Latest News

বারবার আত্মহত্যার চেষ্টা, মানসিক হাসপাতালে ইলেকট্রিক শক, কবিতার বিষাদ মানবী সিলভিয়া

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: কলেজজীবনে পছন্দের পুরুষের সঙ্গে দুবছর চুটিয়ে প্রেম, বিয়ে, ঘর আলো করে আসা দুটো ফুটফুটে বাচ্চা— আপাতভাবে সুখী দাম্পত্যে যা যা দরকার সবই ছিল তাঁর। নিজেও ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কবিতা লেখায় হাত পাকিয়েছিলেন খুব অল্প বয়সে। পেয়েছেন অগুন্তি পাঠকের ভালোবাসা, স্বীকৃতি, সম্মান। সাহিত্যে প্রথমবার পুলিৎজার পুরস্কার, হ্যাঁ তাও পেয়েছেন। এতকিছুর পরেও ‘মরিবার হল তার সাধ!’ নাহলে কেন অন্ধকার ঘিরে ধরল তাঁকে? বিষাদে ডুবে গেলেন, নিয়তিতাড়িত হয়ে ছুটলেন আত্মহননের পথে… একবার দুবার নয়, বারবার। এবং শেষমেশ সফল হলেন। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে থেমে গেল কলম। বড় অসময়ে, অনাদরে ইংরাজি সাহিত্যের আকাশ থেকে ঝরে গেল এক আশ্চর্য ধূমকেতু। অথচ আজও কী প্রাসঙ্গিক তাঁর কবিতা, তাঁর গল্প, এমনকি জীবনদর্শনও। বিশ্বসাহিত্যের সেই বিস্ময় প্রতিভা— সিলভিয়া প্লাথ। (Sylvia Plath)

Image - বারবার আত্মহত্যার চেষ্টা, মানসিক হাসপাতালে ইলেকট্রিক শক, কবিতার বিষাদ মানবী সিলভিয়া

১৯৩২ সালের ২৭ অক্টোবর বোস্টনের ম্যাসাচুসেটসে জন্মেছিলেন সিলভিয়া। সিলভিয়ার বাবা অট্টো প্লাথ আদতে জার্মানির গ্র‍্যাবো শহরের বাসিন্দা। তখনকার দিনের বেশ নামকরা কীটবিশেষজ্ঞ ছিলেন তিনি। বেশ কিছু পাঠ্য বইও লিখেছিলেন এই বিষয়ে। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে কাজ করার সময় অট্টো প্লাথ বিয়ে করেন তাঁর থেকে একুশ বছরের ছোট অরেলিয়া স্কুবেরকে। বোস্টনের বাসিন্দা অরেলিয়া নিজেও প্রাণীবিজ্ঞানী এবং অট্টো প্লাথেরই ছাত্রী ছিলেন। বিয়ের মাস কয়েকের মধ্যেই জন্ম নেয় তাঁদের প্রথম সন্তান। বাবা-মা আদর করে মেয়ের নাম রাখেন সিলভিয়া।

সিলভিয়ার জন্মের বছর তিনেক পর জন্মায় তাঁর ভাই ওয়ারেন প্লাথ। ঠিক এর পরপরই ১৯৩৬ সালে প্লাথ পরিবার ম্যাসাচুসেটসের উইনথ্রপে জনসন অ্যাভিনিউতে একটি বাড়িতে চলে আসেন। সেই শহরের পয়েন্ট শার্লি নামক একটি অংশে সিলভিয়ার দাদু-দিদিমা বসবাস করতেন। শৈশবে সিলভিয়ার জীবনের একটা বড় অংশই কেটেছে তাঁর দিদিমার কাছে। অসম্ভব রাশভারি আর মেজাজি বাবার শাসনকে সেই ছেলেবেলা থেকেই ভয় পেতেন ছোট্ট সিলভিয়া। (Sylvia Plath)

খুব ছেলেবেলা থেকেই লেখালিখি শুরু করে দিয়েছিলেন সিলভিয়া। উইনথ্রপ পাবলিক স্কুলে পড়ার সময় ছোট্ট একটা মেয়ের এমন আশ্চর্য লেখার ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হন শিক্ষকেরাও। মাত্র আট বছর বয়সে সিলভিয়ার কবিতা প্রকাশিত হয় বোস্টন হেরল্ড পত্রিকার শিশু শাখায়। আর ঠিক সেই বছরই ডায়াবেটিসে ভুগে মারা যান বাবা অট্টো প্লাথ। ছোট্ট সিলভিয়ার মনে এই মৃত্যু এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস চলে গিয়েছিল, জীবন সম্পর্কে জন্ম নিয়েছিল হতাশ নেতিবাদী মনোভাব। পরবর্তীকালে লেখা তাঁর বিখ্যাত ‘ড্যাডি’ কবিতাটিতে বাবার প্রতি তাঁর সেই শ্রদ্ধা, ভয় আর দ্বন্দ্বের দিকগুলোকে আশ্চর্য ভাষা পেতে দেখেছি আমরা।

জীবনের চড়াই উৎরাই পেরিয়েও কবিতার হাত ছাড়েননি সিলভিয়া। পাশাপাশি গল্প লেখাতেও মনোনিবেশ করেন কিশোরী সিলভিয়া। এগারো বছর বয়স থেকেই নিয়মিত জার্নাল লিখতে শুরু করেন। স্থানীয় কাগজে, পত্রপত্রিকায় ছাপা হতে থাকে একের পর এক গল্প, কবিতা। শিল্পচর্চার প্রতি ঝোঁকও বাড়ছিল এইসময় থেকেই। ১৯৪৭ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে কিশোরী সিলভিয়া জিতে নেন চিত্রশিল্পের জন্য দ্য স্কলাস্টিক আর্ট অ্যান্ড রাইটিং অ্যাওয়ার্ড। (Sylvia Plath)

Image - বারবার আত্মহত্যার চেষ্টা, মানসিক হাসপাতালে ইলেকট্রিক শক, কবিতার বিষাদ মানবী সিলভিয়া

বাবার মৃত্যুর পর থেকেই চরম আর্থিক অনটনে ভুগছিল প্লাথ পরিবার। টানাটানির সংসার, সব দিক সামলাতে গিয়ে বাধ্য হয়েই ছোট্ট ছেলেমেয়ে দুটোর হাত ধরে ওয়েলেসলিতে চলে যেতে বাধ্য হয় সিলভিয়ার মা অরেলিয়া। সেখানে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেক্রেটারিয়াল স্টাডিজ পড়াতে শুরু করেন তিনি।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিলভিয়ার ডিপ্রেশনও বাড়ছিল। মাঝেমধ্যে অদ্ভুত আচরণ করতেন। হতাশা, বিষাদ আর যন্ত্রণা যেন ঘিরে থাকত তাঁকে। আর ঘিরে থাকত কবিতা। এই সময় থেকেই জাতীয় স্তরের বিখ্যাত পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা ছাপা হতে শুরু করে। তাঁর প্রথম গল্প ‘অ্যাণ্ড দ্য সামার উইল নট কাম এগেইন’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘সেভেনটিন’ পত্রিকায় ১৯৫০ সালে। পাশাপাশি কাঁধে তুলে নেন ‘দ্য স্মিথ রিভিউ’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বও। স্কুল পেরিয়ে কলেজে ঢোকার সময় থেকেই সাহিত্য জগতের বেশ পরিচিত নাম সিলভিয়া প্লাথ। (Sylvia Plath)

একজন ব্যতিক্রমী উজ্জ্বল ছাত্রী ছিলেন সিলভিয়া প্লাথ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর বিষণ্নতা পড়াশোনায় অন্তরায় হয়ে ওঠে। বাধ্য হয়েই মা অরেলিয়া মেয়েকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান চিকিৎসার জন্য। বিষাদ কাটাতে সেসময় রীতিমতো ইলেকট্রিক শক দেওয়া হত সিলভিয়াকে। সেই নির্মম চিকিৎসার ফল হল ভয়াবহ। ১৯৫৩ সালের আগস্ট মাসে প্রথমবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন সিলভিয়া। সেবার ওষুধের বাক্স ভেঙে একসঙ্গে ২৪টি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছিলেন। সে যাত্রা কোনওক্রমে বাঁচিয়ে তোলা হয় সিলভিয়াকে। ভর্তি করা হয় ম্যাকলিন হাসপাতালের মানসিক বিভাগে। পরের ছয় মাস ধরে একটানা মানসিক চিকিৎসা চলে তাঁর, একটা সময় পর সুস্থ হয়ে কলেজে ফিরেও আসেন সিলভিয়া।

১৯৫৫ সালে সসম্মানে কলেজ পাশ করে কেমব্রিজে ভর্তি হলেন সিলভিয়া প্লাথ। এই সময়টাই হয়তো সিলভিয়ার জীবনের সবচেয়ে মধুর অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় সেই সময়ের বিখ্যাত ইংরেজ কবি টেড হিউজের। হিউজের ব্যক্তিত্ব, কণ্ঠস্বর এবং লেখায় মুগ্ধ হন সিলভিয়া। একতরফা আবেগ নয়, ক্রমে দুজনেই দুজনের গুণমুগ্ধ হয়ে পড়েন। সেখান থেকেই প্রেম, তারপর বিয়ে। ১৯৫৬ সালের ১৬ জুন হলবর্নের সেন্ট জর্জ দ্য মার্টিয়ারে প্লাথের মায়ের উপস্থিতিতে বিয়ে সারলেন সিলভিয়া এবং টেড হিউজ। প্যারিসে মধুচন্দ্রিমা সেরে কবিদম্পতি ঘর বাঁধলেন লন্ডনের বুকে।

Image - বারবার আত্মহত্যার চেষ্টা, মানসিক হাসপাতালে ইলেকট্রিক শক, কবিতার বিষাদ মানবী সিলভিয়া

এই সুখও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সংসার, চাকরি, জ্যোতিষে বাড়াবাড়ি রকমের বিশ্বাস সব মিলিয়ে পুরোনো মানসিক দোলাচলতা আবার ফিরে আসে সিলভিয়ার। ব্যস্ত জীবনে কবিতা লেখার সময় মিলছিল না। বাড়ছিল ডিপ্রেশন, আত্মহননের ইচ্ছে। ১৯৫৮ সাল থেকে আবার নিজের মানসিক চিকিৎসা শুরু করেন সিলভিয়া। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি বিশেষ। তীব্র মনখারাপ আর বিষণ্ণতার ভিতরেই ১৯৬০ সালে জন্ম নেয় তাঁদের প্রথম সন্তান ফ্রিদা। সে বছরই প্রকাশিত হয় সিলভিয়া প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘The Colossus’। ১৯৬১ তে আবার গর্ভসঞ্চারের লক্ষণ ফুটে উঠল। আর সেই সময় থেকেই চিড় ধরে সিলভিয়া আর টেডের দাম্পত্যে।

১৯৬২ সালের জানুয়ারি মাসে সিলভিয়ার দ্বিতীয় সন্তান নিকোলাসের জন্ম হয়। সংসারে টাকার টানাটানি চলছিল, তার উপর দুই সন্তানের দায়িত্ব, সামাল দিতে সেসময় মৌমাছি পালন শুরু করেন প্লাথ এবং হিউজ। দাম্পত্য কলহও চলছিল কি? কারণ, ১৯৬২ সালের জুন মাসে আবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন সিলভিয়া। এর ঠিক একমাস পরেই সিলভিয়া জানতে পারেন তাঁদের শ্যালকট স্কোয়ারের ভাড়াটে আসিয়া ওয়েভেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে স্বামী হিউজের। এই দুঃসংবাদে বিশ্বাসের ভিত নড়ে গেছিল সিলভিয়ার। প্রবল হতাশায় নিজের দ্বিতীয় উপন্যাসের একমাত্র পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলেন সিলভিয়া। সেবছরই সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ পাকাপাকি বিচ্ছেদ ঘটে দুজনের। ছোট ছোট দুই ছেলেমেয়ের হাত ধরে লণ্ডনে ফিরে আসেন সিলভিয়া। একা, হতাশ, যন্ত্রণায় মুহ্যমান। শুরু হয় নতুন করে জীবনযুদ্ধ। শুরু হয় লেখাও। সেবছর ১১ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত যে ছাব্বিশটি কবিতা লিখেছিলেন সিলভিয়া, সেগুলোকে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কবিতাগুলি একত্রে তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৬৫ সালে ‘এরিয়েল’ নামে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে ‘ভিক্টোরিয়া লুকাস’ ছদ্মনামে প্রকাশ পায় তাঁর একমাত্র উপন্যাস ‘দ্য বেলজার’। (Sylvia Plath)

Image - বারবার আত্মহত্যার চেষ্টা, মানসিক হাসপাতালে ইলেকট্রিক শক, কবিতার বিষাদ মানবী সিলভিয়া
দুই সন্তানের সঙ্গে সিলভিয়া

খ্যাতি, যশ, পুরস্কার কোনওকিছুই বোধহয় প্রেম আর বিশ্বাসের পরিপূরক হতে পারে না। সিলভিয়ার জীবন আর তার পরিণতি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সেই সত্য। ভাঙা দাম্পত্যের কাঁটায় প্রতিমুহূর্তে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন সিলভিয়া। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেছেন আত্মধ্বংশী খাদের কিনারে। ঘনিষ্ঠ বন্ধু জন হর্ডার এসময় রোজ দেখা করতে আসতেন সিলভিয়ার সঙ্গে। বন্ধুকে হাসপাতালে ভর্তি করার চেষ্টাও করেছিলেন। লাভ হয়নি। অভিমানী, মনখারাপ করা মেয়েটা একটু একটু করে জীবনবিমুখ হয়ে পড়েছে ততদিনে। জীবনের চেয়ে মৃত্যুটাই তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে সহজ, কাঙ্ক্ষিতও। প্রেমহীন স্নেহহীন তাঁর কবিমনও যেন কেঁদে উঠেছে, ফিসফিস করে বলেছে ‘মরণ রে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান’।

১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সেই অভিশপ্ত শীতের সকালে ঠিক কী ঘটেছিল? সকাল থেকে ঠান্ডা মাথায় সংসারের কাজ গোছান, ছেলেমেয়ের খাবার তৈরি করেন এক সদ্য ত্রিশের কোঠায় পা রাখা মা। যাবতীয় কর্তব্য সেরে ঘুমন্ত শিশুদের ভালো করে ঘরবন্দি করে তারপর রান্নাঘরে গ্যাস জ্বালিয়ে ওভেনে মাথা রাখেন সিলভিয়া। আত্মহত্যা করার জন্য এর থেকে ভালো উপায় তবে কি সেদিন খুঁজে পাননি ইংরাজি সাহিত্যের বিষণ্ণতম কবি। মৃত্যুর আগে তিনি না কি রান্নাঘরের দরজায় কাপড় গুঁজে দিয়েছিলেন, যাতে বন্ধ দরজা দিয়ে বিষাক্ত গ্যাস কোনওভাবেই তাঁর সন্তানদের ক্ষতি না করতে পারে। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে প্রবল বিতৃষ্ণায় জশিন্শিন্দা চিরকালের জন্য মুখ ফিরিয়ে নিলেন এক অভিমানী একা কবি।

.

You might also like