Latest News

অজানা বিদ্যাসাগর— সাহেবের মুখের সামনে তুলে দিয়েছিলেন খড়মশুদ্ধ পা

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: তিনি পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক। বর্ণপরিচয়ের স্রষ্টা। দানবীর, দয়ার সাগরও বটে। উনিশ শতকের বাংলার অন্যতম ঋজু মানুষ। আজও বাঙালিজীবনের মিথ হয়ে আছে তাঁর বিদ্যার্জনের গল্প, মায়ের ডাকে সাঁতরে নদী পার হওয়ার কাহিনি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনের এই দিকগুলো নিয়ে যত কথা হয়, তত কথা হয় না তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে। কেমন ছিলেন মানুষ বিদ্যাসাগর? কেমন ছিল তাঁর সংসারজীবন? তাঁর রসবোধ।

চালচলনে, পোশাকে-আশাকে কোনও বাহুল্য ছিল না ঈশ্বরচন্দ্রের। একেবারে টুলো পণ্ডিতের মতো জীবন কাটাতেন। সময়টা ইংরেজ আমল। হিন্দু কলেজের প্রিন্সিপাল তখন ওয়াল্টার স্কট সেটন কার। কী এক প্রয়োজনে একদিন কার সাহেবের অফিসে আস্তে হয়েছে বিদ্যাসাগরকে। নিজের টেবিলে তখন পা তুলে বসে আছেন কার সাহেব। বিদ্যাসাগরকে দেখেও সেই জুতোশুদ্ধ পা নামানোর সৌজন্যটুকুও দেখালেন না। সেদিনকার মতো কাজ মিটল বটে, কিন্তু এই অসৌজন্য ভুললেন না বিদ্যাসাগর। (Vidyasagar)

Image - অজানা বিদ্যাসাগর— সাহেবের মুখের সামনে তুলে দিয়েছিলেন খড়মশুদ্ধ পা

এর বেশ কিছুদিন পর কাজের দরকারে বিদ্যাসাগরের অফিসে এসেছেন কার সাহেব। দরজা খুলে তো তিনি অবাক। টেবিলের ওপারে বসে আছেন বিদ্যাসাগর। আর তাঁর খড়মশুদ্ধ পা দুটো টেবিলের উপর ঠিক কার সাহেবের মুখোমুখি। সেদিন ওভাবেই সাহেবকে অপমানের জবাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ঋজু শিরদাঁড়ার মানুষটা। (Vidyasagar)

গবেষকেরা বলেন বিদ্যাসাগরের দাম্পত্যজীবন খুব সুখের ছিল না। খুব অল্প বয়সে ক্ষীরপাইয়ের শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্যের মেয়ে দীনময়ীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্রের। ঈশ্বরচন্দ্রের বয়স তখন চোদ্দ আর দিনময়ীর আট। বিয়ের ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তান জন্মাচ্ছিল না তাঁদের। দীর্ঘদিন নিঃসন্তান থাকায় তাঁকে বন্ধ্যা ধরে নিয়ে আত্মীয় পরিজনেরা ঈশ্বরচন্দ্রের দ্বিতীয় বিয়ের পরিকল্পনাও শুরু করে দেন। বহুবিবাহে বিরোধী বিদ্যাসাগর নিজেই হেসে উড়িয়ে দেয় সেসব পরিকল্পনা। বিয়ের ১৬ বছরের মাথায় জন্ম হয় ঈশ্বরচন্দ্র আর দীনময়ীর প্রথম সন্তান নারায়ণচন্দ্র। তারপর একে একে আরও চার মেয়ের জন্ম দেন দীনময়ী।

দিনময়ী দেবী

একমাত্র ছেলে নারায়ণের প্রতি অন্ধ স্নেহ ছিল মায়ের। ছেলের অন্যায় কাজেও তাঁর প্রশ্রয় থাকত। প্রয়োজনে নিজের গয়না বন্ধক দিয়েও অর্থের জোগান দিতেন ছেলেকে। যথেচ্ছাচারী ও কুপথগামী সেই ছেলেকে নিয়েই ফাটল ধরে দীনময়ী বিদ্যাসাগরের দাম্পত্যে। একসময় পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেন বীতশ্রদ্ধ বিদ্যাসাগর। (Vidyasagar)

বিদ্যাসাগরের পাণ্ডিত্য নিয়ে যত কথা হয়, তার অর্ধেক আলোচনাও হয় না তাঁর রসিকতা নিয়ে। অথচ ‘যশুরে কৈ’ ঈশ্বরচন্দ্রের রসবোধ ছিল প্রবল। ১৮৭৩ সাল। সেসময় বিদ্যাসাগরের বহুবিবাহ-নিরোধ আন্দোলনের বিরোধিতায় মাঠে নেমেছিলেন পণ্ডিত তারানাথ বাচস্পতি। বহু বিবাহের সমর্থনে একটা বই লিখলেন তারানাথ। বহু সংস্কৃত শ্লোকের ভুল ব্যাখ্যা করলেন সে বইতে।

Image - অজানা বিদ্যাসাগর— সাহেবের মুখের সামনে তুলে দিয়েছিলেন খড়মশুদ্ধ পা
তারানাথ তর্কবাচস্পতি

একে তো তর্কযুদ্ধ তার ওপর ভুলে ভরা সংস্কৃত ভাষায় বই; এ সুযোগ হাতছাড়া করলেন না বিদ্যাসাগর। বাচস্পতি মশাইয়ের সংস্কৃতজ্ঞানকে ব্যঙ্গ করে লিখে ফেললেন পালটা আরও একটা বই- ‘অতি অল্প হইল’… বিদ্যাসাগরের যুক্তির জাল কাটতে রেগেমেগে আরও কিছু কুযুক্তি দিলেন তারানাথ বাচস্পতি। ফলস্বরূপ বিদ্যাসাগর লিখলেন আরও একটি বই। আবার অতি অল্প হইল’। তর্কবাচস্পতির সঙ্গে ‘খুড়ো’ – ‘ভাইপো’ সম্বন্ধ পাতিয়ে লেখা এই বই দুটো বিদ্যাসাগরি রসিকতার দুই উজ্জ্বল স্তম্ভ। এমন বই বাংলা সাহিত্যে আজও বিরল।

You might also like