Latest News

শত শত রহস্যময় সবুজ বোল্ডার, কেন পড়ে আছে আন্দিজের ধূসর উপত্যকায়!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

Yareta

দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল জুড়ে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালা আন্দিজ। দৈর্ঘে সাত হাজার এবং প্রস্থে পাঁচশো কিলোমিটার। গড় উচ্চতা তেরো হাজার ফুট। আন্দিজের বিবর্ণ ধূসর রঙা উপত্যকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পান্না সবুজ ঢিপিগুলির দেখা পেয়ে আনন্দে নেচে ওঠে, এলাকাটিতে ট্রেকিং বা ভ্রমণে আসা বিদেশী পর্যটক বা অভিযাত্রীদের মন। মরুভূমির মধ্যে মরুদ্যানের দেখা পেলে যেমন বেদুইনদের মনে অপরিসীম আনন্দের সৃষ্টি হয়।

পান্না সবুজ ঢিপিগুলিকে দেখে মনে হয় কেউ যেন নরম মখমলের ঢাউস কুশন পেতে রেখেছে পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য। পর্যটকেরা ভাবেন, পাথরের গায়ে কি তাহলে মখমলের মতো সবুজ শ্যাওলা জমেছে! ছুটে গিয়ে ঢিপিগুলি ছুঁতে চান তাঁরা।yareta

কাছে গিয়েই ভুলটা ভাঙে

পর্যটকেরা বুঝতে পারেন, সবুজ গোলাকার ঢিপিগুলি দেখতে মখমলের মতো মনে হলেও, আদৌ মখমলের মতো নরম নয় সেগুলি বরং পাথরের মত শক্ত ও নিরেট। অনেকটা ঠিক এঁচোড়ের গায়ের মতো। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে আঙুল ডোবেই না ঢিপিগুলির গায়ে। কী এগুলো! বিস্ময়ে অবাক হয়ে যান পর্যটক ও অভিযাত্রীরা। এগিয়ে আসেন স্থানীয় গাইড। এবার সত্যি চোখ কপালে ওঠার পালা। গাইড এসে সটান শুয়ে পড়েন একটি সবুজ বোল্ডারের ওপর। বোল্ডারটি এতটাই শক্ত ও এতটাই নিরেট যে এক সেন্টিমিটারও বসে যায় না।

অধৈর্য্য পর্যটকরা নানান প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন গাইডকে। উত্তর না দিয়ে গাইড একটা ভারী ছুরি দিয়ে অনেক কষ্টে বোল্ডারের একটা অংশ কেটে ফেলেন। কাটা অংশে আগুন ধরান। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। পর্যটকদের ধৈর্য্যের সীমা শেষ। তাঁরা উত্তেজিত হয়ে গাইডের কলার ধরার আগেই গাইড মুচকি হেসে বলেন, “না এটা পাথর নয়, এর নীচেও কোনও পাথর নেই। আমি শুয়েছিলাম একটা গাছের ওপর যেটির বয়েস প্রায় ৩৫০০ বছর। চিরসবুজ এই গাছটির নাম ইয়রেটা। বৈজ্ঞানিক নাম ‘অ্যাজোরেলা কমপ্যাক্টা’। পৃথিবীর দীর্ঘজীবী উদ্ভিদগোষ্ঠীদের মধ্যে অন্যতম হল এই ইয়রেটা।”yareta

মৃত্যু উপত্যকায় জীবনের অস্তিত্ব বহন করে ইয়রেটা

গাইডের কাছ থেকে পর্যটকেরা জানতে পারেন, চিলির অত্যন্ত শুষ্ক আটাকামা মরুভূমি, বলিভিয়া, পেরু ও পশ্চিম আর্জেন্টিনায় মূলত ইয়রেটা উদ্ভিদদের বাস। আন্দিজ পর্বতমালার ১০৫০০-১৪৮০০ ফুট উচ্চতায় এই উদ্ভিদদের দেখা মেলে। জনমানহীন ওই স্থানগুলিতে রৌদ্রস্নাত দিনের তাপমাত্রা থাকে ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। রোজ রাতে তাপমাত্রা নেমে যায় শূন্যের নীচে। অত্যন্ত শীতল, শুষ্ক এবং বৃষ্টিহীন এই মৃত্যু উপত্যকায় কোনও প্রাণী বা উদ্ভিদ টিকে না থাকলেও ইয়রেটা উদ্ভিদরা বেঁচে থাকে হাজার হাজার বছর ধরে।

আরও পড়ুন: আলেকজান্ডারের শহরে পাওয়া গিয়েছিল অশোকের শিলালিপি

অনুর্বর মাটি, বেশি পরিমাণ অ্যাসিড বা ক্ষার যুক্ত মাটি, জল দাঁড়ায় না এমন মাটিতেই জন্মায় আজব উদ্ভিদ ইয়রেটা। এদের বৃদ্ধি হয় খুবই মন্থরগতিতে। প্রতি বছর গড়ে মাত্র দেড় সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায় ইয়রেটা। জানলে অবাক হতে হয়, এই সপুষ্পক উদ্ভিদটির আত্মীয়তা রয়েছে আমাদের অতি পরিচিত পার্সলে আর গাজর গাছের সঙ্গে। যদিও চেহারা, আকৃতি ও চরিত্রে ভগ্নাংশের মিলও নেই। ইয়রেটা গাছগুলি মাটির একেবারে কাছাকাছি জন্মায়। কারণ সেখানকার তাপমাত্রা পরিবেশের গড় তাপমাত্রার চেয়ে এক দুই ডিগ্রি বেশি থাকে, মাটির ফিরিয়ে দেওয়া তাপের কারণে। ফলে একটু বেশী উষ্ণতা পায় গাছগুলি।

কাছ থেকে এঁচোড়ের গায়ের মতো দেখতে লাগে ইয়রেটাকে

পাথরের মতো শক্ত কেন সবুজ ইয়রেটা!

অধৈর্য্য পর্যটকেরা গাইডের কাছ থেকে এই প্রশ্নের উত্তর পাননি এখনও পর্যন্ত। এরকম গাছের কথা তাঁরা তো জন্মেও শোনেননি, দেখা তো দূরের কথা। গাইড পর্যটকেদের বিরক্তি না বাড়িয়ে বলেন,” ইয়রেটা গাছগুলির কাণ্ডের ওপরে লক্ষ লক্ষ ছোট পাতা ও কুঁড়ি একেবারে গায়ে গায়ে জমাট বেঁধে থাকে। তাই সবুজ ফুলকপি বা ব্রকোলির ওপরটা যেমন নিরেট লাগে, এই গাছের চারদিকটা তেমনই নিরেট মনে হয়। ফলে গাছটির কাণ্ড দেখা যায় না। কিন্তু কেন ইয়রেটার শরীরে এই পরিবর্তন হয়েছে!

গাইড জানান, “চরম আবহাওয়ায় টিকে থাকতে গেলে নিরেট হওয়া ছাড়া এদের উপায় ছিল না। মাটিতে জলের ভয়ংকর অভাব। যাতে শরীরের জল বাষ্প হয়ে বেরিয়ে না যায়, তাই পাতাগুলি গায়ে গায়ে জুড়ে থাকে। গাছগুলি বেশি লম্বা হলে মৃত্যু উপত্যকার প্রবল হাওয়া গাছগুলিকে মূলশুদ্ধ উপড়ে ফেলবে। তাই উচ্চতায় না বেড়ে পাশাপাশি বেড়ে হাওয়াকে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেয় বুদ্ধিমান ইয়রেটা। গোলাপি ও ল্যাভেন্ডার রঙের ছোট ছোট ফুল হয় ইয়রেটা গাছগুলিতে। একই গাছের পুরুষফুল ও স্ত্রী ফুলের মধ্যে পরাগমিলন ঘটায় পতঙ্গ। ফলে বংশবিস্তারে অসুবিধা হয় না। যাক, ইয়রেটারা কিন্তু এতদিন দিব্য ছিল বুঝলেন।”

ছিল কেন, আছে তো এখনও!

পর্যটকদের কথার উত্তরে একটু উদাস হয়ে যান গাইড। মৃত্যু উপত্যকায় শুয়ে থাকা ৩৫০০ বছরের বৃদ্ধ ইয়রেটার শরীরে মমতার হাত বুলিয়ে বলেন, ” কদিন থাকবে জানি না। সহজে জ্বালানো যায় বলে প্রাচীন কাল থেকে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে  এদের। বৃদ্ধির হার অত্যন্ত কম হওয়ার জন্য এমনিতেই আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে ইয়রেটারা। গাছগুলিকে তাই সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্ত কলোরাডোর রেগিস ইউনিভার্সিটির গবেষক কেট ক্লেয়ার ইয়রেটার শরীরের ভেতর ক্যানসার ও এইডস প্রতিরোধক উপাদান খুঁজে পেয়েছেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই ছুটে আসবে ওষুধ কোম্পানিরা। এলাকায় একটি গাছও থাকবে না। ফলে ইয়রেটার অবলুপ্তি এখন সময়ের স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।”

গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে দেন গাইড। হাঁটতে হাঁটতে স্তম্ভিত পর্যটকদের বলেন, “যাক, আজ একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা নিয়ে গেলেন আপনারা। জেনে নিলেন, দেখতে কোমল হলেও সব কিছুকে প্রকৃতি কোমল করে গড়ে না। জীবনের ময়দানে কাউকে কাউকে সবুজের আড়ালে পাথর হয়ে উঠতে হয়, স্রেফ টিকে থাকার জন্য।”

You might also like