Latest News

৪০০ বছরের পুরোনো অভিশাপের জালে আজও বন্দি মহীশূর রাজপরিবার

দ্য ওয়াল ব্যুরো:  পৃথিবীর বুকে নানা দেশের রাজপরিবারের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে অজস্র ইতিহাস, মিথ, উপকথায় মোড়া রংবেরঙের গল্প। ঠাকুমা-দিদিমাদের হাত ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঘুরে বেড়ানো এসব গল্প কখনও পুরোনো হয় না। বিশ্বাসের বয়স বাড়লে তা ক্রমে মিথে পরিণত হয়। মহীশূর রাজপরিবারকে ঘিরেও রয়েছে এমনই এক অভিশপ্ত ইতিহাসের কালো ছায়া। আজও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে মানুষের সেই আশ্চর্য নিয়তির গল্প শুনলে। কী সেই অভিশাপ? সে কথা জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আরও ৪০০ বছর।

সেটা ১৬১২ সালের কথা। পলাশির যুদ্ধের প্রায় দেড়শ বছর আগে দিল্লির মসনদে তখন বসে আছেন শাহেনশাহ নুরুদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গীর বাদশাহ। দিল্লি থেকে বহুদূরে কর্ণাটকের চামুণ্ডী পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট এক রাজ্য মহীশূর। একসময় বিজয়নগর সাম্রাজ্যের অধীনে সামন্তরাজ্য ছিল এই মহীশূর। ১৫৫৩র পরে স্বাধীন রাজ্য হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। এই
মহীশূরের প্রথম রাজা ছিলেন যদুরায় ওয়াদিয়র, স্বাধীন মহীশূরের সিংহাসনে বসেছিলেন তিনি। আর তাঁর হাত ধরেই ওয়াদিয়র রাজবংশের সূচনা। শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক এই রাজা ১৫৭৮ থেকে ১৬১৭ সাল অবধি রাজত্ব করেছিলেন।সেসময় শ্রীরঙ্গপত্তনমের দূর্গটি ছিল তদানীন্তন বিজয়নগরের ভাইসরয় রাজা তিরুমালা বা থিরুমালার অধীনে। এই দূর্গটির উপর ভারি লোভ ছিল ওয়াদিয়র রাজপরিবারের। শুধু দূর্গ দখলের লোভই নয়, শোনা যায় রাজা থিরুমালার পরিবারে অসাধারণ কারুকাজ করা বেশ কিছু দামি গয়না ছিল। সেই গয়নার উপরও ছিল ওয়াদিয়র রাজার অনেকদিনের লোভ।
গয়না হাতানোর অন্য কোনও পথ খুঁজে না পেয়ে রাজা থিরুমালার বিরুদ্ধে শেষমেশ যুদ্ধ ঘোষণা করেন মহীশূর রাজ। মহীশূরের কাছেই কেসরর যুদ্ধে পরাজিত হন থিরুমালারাজ। তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে শ্ৰীরঙ্গপত্তনমের দুর্গটি দখল করে নেন ওয়াদিয়ররাজ।

থিরুমালার স্ত্রী অলমেলাম্মা ছিলেন শ্রীরঙ্গনায়কি দেবীর একান্ত ভক্ত। এই রঙ্গনায়কি দেবী ছিলেন বিখ্যাত আদি-রঙ্গা মন্দিরের দেবতা শ্ৰীরঙ্গনাথের স্ত্রী বা সহচরী। তামিলভাষায় তাঁকে ‘থাইয়ার’ বা ‘পবিত্ৰ মাতা’ বলেও উল্লেখ করা হয। লক্ষ্মীরই আরেক রূপ এই দেবী ‘রঙ্গনায়কি’র একনিষ্ঠ সেবিকা ছিলেন রানি অলমেলাম্মা।

স্বামীর মৃত্যুর কারণ অনুমান করে ওয়াদিয়র রাজার মূল উদ্দেশ্য বুঝতে খুব বেশি দেরি হয়নি বিধবা রানির। অলমেলাম্মা তাঁর নিজের এবং রাজপরিবারের সমস্ত মূল্যবান অলঙ্কার নিয়ে এলেন তাঁর আরাধ্যা দেবীর চরণে। দেবীকেই সমর্পণ করলেন সেইসব মহামূল্য গয়নাগাটি। আর দেবীর পাহারার ভার তুলে নিলেন নিজের কাঁধে৷ এ ব্যাপারে অন্য কাউকে যে বিশ্বাস করা যাবে না, তা বুঝেছিলেন রানি অলমেলাম্মা।

এদিকে সেই দৈবী গয়নার লোভে তখন পাগল হয়ে গেছেন ওয়াদিয়র রাজ। যে করেই হোক সে গয়না চাই তাঁর। অনুরোধ, উপরোধ, ভয় দেখানো, অপমান করা- সবরকম পথেই তিনি বশ করতে চাইলেন থিরুমালার বিধবা রানিকে। কিন্তু জেদি একরোখা রানি একরকম ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন ওয়াদিয়র রাজার অন্যায় দাবি।

আরও পড়ুন: বিষ্ণুপ্রিয়া চরিত্রে সুচিত্রাকে লাগাতার ‘হা কৃষ্ণ’ বলার অভ্যাস করিয়েছিলেন কে?

রানির ব্যবহারে ভয়ানক রেগে গেলেন ওয়াদিয়ররাজ। মহীশূরেই বন্দি করলেন রানিকে। ঠিক করলেন দরকার পড়লে জোর করে ছিনিয়ে নেবেন সেই গয়না। তাঁর আদেশ পালন করার জন্য লোকও পাঠালেন। অলমেলাম্মাও অত সহজে হেরে যাওয়ার পাত্রী নন। মাইশোরে বন্দিদশাতেই এক অন্ধকার রাতে, তাঁর কাপড়ের মধ্যে সেই সমস্ত গয়না বেঁধে পালিয়ে যান বিধবা রাজরানি অলমেলাম্মা। কাবেরী নদীর তীরে কর্ণাটকের তালাকাডে গিয়ে তিনি আশ্রয় নেন।

খবর পেয়ে ওয়াদিয়রদের সৈন্যরা তালাকাড পর্যন্ত ধাওয়া করে রাজরানি অলমেলাম্মাকে।

সেই সময়ে ধরা পড়ার ভয়ে কাবেরীর প্রচণ্ড ঘূর্ণিজলে ঝাঁপ দেন অলমেলাম্মা। আর মৃত্যুকালে উচ্চারণ করেন এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ-

“তালিকাডু মারালাগলি মালাঙ্গি মাদুভাগালি মাইসুরু ধরেগালিগে মাক্কালাগাড়ে হোগালি!”

কন্নড় ভাষায় বলা ওই অভিশাপের বাংলা করলে দাঁড়ায়- ‘তালাকাড মরুভূমিতে পরিণত হবে, কাবেরীর জলের ঘূর্ণি আসবে মালাঙ্গিতে আর মাইসোরের ওয়াদিয়রদের বংশে কখনও উত্তরসূরি জন্ম নেবে না।’

আরও পড়ুন: শরৎচন্দ্র দু’বার বিয়ে করেছিলেন কেন, কেনই বা অভিমানে গেরুয়া পোশাকে সংসার ছেড়েছিলেন

আশ্চর্য এই অভিশাপ! মৃত্যুকালে বিধবার দীর্ঘনিঃশ্বাস মিশে আছে তার প্রতিটি শব্দে। অমোঘ সেই উচ্চারণ, তাকে টলায় কার সাধ্য! তালাকাড়ে কাবেরীর তীরবর্তী অংশ বালিতে ঢেকে রয়েছে আজ কত শত বছর। গত কয়েক শতাব্দী ধরেই এই তালকাড়ুর বালি খুঁড়ে উদ্ধার হয়েছে একাধিক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। একসময় এখানে নাকি ৩০টির বেশি মন্দির ছিল, যার অধিকাংশই চলে গিয়েছিল বালির তলায়। সেই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই নাকি মালাঙ্গির কাছে কাবেরী নদীর জলাবর্ত এক ভয়াল রূপ ধারণ করে এবং গ্রামটির বেশ কিছু অংশ জলের তলায় চলে যায়। আর মহীশূরের রাজবংশে প্রতিটি অল্টারনেট জেনারেশন অর্থাৎ পৰ্যায়ক্রমিক প্রজন্মে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিয়েই চলেছে, এই ৪০০ বছরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।শোনা যায় রানির এই অভিশাপের কথা শুনে ওয়াদিয়র রাজ অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসেন রাজবাড়িতে। মহীশূর প্যালেসের মধ্যেই স্থাপিত হয় অলমেলাম্মার সোনার এক মূর্তি। সে মূর্তি নাকি এখনও প্যালেসে পুজো পায় রোজ। এই অলমেলাম্মা মন্দিরের দায়িত্বভার রয়েছে রাজা থিরুমালা পরিবারের আইনি উত্তরাধিকারদের হাতেই। মহীশূর প্যালেস ফোর্টেই থাকেন তাঁরা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে রানির অভিশাপ রেয়াত করেনি নিজের বংশকেও। একই অভিশাপে অভিশপ্ত তাঁরাও। সন্তানহীনতার অভিশাপ ঐ রাজপরিবারের পুরোহিত আর কেয়ারটেকারদেরও ছাড়েনি। বিধবার শেষ সম্বল, তাঁর ভক্তি, আর চোখের জলে মেশা এই ভয়ঙ্কর অভিশাপ আজও ধ্বনিত হয় রাজবাড়ির আনাচে-কানাচে।

 

 

You might also like