Latest News

করোনা যোদ্ধার কথা: আমরা আছি হাসপাতালে, আপনারা ঘরে থেকেই লড়ুন

তিস্তা পাহাড়ি

আমি, এক জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মী বলছি। নার্সিং আমার পেশা। আর্ত মানুষের সেবা করা আমার কাজ। ভালবেসে এ কাজ করি আমি, এ কাজ করে ভালবাসাও পাই। তবে অভিযোগ বা আক্রমণের ঢিলও কম গায়ে এসে লাগেনি এই নাতিদীর্ঘ পেশাদারি জীবনে। আমি মনে রাখিনি। ভালবাসাগুলো মনে রেখেছি। নইলে আরও ভালবেসে কাজ করব কী করে? এই যেমন এখন। অচেনা অসুখে থমথমে একটা সময়ে। রোগীর চাপ বাড়ছে। মানুষ ভয় পাচ্ছে। মিথ্যে বলব না, আমিও পাচ্ছি। পাব না? ঘরে প্রিয়জন নেই আমার? সেই ভয়ের কথাই একটু বলি প্রথমে।

মনে পড়ছে সেই দিনটা। কলকাতায় করোনা পজিটিভের খবর মিলেছে সদ্য। আমার নাইট ডিউটি তার পরের দিন। এর আগে ওয়ার্ডে অনেকবার পঞ্চাশ-ষাট জন রোগী একা সামলেছি, কোনও দিন আত্মবিশ্বাসের অভাব হয়নি, মনোসংযোগ কম পড়েনি। অথচ সেদিন মনে হচ্ছিল, সময়টা আরও কঠিন হবে। রাত এগারোটা নাগাদ জানতে পেরেছিলাম, ইতালি আর ইজিপ্ট থেকে দুজন রোগী আসছেন, প্রথম জনের বেশ কিছু উপসর্গও আছে। না, নিজে সংক্রামিত হওয়ার ভয় নয় কিন্তু। সে ভয়টাকে তো ছাত্রীজীবনের প্রথম বর্ষে শপথ গ্রহণের দিনই কী এক অদ্ভুত মন্ত্রবলে জয় করে ফেলেছিলাম। ভয় হচ্ছিল প্রায় সম্পূর্ণ অজানা এক পরিস্থিতি মাঝরাতে ঠিকমতো সামলাতে পারব কিনা, সেই নিয়ে। আসলে এমন একটা অসুখ, যা গোটা বিশ্বের কাছেই প্রায় নতুন, অজানা। সেই সম্ভাব্য রোগী এই হাসপাতালে প্রথমবার, আমারই সময়ে, আমারই অ্যালোকেশনে!

চিনের পর গোটা বিশ্বই হয়তো আতঙ্কের পরিস্থিতি আঁচ করছিল একটু একটু করে। আন্দাজ করা যাচ্ছিল, থাবা বসতে পারে ভারতবর্ষে, পশ্চিমবঙ্গেও। প্রস্তুতি শুরু হচ্ছিল ধীর গতিতে। জেলা হাসপাতালে শুধুমাত্র করোনা রোগীদের জন্য আলাদা করে আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলার নির্দেশিকা জারি হল, শুরু হল আমাদের মত কয়েকজনের প্রস্তুতি। মিটিং, তথ্য আদান প্রদান, পড়াশুনা, সংক্রমণ রোধ করতে সম্ভাব্য কী কী প্রস্তুত রাখা যেতে পারে সেইসব দিয়ে পুরো ইউনিট সাজানোর চেষ্টা করছিলাম। প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে থেকে ধীরে ধীরে রোগী আসা শুরু হল। কেউ শুধু চেক আপের জন্য, তারপর তেমন বুঝলে ভর্তি। তারপরই একটু একটু করে আমরা বুঝতে শুরু করলাম, লড়াইটা এতটাও সহজ ও পদ্ধতিমাফিক হওয়ার নয়।

মৃত্যুমিছিল সম্পর্কে ভয় ছড়িয়ে পড়ছে গোটা পৃথিবীতে। ভারতবর্ষে প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। এদিকে আমাদের স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির মাত্র ১.২৮ শতাংশ ব্যয় করে দেশ। আমরা স্বাস্থ্যকর্মীরা না হয় প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও কাজ করতে বদ্ধপরিকর, কিন্তু আমাদের পরিবারের বয়স্ক বা অসুস্থ মানুষগুলো? পরিসংখ্যান বলছে, মৃত্যুহার এই মানুষদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি।
অনেক জায়গায় শুনেছি স্বাস্থ্যকর্মীদের এলাকায় থাকা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে, স্থানীয় মানুষ আপত্তি করছেন। বহু স্বাস্থ্যকর্মী ঘরে নিজের সন্তানকে রেখে এসে নিজেদের আইসোলেট করে ডিউটি করছেন, যাতে তাঁর থেকে অসুখ না ছড়ায় অন্যান্য মানুষদের। কবে তাঁরা আবার ফিরবেন তাঁদের প্রিয়জনদের কাছে, কেউ জানে না। আদৌ যদি… ভাবতে বড় ভয় হয়..আসলে অধিকাংশ মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীই মা তো..!

বুঝতে পারছি, মৃত্যুমিছিল দেখার ক্ষমতা আমাদের আর নেই। প্রিয়জন হারানোর শোক তবুও আমরা খানিক জানি, মৃত্যুপথযাত্রী প্রিয়জনকে শেষবারের মত একবার ছুঁয়ে দেখতে না পারার যন্ত্রণা আমরা জানি না, জানতে চাইও না! তাই সকলকেই অনুরোধ করছি, নিজেদের কথা ভেবে, আমাদের কথা ভেবে ঘরে থাকুন আপনারা, নিজেদের নিরাপদে রাখুন… আমরা শেষ চেষ্টা করব এই দৃশ্য রুখে দেওয়ার। কিন্তু আমাদের একটু সাহায্য করার জন্যও কি আমার সহনাগরিকরা প্রস্তুত নন?

এ তো গেল আমার নিজস্ব ভাবনাগুলো। বাকি থাকে কাজ। আমরা সবাই জানি, ভেন্টিলেশনে থাকা একজন মুমূর্ষু মানুষকে তার প্রয়োজনীয় পরিষেবা দিতে সবাই পারে না। শিরার ভিতর দিয়ে কীভাবে ক্যানিউলেট করতে হয়, তা সবাই পারে না। হৃদযন্ত্র, ফুসফুস জবাব দিয়ে দিলে তাকে রিসাসিটেট করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সবাই পারে না। এগুলোকে বলে পেশাগত দক্ষতা। আমি আমার জীবনের কাছে কৃতজ্ঞ, যে এই পেশাগত দক্ষতাটুকু আমি যতটা সম্ভব অর্জন করেছি। মানুষকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেও তাকে ফিরিয়ে আনার শেষ চেষ্টাটুকু করার ক্ষমতা আমার আছে। কিন্তু যাঁরা এই পেশার মানুষ নন? বিশ্বাস করুন, এই মৃত্যুকালীন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে প্রতি মুহূর্তে বুঝতে পারছি, এ লড়াইয়ে কোনও অংশে তাঁদেরও অংশগ্রহণ কম নয়। তাঁদের শুভাকাঙ্ক্ষা, ক্রমাগত মনের জোর দিয়ে যাওয়া, পাশে থেকে আমাদের সুরক্ষার দাবি তোলা– এইটুকু না থাকলে আর একফোঁটা মানসিক শক্তি অবশিষ্ট থাকত না আমাদের। রাত জেগে থাকলে যখন একের পর এক ধমক আসতে থাকে, “ঘুমোতে যা, নিজেকে সুস্থ রাখ, তোরা সুস্থ না থাকলে আমাদের কী হবে!”– আমাদের ক্ষতগুলোয় এক এক করে প্রলেপ পড়ে। আবারও মনে হতে থাকে, পারতেই হবে আমাদের। যেভাবে হোক! এই শক্তিটুকু ছাড়া বুঝি কোনও লড়াই করা যায়!

এখন না হয় এই শক্তিটুকু আঁকড়ে ধরে আমরা আইসোলেটেডই থাকি। আশা করব, অসুখমুক্ত ভারতবর্ষে দেখা হবে আমাদের একদিন। ততদিন নিরাপদে থাকুন, সুস্থ থাকুন। আর বুঝুন, লড়াইটা আমাদের সব্বার। আমরা স্বাস্থ্যকর্মীরা এই পর্বে জান লড়িয়ে দেব, আমরা জানি। কিন্তু এখানেই কি এই মহামারী শেষ হবে? এর পরেও তো সাংঘাতিক রকমের মন্দার মুখে পড়তে হতে পারে আমাদের সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা ভারতবর্ষকে। সেই পরিস্থিতিতেও আমরা সবার লড়াই করে নিতে পারি যেন, কেমন?

বহুবার বলা কথাটা আবার বলি শেষে। আমি আপনাদের জন্য ঘর ছেড়ে, ঘরের মানুষ ছেড়ে হাসপাতালে পড়ে রয়েছি। আপনারা আমাদের জন্য, আপনাদের ঘরের মানুষের জন্য, ঘরেই থাকুন। প্লিজ়।

(লেখিকা পেশায় নার্স, রাজ্যের একটি হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে কর্তব্যরত)

You might also like