Latest News

জীবনানন্দকে মানতেন না কবি বলে, নিজেও কি অপঠিত থেকে গেলেন ‘উটপাখি’র কবি?

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: তাঁর সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের সম্পর্ক নিয়ে রয়েছে নানা কথা, নানা প্রতর্ক। জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে ঠিক কবিতা বলে ভাবতেন না তিনি। পাত্তাও দিতেন না তেমন কবিকে। জীবিতাবস্থায়, এমনকি মৃত্যুর পরেও ‘ঝরা পালক’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’র কবিকে নিয়ে খুব বেশি বাক্যব্যয় করেননি কখনও। অথচ দুজনেই ত্রিশের দশকের দুই স্তম্ভপ্রতিম কবি। আবার কাব্যবোধের বিচারে দুজনের অবস্থান একেবারে বিপ্রতীপ। আজ ২০২২ এ দাঁড়িয়ে জীবনানন্দ যখন বাংলা কবিতার অবশ্যপাঠ্য এক নাম, সেখানে কিছুটা কি আড়ালেই চলে গেলেন মননঋদ্ধ বাংলা কবিতার এই কারিগর, ‘অর্কেস্ট্রা’র কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। (Sudhindranath Dutta)

Image - জীবনানন্দকে মানতেন না কবি বলে, নিজেও কি অপঠিত থেকে গেলেন 'উটপাখি'র কবি?

১৯০১ সালের ৩০ অক্টবর কলকাতার হাতিবাগানের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ। বাবা হীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পিতামহ দ্বারকানাথ দত্ত। মায়ের নাম ইন্দুমতী বসুমল্লিক। ছেলেবেলার প্রথমদিকটা কেটেছে কাশীতে। লেখাপড়ায় হাতেখড়ি সেখানেই। এরপরে কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে ১৯২২ সাল নাগাদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য ও আইন বিভাগে ভর্তি হন সুধীন্দ্রনাথ। (Sudhindranath Dutta)

বেশ কম বয়স থেকেই বাংলা সাহিত্যের পরিমণ্ডলে প্রবেশ করেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯২৫ সাল থেকে নানান পত্র-পত্রিকায় কবিতা লিখতে শুরু করেন, ‘কবিতা’, ‘পরিচয়’ প্রভৃতি পত্রিকায় একে একে প্রকাশ পেতে থাকে সেসব কবিতা। এরপর ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তন্বী’। তবে এই কাব্যগ্রন্থে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যবৈশিষ্ট্য তেমনভাবে ফুটে ওঠেনি। বরং বলা যায় পূর্ববর্তী কবিদের বিশেষত রবীন্দ্রনাথের প্রভাব তাঁর এই কাব্যে লক্ষ্য করা যায়। কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গও করেন ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্রীচরণে’: ‘ঋণ শোধের জন্য নয়, ঋণ স্বীকারের জন্য।’ সুধীন্দ্রনাথের দুঃখবাদী, ক্ষণবাদী চেতনা অস্ফুটে স্তিমিত রয়েছে এর কবিতাগুলিতে৷ তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘অর্কেস্ট্রা’ প্রকাশ পায় ১৯৩৫ সালে। এরপর প্রকাশিত হয় ‘ক্রন্দসী’ (১৯৩৭), ‘উত্তর ফাল্গুনী’ (১৯৪০), ‘সংবর্ত’ (১৯৫৩), ‘প্রতিধ্বনি’ (১৯৫৪), ‘দশমী’ (১৯৫৬)।

সুধীন্দ্রনাথ যখন লিখতে আসছেন, তখন বাংলা কবিতার একচ্ছত্র অধিপতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনিই তখন বাংলা সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট। তারপরেও বিশ শতকের ত্রিশের দশকে যে পাঁচ জন কবি বাংলা কবিতায় দুর্নিবার রবীন্দ্র প্রভাব কাটিয়ে আধুনিকতার সূচনা ঘটান, তাদের মধ্যে সুধীন্দ্রনাথ অন্যতম। ত্রিশের দশক এক সর্বব্যাপী অবিশ্বাসের দশক। যুদ্ধ, অমানবিকতা, কালোবাজারি এবং পরাধীন জাতির দৈন্য যেন সেসময় মাথায় পা তুলে ডুবিয়ে দিতে চাইছে বাঙালির অতীত ঐতিহ্যকে। এই টালমাটাল সময়ে দাঁড়িয়ে প্রেম, ক্ষমা, সুন্দরে বিশ্বাস রাখা কঠিন। সন্দেহ, সংশয়, অবিশ্বাস বাস্তব জগতের গণ্ডি পেরিয়ে ছায়া ফেলেছে কবিতার ভুবনেও। ত্রিশের কবিরা সকলেই সেই যুগধর্মের শিকার। কিন্তু সেই দোলাচলতা আর অবিশ্বাসের ছবি সবচেয়ে নিগূঢ় ফুটেছে সুধীন্দ্রনাথের কলমেই। একেবারে সরাসরি তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন ঈশ্বরকে। সর্বব্যাপী নাস্তিকতার কঠিন মাটিতে পা রেখে দাঁড়িয়ে আছে সুধীন্দ্রনাথের কবিতা।

এই কবি পরপর দু’টো বিশ্বযুদ্ধের ভয়াল রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন। যুদ্ধের বিভীষিকা তাঁর মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। একদিকে তিনি ফ্যাসিবাদের ভয়ঙ্কর চেহারার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, অন্যদিকে সাম্যবাদী চেতনার প্রতিও আস্থা রাখতে পারেননি। তাই তাঁর কবিতায় একই সঙ্গে কালচেতনা ও নাস্তিবাদী চিন্তার সহাবস্থান দেখতে পারি। বৃহৎ কোনও আদর্শ নিয়ে বাড়াবাড়ি করার পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। যার ফলে মহৎ সৃষ্টির ব্যপারেও হয়তো তিনি ছিলেন অনাগ্রহী। (Sudhindranath Dutta)

Image - জীবনানন্দকে মানতেন না কবি বলে, নিজেও কি অপঠিত থেকে গেলেন 'উটপাখি'র কবি?

সুধীন্দ্রনাথের কবিতা দুর্বোধ্য- এই অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়৷ মূলত তৎসম শব্দের বহুল ব্যবহার, সন্ধিবদ্ধ ও সমাসবদ্ধ পদের ব্যবহার তাঁর কবিতাকে জটিল করে তোলে৷ তাঁর কবিতার গতি সরল নয় বরং বিচিত্র। তৎসম শব্দের দুরূহতা কিন্তু অভিধানের সাহায্যেও অতিক্রম করা সহজ। তাই জটিলতা নয়, বলা যায় সুধীন্দ্রনাথ একালের ভাষারহস্যের কবি। একসময় খুব সচেতনভাবে মালার্মের কাব্যাদর্শকে অনুসরণ করেছিলেন তিনি। ‘সংবর্ত’ কাব্যের মুখবন্ধে এ প্রসঙ্গে নিজেই লিখছেন– “মালার্মে প্রবর্তিত কাব্যাদর্শই আমার অন্বিষ্ট। আমিও মানি যে কবিতার মুখ্য উপাদান শব্দ; এবং উপস্থিত রচনাসমূহ শব্দ প্রয়োগের পরীক্ষা রূপেই বিবেচ্য।” মালার্মের সংহত শব্দপ্রয়োগ, ব্যঞ্জনাময় প্রকাশভঙ্গী, শব্দের আভিধানিক অর্থকে অতিক্রম করে নতুনতর অর্থরূপ প্রদান করা ইত্যাদি সুধীন্দ্রনাথকে যথেষ্ট আকৃষ্ট করে। ফলে তিনি কবিতায় ফর্মের প্রতি বেশি মাত্রায় সচেতন হয়ে ওঠেন৷ তাঁর কবিতায় ভাবাবেগ ও বুদ্ধিদীপ্তির সঙ্গে মিশে ছিল কবির নিজস্ব শব্দচারণা। তিনি মনে করেন কবিতার মুখ্য উপাদান হল শব্দ। ফলে শব্দের বৈচিত্রময় গতি সম্পর্কে অধিক নিমগ্ন থাকতেন তিনি।

মালার্মের কাব্যাদর্শকে অনুসরণ করেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ

সুধীন্দ্রনাথ ছিলেন বহুভাষাবিদ পণ্ডিত মানুষ। পেশায় অধ্যাপক হলেও আজীবন সাহিত্য সাধনায় নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। আর তারই ফলশ্রুতি হিসাবে ১৯৩১ সাল থেকে দীর্ঘ ১২ বছর তিনি পরিচয় সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় কাজ করেন তিনি। কিছুদিন প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ও সম্পাদনা করেছেন। তাঁকে ‘জিনিয়স’ বলে স্বীকার করে নিয়েছিলেন স্বয়ং বুদ্ধদেব বসু। বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর সুধীন্দ্রনাথের মতো ‘নানাগুণসমন্বিত পুরুষ’ আর দুটি দেখেননি তিনি। পরিচ্ছন্ন স্যুটেড বুটেড হয়ে থাকতেই ভালোবাসতেন। তাঁর পাণ্ডিত্য, বাগ্মীতা আর উপস্থিতি সবটাই ছিল জ্যোতিষ্কের মতো উজ্জ্বল, ব্যক্তিত্বময়।

Image - জীবনানন্দকে মানতেন না কবি বলে, নিজেও কি অপঠিত থেকে গেলেন 'উটপাখি'র কবি?

চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই কবি সুধীন্দ্রনাথ ‘চর্চিত’— খুব কম লেখেন বা প্রায় লেখেনই না বলে। মাত্র ছ’টি কবিতার বই, দুটো গদ্যের বই। একটা অসমাপ্ত আত্মজীবনী, সেও ইংরেজিতে লেখা। সাহিত্যজীবন বলতে তো এটুকুই। সত্যি বলতে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা কোনওদিনই বহুপঠিত নয়। এর কারণ কী? তাঁর কবিতা আয়েস করে পড়ার মতো কবিতা নয়। বালিশে হেলান দিয়ে অবসর যাপনের মতো নয়৷ বরং তাঁর কবিতায় ডুবতে গেলে চাই ডুবুরির মতো রত্ন অন্বেষণের মন ও মনন। কবির যেমন দু’টি জাত আছে, তেমনি পাঠকেরও দুটি জাত। এক ধরণের পাঠক আছেন যাঁরা কেবল প্রচলিত, ভাববাদী, সহজবোধ্য কবিতা পাঠ করেন। আর এক ধরণের পাঠক কবিতার মর্মে পৌঁছাতে চান, কবিতায় নতুনত্বের আস্বাদন করতে চান। এই জাতের পাঠক হন পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল এবং পড়ুয়া প্রকৃতির। এঁদের দীক্ষিত পাঠক বলা যায়। সুধীন্দ্রনাথ আজও নিঃসন্দেহে এই দীক্ষিত পাঠকের কবি।

You might also like