Latest News

পা ছুঁয়ে প্রণাম করবেন না, চাকরি চাইবেন না, বাড়িতে নোটিস টাঙিয়ে দিলেন মন্ত্রী

অমল সরকার

একদিন নয়, বীরেনবাবুকে (Birendra Kumar Maitra) বেশ কয়েকদিন বৌবাজারে ট্রাম থেকে নামতে দেখেছি। তখনও তিনি মন্ত্রী। বৌবাজার এলাকায় সম্ভবত, পরিচিত কারও বাড়িতে থাকতেন। রাইটার্স থেকে ট্রামেই ফিরতেন প্রায় দিন।

sot montri

একদিন আমার এক সতীর্থ সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আরে আপনি! সরকারি গাড়ি ছেড়ে মন্ত্রী কিনা ট্রামে?’ উত্তরটা কী হতে পারে আন্দাজ করাই গেছিল। মন্ত্রীর জার্সি গায়ে চাপিয়ে চলার মানুষ ছিলেন না তিনি। বিশেষ করে সরকারি কাজ ছাড়া সরকারের গাড়ি ব্যবহার করার তো প্রশ্নই উঠত না। তবে আমার ওই সাংবাদিক বন্ধুর প্রশ্নের জবাবে সরকারি গাড়ির প্রসঙ্গও টানেননি তিনি। শুধু বলেন, ‘হাঁটুতে ব্যথা। এখন আর বাসে উঠতে পারি না।’

বীরেন্দ্র কুমার মৈত্র একটি মেয়াদের জন্য মন্ত্রী ছিলেন। তবে বিধায়ক ছিলেন অনেক বছর। ঘনিষ্ঠজনরা বলতেন, সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী, বিধায়ক এবং মন্ত্রী— এই তিনের মধ্যে কখনও ফারাক করতেন না তিনি। আমৃত্যু রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে থেকে গিয়েছেন। সেই কারণেই হয়তো, বছর পনেরো আগে কলকাতার একটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে চিরকালের জন্য চোখ বুজেছেন।

ওই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সময়ে প্রাক্তন বিধায়ক ও মন্ত্রীকে ওষুধের লম্বা প্রেসক্রিপশন ধরিয়েছিলেন ডাক্তারবাবুরা। চিকিৎসার জন্য সেগুলি অপরিহার্য ছিল। কিন্তু তা কেনার পয়সা ছিল না বীরেনবাবুর। ততদিনে পৈতৃক জমি-জায়গা সব বেচে দিয়ে রাজনীতি আর দান-ধ্যান করে শেষ করে দিয়েছেন। নিকটজনরা চাঁদা তুলে কিছুদিন চিকিৎসা সামলেছেন। শেষ পর্যন্ত আর পেরে ওঠেননি।

বুদ্ধবাবু চোখ দেখাতে কিউবা গিয়েছিলেন, শান্তিবাবুকে ঠেলে পাঠাতে পারেননি অনিল বিশ্বাস

সত্যি কথা বলতে কী, বিধানসভা, রাইটার্স বিল্ডিংসের তুলনায় বীরেন মৈত্রকে সরকারি হাসপাতালেই বেশি পাওয়া যেত। খবরের সন্ধানে তো যেতামই, পরিচিতদের চিকিৎসার তদারকি, ভর্তি, আউটডোরে দেখানো ইত্যাদি প্রয়োজনে সরকারি হাসপাতালে আমারও তখন নিত্য যাতায়াত। বীরেনবাবুর সঙ্গে প্রায়ই দেখা হত।

দীর্ঘদেহী মানুষ। পরনে সাদা রংয়ের মোটা কাপড়ের পাঞ্জাবি, ধুতি। সেগুলির দশা দেখে মনে হত, বীরেনবাবু নির্ঘাৎ কারও কাছ থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড কিনে ব্যবহার করতেন। সরকারি হাসপাতালের আউটডোর থেকে ওয়ার্ড কিংবা অপারেশন থিয়েটারের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন। নিজের বিধানসভা কেন্দ্র হরিশচন্দ্রপুর তো বটেই, মালদহের নানা জায়গার মানুষ কলকাতার হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে তাঁর দ্বারস্থ হতেন। রাইটার্সে একদিন বীরেনবাবুর সমবয়সি এক প্রবীণ সাংবাদিক তাই মজা করে তাঁকে বললেন, ‘আপনি কিন্তু হাওড়া, শিয়ালদহ স্টেশনে পালা করে চেম্বার খুলে বসতে পারেন। ডাক্তার দেখাতে আসা জেলার মানুষকে অ্যাডভাইস করতে পারবেন, কোন অসুখের জন্য কোন হাসপাতালের কোন ডাক্তারের কাছে যাওয়া যেতে পারে’।

চেম্বারের বাইরে লালবাতি জ্বালিয়ে রেখে ছেঁড়া পাঞ্জাবি সেলাই করলেন মন্ত্রী

সত্যি কথা বলতে কী, বীরেনবাবুর বড় ডাক্তারদের রুটিন মুখস্থ ছিল। এমনকী কোন হাসপাতালে অ্যাঞ্জিওগ্রাম বন্ধ আছে, কোথায় অর্থোপেডিক সার্জারি থমকে আছে, কোথায় রেডিওথেরাপি মেশিন খারাপ, হাসপাতালে ঘোরাঘুরির সুবাদে এসব ঠোঁটস্থ ছিল তাঁর।

সরকারি হাসপাতালে এলাকার লোকজনের চিকিৎসার ব্যবস্থা জেলার মন্ত্রীদের কম-বেশি করতেই হয়। কিন্তু বেশিরভাগ মন্ত্রীই চিঠি লিখে দায় সারেন। বীরেনবাবু রোগীকে নিয়ে নিজেই হাজির হতেন হাসপাতালে। ডাক্তার দেখানোর পর হাসপাতালের ক্যান্টিনে খাওয়ানো, বাড়ি ফেরার পয়সা দেওয়া, ওষুধ কিনে দেওয়া, কিছুই বাদ থাকত না। বহুদিন নিজের আস্তানায় জেলার লোকদের থাকতে দিয়েছেন তিনি।

সরকারি গাড়ির চালককে ছুটি দিয়ে রাইটার্স থেকে হাঁটা দিলেন মন্ত্রী

এহেন বীরেনবাবু মন্ত্রী হয়ে বাড়িতে নোটিস টাঙিয়ে দিলেন, ‘পা ছুঁয়ে প্রণাম করবেন না, চাকরি চাইবেন না।’ তার পরেও চাকরি চাইতে আসা লোকজনকে বলতেন, ‘শোনো বাবা, আমার কথায় কেউ তোমাকে চাকরি দেবে না। চাকরি দেওয়ার মতো ক্ষমতাবান মন্ত্রী আমি নই।’

আর কেউ তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করুক, একবারেই না-পসন্দ ছিল সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লক পার্টির নেতা গান্ধীবাদী বীরেনবাবুর। ছাত্র জীবন থেকে কংগ্রেস করতেন। তাঁর মুখ থেকেই শোনা, ছোটবেলায় কোথাও একদিন গান্ধীজীর সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল। গান্ধীজি বলেছিলেন, ‘মিথ্যে কথা বলবে না। পিছু হটবে না।’

সর্বশেষ খবর জানতে পড়ুন দ্য ওয়াল

মিথ্যে বলবেন না বলেই ‘চাকরি দিতে পারব না’, ঘোষণা করেছিলেন বীরেনবাবু। অবশ্য কম লোকের চাকরির ব্যবস্থা তিনি করেননি। বিধায়ক এবং মন্ত্রী থাকাকালে পার্টি নাম চেয়ে পাঠালে তালিকা পাঠানোর আগে বারেবারে যাচাই করতেন, যে নামগুলি পাঠানো হচ্ছে তাদের থেকে গরিব কেউ নেই তো! একবার আইসিডিএসের চাকরিতে প্যানেলভুক্ত একজনের কাছ থেকে ঘনিষ্ঠ একজন তিন হাজার টাকা নিয়েছিলেন। জানতে পেরে সেই ঘনিষ্ঠকে দিয়ে শুধু টাকা ফিরিয়েছিলেন তাই-ই নয়, সবার সামনে ক্ষমাও চাইয়েছিলেন।

বীরেনবাবু ছিলেন কৃষি বিপণন দফতরের মন্ত্রী। একেবারে অতিক্ষুদ্র দফতর। ২০০০ সাল নাগাদও বাৎসরিক বাজেট ছিল মাত্র তিন কোটি টাকার মতো। সরকারের আর্থিক টানাটানি শুরু হলে সেই টাকাও সময় মতো মিলত না। কিন্তু কৃষি দফতর ভেঙে কৃষি বিপণন আলাদা দফতর হওয়ার সময় সিপিএমের সঙ্গে ফরওয়ার্ড ব্লকের জোর দড়ি টানাটানি হয়েছিল। সিপিএম চেয়েছিল দফতরটি নিজেদের হাতে রাখতে। মানেনি ফরওয়ার্ড ব্লক। আসলে দফতরটি হল নারকেল গাছের মতো। রুক্ষ, লিকলিকে গাছে জল ভরা ফল। এক কথায়, কৃষি বিপণন হল কামানোর দফতর।

ইতিহাসের অজানা কাহিনি জানতে পড়ুন দ্য ওয়াল ফিচার

বীরেনবাবুর মতো সজ্জন ব্যক্তিকে ওই দফতরের মন্ত্রী করায় অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। ওঁর ঘরে বহুবার এই প্রসঙ্গ উঠেছে। প্রবীণ সাংবাদিকরা, যাঁরা ওঁকে বহুকাল চিনতেন, তাঁরা বলতেন, আপনি এই ভুলটা করতে গেলেন কেন? এই দফতর হল লুটেপুটে খাওয়ার জায়গা। আপনার মিছিমিছি বদনাম হবে।

বীরেনবাবু প্রায়ই বলতেন, আমি মন্ত্রী হওয়ার লোভে মন্ত্রী হইনি। জেলায় যাঁরা রাজনীতি করেন এলাকায় উন্নতির জন্য তাঁদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। কলকাতায় অফিসারদের না বললে কোনও কাজ হয় না। ডিএম, এসপি-রা জেলার মন্ত্রীদের কথাও শোনেন না।

বীরেনবাবুর কাছে হরিশচন্দ্রপুরের উন্নতিই ছিল পাখির চোখ। এলাকার উন্নয়ন নিয়ে এতটাই বিচলিত থাকতেন যে ওঁর সঙ্গে যদি কোনও দিন দুর্ঘটনাবশত মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেখা হয়ে যেত, উনি তাঁকেও নির্ঘাত বলতেন, হরিশচন্দ্রপুরের জন্য কিছু করুন। নইলে মন্ত্রী হওয়ার পরও কেউ এলাকার রাস্তাঘাট, এটা-ওটা নিয়ে আর্জি জানিয়ে রাজ্যপালকে চিঠি পাঠাতে পারেন! বীরেনবাবুর ধারণা ছিল, ডিএম, এসপিরা তাঁর কথা না শুনলেও রাজভবন থেকে চিঠি গেলে ফেলে দিতে পারবেন না।

সবরকম হেলথ টিপস ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খবরের জন্য পড়ুন দ্য ওয়াল গুড হেলথ

মন্ত্রী হওয়ার কিছুদিন পরে বীরেনবাবুর সঙ্গে জেলার এক পুলিশকর্তার সাক্ষাৎকারটি স্মরণীয়। বীরেনবাবু প্রথম সাক্ষাতে তাঁকে বলেন, আমার বাড়ি থেকে পুলিশ প্রহরা তুলে নিন। আর গাড়ির আগে পাইলট কারও দরকার নেই। পুলিশ সুপার বললেন, স্যার এটা তো সরকারের নির্দেশ। আমাদের কিছু করণীয় নেই। কিছুদিন পর মালদহে পরপর চুরি-ডাকাতির কিছু ঘটনায় শোরগোল শুরু হয়। কাগজে লেখালেখি হয়, জেলায় পুলিশ কম। বীরেনবাবু পুলিশ সুপারকে চিঠি লিখে বলেন, আমার বাড়ির প্রহরা এবং দেহরক্ষী তুলে নিন। ওঁদের চোর-ডাকাত ধরার কাজে ব্যবহার করুন।

বীরেনবাবুর মন্ত্রী-সহকর্মীদের অনেকেই তাঁর মতো ছিলেন না। আবার অনেকেই ছিলেন ঠিক উল্টোটা। এক মন্ত্রী যেমন পথে গাড়ির কাচ নামিয়ে শুনে নিতেন, সামনে চলা পাইলটকারের হুটার বাজছে তো? গাড়ির মাথায় লালবাতিটা নিভে যায়নি তো? বৈকালিক ভ্রমণেও বেরোতেন রক্ষী পরিবৃত হয়ে। তখনও বাংলায় পুলিশের অভাব ছিল। কিন্তু বীরেনবাবু মনের দিক থেকে ছিলেন অনেক ধনী, অনেক উদার।

‘সবচেয়ে অসুখী বোধ করছিলাম, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায় পুকুর চুরির মতো ব্যাপার ঘটছিল বলে’

You might also like