Latest News

ভারতের টাইটানিক ‘বিজলি’, সাড়ে সাতশো যাত্রী নিয়ে ডুবে গিয়েছিল আরব সাগরে

SS Vaitarna, the forgotten Titanic of India.

SS Vaitarna

রূপাঞ্জন গোস্বামী

বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই ইতিহাস বই, গল্প, উপন্যাস, ইন্টারনেট, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ডিসকভারি চ্যানেল ও জেমস ক্যামেরনের অস্কার বিজয়ী সিনেমা দৌলতে জানেন আরএমএস টাইটানিকের নাম। নৌ-পরিবহনের ইতিহাসে সবথেকে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল অতিকায় ও বিলাসবহুল এই ব্রিটিশ জাহাজটি। উত্তর অ্যাটলান্টিক মহাসাগরে ভাসমান এক হিমশৈলকে আঘাত করে জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল, ১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল ভোর রাতে। জাহাজে ছিলেন ২০০৮ জন যাত্রী ও জাহাজ কর্মী। তাঁদের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৫০০ জন। শোকে আকুল হয়েছিল সারা বিশ্ব। টাইটানিককে লেখা হয়েছিল কত শত উপন্যাস, গল্প ও কবিতা। মানুষের মনে চিরতরে গেঁথে গিয়েছিল সেই সব আবেগবিহ্বল শোকগাথা।

কিন্তু বিশ্ববাসী জানে না, টাইটানিক ডুবে যাওয়ার চব্বিশ বছর আগে ভারত প্রত্যক্ষ করেছিল এক ভয়াবহ জাহাজ দুর্ঘটনা। যা কোনও অংশেই টাইটানিকের পরিণতির থেকে কম মর্মান্তিক ছিল না। যদিও টাইটানিকের বহন ক্ষমতা, যন্ত্রাংশ, আকার, বৈভব ও স্বাচ্ছন্দের সঙ্গে ভারতীয় জাহাজটির তুলনা চলে না। কারণ দৈত্যাকার টাইটানিকের কাছে ভারতীয় জাহাজটি ছিল লিলিপুট। তবুও ঘটনাটি টাইটানিক ডুবির থেকে অনেক বেশি মর্মান্তিক, কারণ ডুবে যাওয়া টাইটানিকের ৭০৫ জন যাত্রী বেঁচে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। কিন্তু আরব সাগরে ডুবে যাওয়া ভারতীয় জাহাজটির ৭০৩ জন যাত্রী ও ৩৮ জন জাহাজ কর্মীর একজনও বেঁচে ফিরে আসতে পারেননি।

এস এস বৈতর্ণ

ব্রিটেনের গ্লাসগোর গ্র্যাঞ্জমাউথ ডকইয়ার্ড কোম্পানি লিমিটেড, ১৮৮২ সালে বানাতে শুরু করেছিল তাদের প্রথম স্টিমশিপ ‘এস এস বৈতর্ণ’। জাহাজটি বানানো হচ্ছিল বোম্বের শেপার্ড অ্যান্ড কোম্পানির জন্য। উত্তর মুম্বাইয়ে বয়ে চলা বৈতর্ণ নদীর নামানুসারে রাখা হয়েছিল জাহাজটির নাম। প্রায় তিন বছর ধরে বানানো হয়েছিল জাহাজটিকে। খাঁটি ইস্পাতে তৈরি স্টিমচালিত জাহাজটিতে ছিল একটি চিমনি, দুটি মাস্তুল ও ৭৩ হর্স-পাওয়ারের ইঞ্জিন। জাহাজটির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৩ নটিক্যাল মাইল (২৪ কিলোমিটার)। প্রায় ১৭০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৬ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট, ত্রিতল জাহাজটিতে ছিল পঁচিশটি কেবিন।

SS Vaitarna
এস এস বৈতর্ণ

জাহাজ তৈরির কাজ শেষ হয়েছিল ১৮৮৫ সালে। গ্লাসগো পোর্টে জাহাজটির রেজিস্ট্রেশন হওয়ার পর, সেই বছরেই বম্বের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল ‘এস এস বৈতর্ণ’। ব্রিটেনের ডান্ডি পোর্ট থেকে রওনা হয়ে, আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে ‘এস এস বৈতর্ণ’ নোঙর করেছিল করাচিতে। তারপর কচ্ছের মাণ্ডবি, পোরবন্দর হয়ে পৌঁছেছিল বম্বে বন্দরে। ‘এস এস বৈতর্ণ’ বম্বে পৌঁছনোর পর, শেপার্ড অ্যান্ড কোম্পানির কাছ থেকে জাহাজটি লিজে নিয়েছিল ‘বম্বে স্টিমার নেভিগেশন কোম্পানি’।

এই কোম্পানিটি ছিল ভারতের প্রথম ব্যাক্তিগত মালিকানাধীন জাহাজ কোম্পানি। বম্বে থেকে উপকূলীয় সমুদ্রপথে কচ্ছের মাণ্ডবি পর্যন্ত যাত্রী ও পন্যবহন করার জন্য লিজে নেওয়া হয়েছিল জাহাজটিকে। কোম্পানিটির মালিক ইসমাইল হাসামের আদিবাড়ি ছিল গুজরাতের কচ্ছ এলাকায়। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন বম্বে-মাণ্ডবি রুট।

সে যুগে বোম্বে পোর্ট

আরও পড়ুন: খুঁজছিল আমেরিকা, আপন করেছিল মুণ্ডশিকারি নাগারা, ভারতে প্রাণ দিয়েছিলেন এই ‘জন হেনরি’

কোম্পানির সেরা ক্যাপ্টেন ছিলেন হাজি কসম

বম্বে স্টিমার নেভিগেশন কোম্পানির সেরা ক্যাপ্টেন হাজি কসম ইব্রাহিমও ছিলেন কচ্ছের লোক। তবে বম্বের বরিভেলি ও দহিসরে ছিল তাঁর প্রচুর জমিজমা। আব্দুল রহমান স্ট্রিটে ছিল নিজস্ব অফিস। ক্যাপ্টেন হাজি কসম থাকতেন মালাবার হিলসের অভিজাত এলাকায়। প্রায় অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রে ঘুরে বেড়িয়েছেন পণ্য ও যাত্রীবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে।

স্বচ্ছন্দে সামলেছেন বহু প্রতিকূল পরিস্থিতি। কোন সমুদ্রের কীভাবে জাহাজ চালাতে হবে, সেটা তাঁর চেয়ে ভাল খুব কম ক্যাপ্টেনই জানতেন। ক্যাপ্টেন হাজি কসম একবার মক্কায় হজ করতে গিয়েছিলেন, সেখানে এক ফকির তাঁকে বলেছিলেন, সারাজীবনে হাজি কসম মোট নিরানব্বইটা জাহাজ চালাবেন। ১৮৮৫ সাল অবধি হাজি কসম চালিয়ে ফেলেছিলেন বিভিন্ন ধরনের ৯৮ টি জাহাজ। গ্লাসগো থেকে বম্বে আসা ‘এস এস বৈতর্ণ’ ছিল তাঁর নিরানব্বইতম জাহাজ।

ss vaitarna
ক্যাপ্টেন হাজি কসম ইব্রাহিম

বম্বে স্টিমার নেভিগেশন কোম্পানি লিজ নেওয়ার পর টানা তিন বছর ধরে বম্বে-মাণ্ডবি রুটে সফলভাবে যাতায়াত করেছিল ‘এস এস বৈতর্ণ’। তিরিশ ঘণ্টার এই সমু্দ্রযাত্রার জন্য টিকিটের দাম পড়ত আট টাকা। যুগের তুলনায় টিকিটের দাম বেশি হলেও একটি যাত্রীর আসনও খালি থাকত না। কারণ স্থলপথে এই দূরত্ব পার হতে সময় লেগে যেত প্রায় এক সপ্তাহ।

আরও একটি কারণে যাত্রীরা আকর্ষিত হতেন। সে যুগে ভারতের প্রায় কোথাও ইলেকট্রিক বাল্ব না জ্বললেও, ‘এস এস বৈতর্ণ’ জাহাজে লাগানো ছিল কয়েক বছর আগে আবিষ্কৃত ইলেকট্রিক বাল্ব, যা সে যুগে ছিল চরম বিলাসিতা। আলোকোজ্জ্বল জাহাজটিকে দেখার জন্য প্রতি সন্ধ্যায় বন্দরে ভিড় করতেন স্থানীয় মানুষেরা। জাহাজটিতে কয়েকশো বিজলিবাতি থাকার জন্য কালক্রমে এস এস বৈতর্ণের নামই হয়ে গিয়েছিল ‘বিজলি’। সে যুগে ভারতের পশ্চিম উপকূলের সবথেকে আধুনিক যাত্রীবাহী জাহাজ ছিল ‘বিজলি’।

অভিশপ্ত ৮ নভেম্বর, সাল ১৮৮৮

দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। তিথি ছিল লাভ পঞ্চমী। গুজরাতের মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র দিন। দীপাবলির উৎসবের সমাপ্তি দিবস বলে ধরা হয় দিনটিকে। সৌভাগ্য পঞ্চমী ও জ্ঞান পঞ্চমীও বলা হয়। এই দিনটিতে বিশেষ পূজা আরাধনা করা হয় বাণিজ্যিক সৌভাগ্য ও সাংসারিক সুখ এবং শান্তির জন্য। কিন্তু এমন শুভ দিনে সকাল থেকেই মুখ ভার করেছিল আকাশ। দমকা হাওয়া বইতে শুরু করেছিল কচ্ছের ওপর দিয়ে। ঘন কালো মেঘ ক্রমশ জমতে শুরু করেছিল আরব সাগরের ওপর। কচ্ছের মাণ্ডবি বন্দর থেকে এক মাইল দূরে, আরব সাগরের বুকে নোঙর ফেলে ভাসছিল বিজলি। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে বার বার আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন হাজি কসম। কপালে চিন্তার ভাঁজ। বাতাসের তেজ ক্রমশ বাড়ছিল। ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ছিল তাঁর দুধসাদা চুল ও দাড়ি।

পরিবেশ এরকমই ভয়াবহ হয়ে আসছিল

ধুলো উড়িয়ে একের পর এক গরুর গাড়ি এসে পৌঁছচ্ছিল মাণ্ডবি বন্দরে। গরুর গাড়িগুলিতে চেপে আসছিলেন জাহাজ যাত্রীরা। বন্দর থেকে ফেরি বোটে করে যাত্রীদের পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল জাহাজে। কিছুক্ষণ পর কয়েকশো গরুর গাড়ি চড়ে, বাজনা বাজাতে বাজাতে বর নিয়ে এসেছিল তেরোটি আলাদা বরযাত্রীদের দল। কোনও দল জাহাজ থেকে নামবে দ্বারকায়, কোনও দল পোরবন্দরে। ইতিমধ্যেই জাহাজে উঠে পড়েছিল কয়েকশো ছাত্র। দলবেঁধে তারা বম্বে যাচ্ছিল ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। সেই সময় পশ্চিম ভারতে ম্যাট্রিক পরীক্ষা নিতো বম্বে বা করাচি ইউনিভার্সিটি। প্রত্যেক বছর অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে হতো সেই পরীক্ষা। সে বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষার দিন পড়েছিল নভেম্বর মাসে, তাই সৌরাষ্ট্র ও কচ্ছের ছাত্ররা বম্বে চলেছিল পরীক্ষা দিতে।

শেষ গরুর গাড়িটিতে ছিলেন একটি জৈন বণিক পরিবার। কচ্ছের কাপায়া গ্রামে তাঁদের বাড়ি। বন্দর থেকে ফেরি বোটে করে পরিবারটি পৌঁছেও গিয়েছিল জাহাজের কাছে। কিন্তু জাহাজটিকে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিল সঙ্গে থাকা পাঁচ বছরের বালকটি। কিছুতেই বালকটি জাহাজে উঠতে চাইছিল না। বার বার সে বলছিল, জাহাজটি ডুবে যাবে। সে মরে যাবে। যাত্রার শুরুতেই এমন অলুক্ষুণে কথা শুনে ধর্মভিরু পরিবারটি জাহাজে না উঠে, বোটে করে ফিরে গিয়েছিল বন্দরে। তারপর ধরেছিল বাড়ির পথ।

গুজরাটের মাণ্ডবি পোর্ট, এখান থেকেই শেষযাত্রা শুরু করেছিল বিজলি

শুরু হয়েছিল  বিজলির শেষযাত্রা

সমুদ্র ক্রমশ উত্তাল হয়ে উঠছিল। অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন হাজি কসম অনুমান করেছিলেন, ঘুর্ণিঝড় আসতে চলেছে। ঘুর্ণিঝড়ের হানায় আরব সাগর কীরকম ভয়ঙ্কর রূপ ধরে, তা বিলক্ষণ জানতেন হাজি কসম। কিন্তু জাহাজে ততক্ষণে উঠে পড়েছেন সব যাত্রী। অন্য কোনও দিন হলে যাত্রা পরিত্যক্ত বলে ঘোষণা করে দিতেন। কিন্তু জাহাজে ছিল বরযাত্রী ও পরীক্ষার্থীদের দল। যাদের বিয়ে ও পরীক্ষার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছে পুরোহিত ও ম্যাট্রিক বোর্ড। যা একমুহূর্ত পিছিয়ে দেওয়ার উপায় নেই।

যাত্রা পরিত্যক্ত বলে ঘোষণা করলে লগ্নভ্রষ্টা হবে তেরোটি কনে ও ম্যাট্রিক দিতে পারবে না কয়েকশো পরীক্ষার্থী। তাই বাধ্য হয়ে ৫২০ জন যাত্রী, ক্যাপ্টেন সহ ৩৮ জন জাহাজ কর্মী ও প্রচুর পন্য নিয়ে, দুপুরবেলা কচ্ছের মাণ্ডবি ছেড়ে বোম্বের পথে রওনা হয়েছিলেন ক্যাপ্টেন হাজি কসম। বিকেলবেলা সঙ্গে শুরু হয়েছিল মুষলধারে বৃষ্টি ও বজ্রপাত। হাওয়ার গতিবেগ বেড়েই চলেছিল। উন্মত্ত ঢেউয়ের ওপরে মোচার খোলার মতো দুলছিল বিজলি।

বিজলির দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করেছিল বিশাল বিশাল ঢেউ (প্রতীকী ছবি)

ক্যাপ্টেন হাজি কসমের অসামান্য দক্ষতায় সন্ধ্যার মধ্যে বিজলি পৌঁছে গিয়েছিল দ্বারকা বন্দরে। কিছু যাত্রী নেমে গিয়েছিলেন। দ্বারকা থেকে জাহাজে উঠেছিলেন আরও ১৯২ জন যাত্রী। মোট ৭৫০ জন যাত্রী নিয়ে দ্বারকা বন্দর ছেড়ে বিজলি এগিয়ে গিয়েছিল পোরবন্দরের দিকে। ততক্ষণে সমুদ্র রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিল। দশ পনেরো ফুটের ঢেউয়ের আছড়ে পড়ছিল জাহাজের গায়ে। জাহাজে উঠেছিল কান্নার রোল।

গবেষকেরা অনুমান করেছেন, আতঙ্কিত যাত্রীরা সম্ভবত জাহাজ তীরে লাগানোর কথা বলেছিলেন হাজি কসমকে। কিন্তু যাত্রীদের কথা কানে তোলেননি ক্যাপ্টেন হাজি কসম। কারণ তীরের দিকের ঢেউগুলি আরও ভয়ঙ্কর। বন্দর ছাড়া সাধারণ সৈকতে জাহাজ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বালিতে আটকে যাবে জাহাজ, তখন দোতলা সমান ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজডুবি অনিবার্য। তাই হাজি কসম জাহাজ নিয়ে সরে গিয়েছিলেন তীর থেকে আরও দূরে। তাঁর পাখির চোখ ছিল পোরবন্দর। যেমনভাবেই হোক তাঁকে পৌঁছতেই হবে পোরবন্দরে। সেখানে পৌঁছে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবেন।

সে যুগের পোরবন্দর

সবাইকে নিয়ে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল বিজলি

বেশ কয়েকঘণ্টা ভয়াবহ ও উন্মত্ত সমুদ্রপথে চলার পর বিজলি পৌঁছে গিয়েছিল পোরবন্দরের কাছাকাছি। জাহাজের বেশিরভাগ যাত্রীই নেমে যেতে চেয়েছিলেন পোরবন্দরে। কিন্তু হাজি কসমের মতো অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনও জাহাজ ভেড়াতে পারেননি পোরবন্দরে। বন্দরের গায়ে তখন আছড়ে পড়ছিল দোতলা বাড়ির সমান ঢেউ। অনেক লোকগাথায় বলা হয়েছে, পোরবন্দরের পোর্ট ম্যানেজার লিলি, হাজি কসমকে নাকি বলেছিলেন, “সমুদ্র অ্যাডভেঞ্চার করা জায়গা নয়। জাহাজ এখানেই নোঙর করে যাত্রা সমাপ্ত বলে ঘোষণা করুন।” কিন্তু পরবর্তীকালে গবেষকেরা বন্দরের লগবুক ঘেঁটে প্রমাণ করেছিলেন, সেই রাতে ক্যাপ্টেন হাজি কসম জাহাজটিকে পোরবন্দরে ভেড়াতেই পারেননি। বন্দরের অনেক দূর দিয়ে চলে গিয়েছিল জাহাজটি। বিজলির বিজলি বাতিগুলিই শুধু দেখা গিয়েছিল বন্দর থেকে।

মাঝরাত নাগাদ আরব সাগরের বুকে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এক ভয়ঙ্কর ঘুর্ণিঝড়। ঝড়ের দাপটে একে একে ভেঙে পড়ছিল তীর সংলগ্ন গাছ পালা ও মাটির বাড়ি। আরব সাগরে উঠছিল পাহাড় প্রমাণ ঢেউ। এরই মধ্যে ক্যাপ্টেন হাজি কসম বিজলিকে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন, গুজরাটের জুনাগড় জেলায় অবস্থিত মনগ্রল উপকূলের মাধবপুরের কাছে। তীরে থাকা বাতিঘর থেকে দেখা গিয়েছিল বিজলির কাঁপতে থাকা আলো। সেই শেষ দেখা। এরপর জমাট অন্ধকার ও প্রলয়ঙ্কারী ঘুর্ণিঝড়ের মধ্যে ৭৫০ জন যাত্রী ও কর্মীকে নিয়ে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল এস এস বৈতর্ণ ওরফে বিজলি।

এরকমই কোনও ঢেউয়ের আঘাতে ডুবে গিয়েছিল বিজলি ( প্রতীকী ছবি)

আজও মেলেনি ধ্বংসাবশেষ

ঘুর্ণিঝড় থেমে যাওয়ার পর শুরু হয়েছিল অনুসন্ধান। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি বিজলির ধ্বংসাবশেষ। পাওয়া যায়নি একজনও যাত্রী, নাবিক বা ক্যাপ্টেন হাজি কসমের মৃতদেহ। দুর্ঘটনার স্থল থেকে ফিরে এসে তদন্তকারী দল বলেছিল, উপকূলভাগের জলে, শান্ত পরিবেশে চলার জন্য বানানো হয়েছিল বিজলিকে। তাই অশান্ত মাঝ সমুদ্রে অতর্কিতে ধেয়ে আসা ঢেউয়ের আঘাত সামলাতে পারেনি বিজলি। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া জাহাজটিতে পর্যাপ্ত লাইফবোট বা লাইফ জ্যাকেট ছিল না। সামান্য যে ক’টি লাইফবোট ও লাইফ জ্যাকেট ছিল তা ব্যবহার করার সুযোগই পাননি যাত্রীরা।

বিজলির সঙ্গেই অতল জলের গভীরে তলিয়ে গিয়েছিলেন সাড়ে সাতশো জন মানুষ। প্রাণ বাঁচাতে পারেননি সারা বিশ্বের সমুদ্র চষে ফেলা ক্যাপ্টেন হাজি কসমও। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত যাত্রীদের প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা করে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সত্যি হয়েছিল জৈন পরিবারের বালকটির ভবিষ্যবাণী। লগ্নভ্রষ্টা হয়েছিল তেরোজন কনে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়া হয়নি কয়েকশো কিশোরের।

প্রতীকী ছবি

আজও বেঁচে আছে অভিশপ্ত জাহাজ ‘বিজলি

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে বিশ্ব মনে না রাখলেও, মনে রেখেছে গুজরাত। সৌরাষ্ট্র ও কচ্ছ উপকূলের লোকগাথায় ও লোকসঙ্গীতে আজও বেঁচে আছে অভিশপ্ত জাহাজ ‘বিজলি’। আজও গুজরাতের মানুষের মুখে মুখে ফেরে “হাজি কসম, তারি বিজলি রে মাধ দারিয়ে ভেরান থাই” গানটি। কাঁদিয়ে দেওয়া গানটির এই কলিটির অর্থ হল ও হাজি কসম, তোমার বিজলি সমুদ্রের মাঝে তলিয়ে গেছে।” হাজি কসমকে মনে রেখেছে মুম্বাইও। আজও মধ্য মুম্বাইয়ে তাঁর নামে আছে একটা এলাকা, নাম ‘হাজি কসম চাল’।

এই সেই হাজি কসম চাল

রবার্ট ব্যালার্ড ১৯৮৫ সালে খুঁজে পেয়েছিলেন টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু ১৩১ বছর কেটে যাওয়ার পরও খুঁজে পাওয়া যায়নি এস এস বৈতর্ণ জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ। অনেক গবেষক বলেন, টাইটানিকের থেকেও অনেক বড় ট্র্যাজেডি ছিল বিজলির হারিয়ে যাওয়া এবং সমস্ত যাত্রী ও জাহাজকর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু। কিন্তু পশ্চিমি দেশগুলির চোখে ভারত তখন দরিদ্র কালা আদমির দেশ। তাই হয়ত একসঙ্গে এত ভারতীয়ের মৃত্যু দাগ কাটেনি সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী প্রথম বিশ্বের মনে।

মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি নিয়ে আলোচনাই করেনি বিশ্বের ইতিহাস। উন্নত বিশ্বের জাহাজ হলে, হয়তো বিজলিকে নিয়ে লেখা হতো অনেক কালজয়ী উপন্যাস। ব্লকবাস্টার সিনেমাই বানিয়ে ফেলতেন পশ্চিমি চলচ্চিত্র নির্মাতারা। সাড়ে সাতশো মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর কাহিনি বেচে ছিনিয়ে নিতেন অস্কার পুরষ্কার। তবুওতো বিশ্ববাসীর বুকে বেঁচে থাকতো সমুদ্র সুন্দরী বিজলি, টাইটানিকের মতোই ।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like