Latest News

বাড়িতে ইনভার্টার! মন্ত্রীর সাফ কথা, সরকারের পয়সায় কখনও না

অমল সরকার

সেদিন সন্ধ্যায় অফিস ঢোকার পর দায়িত্বটা আমার উপর এসে পড়ল। এভাবে বলার কারণ, বিনয়বাবুর (Binay Chowdhury) সঙ্গে ফোনে কথা বলে প্রতিক্রিয়া আদায় করা মোটেই সহজ ব্যাপার ছিল না। একটা বিষয় অবশ্য সহজ ছিল, বাড়িতে থাকলে বেশিরভাগ সময় ফোনটা তিনিই ধরতেন।

সিনিয়র একজন বুঝিয়ে দিলেন, কী বিষয়ে প্রতিক্রিয়া নিতে হবে। চোখের ঈশারায় এডিটরের (Editor) ঘরটা দেখিয়ে তিনি সমঝে দিলেন, বিনয়বাবুর প্রতিক্রিয়াটা চাই-ই চাই। না পেলে উনি অর্থাৎ সম্পাদক মশাই অসন্তুষ্ট হবেন।

আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতেও উপলব্ধি করলাম, এই জাতীয় খবরে যাঁকে নিয়ে খবর, তাঁর প্রতিক্রিয়া থাকা জরুরি। একান্তই না পেলে আলাদা কথা। বর্ধমানের সহকর্মীকে ফোন করে তাঁর মুখে থেকেও একবার শুনে নিলাম, বিনয়বাবু ঠিক কী বলেছেন।

তখন টেলিভিশন বলতে শুধু দূরদর্শন। দিনে একবার মাত্র বাংলা খবর। লোকে রেডিওর খবরই বেশি শোনে। তাছাড়া, আকাশবাণী, দূরদর্শনের একটি অলিখিত নিয়ম ছিল, বিতর্কিত বিষয়ে তারা ঢুকত না। তখন মোবাইল আসেনি, ইন্টারনেট আসেনি। ফলে অ্যাপ নিউজের বালাই নেই। খবরটা তাই চাপাই আছে। যা বেরনোর পরদিনের কাগজেই বেরোবে। বর্ধমানের সহকর্মী খুবই উত্তেজিত। তিনি ছাড়া আর কেউ সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন না যেখানে বিনয় চৌধুরী বোমাটি ফাটিয়েছেন।

বিনয়বাবু কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার একেবারে গোড়ায় কিছুদিন পকেটে পিস্তল রাখতেন। উদ্দেশ্য ছিল, ডাকাতি করে পার্টির তহবিলের জন্য টাকা তুলবেন। সেটা স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়। দেশের মুক্তির জন্য নাওয়া-খাওয়া ভুলে নেতারা প্রাণপাত করছেন। পার্টির নেতারা জানার পর ধমক খেয়ে ডাকাতির রাস্তা ছেড়ে দলের অন্য কাজে মনোনিবেশ করেন। তারপর বয়স যত বেড়েছে ততই বদলে গিয়েছেন বিনয় চৌধুরী। একেবারে নামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা জীবনের ব্রত করেছিলেন বলা চলে। কাউকে কটু কথা বলা তাঁর স্বভাবে ছিল না।

সেই বিনয়বাবুই কিনা এমন কথা বলেছেন! প্রথমটায় বিশ্বাস হয়নি। যাইহোক বলেছেন যখন প্রতিক্রিয়া তো নিতেই হবে। ওঁর মানিকতলার সরকারি আবাসনে সন্ধ্যা থেকে কিছু সময় পর পর ফোন করছি।

বিনয়বাবু বাড়ি না থাকলে ফোন ধরতেন স্ত্রী। যতদূর মনে পড়ে তিনি স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন। একটু মেজাজি প্রকৃতির ছিলেন ভদ্রমহিলা। পরে জানতে পারি, টানা রোগভোগের কারণে ফোনের শব্দে বিরক্ত বোধ করতেন। আর শব্দ তো নয়, তখনকার দিনে ল্যান্ড ফোন বলতে গেলে গর্জন করত।

পরের পর ফোন। ‘উনি বাড়ি ফেরেননি’ বলে রিসিভার নামিয়ে রাখেন মহিলা। বর্ধমান থেকে সেই সহকর্মী খোঁজখবর নিয়ে জানালেন, বিনয়বাবু সন্ধ্যার পর জেলা পার্টি অফিস থেকে কলকাতা রওনা হয়েছেন। ফলে নিশ্চিত ছিলাম, বাড়ি ফিরে ফোনটা উনি ধরবেন।

রাত সাড়ে ন’টা-দশ’টা নাগাদ ফোনটা ধরলেন বিনয়বাবু। পরিচয় দিয়ে বললাম, বর্ধমানে উনি কী কী বলেছেন। শুনে বললেন, আমি আরও অনেক কথা বলেছি। আপনি দু-তিনটি লাইনের কথা বলে প্রতিক্রিয়া চাইছেন। দুঃখিত। আমি কোনও প্রতিক্রিয়া দিচ্ছি না।

বিনয়বাবুর একটি গুণের কথা এখানে না বললেই নয়। কখনও বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। কত চারাপোনা মন্ত্রী মুখের উপর ঝপাৎ করে ফোনের রিসিভার নামিয়ে রেখেছেন। বিনয়বাবু ছিলেন উল্টো প্রকৃতির মানুষ। বলতে গেলে ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা ব্যক্তির অনুমতি নিয়ে ফোন রাখতেন। সে ওপ্রান্তের ব্যক্তিটি যিনিই হোন না কেন।

বিনয়বাবুর কথা শুনে আমি বুঝলাম, লক্ষ্যপূরণ হয়েছে। উনি তো কথাগুলি অস্বীকার করলেন না। বললেন না যে, এমন কথা আমি বলিনি। বা আমার কথা বিকৃত করা হচ্ছে, ইত্যাদি।

সিনিয়ররাও ওঁর প্রতিক্রিয়ার কথা জানতে পেরে খুব খুশি। কারণ, অজাতশত্রু মানুষটিকে নিয়ে খবরে কোনওরকম অসম্পূর্ণতা থাক, কেউ চান না। খবরটা প্রথম পাতায় বের হল। নানা সূত্রে জানাজানি হয়ে যাওয়ায় আরও কিছু কাগজে বের হয়েছিল খবরটি। বিনয়বাবুর প্রতিক্রিয়াটি শুধু আমরাই পেয়েছিলাম। খবরের প্রতিক্রিয়া সেই কারণেই আরও চড়েছিল, টের পেয়েছিলাম পরদিন।

বর্ধমানে সরকারি ইঞ্জিনিয়ারদের সম্মেলনে রাজ্যের ভূমি ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রী বিনয় চৌধুরী নিজের সরকার সম্পর্কে সেদিন বলেছিলেন, সরকার ঠিকাদারদের স্বার্থে, ঠিকাদারদের দ্বারা চালিত হচ্ছে।

পরদিন ছিল মন্ত্রিসভার বৈঠক। রাইটার্স বিল্ডিংসের তিনতলায় বিনয়বাবুর ঘর থেকে ঢিল ছোড়া দূরে ক্যাবিনেট রুম। বৈঠক সেরে জ্যোতিবাবু গট গট করে ভিআইপি লিফটের দিকে এগোচ্ছেন। এক ফাঁকে কাছে গিয়ে বিনয়বাবুর বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া চাইলাম। জ্যোতিবাবু সেদিন যে তৈরি হয়েই ছিলেন। ঝটিতি জবাব এল, ‘তাহলে উনি সরকারে আছেন কেন?’

আজকের মতো ব্রেকিং নিউজের যুগ হলে সাংবাদিকরা হয়তো ক্যামেরা, বুম নিয়ে বিনয়বাবুর পিছু পিছু ছুটতেন। তবে লাভ হত না, সে কথাও হলফ করে বলা যায়। জ্যোতিবাবুর ঝটিতি জবাব নিয়ে বিনয়বাবু রা কাড়লেন না। বিকালে সিপিএম রাজ্য দফতরে অনিল বিশ্বাস পরিস্থিতি হাল্কা করতে সাংবাদিকদের বললেন, জ্যোতিবাবু সিরিয়াসলি কিছু বলেননি। ওটা ওঁর মনের কথা নয়। তাছাড়া বিনয়দা ঠিকাদারদের সরকার কথাটা বলেছেন বলেও শুনিনি। সরকারের অনেক দফতরেই ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ হয়। বোধহয়, উনি সে কথাই বলতে চেয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কারের প্রসঙ্গ এলেই বিনয় চৌধুরীর নাম আসে। তাঁর উৎসাহ ও নেতৃত্বেই বাংলার কয়েক লক্ষ্য ভূমিহীন কৃষক সরকারি জমি পেয়েছেন। অপারেশন বর্গা কর্মসূচির সাফল্যও তাঁরই কৃতিত্ব।

বর্ধমানের এই সিপিএম নেতা ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ভূমি ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রী ছিলেন। গোড়ার কয়েক বছর বাদে বাকি দিনগুলি ছিলেন মন্ত্রিসভায় দু-নম্বর ব্যক্তি। জ্যোতিবাবু বিদেশে গেলে বিনয়বাবুই কার্যনির্বাহী মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাতেন। ছিলেন দলের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী এবং পলিটব্যুরোর সদস্য।

কিন্তু কথাবার্তা, চালচলনে দল ও প্রশাসনে তাঁর ওজন টের পাওয়া যেত না। আমি অনেক অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেছি উদ্বোধন কিংবা প্রধান অতিথি বিনয়বাবু পৌঁছে গিয়েছেন। অথচ, প্রধান উদ্যোক্তা, শ্রোতা-দর্শক কারও দেখা নেই। বিনয়বাবু চুপচাপ দর্শকদের জন্য সাজিয়ে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসে থাকতেন। রাগারাগি, কিংবা চলে যাওয়া, এসবের বালাই ছিল না। আসলে সময় মেনে চলাটা ছিল তাঁর নীতি। কিন্তু অন্যরা দেরি করলে ভর্ৎসনা করতেন না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন কদাচিৎ। তবে উপেক্ষা বা দুর্ব্যবহার করতেন না কখনও।

রাইটার্স বিল্ডিংসের বারান্দা দিয়ে অমন মাথা উঁচু করে হেঁটে যাওয়া মানুষ কম ছিলেন। পথেঘাটে আবার তাঁর উপস্থিতি টের পাওয়া যেত না। তিনিও লালবাতি জ্বালিয়ে, ভেঁপু বাজিয়ে চলার মানুষ ছিলেন না। মানিকতলার সাধারণ আবাসনে আমৃত্যু কাটিয়েছেন।

একবার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকে খবর বের হল, বিনয়বাবুর মানিকতলার ফ্ল্যাটে সরকার ইনভার্টার বসাবে। তখন লোডশেডিংয়ের যুগ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কারেন্ট থাকে না। বিনয়বাবু প্রবীণ মন্ত্রী। কারেন্ট চলে গেলে সমস্যা হয়। তাছাড়া মন্ত্রীদের তো বাড়িতেও সরকারি কাজকর্ম সারতে হয়। অনেক মন্ত্রী দফতরের সঙ্গে কথা বলে বাড়িতে ইনভার্টার, এসির ব্যবস্থা করে নিয়েছেন ততদিনে। কিন্তু মন্ত্রিসভার দু-নম্বর বিনয় চৌধুরী এসব চাইবার পাত্র নন। যেমন, কখনও সরকারি অতিথিশালায় থাকলে খাবারদাবার যা মিলত তাই সই। এটা ওটা খাওয়ার বায়না বালাই ছিল না। যদিও সার্কিট হাউসগুলি ছিল বরাবরই তাঁর ভূমি দফতরের অধীনে।

ইনভার্টার নিয়ে খবরটি প্রকাশের দিনে বিনয়বাবুর প্রাইভেট সেক্রেটারি সেই কাগজের সাংবাদিককে ডেকে জানান, এই বিষয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে সরকারের তরফে কেউ কথা বলেনি। উনি এই বিষয়ে অবগত নন। মন্ত্রী সরকারের সংশ্লিষ্ট জায়গায় জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর ফ্ল্যাটে যেন এসব বসানো না হয়।

ফিরে যাই বিনয়বাবুর সেই মন্তব্যের প্রসঙ্গে। তাঁর মতো সাচ্চা মানুষের মুখে নিজের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, সরকার ঠিকাদারদের কব্জায় চলে গিয়েছে বলে মন্তব্যের বড় খেসারত দিতে হয় সিপিএম এবং জ্যোতিবাবুকে। কারণ, বিনয়বাবুর মন্তব্যের অভিঘাতটি ছিল ধন্বন্তরি চিকিৎসকের রোগ ধরার মতো। কারণ, বিনয়বাবুর সততা ছিল প্রশ্নাতীত। দলের অধঃপতন মানতে পারতেন না। শুধু ঠিকাদার নির্ভরতা, তাদের থেকে কমিশন আদায়ই নয়, সিপিএমের রোজগারের বড় উৎস ছিল তখন বেআইনি ভেড়ি, বালি খাদান, পাথর খাদান। এগুলি আবার ভূমি দফতরেরই অধীনে। পার্টির অনাচারে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বিনয়বাবু মনের কথাটি একদিন বলেই ফেলেছিলেন।
‘উনি তবে আছেন কেন?’, জ্যোতিবাবুর এই শ্লেষ ভরা মন্তব্যের কোনও প্রতিক্রিয়া বিনয়বাবু মুখে দেননি। তবে সিদ্ধান্তে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, থাকতে চান না। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৬-এর বিধানসভা ভোটে আর প্রার্থী হলেন না।

পা ছুঁয়ে প্রণাম করবেন না, চাকরি চাইবেন না, বাড়িতে নোটিস টাঙিয়ে দিলেন মন্ত্রী

সেবার ভোটের দিন কয়েক আগে রাইটার্সে শেষ কাজের দিনটি ওঁর ঘরের আশপাশে ঘুর ঘুর করছিলাম। উদ্দেশ্য উনি চেম্বার থেকে বেরনোর সময় এটা ওটা জিজ্ঞাসা করব। উনি বেরলেন এবং তেমন কিছুই বললেন না। আর পাঁচটা দিনের সঙ্গে শেষের দিনটির ফারাক করা গেল না।

ওঁর অফিসের লোকেরা কথায় কথায় বললেন, প্রথম দিন মন্ত্রী হয়ে যে চেয়ার-টেবিলে কাজ শুরু করেছিলেন, শেষ দিন পর্যন্ত সেগুলি বদলাননি। বদলাতে দেননি ঘরের পর্দা, ইত্যাদিও। সরকারি অর্থ খরচের ব্যাপারে এতটাই স্পর্শকাতর ছিলেন। অবসর বা নিজে থেকে কেউ বদলি না চাইলে নিজের চেম্বারে কর্মী-অফিসারদের কাউকেও বদল করেননি। পরদিনের কাগজের জন্য এসবই লিখলাম। সঙ্গে ভূমি সংস্কারে অবদানের কথা। খবরের শিরোনাম ছিল— ব’য়ে বিনয়, ভ’য়ে ভূমি সংস্কার।

You might also like