Latest News

আজ স্নানের দিন

 অদিতি বসুরায়

Image - আজ স্নানের দিন

(৭)

-ডাকছিলেন বাবা?

-হ্যাঁ। বসো। তোমার মায়ের মুখে শুনলাম, একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছ।

আমি চুপ করে ভাবছি, কী বলা যায়। জানেন যখন সবই!

-মেয়েটি শুনলাম, পিতৃ-মাতৃহীণ?

আবার জিজ্ঞেস করলেন (Bengali Novel)।

-ঠিকই শুনেছেন। ইরার বাবা-মা নেই। পিসির কাছে মানুষ হয়েছে।

-তা লেখাপড়া কদ্দূর?

-বাংলায় অনার্স।

-বাহ । মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে মেয়ের পিসিমাকে ডাকো একদিন বাড়িতে। কথা বলে, ভালো  দিন ঠিক করা যাবে।

-সে সবের প্রয়োজন নেই বাবা। আমরা রেজিস্ট্রি করবো ঠিক করেছি। আর …

-আর?

– ওর আগের বিয়ের একটি বাচ্চা আছে। তার বয়েস বছর পাঁচেক। সে খুব একটা কমফর্টেবল ফিল করবে না সানাই বাজিয়ে বিয়ে করলে।

বাচ্চার কথা জেনে, বাবা কয়েক মুহুর্ত চুপ করে থেকে, মায়ের দিকে ঘুরলেন

  • তুমি এ কথা জানতে?

মা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ালে, বাবা চুপ । আবার মিনিট খানেক পর, মুখ খুললেন। এবার আমার দিকে নজর ।

  • বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়া কিন্তু বিয়ের থেকে অনেক কঠিন। এইকথাটা জানো নিশ্চয়? যদি না জেনে থাকো, তবে জেনে রাখো। আর এও মনে রেখো, নিজের সন্তানকে মানুষ এমনিই ভালবাসে ।তাতে আলাদা কোনও মহত্ব নেই। কিন্তু অন্যের সন্তান আপন করে নিতে সবাই পারে না। তার জন্যে মনকে অন্যরকম করে তৈরি রাখতে হয়। আশা করি, তুমি তা পারবে।

আমি মাথা নীচু করে সম্মতি জানানো ছাড়া আর কি-ই বা বলতে পারতাম ওই অবস্থায়। খানিক বাদে, তাকিয়ে দেখি,বাবা হাসছেন মায়ের দিকে ফিরে।

ব্যস! এখানেই লাখকথার এক কথায় বিয়ে স্থির হয়ে গেল। গোলমাল বাঁধল পরে। বাবা যখন রণোর জন্মদাতা বাবার পরিচয় জানতে পারলেন।

  • কি হল? এসো। চা জল হয়ে গেল তো।

ইরা চা বানিয়ে ডাকছে। রণোকে নিয়ে আমরা খুব চিন্তায় আছি এই কদিন। গোড়া থেকেই রণোর সঙ্গে আমার একটা সুন্দর বোঝাপড়া আছে। আমাদের বিয়ের আগে থেকেই ও আমার সঙ্গে ঘুরতে যেত। কথা বলত। আবদার করত। বিয়ের পর, ওর ছোট্ট বালিশটা নিয়ে এসে মুখে আঙুল পুরে, টুক করে শুয়ে পড়ত আমার আর ইরার মাঝখানটিতে। ইরা একটু অস্বস্তিতে ভুগত। আমার কিন্তু ভারি ভাল লাগত। – কেমন মিষ্টি শিশু গন্ধ – আহা! এ জিনিস, তার আগে আমি পাইনি। ছোট্ট রণো, আমি কাজ থেকে ফিরতেই ছুট্টে আসত, কোলে উঠবে বলে। আমারই ছেড়ে রাখা হাওয়াই চটি পায়ে দিয়ে ঘুরঘুর করত ঘরে।

-বাবাই, আমাকে নিয়ে যাবে তোমার সঙ্গে?

– কেন বাবা? তুমি তো বাড়িতে খেলা কর।

– বাড়ি ভাল না, বাবাই। তুমি ভাল।

আমি হাসতাম শুনে।

  •  বাড়ি ভাল না? সেকি কেন?
  • ওরা খেলতে পারে না কেউ, তোমার মত।
  • কি করে ওরা খেলবে বাবা? ওরা কি তোমার সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করতে পারে?

রণো জেদ করত না। অন্য কোনও একটা খেলনা বা কিছু নিয়ে  ব্যস্ত হয়ে যেত। সে-ই রণো। এখন সে বড়। সে যেভাবে জগতকে দেখে, আমার তার জন্য ওর প্রতি, শ্রদ্ধাহয়। খারাপও লাগে। এই দুনিয়া যে কত কঠিন আর শক্ত ঠাঁই – বোঝেনা এখনও।

ইরা সবসময়, মুখে কিছু বলেনা বটে কিন্তু মায়ের প্রাণ তো! এই ‘মুখেকিছুনাবলার’ জন্যে যে কত সমস্যা! কলেজে, ছাত্রীদের আমার কাছে নানা আবদার থাকে। সবটাই যে আকাডেমিক ইন্টারেস্ট তাও বলা যাবে না। কেউ কেউ আবার একটু বেশি উৎসাহী। অল্প বয়েসে ইরা, তাদের নিয়ে ভাবনায় পড়ত। মুখ গম্ভীর। কথা বলেনা।  জিজ্ঞেস করেই যাচ্ছি। সে কি ব্যাপার – ভাংছেনা কিছুতেই। শেষ পর্যন্ত চেপে ধরতে বলে, নিশা সেদিন তোমাকে পাঞ্জাবি দিয়ে গেল কেন? কেন রমা টোমা, মোমো বানালেই বাড়ি বয়ে এসে দিয়ে যায়? পাগল আর কাকে বলে!

কাল রাতে বলল, বেড়াতে যেতে চায় রণো। রণোর ইচ্ছে মানে ইরা তা পূরণ করেই ছাড়বে। এই সময় ছুটিপাওয়া বেশ সমস্যার।দেখাযাক কী হয়! তা ছাড়া বর্ষায় পাহাড়ে যাওয়া খুব রিস্কি। -ল্যান্ডস্লাইড হওয়ার চান্স থাকে। গাড়ি আটকে পড়ে। ধ্বস নামে। খুব মুস্কিল!  কিন্তু কে আমার বাড়ির এদের বোঝাবে?

আরও পড়ুন: আজ স্নানের দিন (পর্ব ৬)

ইরা এসে বসলো পাশের চেয়ারে। কাগজ দিয়ে গেল।

  • চা খেয়ে, বাজারে যাও- একবার! মাছ আনতে হবে।
  • কি মাছ আনবো?
  • দেখো কি মাছ পাও! মাছ তেমন পাওয়া যায় কোথায় এই বাজারে? কাটাপোনা আর কাতলা খেয়ে খেয়ে তো জিভে চড়া পড়ে গেল।
  • দেখি যদি ইলিশ ওঠে ।
  • ইলিশ কিন্তু এক কিলোর নীচে হলে, এনো না। খোকা ইলিশে বড্ড কাঁটা! ছেলেরা খেতে পারে না।
  • এখানে কি এক কিলোর ইলিশ উঠবে? দেখি যাই।

বাজারে যেতে যেতে মনে পড়ে গেল আবার বাবার কথা। বাবা  ইরার প্রথম স্বামী, ফারহান সিদ্দিকিকে খুব  ভাল করে চিনতেন। স্নেহও করতেন। সবাইকে বলতেন উনি ফারহানের মতো শিল্পী খুব কমই দেখেছেন। ওমন স্কেচ ও রঙের সেন্স – একসঙ্গে খুব কম সংখ্যক শিল্পীরই থাকে। ফারহানের মারা যাওয়ার দিনটিতে বাবা মনিপুরে ছিলেন না। চেষ্টা করেছিলেন ওকে একটা স্থায়ী কাজের বন্দোবস্ত করে দেওয়ারও। ফারহান খুব স্বল্পভাষী হওয়ার জন্য, ইরার কথা জানতেন না। তবে ফারহান যে ছেলের বাবা – এই তথ্য তাঁর জানা ছিল। ইরাবতীকে  বিয়ে করার কথা বাবা যখন জানতে পারেন তখনও তিনি জানতেন না ইরাবতী, ফারহানের স্ত্রী। যেদিন জানতে পারলেন, সেদিন বেশ খানিকক্ষণ নাকি ঝিম হয়ে বসেছিলেন। মা বলেছিলেন সেই বিকেলে বাবা ইস্কুল থেকে ফিরে এসে চা-ও  পান করেন নি। কিছুক্ষণ পরে, মা ঘরে আসতে জিজ্ঞেস করেন –

  • তুমি জানো ইরাবতী মিত্র আসলে কে?

মা উত্তর দেন – জানি তো। ও তো বাবুর সঙ্গে সেই প্রাইমারি ইস্কুল থেকে পড়েছে। পুবপাড়ার শর্মিলার দাদার মেয়ে।

  • কোন শর্মিলা?
  • শর্মিলা রায় গো!  তুমি চেনো ওদের। ওই যে গো,  রাণিবালা ইস্কুলের ইতিহাসের দিদিমণি। ওর এক ভাই ছিল। সেই ভাই আর ভাই বউ একইসঙ্গে দুর্ঘটনায় মারা যায়। তাদের একমাত্র মেয়ে এই ইরাবতী। পিসির কাছেই মানুষ। বড় দুঃখী মেয়ে।
  • এসব তো আমি জানতাম না।  আর যেটা আজ জানলাম,তা হল, ও ছিল আমাদের ফারহানের স্ত্রী।
  • ছবি আঁকতো যে, সে?
  • হ্যাঁ।
  • তা তুমি এতো চিন্তা করছো কেন? সে তো আর নেই।
  • নাহ! তবু কেমন অস্বস্তি হচ্ছে।
  • এতো ভেবো না। মেয়েটা খুব লক্ষ্মী। আমার তো খুব পছন্দ ওকে।
  • বড় বউ, তুমি যখন বলছ তাহলে  আমার আর কোন চিন্তা রইল না। রণোকে নিয়ে একটু ভাবনা হয়। হাজার হোক, রক্তটা তো আলাদা!

এই একটি ব্যাপারে আমার সংস্কারহীন বাবাও বেরতে পারেন নি। রক্ত- রক্ত কি করে আলাদা হতে পারে? বাবা বিশ্বাস করতেন পারে। এবং  আজীবন তিনি বিশ্বাস করে গেছেন, ধর্ম মানুষকে আলাদা করে দেয়। দিতে বাধ্য। এবং ট্রাজেডি এটাই যে বাবা এই মতকে গুরুত্ব দিয়ে মাথায় রাখতেন। মায়ের মতামতকে বরাবর অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন বাবা। কিন্তু ফুলডাঙ্গার জমির  ব্যাপারে  তিনি মায়ের কথা শোনেন নি। পরবর্তীকালে তাই নিয়ে বাবার আক্ষেপের অন্ত ছিল না।

 রণদীপ সিদ্দিকি (Bengali Novel)

“আমাদের উপমহাদেশের বাতাস, ধর্ম নামের বায়ুতে ভারি করে রেখেছেন রাজনীতিকরা। শুধু উপমহাদেশই বা বলি কেন? এই চমৎকার গ্রহের সর্বত্রই এখন যে  অভিশাপের বলি হচ্ছে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ, তার নাম সন্ত্রাসবাদ। এই সন্ত্রাসের মূল ভিত্তিই ধর্ম নামক আফিম। আদিমকাল থেকে হিউম্যান রেসকে দ্বিধাবিভক্ত করার জন্য চালাক শাসক-গোষ্টী ধর্মকে ব্যবহার করে এসেছেন। বুদ্ধিহীন বিপুল জনতা, মস্তিষ্কহীন। তারা বারেবারে এই চক্রান্তের জালে জড়িয়েছে – মরেছে – হিংসা করেছে- কেটেছে প্রতিবেশির গলা- রেফ্রিজারেটর খুলে মাংস খুঁজেছে- ধর্ষণ করেছে-হারিয়েছে পরিজন- সন্তানের মৃতদেহ নিয়ে মিছিলে সামিল হয়েছে, বোঝে নি আসলে তারা দাস। তাদের এই সমস্ত ব্যাবহারের রিমোট যাদের হাতে, তারা শাসক। তাদের গায়ে কোনকিছুতেই আঁচড়টুকুও পড়ে না। সাধারণ মানুষের এক্যকে, শাসক ভয় পায়। তাদের আলাদা করতেই তারা মসজিদ, মন্দির, গির্জে বানিয়েছে। ধর্মযাজককে দিয়েছে ‘মহামানবের’ তকমা। বুঝিয়ে ছেড়েছে, ঈশ্বর নামের অতীন্দ্রিয় বিষয়টি দেহ পায় শিব,আল্লা,যীশুর অবয়বে। ধীরে ধীরে এক পৃথিবী লোক আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। ভুলে গেছে জীবন-ধর্মের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। জিতে গেছে ক্ষমতার কূটনীতি। ধর্মকেই এখন মানুষ ভাবছে রক্ষাকবচ। আর গ্রহটি এগিয়ে চলেছে শেষের দিকে”। নিজের ভাবনা বলতে পারেনি সে কাউকে সেভাবে। এইসব লেখাগুলোই ছিল তার মনের কথা। মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো এই ডায়েরিটা তাকে মা দিয়েছিল জন্মদিনে। খুব ছোটবেলা থেকেই সে ডায়েরি লেখে। কিন্তু এখন সেসব কথা লিখে ফেলে ফেসবুকে। মানে এই কথাগুলো সে ফেসবুকে পোস্ট করে।  এবং তাতে ঝামেলা হয় খুব। সে ভাবতেও পারে নি এই পোস্ট ঘিরে পরিস্থিতি এমন উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে! অথচ কথাগুলো তো লেখা দরকার। বাকিদের ভাবানো দরকার ! সেই কাজ কাউকে না কাউকে তো শুরু করতেই হবে। এভাবে এই চমৎকার গ্রহটিকে শেষ হতে, দেখা যায় নাকি? সেদিন খুব গরম পরেছিল । তাপপ্রবাহ চলছে- জানাচ্ছিল টেলিভিশন আর খবরের কাগজ। ঘনঘন বুলেটিনে বলা হচ্ছিল জেলায়-জেলায় কতজন মারা গেছে সানস্ট্রোকে। তার সকাল থেকে আবার অস্থির লাগছিল খুব। রাগও হচ্ছিল। সকালে গুগল-এ গ্রাহাম স্টেইন-এর ঘটনাটা পড়তে পড়তে কিরকম অসহায় হয়ে পড়ছিল ধীরে ধীরে। পুরো নাম গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইন।  অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছিলেন দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে। ওডিশার কেন্ডুঝড় গ্রামে ঘুমাচ্ছিলেন শীতের রাতে। ছেলেদের নিয়ে। তখনই বজরং দলের নেতা, দলবল নিয়ে এসে তাঁর স্টেশন ওয়াগানের আগুন লাগিয়ে দেয়। জীবন্ত জ্বলে, মারা যান তাঁরা। ঘটনাটা যখন ঘটে সে অনেকটাই ছোট! কিন্তু নিয়মিত খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাসের সুবাদে সে নিজে নিজেই সেই সময় পড়েছিল এই সংবাদ। তার শিশুমনে এই ঘটনার তীব্র অভিঘাত তৈরি হয় তখনই। মাঝে মাঝে, তার ভাবতে ইচ্ছে যায়, কতখানি রাগ হলে, একজন মানুষ আর একজনকে এরমভাবে পুড়িয়ে মারতে পারে!

You might also like