সন্ধ্যার পর আবার রাজভবনের কোয়ার্টারে আগু পিছু কৌশল ঠিক করতে বসতে হয়েছে কৃষ্ণা-ববি-মলয়কে।

নাটকের এখানেই শেষ নয়। আগে দল বদলের সময়ে ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের ফুটবলারদের যে ভাবে লুকিয়ে রাখা হতো, অবিকল সেই কায়দায় অপারেশনে নেমে পড়ে তৃণমূল। তৃণমূলের অধিকাংশ কাউন্সিলরকে তিন ভাগে ভাগ করে, তিন শিবিরে (সল্টলেক-রাজারহাটেরই তিনটি বাড়িতে) রাখা হয়। তাঁর মোবাইল ফোনও নিয়ে নেয় দল।

অনেকের মতে, এর পরে আর ঘোড়া কেনাবেচার সুযোগ ছিল না। সব্যসাচী ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য ছিল, ঘোড়া কেনাবেচা করতে যাবেন কেন দাদা। তাতে তো ঝক্কি অনেক। খেলা তো জমবে এর পর!

কী খেলা? পদ ছেড়ে সব্যসাচী এ দিনই হুমকি দিয়ে রেখেছেন, “আমাকে দাবায়ে রাখা যাবে না!” তাঁর ঘনিষ্ঠরা বলছেন, খেলার জন্য তো এখন গোটা মাঠ!

সব্যসাচী এখনও হাতের তাস দেখাননি। তবে তাঁর অনুগামীরা বলছেন, এ বার তো তৃণমূলে টানাটানি শুরু হবে,– বিধাননগরের মেয়র হবেন কে?

চেয়ারপার্সন কৃষ্ণা চক্রবর্তী যে অন্যতম দাবিদার সেই ইঙ্গিত তিনি পষ্টাপষ্টি আগেই জানিয়ে রেখেছেন। সংবাদমাধ্যমের সামনেই সে কথা বলেছেন তিনি। তা ছাড়া সূত্রের খবর, দিন কুড়ি আগে দিদি নিজে তাঁকে একবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কারও কারও আবার মনের ইচ্ছে ডেপুটি মেয়র তথা রাজারহাটের একদা দাপুটে নেতা তাপস চট্টোপাধ্যায় মেয়র হোক। বিশেষ করে গাড়ির বহর নিয়ে তাপস যে ভাবে কাউন্সিলরদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে সব্যসাচীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের সই সংগ্রহ করেছিলেন, তাতে তাঁর উচ্চাকাঙ্খা আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। এই অবস্থায় আবার মেয়র পরিষদ সদস্য দেবাশিস জানা সহ কয়েকজন কাউন্সিলর বলতে শুরু করেন, তাপসকে তাঁরা মানবেন না।

সব্যসাচী এই দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে পারেন আশঙ্কা করছেন তৃণমূলের অনেকেই। কোনও ভাবে তাপস মেয়র পদপ্রার্থী হলে আস্থা ভোটে সব্যসাচী তাঁর বিরুদ্ধে নিজে প্রার্থী হয়ে যেতে পারেন, কিংবা তাঁর অনুগামী কাউকে দাঁড় করাতে পারেন। আবার কৃষ্ণা চক্রবর্তী প্রার্থী হলে তাঁকে পরাস্ত করা সব্যসাচীর পক্ষে কঠিন হতে পারে ঠিকই। কিন্তু তিনি যে হেতু এখনও খাতায়কলমে বিধাননগরের কাউন্সিলর, তাই ভিতরে থেকে পুরসভার কাজে অস্থিরতা তৈরি করতে পারেন বলে উদ্বেগ রয়েছে তৃণমূলে।

এই পরিস্থিতিতে মেয়র প্রার্থী কে হবেন তা এখনও স্পষ্ট করেননি দিদি। বেশ কিছুদিন আগে একবার কৃষ্ণার কথা ভেবেছিলেন তিনি। পরে নিজেই আবার বলেছেন, আগে সব্যসাচী মেয়র পদ থেকে বিদেয় হোক, তার পর ঠিক করব। সম্ভবত কালই সেই ঘোষণা হয়ে যেতে পারে।

তবে দিনের শেষে এই ছবিটা পরিষ্কার যে, মেয়র যেই হোন সাত-আট মাসের জন্য তাঁকে কাঁটার মুকুট পরেই বসতে হবে চেয়ারে।

কারণ, সব্যসাচী। ইদানীং যাঁর কার্যত দু’হাত সমানে চলছে। যিনি বলেন, “এক জন সোলজার মরার আগে মরে না।”

Comments are closed.