Latest News

ভানু জহরের সঙ্গে পর্দা মাতিয়েছিলেন, স্বর্ণযুগের এই কমেডিয়ানকে মনে রেখেছি কি

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ভানু-জহর-অজিত। কমেডিয়ান ত্রয়ী বাংলা ছায়াছবির অমর তিন নাম। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে উত্তম-সুচিত্রা জুটির চেয়েও বেশি জনপ্রিয় হয়ে আছে ভানু-জহর-অজিত ত্রয়ীর কমেডি। সেই ছেলেদের মেসবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে অজিত-জহর-ভানুর উল্টোদিকের বারান্দায় সুচিত্রা সেনকে অবাক নয়নে দেখার দৃশ্য আজও বাঙালির প্রেমের ফ্যান্টাসি, যাকে আজকাল বলা হয় ‘ঝাড়ি মারা’। এই কীর্তির আদি বিদ্যাপীঠ তো ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর সেই মেসবাড়িই।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও জহর রায় পরের দিকে যত সুযোগ পেয়েছেন সে তুলনায় অজিত চ্যাটার্জী তত ছবি পাননি। পেলেও সেসব রোলে তাঁর করার মতো খুব কিছু ছিল না। ভানু-জহরের নাম দিয়ে ছবি হয়েছে ‘ভানু পেল লটারি’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’। আবার কমেডির বাইরেও ভানু ব্যানার্জী ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে’, জহর রায় ‘ঘুম ভাঙার গান’-এর মতো দু-একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি পেয়েছেন, যে ছবিগুলিতে ওঁরাই মুখ্যভূমিকায় এবং সিরিয়াস চরিত্রে। তুলসী চক্রবর্তীও সত্যজিৎ রায়কে পেয়ে ‘পরশ পাথর’ করতে পেরেছেন। কিন্তু অজিত চ্যাটার্জী একেবারেই সব জুনিয়র আর্টিস্ট গোছের রোল করে গেছেন। অজিত চ্যাটার্জীর নিজের একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নেই, যা সত্যি দুঃখের। অথচ ভানু, জহরের চেয়েও কিছু ক্ষেত্রে অজিত চ্যাটার্জীর কমেডি টাইমিং ছিল বেশি নিপুণ। কিন্তু ওঁর প্রাপ্য মর্যাদা উনি পাননি। অজিত চ্যাটার্জীর ফেসভ্যালুও তৈরি হয়নি প্রচার-বিজ্ঞাপনে।

অথচ অজিত চ্যাটার্জী প্রথম যৌবনে ব্যায়ামবীর ও বক্সার ছিলেন। ভানু-জহরকে ফিল্মে আসতে তিনি অনেক সাহায্যও করেছিলেন। আবার অজিত চ্যাটার্জী ছিলেন হেমন্ত মুখার্জীর কাছের বন্ধু। তেমনি এই সব বন্ধুরা মিলেই চালু করেছিলেন ‘বসুশ্রী’র মন্টু বসুর উদ্যোগে ‘বসুশ্রীর জলসা’। এছাড়াও হাজরার বসুশ্রী সিনেমা হলে তখন বসত শিল্পীদের আড্ডার আসর। সেখানে হেমন্ত, উত্তম, শ্যামল সবার আড্ডাচক্র চলত। বহু সুপারহিট ছবির চিত্রনাট্য ও গানের কথা সুর এই বসুশ্রীর আড্ডায় তৈরি হয়েছে। যেমন সুনীল ব্যানার্জী পরিচালিত ছবি ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এই বসুশ্রীর আড্ডার একজন প্রধান। কিন্তু প্রথম এই বসুশ্রীতে ভানুকে নিয়ে গেছিলেন যিনি, তিনি অজিত চ্যাটার্জী।

অজিত চ্যাটার্জীর প্রথম ছবি ছিল ‘বামন অবতার’। তাঁর আরও উল্লেখযোগ্য ছবি হল, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘চিরকুমার সভা’, ‘মন্ত্রশক্তি’, ‘মনের ময়ূর’, ‘ছেলে কার’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘হাসি শুধু হাসি নয়’, ‘পুষ্পধনু’, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ প্রভৃতি।

কোনও কোনও অভিনেতার অভিনয়সত্ত্বা ছোট থেকেই তাঁর ভিতরে সুপ্ত থাকে। অজিত চ্যাটার্জী তেমনই একজন। তিনি ছোটবেলা থেকেই যে কাউকে নকল করতে অর্থাৎ ক্যারিকেচার করতে খুব ভাল পারতেন। সে অন্যের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ নকল করা হোক বা অন্যের কণ্ঠ অবিকল নিজের গলায় প্রকাশ করা। আর টাইমিং ব্যাপারটাও যেন ওঁর ভিতরে ছিল সহজাত।

অজিত চ্যাটার্জীর কৈশোরের একটি গল্পই বুঝিয়ে দেয়, উনি কতটা প্রতিভাধর আবার দুষ্টুও ছিলেন। তখন অজিত চ্যাটার্জী কিশোর। তাঁদের বাড়িতে একটা বিয়ের নেমতন্ন এসেছে পড়শিবাড়ি থেকে। অজিতের মা স্বামীকে অর্থাত অজিতের বাবাকে বললেন, সন্ধ্যেবেলা তো বিয়েবাড়ি যেতে হবে অমুক বাড়িতে, এখনও তো উপহার কেনা হয়নি। তিনি স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বললেন, তিনি আপিস-ফেরতা বিয়েতে উপহার দেওয়ার জন্য শাড়ি কিনে ফিরবেন। বেশ ভাল কথা, সেইমতো অজিতের বাবা আপিসে রওনা দিলেন।

এর পর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে সাতটা বেজে গেছে, অজিত চ্যাটার্জীর বাবার দেখা নেই। তাঁর মা ঘরবার করছেন। বিয়ের নেমন্তন্ন যদিও পাড়ার মধ্যেই, তবু এত দেরি হয়ে গেল, উনি কখন ফিরবেন তার পর সেজেগুজে বেরোনো! মা চিন্তা করছেন দেখে ইতিমধ্যে অজিত নিজে একটা প্ল্যান ভেবে ফেলল।

অজিত চলে গেল বাবার ঘরে। ঘর অন্ধকার করে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। তখন মাঘ মাস, তাই শীতটাও জমিয়ে পড়েছে। মা বাইরে থেকে দেখছেন ঘরে কে যেন শুয়ে আছে। তিনি ভাবলেন তাঁর স্বামী নিশ্চয়ই ফিরে এসছেন। যাচাই করে দেখতে হাতের কাজ সারতে সারতে দালান থেকে বললেন ‘কী গো তুমি ফিরলে কখন? আমি চিন্তা করছি। শাড়ি কিনে এনেছো?’

তখন লেপের ভিতর থেকে অজিত চ্যাটার্জী অবিকল তাঁর বাবার কন্ঠ নকল করে বলে উঠলেন ‘হ্যাঁ ফিরে এসেছি তবে শাড়িটা কেনা হয়নি। বিয়ে বাড়ি যাওয়ার আগে কিনে নেব।’


মা বললেন ‘এখনও শাড়ি না কিনলে নেমতন্ন বাড়ি যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে তো!’

অজিত চ্যাটার্জী পিতৃকণ্ঠ নকল করে বললেন ‘না না দেরি হবে না। তুমি তৈরি হতে থাকো। আমি ঠিক কিনে নেব যাওয়ার আগে।’

তাঁর মা ভেবে বসলেন গলা শুনে, সত্যিই তাঁর স্বামী ফিরে এসেছেন এবং আশ্বস্ত হয়ে সাজগোজ করতে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর মা জানলা দিয়ে দেখেন, অজিতের বাবা একটা শাড়ির বাক্স হাতে নিয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে বাড়ির দিকে আসছেন। মা ভাবলেন তাহলে ঘরে কে ছিল! তখন তড়িঘড়ি  মা সেই ঘরে গিয়ে দেখেন, তখনও কে একজন লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে!

বাবা শাড়ি হাতে বাড়ি ঢুকতেই মা বললেন ‘তুমি এখন বাড়ি ফিরলে?’ বাবা বললেন ‘হ্যাঁ তো, একটু দেরি হল একেবারে শাড়ি কিনে ফিরলুম। কেন?’ মা বললেন, ‘তাহলে ঘরে কে শুয়ে যে তোমার মতোই বললে, শাড়ি কিনতে বেরোবে! তাজ্জব ব্যাপার!’ বাবা বললেন, ‘কে আবার! নিশ্চয়ই তোমার গুণধর পুত্র!’

বাবা-মার কথোপকথন শুনে ততক্ষণে লেপ ছেড়ে পালানোর চেষ্টায় কিশোর অজিত চ্যাটার্জী। কিন্তু শেষমেষ বাবার হাতে ধরা পড়লেন। সেদিন বিয়ে বাড়ি থাকার সুযোগে বাবার গলা নকলের অপরাধে উত্তম-মধ্যম থেকে বেঁচে গেছিলেন অজিত চ্যাটার্জী।

এই গল্পটা ছিল যেন তাঁর স্বর্ণযুগের অভিনেতা কমেডিয়ান হবার সুপ্ত প্রতিভা। কিন্তু তাঁর যে প্রতিভা ছিল, সেইমতো যোগ্য রোল তিনি পাননি। দেবকী বোসের ‘চিরকুমার সভা’, নির্মল দে-র ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ বা ভানু-জহরের সঙ্গে দল বেঁধে কিছু ছবি ও রেডিও নাটকে অজিত চ্যাটার্জী ভাল সুযোগ পেয়েছিলেন।


তার পর সত্যজিৎ রায়, তরুণ মজুমদার-সহ বহু নামী পরিচালকের ছবিতে কাজ করেও মনে রাখার মতো একটি চরিত্রও তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। চরিত্রাভিনেতা অনেকেই হন কিন্তু চরিত্র কথা বলে, রয়ে যান দর্শক মনে। সেরকম সুযোগ অজিত চ্যাটার্জী পেলেন না, কমেডি লেজেন্ড হয়েও তিনি আজ বিস্মৃত।

You might also like