Latest News

Shakuntala devi: ‘মানব কম্পিউটার’ শকুন্তলা দেবী: বাঙালি বাড়ির বউ অঙ্ক কষতেন মুখে মুখে

চৈতালী চক্রবর্তী

সার্কাসের তাঁবুতে বাবার পাশে বসে মনোযোগ দিয়ে তাসের খেলা শিখছে বছর পাঁচেকের ফুটফুটে মেয়েটা (Shakuntala devi)। বাবা সার্কাসের নাম করা খেলোয়াড়। শরীরী কসরত তো বটেই, তাসের ম্যাজিকে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তুখোড় বুদ্ধি মেয়েরও। একবার দেখেই খেলা শিখে নেয়। তাসের সব ক’টা ম্যাজিকই আয়ত্তে চলে এসেছে। এখন বাবার কাছে নম্বরের ভেল্কি শিখছে সে। মুখে মুখেই যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ (Maths) ঝটাপট করে ফেলতে পারে পাঁচ বছর বয়সেই। আঙুল গোনা তার ধাতে নেই। বাবা আদর করে ডাকেন ‘ক্যালকুলেটর (Human Calculator)।’ শৈশবে বাবার দেওয়া সেই নামই পরবর্তী কালে একবাক্যে মেনে নেয় গোটা বিশ্ব। শকুন্তলা দেবী। বিশ্বে যাঁর পরিচিতি হিউম্যান-ক্যালকুলেটার’ (Shakuntala devi) নামে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড তাঁকে নতুন নাম দিয়েছে, ‘মানব-কম্পিউটার (Human Computer)।’

শকুন্তলা দেবী আজ আর নেই। দেশের গর্ব নারী-শক্তির অনন্য প্রতীক শকুন্তলা দেবীর (Shakuntala devi) মৃত্যু হয়েছে ২০১৩ সালে। আজও তাঁর জন্মদিন ৪ নভেম্বরকে বিশেষ সম্মান দেয় গুগল ডুডল। সম্প্রতি তাঁর জীবনী নিয়েই সিনেমা বানিয়েছেন চিত্রপরিচালক অনু মেনন। নাম চরিত্রে বিদ্যা বালন। বিদ্যা বলেছিলেন, এমন এক জন নারীর চরিত্রে অভিনয় করার জন্য রীতিমতো প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে তাঁকে, শিখতে হয়েছে অঙ্ক।

Shakuntala devi

সার্কাসের তাঁবুতেই কাটে কিশোরী-বেলা (Shakuntala devi), গোঁড়ামির বাঁধন ভাঙতে শিখিয়েছিলেন বাবা

১৯২৯ সালে বেঙ্গালুরুর গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। বাবা ছিলেন ধর্মের আস্ফালনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এক বিপ্লবী। প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল পরিবারের অন্দরেই। সম্পন্ন ঘরের মায়া ছেড়ে সার্কাসের তাঁবুতে ঘুরে বেড়ানোতেই ছিল তাঁর আনন্দ। পারিবারিক ব্যবসায় যোগ না দিয়ে নাম কুড়িয়ে ছিলেন ম্যাজিসিয়ান হিসেবে। সংসার পাতেন সেই সার্কাসের টেন্টেই। মেয়েও ছোট থেকেই বাবার চিন্তাধারায় প্রভাবিত। অভাব থাকলেও, মুখে তার প্রকাশ নেই। শেখার তাগিদ অদম্য। অঙ্কের নম্বর চেনা শুরু বাবার কাছেই।

আরও পড়ুন: Solar Sahelis: অন্ধকার থেকে আলোর অভিযান! রাজস্থানের ঘরে ঘরে সূর্যের আলো পৌঁছে দিচ্ছেন সৌর-বান্ধবীরা

শকুন্তলা দেবী জানিয়েছিলেন, তাঁর বাবা যখন তাসের ম্যাজিক দেখাতেন, প্রতিটা তাসের নম্বর তাঁর মুখস্থ হয়ে যেত। একটা সময় বাবা আবিষ্কার করেছিলেন, মেয়েকে তাসের খেলায় হারানো দুষ্কর। একরত্তি মেয়ে স্মরণ ক্ষমতায় টেক্কা দিয়েছে তার বাবাকেও। পাঁচ বছরের মেয়ের ব্যতিক্রমী মেধার কথা চাপা থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে গোটা বেঙ্গালুরুতে।

Shakuntala devi


মহীশূর ইউনিভার্সিটিতে ১৮ বছরের ছাত্রের অঙ্ক কষে দেন ছ’বছরের শকুন্তলা (Shakuntala devi)

শকুন্তলা তখন ছয়। স্কুলে-কলেজে মেয়েকে নিয়েই তাসের খেলা দেখিয়ে বেড়ান বাবা। সার্কাসের জীবন থেকে মেয়েকে দূরে রাখতে হবে। মহীশূর ইউনিভার্সিটিতে ছ’বছরের মেয়ের তাসের ম্যাজিক দেখে মুগ্ধ হলেন অধ্যাপক-অধ্যাপিকারা।

মেয়ের মন তখন বোর্ডে লিখে রাখা জটিল অঙ্কের প্রশ্নের দিকে। গুটিগুটি পায়ে হেঁটে চক নিয়ে পুরো অঙ্কটা নির্ভুল ভাবে কষে দেয় সে। থতমত খেয়ে যান অধ্যাপক থেকে ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরাও। জটিল এই সমস্যার সমাধান এই পুঁচকে মেয়ে করল কী ভাবে? বাবার মুখে গর্বের হাসি। মেয়ের কিন্তু হেলদোল নেই। ম্যাজিক দেখিয়ে সে বাবার হাত ধরে হাঁটা দিয়েছে আন্নামালাই ইউনিভার্সিটির দিকে। সেখানেও একই অবাক কাণ্ড। গড়গড়িয়ে মুখে মুখেই অঙ্ক কষে দিচ্ছে মেয়ে। ধীরে ধীরে ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটি, হায়দরাবাদ ও বিশাখাপত্তনমের একাধিক কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়তে একই ভাবে নিজের কেরামতি দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেয় একরত্তি শকুন্তলা।

বাবার হাত ধরে লন্ডনে, শকুন্তলা (Shakuntala devi) তখন ১৫, আন্তর্জাতিক স্তরে মিলল খ্যাতি

প্রথাগত স্কুলের শিক্ষা শকুন্তলা দেবীর হয়নি। নিজের শিক্ষক নিজেই ছিলেন তিনি। পাশে পেয়েছিলেন বাবাকে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় মেয়েকে নিয়ে ‘রোড শো’ করেছিলেন বাবা। পয়সা রোজগারের জন্য নয়, শকুন্তলার প্রতিভাকে পরিচিতি দিতে। ঠোক্কর খেয়েছিলেন বিস্তর, অবিশ্বাস করেছিলেন অনেকেই। বেঁচে থাকার লড়াইটা তখনই শিখে নিয়েছিলেন কিশোরী শকুন্তলা। ১৯৪৪ সাল। বাবার হাত ধরে দেশের বাইরে পা রাখলেন শকুন্তলা। প্রথম ট্রিপ লন্ডনে। একটা ক্যুইজ কনটেস্টে বাকিদের হারিয়ে পুরস্কার জিতে নিলেন শকুন্তলা। বাড়ল আত্মবিশ্বাস। শুরু হলো বিশ্বের নানা দেশে ভ্রমণ।

Shakuntala devi

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, জাপান, শ্রীলঙ্কা, ইতালি, কানাডা, রাশিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, মরিশাস, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার বিভিন্ন স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে নিজের স্কিল দেখিয়ে দিলেন শকুন্তলা। অবাক হলেন নামী দামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-গবেষকরা। ১৯৫৫ সালে বিবিসি-র শো-য়ে শকুন্তলার মুখোমুখি হলেন সঞ্চালক লেসলি মিশেল। খুঁজে খুঁজে সবচেয়ে শক্ত অঙ্কের হিসাব নিয়ে এসেছেন তিনি। শকুন্তলাকে ভুল প্রমাণ করতেই হবে। শুরু হলো ঠাণ্ডা যুদ্ধ।

১৯৫১ সাল, শকুন্তলা দেবী তখন ইউরোপে:

শকুন্তলা ততদিনে অনেক সাবলম্বী। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, গ্রামের সেই লাজুক মেয়েটি আর নেই। মিশেলের প্রশ্নের উত্তর কয়েক সেকেন্ডে দিয়ে দিলেন শকুন্তলা। কিন্তু মিশেল নাছোড়। বললেন, ভুল উত্তর। পরে ক্যালকুলেটর ও কম্পিউটারে সেই হিসেব ফেলে দেখা গেল, শকুন্তলার উত্তরই সঠিক। ক্যালকুলেটর এই হিসেব কষতে সময় নিয়েছিল তিন মিনিট। শকুন্তলা নিয়েছিলেন কয়েক সেকেন্ড। মাথা নোয়ালেন বিবিসি-র সঞ্চালক। শকুন্তলার নাম হলো ‘হিউম্যান-ক্যালকুলেটার।’

১৯৭৭ সাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে ‘সাদার্ন মেথোডিস্ট ইউনিভার্সিটি’তে ডাক পড়ল শকুন্তলার। ততদিনে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছে গোটা মার্কিন মুলুকে। ২০১ ডিজিটের নম্বরের ২৩তম রুট করতে বলা হলো তাঁকে। শকুন্তলা কষে দিলেন ৫০ সেকেন্ডে। তাজ্জব হলেন অধ্যাপক। কারণ প্রবলেমটা বোর্ডে লিখতে তাঁর সময় লেগেছিল ৪ মিনিট। কম্পিউটার সেটা সলভ করেছিল ১-২ মিনিটে।

Shakuntala devi

বিশ্ব রেকর্ড করলেন শকুন্তলা দেবী, নাম হলো ‘মানব কম্পিউটার’

১৯৮০ সালের, ১৮ জুন। শকুন্তলা দেবীর অঙ্কের-ম্যাজিক দেখতে ইম্পেরিয়াল কলেজ অব লন্ডনের ক্লাস ঘরে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। অধ্যাপক বোর্ডে দু’টো সংখ্যা লিখে দিলেন। দুটোই ১৩ নম্বরের সংখ্যা। গুন করতে হবে। ৭,৬৮৬,৩৬৯,৭৭৪,৮৭০*২,৪৬৫,০৯৯,৭৪৫,৭৭৯। শকুন্তলা দেবী সময় নিলেন ২৮ সেকেন্ড। কোনও কম্পিউটারের সাহায্য নয়। স্রেফ মুখে মুখেই অঙ্ক কষে উত্তর দিলেন ১৮,৯৪৭,৬৬৮,১৭৭,৯৯৫,৪২৬,৪৬২,৭৭৩,৭৩০ (Human Calculator)। হাততালি দিয়ে উঠলেন ক্লাসে উপস্থিত পড়ুয়া, অধ্যাপক-অধ্যাপিকারা। ‘দ্য বুলেটিন’ দৈনিকে ছবি দিয়ে ফলাও করে বার হলো শকুন্তলা দেবীর ব্যতিক্রমী প্রতিভার কথা।

এর পরেও চমক দিয়েছেন বহুবার। ১৯৮২ সালে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম উঠল অঙ্কের-জাদুকর শকুন্তলী দেবীর। বিশ্বে পরিচিতি হলো ‘মানব-কম্পিউটার’ (Human Computer) নামে।

Shakuntala devi

কী রয়েছে এই মেয়ের মগজে? শকুন্তলা দেবীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির সাইকোলজির অধ্যাপক আর্থার জেসন। নানা রকম জটিল অঙ্কের সমস্যা দিয়ে তিনি নিশ্চিত হন, এই মেয়ের ব্রেন কাজ করে অসামান্য ক্ষিপ্রতায়। ১৯৯০ সালে ‘ইনটেলিজেন্স’ জার্নালে তিনি লেখেন,  ৬১,৬২৯,৮৭৫ এর ৩ বর্গমূল এবং ১৭০,৮৫৯,৩৭৫ এর ৭ বর্গমূল করতে দেওয়া হয়েছিল শকুন্তলা দেবীকে। জেসন যতক্ষণ নোটবুকে সংখ্যাগুলো তুলেছিলেন, তার অনেক আগেই সঠিক উত্তর দিয়ে দিয়েছিলেন শকুন্তলা দেবী।

রাশিয়ান টিভি প্রোগ্রামের লাইভ শো-য়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন শকুন্তলা দেবী:

‘সমকাম অপরাধ নয়’ শকুন্তলা দেবী (Shakuntala Devi) লড়াই শুরু করেছিলেন ১৯৭৭ সালেই

কলকাতার আইএএস অফিসার পরিতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শকুন্তলা দেবীর। সেটা ১৯৬০ সালের মাঝামাঝি। বাঙালি পরিবারের বউ শকুন্তলা সব আদব কায়দাই রপ্ত করেছিলেন। জীবনও চলছিল চেনা ছন্দেই। তাল কাটে কয়েক বছর পরে। শকুন্তলা বুঝতে পারেন, তাঁর স্বামী আদতে সমকামী। ১৯৬৫-৭০ সালে সমকামিতা তখন আইনের চোখেই নয়, সমাজের চোখেও ‘প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপরাধ।’ যৌন পছন্দকে তাঁর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেয়নি দেশ। সমকামিতাকে মানসিক অসুস্থতা বলেই দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এগিয়ে এলেন শকুন্তলা দেবী। সংসার ভাঙল ঠিকই, তবে আদর্শ মচকাল না। সমকামিতার লড়াইয়ে স্বামীর পাশেই দাঁড়ালেন। শুরু হলো এক অন্য পথ চলা।

Shakuntala devi with husband

সমকামী, উভকামী, রূপান্তরকামীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলেন শকুন্তলা দেবী। তাঁদের মানসিকতা নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করেন তিনি। এই গবেষণার ফসল হলো তাঁর প্রথম বই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব হোমোসেক্সুয়ালস।’ সমকামিতা যে অপরাধ নয়, সমকামীদের যাপন-পদ্ধতি শুধু আলাদা, এই বইয়ের প্রতি পাতায় সেটাই বুঝিয়েছিলেন শকুন্তলা দেবী। পরবর্তী কালে আন্তর্জাতিক মহলেও স্বীকৃতি পায় এই বই। বলা হয়, এলজিবিটি কমিউনিটির উপর এত বিস্তারিত তথ্য আগে কেউ লেখেননি।

অঙ্কের-জাদুকর শকুন্তলা দেবীর জীবন খুব একটা বাঁধাধরা গতে ছিল না। অঙ্কের হিসাব (Human Computer) চটজলদি মেলাতে পারলেও, জীবনের হিসেবে তিনি নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়েছেন। পরিস্থিতি তাঁকে করে তুলেছিল বজ্র-কঠিন, মানবিকতার আদর্শ রূপ। দারিদ্র শিখিয়েছিল কী ভাবে লড়াই করতে হয়। দুর্যোগের মেঘ গাঢ় হলেও, জীবনের উপর আস্থা হারাতে নেই। আর এখানেই তাঁর সাফল্য, বিশ্ব-জোড়া খ্যাতি।

You might also like