Latest News

ওলমেক-আজটেক-মায়া সভ্যতার হাত ধরে পৃথিবীতে এসেছিল চকোলেট

রূপাঞ্জন গোস্বামী

আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে, বর্তমান মেক্সিকোর সমুদ্র উপকূলবর্তী ভেরা ক্রুজ ও টাবাস্কো প্রদেশকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক প্রাচীন সভ্যতা। ইতিহাসে যে সভ্যতার নাম ওলমেক সভ্যতা (Olmec Civilization)। কোনও এক অজানা কারণে, যে সভ্যতা হারিয়ে গিয়েছিল ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। ১৮৬২ সালে, স্থানীয় কৃষকদের লাঙলের ফলায় উঠে এসেছিল, হারিয়ে যাওয়া সভ্যতাটির প্রথম নিদর্শন। এরপর প্রত্নতাত্ত্বিকদের দেড়শো বছরের নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা, বিশ্ববাসীর সামনে এনেছে এই মেসোআমেরিকান সভ্যতার অসংখ্য নিদর্শন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার মধ্যে একটি হল চকোলেট (Chocolate)। যে খাদ্যবস্তুটিকে নিয়ে লেখা যেতে পারে আস্ত একটি মহাকাব্য।

Chocolate

মাটির পাত্রে ও কীসের বীজ!

পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গবেষকেরা ওলমেকদের তৈরি করা অসংখ্য মাটি, ধাতু ও পাথরের পাত্র আবিষ্কার করেছিলেন। সেগুলির মধ্যে ছিল একটি বিশেষ পাত্র। যেটি তৈরি করা হয়েছিল, ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেরও আগে। তৈলস্ফটিক (alabaster) দিয়ে তৈরি করা পাত্রটির ভেতর থেকে গবেষকেরা বের করেছিলেন বেশ কিছু বাদামী রঙের বীজ। খুলে গিয়েছিল বিশ্ব ইতিহাসের এক অজানা দরজা।

গবেষকেরা প্রাচীন পাত্রটির ভেতর আবিষ্কার করেছিলেন ক্যাকাও (Theobrama Cacao) গাছের বীজ। যে বীজ দিয়ে আজ তৈরি হয় লোভনীয় খাদ্যবস্তু ‘চকোলেট’(Chocolate)। বিভিন্ন তথ্য একত্রিত করে গবেষকেরা বলেছিলেন, সম্ভবত ওলমেকই পৃথিবীর প্রথম সভ্যতা। যে সভ্যতা ক্যাকাও বীজের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল খাদ্যগুণ। আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে।

এই সেই পাত্র ও ক্যাকাও বীজ

ক্যাকাও বীজকে ধর্মে এনেছিল মায়া সভ্যতা

ওলমেক সভ্যতার পর লাতিন আমেরিকা দেখেছিল আরও এক মহান সভ্যতা। দক্ষিণ-পূর্ব মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, বেলিজ, পশ্চিম হন্ডুরাস ও এল-সালভাদোর নিয়ে গড়ে উঠেছিল সুবিশাল মায়া সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০৯০০ খ্রিস্টাব্দ)। যে সভ্যতার হস্তশিল্প, স্থাপত্য, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও বর্ষ পঞ্জিকা সে যুগেই ছুঁয়েছিল উন্নতির শিখর। ওলমেকদের কাছ থেকে মায়ারা পেয়েছিল ক্যাকাও বীজের উত্তরাধিকার। তবে মায়া সভ্যতায় (Maya Civilization) ক্যাকাও বীজ হয়ে উঠেছিল পবিত্র ও ঈশ্বরের খাদ্য। মায়াদের আঁকা বিভিন্ন দেওয়াল চিত্র ও ভাস্কর্যে, দেবতাদের দেখা গিয়েছে ক্যাকাও বীজের সঙ্গে ।

Image - ওলমেক-আজটেক-মায়া সভ্যতার হাত ধরে পৃথিবীতে এসেছিল চকোলেট
মায়া দেবতার গলার মালায় ক্যাকাও ফল

মায়ারা বিশ্বাস করত ক্যাকাও বীজের ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে। তাই সমস্ত শুভ কাছে ক্যাকাও বীজ ব্যবহার করা হত।ক্যাকাও বীজের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি সরবত মায়ারা নিবেদন করত বিভিন্ন দেবতাকে। তবে দেবতার প্রসাদী সরবত খাওয়ার একমাত্র অধিকার ছিল মায়া শাসক ও পুরোহিতদের। কেননা সে যুগে ক্যাকাও বীজ ছিল দুর্লভ ও দুর্মূল্য। এর অন্যতম কারণ হল, ক্যাকাও গাছ সব পরিবেশে জন্মায় না।

লাতিন আমেরিকার কিছু কিছু পাহাড়ি নদীর দুর্গম তীরে, বিশাল বিশাল গাছের ফাঁকে জন্ম নেয় ক্যাকাও গাছ। প্রত্যেকটি ক্যাকাও ফলে থাকে ২৫ থেকে ৪০ টি বীজ। তবে জলবায়ু ও পরিবেশ আদর্শ না হলে, গাছটিকে বাঁচিয়ে রাখা খুব কঠিন। কারণ গাছগুলির বেড়ে ওঠার জন্য চাই আলো আঁধারি পরিবেশ। নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের মাটি। নির্দিষ্ট পরিমাণ বৃষ্টিপাত ও প্রচুর পরিমাণ জলীয়বাস্প। তাই গাছের সংখ্যা কম থাকায়, বীজের দাম সে যুগে ছিল আকাশছোঁয়া। তাই হয়ত মায়া সভ্যতায় ক্যাকাও বীজকে মুদ্রা হিসেবেও ব্যবহার করা হত। যেমন একসময় এদেশে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করা হত ‘কড়ি’।

ফল ধরেছে ক্যাকাও গাছে

পথ দেখিয়েছিল আজটেক সভ্যতা!

মায়া সভ্যতার পর, ১৩০০ থেকে ১৫২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে, বর্তমান মেক্সিকোর মধ্যভাগে বিকশিত হয়েছিল শক্তিশালী আজটেক সভ্যতা (Aztec Civilization)। মায়াদের থেকে পাওয়া ক্যাকাও বীজকে আজটেকেরা নিয়ে গিয়েছিল এক অভূতপূর্ব দিশায়। যদিও মায়াদের মত আজটেকদের কাছে ক্যাকাও বীজ ছিল অত্যন্ত পবিত্র। কারণ আজটেকরা বিশ্বাস করত পৃথিবীতে ক্যাকাও গাছ নিয়ে এসেছিলেন তাদের সর্প দেবতা কেটজলকোয়াটল। তাই সমস্ত শুভকাজে আজটেকেরা ব্যবহার করত ক্যাকাও বীজ। তবে ক্যাকাও বীজকে খাদ্য হিসেবে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল আজটেক সভ্যতাতেই।

Image - ওলমেক-আজটেক-মায়া সভ্যতার হাত ধরে পৃথিবীতে এসেছিল চকোলেট
শিল্পীর তুলিতে আজটেক সভ্যতার মানুষেরা

আজটেকেরা ক্যাকাও ফলকে পোড়ামাটির পাত্রে ভরে, রেখে দিত কয়েক সপ্তাহ। একসময় গেঁজিয়ে উঠত ফল। এরপর ফলের ভেতর থেকে বীজ বের করে, আগুনে ঝলসে নিয়ে কড়া রোদে ফেলে রাখত আরও কয়েক সপ্তাহ। তারপর শুকনো ক্যাকাও বীজকে গুঁড়ো করা হত। এই গুঁড়োকে বলা হত ক্যাকোয়া (Cacoa)। সবশেষে ক্যাকোয়ার সঙ্গে জল মিশিয়ে তৈরি করত বড় বড় পিণ্ড। সেগুলি শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেলে, অন্ধকারে রেখে দেওয়া হত প্রায় দু’বছর। এই ক্যাকাও পিণ্ডগুলিই সম্ভবত ছিল পৃথিবীর আদি চকোলেট।

আজটেক সমাজের সর্বস্তরে ক্যাকাও বীজের সরবত খাওয়ার প্রথাও প্রচলিত ছিল। সমাজের দরিদ্রেরা ক্যাকাও গুঁড়োর সঙ্গে ভুট্টার গুঁড়ো, লঙ্কা ও গোলমরিচ মিশিয়ে সরবত বানাত। ক্যাকাও গুঁড়োর সঙ্গে ভ্যানিলা (Vanilla planifolia),ফুলের পাপড়ি, মশলা, মধু ও ম্যাগুয়ে ক্যাকটাসের মকরন্দ মেশানো সরবত খেত সমাজের অভিজাত শ্রেণী। কারণ ক্যাকাও বীজের গুঁড়ো ছিল অসম্ভব তেতো। এছাড়াও কিছুটা উঁচু থেকে, নিচে রাখা পাত্রে তরল ক্যাকাও বার বার ঢেলে তৈরি করত ফেনা। সেই ফেনা তুলে নিয়ে পান করত আজটেক সভ্যতার মানুষেরা।

আজটেক সভ্যতার চকোলেট

আজটেকরা বিশ্বাস করত ক্যাকাও বীজ বলবর্ধক। তাই যুদ্ধের সময় আজটেক যোদ্ধাদের রসদে থাকত ক্যাকাও বীজের গুঁড়ো এবং পিণ্ড। এছাড়া পাকস্থলী ও অন্ত্রের রোগ সারাতে আজটেকরা পান করত, রবার গাছের নির্যাস মেশানো ক্যাকাও বীজের সরবত। মায়াদের মত আজটেকেরাও মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করত ক্যাকাও বীজকে। প্রজারা আজটেক শাসকদের খাজনা দিত ক্যাকাও বীজ দিয়ে। ষোড়শ শতাব্দীতে পাওয়া একটি তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, আজটেক সভ্যতায় দশটি বীজ দিয়ে কেনা যেত একটি খরগোস। দশটি বীজের বিনিময়েই পাওয়া যেত পতিতার সঙ্গ। একশোটি বীজ দিয়ে কেনা যেত ক্রীতদাস।

ক্যাকাও বীজকে চিনতে পারেননি কলম্বাস

লা সান্তা মারিয়া‘ নামে এক স্প্যানিশ জাহাজে চড়ে, ১৪৯২ সালে লাতিন আমেরিকায় পা রেখেছিলেন ইতালীয় নাবিক ও অভিযাত্রী ক্রিস্টোফার কলম্বাস (Christopher Columbus)। ১৫০২ সালে তাঁর পুত্র ফার্দিনান্দকে নিয়ে একটি আজটেক ক্যানো আটক করেছিলেন। স্থানীয় মালবাহকদের সাহায্যে নিজের জাহাজে উঠিয়ে নিয়েছিলেন আজটেক ক্যানোয় থাকা সমস্ত সম্পদ। সেই সময় একটি পাত্র থেকে ক্যাকাও বীজ ছড়িয়ে পড়েছিল জাহাজের ডেকে।

ক্যাকাও বীজগুলি কুড়ানোর জন্য উন্মত্তের মত ছুটে গিয়েছিল স্থানীয় মালবাহকেরা। কলম্বাস সেদিন বুঝে উঠতে পারেননি, কেন সামান্য বীজগুলির জন্য মালবাহকেরা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে গিয়েছিল। ঘটনাটিকে বিশেষ গুরুত্বও দেননি কলম্বাস। তবে তিনিই সম্ভবত প্রথম ইউরোপীয় যিনি ক্যাকাও বীজ দেখেছিলেন। এবং অবহেলা করেছিলেন ভবিষ্যতে ইতিহাস গড়তে চলা বীজকে।

Image - ওলমেক-আজটেক-মায়া সভ্যতার হাত ধরে পৃথিবীতে এসেছিল চকোলেট
লাতিন আমেরিকায় কলম্বাস

রাজা মন্টেজুমার ‘সোকোয়াটল’ হয়েছিল ‘চোকোলাট’

সোনা ও রত্নের লোভে, ১৫১৯ সালে আজটেক সাম্রাজ্যের রাজধানী টেনসটিটলানে এসেছিলেন, কূটবুদ্ধির স্প্যানিশ হানাদার হার্নান কর্তেস। সেই সময় আজটেক সাম্রাজ্য শাসন করছিলেন রাজা মন্টেজুমা। সাদা চামড়ার হার্নানকে রাজা মন্টেজুমা ভেবেছিলেন মনুষ্য জন্ম নেওয়া কোনও দেবতা। তাই নিজের প্রাসাদে আমন্ত্রণ করেছিলেন হার্নান কর্তেসকে। যা ছিল এক ঐতিহাসিক ভুল। নৈশভোজে হার্নানকে দেওয়া হয়েছিল মধু ও আখের রস মেশানো ক্যাকাওয়ের সরবত। অচেনা সরবতের অকল্পনীয় সুগন্ধ ও স্বাদ মুগ্ধ করেছিল হার্নানকে। এই হার্নানই ১৫২১ সালে দখল করে নিয়েছিলেন আজটেক সাম্রাজ্য। স্প্যানিশদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল রাজা মন্টেজুমাকে।

স্পেনের রাজা প্রথম কার্লোসকে চিঠি লিখে হার্নান জানিয়েছিলেন, সোকোয়াটল (xocoatl) নামে এক ফেনাযুক্ত পানীয়ের কথা। যে পানীয়টি রাজা মন্টেজুমা প্রতিদিন পঞ্চাশ কাপ খেতেন। এই পানীয়টি নাকি শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে ও ক্লান্তি দূর করে।

রাজা মন্টেজুমার সঙ্গে প্রথম দেখা হার্নান কর্তেসের

হার্নান কর্তেস ১৫২৮ সালে কয়েক টন ক্যাকাও বীজ পাঠিয়েছিলেন স্পেনে। স্প্যানিশদের মন জয় করে নিয়েছিল সোকোয়াটল। পানীয়টির সঙ্গে স্প্যানিশরাই প্রথম মিশিয়েছিল ক্যারিবীয় দ্বীপপূঞ্জ থেকে আনা চিনি। সোকোয়াটলের নাম দিয়েছিল চোকোলাট (Chocolat)। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই স্পেনের অভিজাত শ্রেণীর প্রিয় পানীয় হয়ে গিয়েছিল চোকোলাট। এছাড়া জ্বর কমানো, শরীর ঠাণ্ডা করা ও ব্যাথা কমানোর ওষুধ হিসেবেও স্পেনে চকোলাটের ব্যবহার করা হত। যোগান বজায় রাখার জন্য, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ফিলিপিন্সে ক্যাকাও গাছের বাগান তৈরি করতে শুরু করেছিল স্প্যানিশেরা। তবে প্রায় একশো বছর নিজেদের দেশেই চোকোলাটকে আটকে রেখেছিল স্প্যানিশেরা।

‘চোকোলাট’ হয়েছিল ‘চকোলেট’

ইংল্যান্ডে পানীয় চকোলাটের প্রথম পাব খোলা হয়েছিল ১৬৫৭ সালে। স্পেনের চকোলাট (Chocolat) ইংল্যান্ডে এসে হয়ে গিয়েছিল চকোলেট (Chocolate। ইংরেজরা পানীয়টিতে মিশিয়েছিল শুকনো লঙ্কা, লম্বঙ্গ, আমন্ড, কমলা লেবুর রস, মৌরি, কস্তুরি বা স্পার্ম হোয়েলের অন্ত্র থেকে নেওয়া একপ্রকার সুগন্ধী। এতদিন চকোলেট ঠাণ্ডা সরবত হিসেবে খাওয়ার চল থাকলেও, ইংল্যান্ডে আসার পর পানীয়টি গরম গরম খাওয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল।

ইংরেজ চিকিৎসকেরাও পানীয়টির মধ্যে ঔষধি গুণ খুঁজে পেয়েছিলেন। চকোলেট নাকি আয়ু, হজম ক্ষমতা ও যৌন শক্তি বাড়ায়। ১৭৬১ সালে, ‘পুওর রিচার্ড’ পঞ্জিকায় চকোলেটের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন স্বয়ং বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন। , তিনি লিখেছিলেন, চকোলেটের স্মল পক্স সারানোর ক্ষমতা আছে। তবে ১৭৭০ সালে ভার্জিনিয়া পঞ্জিকায় মহিলাদের চকোলেট পান করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল। কারণ চকোলেট নাকি মহিলাদের যৌন ইচ্ছা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মহিলারা শোনেননি সে কথা। কারণ তাঁরাই ছিলেন সে যুগে চকোলেটের সবথেকে বড় ক্রেতা।

Image - ওলমেক-আজটেক-মায়া সভ্যতার হাত ধরে পৃথিবীতে এসেছিল চকোলেট
ইংল্যান্ডে আজও আছে অনেক প্রাচীন চকোলেট হাউস

ইংরেজ ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই প্রথমে ইউরোপ ও আমেরিকা, পরবর্তীকালে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল চকোলেট।ক্যাকাও গাছের নাম হয়েগিয়েছিল ‘চকোলেট নাট ট্রি’। স্প্যানিশ, ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ ও ডাচেরা শ্রীলঙ্কা, ভেনেজুয়েলা, জাভা , সুমাত্রা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফ্রিকাতে বিশাল জায়গা জুড়ে ক্যাকাও গাছের চাষ শুরু করেছিল।

বিশ্ববিখ্যাত করেছিলেন জন ক্যাডবেরি

বার্মিংহামের বস্ত্র ব্যাবসায়ী রিচার্ড ক্যাডবেরির পঞ্চম সন্তান ছিলেন জন ক্যাডবেরি (John Cadbury)। ১৮১৬ সালে, পনেরো বছরের জনকে পাঠানো হয়েছিল একটি ফার্মে। চা ব্যবসার আদ্যপান্ত শিখে আসার জন্য। প্রায় আট বছর ধরে চা ব্যবসার নাড়িনক্ষত্র জানার পর, বাবাকে চিঠি লিখে জন জানিয়েছিলেন, তিনি চকোলেটের ব্যবসা করবেন।

বাবার থেকে কিছু টাকা নিয়ে, ১৮২৪ সালে, বার্মিংহামের বুল স্ট্রিটে কফি ও পানীয় চকোলেটের পাব শুরু করেছিলেন জন ক্যাডবেরি। মেহগিনি কাঠ ও কাচের তৈরি ঝকঝকে পাবে, খল নুড়ি দিয়ে ক্যাকাও বীজ গুঁড়ো করে নিজেই পানীয় তৈরি করতেন জন ক্যাডবেরি। শৌখিন পাত্রে পানীয় চকোলেট পরিবেশন করতেন এক চিনা কর্মচারী। কয়েকমাসের মধ্যেই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল জনের পাব। তাঁর পাবে আসতে শুরু করেছিলেন অভিজাত পরিবারের মানুষজন।

ক্যাডবেরি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জন ক্যাডবেরি

ব্যবসা লাভের মুখ দেখায়, ১৮৩১ সালে জন ক্যাডবেরি বানিয়ে ফেলেছিলেন চকোলেট তৈরির কারখানা। দশ বছরের মধ্যে বাজারে এনে ফেলেছিলেন ষোল রকমের পানীয় চকোলেট। এরপর ১৮৪৭ সালে, ভাই বেঞ্জামিন ক্যাডবেরিকে সঙ্গে নিয়ে জন ক্যাডবেরি শুরু করেছিলেন ‘ক্যাডবেরি ব্রাদার্স’ নামের এক কোম্পানি। নতুন আর একটি কারখানা তৈরি করেছিলেন বার্মিংহামের ব্রিজ স্ট্রিটে।

সেই বছর, অর্থাৎ ১৮৪৭ সালেই বাজারে এসেছিল আধুনিক চকোলেট। এক ব্রিটিশ চিকিৎসক ও বৈজ্ঞানিক জোসেফ ফ্রাইয়ের হাত ধরে। সেই প্রথম চিবিয়ে খাওয়ার জন্য নিরেট ও ছাঁচে ফেলা ‘চকোলেট বার’ তৈরি করেছিল জে এস ফ্রাই এন্ড সন্স। চকোলেটের বাজার দখলের লড়াই শুরু হয়েছিল ক্যাডবেরি ব্রাদার্স ও ফ্রাই এন্ড সন্সের মধ্যে। কিন্তু কিছুদিন পরেই বাজি জিতে নিয়েছিলেন জন ক্যাডবেরি। ১৮৫৩ সালে জন পেয়েছিলেন কুইন ভিক্টোরিয়ার প্রাসাদে চকোলেট সরবরাহের বরাত।

Image - ওলমেক-আজটেক-মায়া সভ্যতার হাত ধরে পৃথিবীতে এসেছিল চকোলেট
চিবিয়ে খাওয়ার জন্য নিরেট চকোলেট বানালেন জে.এস ফ্রাই

খুলে গিয়েছিল জনের কপাল। এসেছিল আকাশ ছোঁয়া সাফল্য। সারা পৃথিবীর ব্রিটিশ উপনিবেগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল জনের ‘বার চকোলেট’। কিন্তু ব্যবসা যখন মধ্য গগনে, পরপর দুটি আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন জন। ১৮৫৫ সালে মারা গিয়েছিলেন জনের স্ত্রী এবং ১৮৫৬ সালে ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন জনের ভাই বেঞ্জামিন। হতাশার সাগরে ডুবে গিয়েছিলেন চকোলেট সাম্রাজ্যের অধীশ্বর জন ক্যাডবেরি। ছেলে রিচার্ড ও জর্জের হাতে ব্যবসা ছেড়ে অবসর নিয়েছিলেন ১৮৬১ সালে।

ক্যাডবেরি কোম্পানির এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী এসেছিল ১৮৬৭ সালে। সুইৎজারল্যান্ডের ফার্মাসিস্ট হেনরি নেসলে প্রথম তৈরি করেছিলেন গুঁড়ো দুধ। নেসলেকে এক অনবদ্য যুক্তি দিয়েছিলেন আর একজন সুইস। তাঁর নাম ড্যানিয়েল পিটার। নেসলে চকোলেটে মিশিয়ে দিয়েছিলেন নিজের কারখানায় তৈরি গুঁড়ো দুধ। বাজারে এসেছিল নেসলের মিল্ক চকোলেট। আসামাত্রই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল নেসলের মিল্ক চকোলেট। প্রমাদ গুণেছিল ক্যাডবেরি কোম্পানি। তারাও মিল্ক চকোলেট বানানোর জন্য গবেষণা শুরু করেছিল। ১৮৮৯ সালের ১১ মে, প্রয়াত হয়েছিলেন জন ক্যাডবেরি। দেখে যেতে পারেননি তাঁর কোম্পানির কিস্তিমাতের চাল।

হেনরি নেসলে ও তাঁর কোম্পানির তৈরি মিল্ক চকোলেট

ক্যাডবেরি কোম্পানির গবেষণা শেষ হয়েছিল অত্যন্ত গোপনে। ১৯০৪ সালে উন্নত মানের মিল্ক চকোলেট তৈরি করে ফেলেছিলেন রিচার্ড ও জর্জ ক্যাডবেরি। তৈরি করার পরেই কিন্তু বাজারে আনেননি। মিল্ক চকোলেটের নতুন নাম চাওয়া হয়েছিল গ্রাহকদের থেকে। গ্রাহকদের পাঠানো অসংখ্য নামের মধ্যে থেকে জর্জ ক্যাডবেরি বেছে নিয়েছিলেন একটি ছোট্ট মেয়ের দেওয়া নাম ‘ডেয়ারি মিল্ক‘। ১৯০৫ সালে, হালকা বেগুনি রঙের মোড়কে নিজেকে মুড়ে বাজারে এসে ছিল ক্যাডবেরির ডেয়ারি মিল্ক। সৃষ্টি করেছিল ইতিহাস।যে ইতিহাসের সলতে পাকিয়েছিল ওলমেক, মায়া ও আজটেক সভ্যতা।

Image - ওলমেক-আজটেক-মায়া সভ্যতার হাত ধরে পৃথিবীতে এসেছিল চকোলেট
বিশ্ব দখল করেছিল ক্যাডবেরির ডেয়ারি মিল্ক

আরও পড়ুন:‘ওল্ড মঙ্ক’ এক আবেগের নাম, ভিনদেশি বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর দিয়ে যাওয়া টাইম মেশিন

You might also like