Latest News

রূপকথার মতো, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে মায়ের টানে দেশে ফিরেছিল এই ছেলে

শাশ্বতী সান্যাল

১২ই ফেব্রুয়ারি ২০১২, মধ্যপ্রদেশ। পিচ রাস্তা চিরে দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে একটা গাড়ি। অসময়ের বৃষ্টিতে ঝাপসা কাচ। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই বছর ত্রিশের একজোড়া চোখ তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলেছে চারপাশ। খুঁজছে তার হারিয়ে যাওয়া ছোটবেলা, হারিয়ে যাওয়া পথঘাট, বাড়ি। মাঝখানে কেটে গেছে দীর্ঘ ২৫ বছর। আমূল বদলে গেছে চারপাশ। স্মৃতি খুঁড়েও ছেলেবেলার চেনা ছবির সঙ্গে মিলছে না আজকের বাস্তব। একেবারে অচেনা, পাল্টে যাওয়া এক শহরে ভরসা বলতে শুধু গুগল ম্যাপ।

আরও বেশ খানিকটা যাওয়ার পর গাড়ি এক জায়গায় থামল। বাধ্য হয়েই থামল। ম্যাপ বলছে গন্তব্য থেকে এখন দূরত্ব মাত্র ৫০০ মিটার। ম্যাপে রাস্তার নাম দেখাচ্ছে গানেশতালা। কিন্তু একে কি রাস্তা বলা চলে? একটা পায়ে চলা পথ, তাও ক্রমশ সরু হয়ে মিলিয়ে গেছে সামনে। জানালাবিহীন ছোট ছোট ঘুপচি একচালা বাড়ি যেন গিলে ফেলেছে রাস্তাটাকে। পথের ধারেই রান্না চড়েছে। প্রকাশ্যে চান করছে কেউ কেউ। বলাই বাহুল্য, গাড়ি আর এগোবে না। এদিকে তর সইছে না যুবকেরও। এক লাফে গাড়ি থেকে সটান নেমে পড়ল সে। দ্রুতগতিতে পা চালাল। দুরুদুরু করছে বুক। কেমন একটা চেনা গন্ধ এবার ঘিরে ধরেছে তাকে। সোঁদা মাটির গন্ধ, মায়ের শাড়ির আঁচলের গন্ধ।

ঘিঞ্জি বস্তির মধ্যে এমন সুন্দর পোশাক পরা কেতাদুরস্ত মানুষ দেখতে একেবারেই অভ্যস্ত নন বস্তিবাসীরা। একটু অবাক চোখেই তাঁরা দেখতে লাগলেন এই যুবককে। কী এক অজানা ভাষায় কথা বলছে সে! একবর্ণও বোঝা যাচ্ছে না। ওদিকে নাছোড়বান্দা যুবকটিও তখন জনে জনে ছুটে যাচ্ছে, জানতে চাইছে নিজের মায়ের কথা, পরিবারের কথা। কিন্তু উত্তর মিলছে না। মিলবে কী করে! যে ভাষায় ২৫ বছর আগে কথা বলত সে ভাষাটাই তো ভুলে গেছে যুবক। ভুলে গেছে নিজের মায়ের ভাষা। স্থানীয় লোকেরাও অস্ট্রেলিয় ভাষার মাথামুণ্ডু বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে থাকছে তার মুখের দিকে।

Image - রূপকথার মতো, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে মায়ের টানে দেশে ফিরেছিল এই ছেলে

বেশ কিছুক্ষণ এমন অসহায় ছোটাছুটির পর অবশেষে বস্তিরই একজনকে পাওয়া গেল যে অল্প ইংরেজি ভাষা বোঝে। তাকে নিয়েই তন্ন তন্ন করে শুরু হল খোঁজা। সুদুর অস্ট্রেলিয়া থেকে নিজের হারিয়ে যাওয়া পরিবার, ভাই-বোন, মাকে খুঁজতেই তো এত পথ পাড়ি দেওয়া, এত উৎকণ্ঠার প্রহর গোনা। অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা সেই যুবক সারু ব্রিয়ারলি কি শেষমেশ খুঁজে পেয়েছিল তার হারানো শিকড়? কীভাবেই বা মধ্যপ্রদেশের এক দরিদ্র পরিবার থেকে সে আচমকা ছিটকে গেল একেবারে উলটো গোলার্ধে? আসুন, সে গল্পটাই শুনে নেওয়া যাক আগে। (Saroo Brierley)

সারু ব্রিয়ারলি

সারুর পরিবার বলতে তার মা, দুই ভাই আর এক বোন। বাবা আরেকটা বিয়ে করে অন্য জায়গায় থাকতে শুরু করলে একা মা তিন নাবালক সন্তানকে নিয়ে পড়েন আতান্তরে। দারিদ্র্য, অর্থাভাব, চরম টানাটানির সংসার। ফলে পাঁচ বছর বয়স থেকেই অন্য দুই ভাই গুড্ডু এবং কাল্লুর সাথে রেলওয়ে স্টেশনে ভিক্ষা করে খাবার যোগাড় করতে হত সারুকে। বড় ভাই গুড্ডু অনেক সময় ট্রেনের কামরা পরিষ্কার করত, সাথে থাকত সারু। ১৯৮৬ সালের এমনই এক রাতে দাদা গুড্ডুর সঙ্গে খান্দোওয়া থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে বুরহানপুর স্টেশনে গিয়েছিল সারু। গুড্ডু কাজে চলে গেলে ছোট্ট সারু ঘুমিয়ে পড়ে স্টেশনেই। ঘুম থেকে উঠেও দাদাকে দেখতে না পেয়ে একটা ট্রেনে উঠে বসে সারু। অন্যদিনের মতো বড়ো ভাই ট্রেনেরই কোনও কামরা পরিষ্কার করছে ভেবে সারু নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড়ে ট্রেনের মধ্যে। ঘুমন্ত সারুকে নিয়েই ট্রেন ছেড়ে দেয়।

Image - রূপকথার মতো, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে মায়ের টানে দেশে ফিরেছিল এই ছেলে
ছোট্ট সারু

একচোখ ঘুম নিয়ে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারে না সারু। যখন তার ঘুম ভাঙে তখন সে বুঝতে পারে রাতের অন্ধকার চিরে ট্রেন ছুটে চলেছে প্রচণ্ড গতিতে। প্রায় ফাঁকা সেই কামরায় সারু ছিল একাই। কাউকে দেখতে না পেয়ে কামরা জুড়ে পাগলের মত ছোটাছুটি করতে থাকে সারু। হাজার টানাটানি করেও খোলে না দরজা। এর মধ্যে ট্রেন নিয়ম মেনে বেশ কিছু স্টেশনে থামলেও বাইরে থেকে লক করা সেই দরজা খুলে এগিয়ে আসে না কেউ। অনেক চেষ্টা করেও দরজা খুলতে না পেরে ক্লান্ত সারু আবার ঘুমিয়ে পড়ে ট্রেনে। এভাবেই প্রায় ১৪ ঘণ্টা অপরিচিত পথে ভ্রমণের পর যখন সে ট্রেন থেকে নামে তখন অবাক হয়ে যায়। সম্পূর্ণ অচেনা এক পরিবেশ, অচেনা এলাকা, মানুষগুলোও অচেনা। যে ভাষায় তারা কথা বলছে সে ভাষাও আগে কখনও শোনেনি সারু। ছোট্ট সারু বুঝতেও পারে না নিজের ঘর পেরিয়ে ততক্ষণে সে চলে এসেছে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে কলকাতার হাওড়া স্টেশনে। (Saroo Brierley)

বস্তিতে বড় হওয়া সারু তার নিজের পুরো নামটাই জানত না। এলাকার নাম বা ঠিকানা তো দূরস্থান। সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়ল সে ভাষা নিয়ে। তার দেশোয়ালি ভাষা কলকাতার মানুষ বুঝতে পারে না। সে বাড়ি ফিরতে চায়, মায়ের কাছে যেতে চায়- কিন্তু কীভাবে যাবে জানে না। হাতে একটা সিকি অবধি নেই। খিদের জ্বালায়, হতাশায়, ভয়ে গুটিয়ে যায় সে। মিশে যায় কলকাতায় হাজার হাজার পথশিশুদের সঙ্গে। পেটের জ্বালা মেটাতে দুমুঠো অন্নের জন্য ভিক্ষা করতে শুরু করে। কিছু না জুটলে ফেলে দেওয়া খাবারের খোঁজে হাতড়াতে থাকে ডাস্টবিন। একদিন রেলের এক কর্মচারী সারুকে নিজের বাড়ি নিয়ে যায়। খেতে দেয় পেটপুরে। মাকে খুঁজে দেবে এমন প্রতিশ্রুতিও দেন। কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ছোট্ট সারু ততদিনে অনেক পরিণত। সে বুঝতে পারে লোকটার এই অযাচিত স্নেহের আড়ালে কোনও খারাপ উদ্দেশ্য আছে। ভয় পেয়ে পালিয়ে যায় সে। পাঁচ বছরের সারুর মাথা গোঁজার আশ্রয় হয়ে ওঠে কলকাতার ফুটপাত আর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম।

Image - রূপকথার মতো, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে মায়ের টানে দেশে ফিরেছিল এই ছেলে

এইভাবে বেশ কয়েক সপ্তাহ চলার পর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয় সারুর। কীভাবে যেন সে চোখে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়ান এক নিঃসন্তান দম্পতির। একটা ছোট্ট বাচ্চাকে এভাবে শুকনো মুখে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে দেখে তাঁদের খুব মায়া হয়। সারুকে দত্তক নেবেন ঠিক করেন তাঁরা। ছোট্ট সারু হয়তো বুঝেছিল তার একার পক্ষে এই অজানা শহরের গোলকধাঁধা পেরিয়ে পরিবারের কাছে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। হয়তো সাদা চামড়ার দুজন মানুষের চোখে চেনা স্নেহ দেখতে পেয়েছিল সে। মোটকথা, সেই অস্ট্রেলিয়ান দম্পতির সঙ্গে নতুন জীবনের পথে পা বাড়ায় সারু। শুরু হয় নতুন অধ্যায়।

সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে নতুন বাবা-মায়ের সঙ্গে সারু চলে আসে অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে তার নামের সঙ্গে ওই দম্পতির পদবী ব্রিয়ারলি যোগ হয়। জীবনের প্রথম পাঁচ বছর চরম দারিদ্র্য আর কষ্টের মধ্যে কাটানোর পর একটা ঠিকঠাক জীবন পায় সারু। নতুন পরিবারে স্নেহ আদরের ভিতর রাজার মতো বড় হতে থাকে তাসমেনিয়া হোবার্টে। (Saroo Brierley)

অস্ট্রেলিয়ায় বড় হলেও অতীত শৈশবের কথা ভুলে যায়নি সারু। তার বারবার মনে পড়ত আধো আধো বুলি ফোটা ছোট্ট বোনটার কথা, ভায়েদের কথা। চোখে ভাসত রোগা কালো মায়ের মুখটা। হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ার জন্য ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল হোটেল স্কুলে ভর্তি হলেও, তার মনে তখন অন্য চিন্তা। নিজের আসল পরিবারকে খুঁজে বের করার কথা এইসময় প্রায়ই ভাবত সে। একেই বোধহয় বলে শিকড়ের টান। অস্ট্রেলিয়ার জীবনে কোনও খামতি ছিল না তার। পরিবারের স্নেহ, ভরপেট খাবার, উচ্চশিক্ষা আর দারুণ কেরিয়ারের হাতছানি— ছিল সবই। তবু তার মন পুড়ত মায়ের জন্য। কী অবস্থায় আছে মা? বেঁচে আছে তো? এমনই কত কথা সারাদিন ধরে ভাবত সে। কিন্তু এই বিরাট পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া মাকে খুঁজে পাওয়া যে প্রায় অসম্ভব সে কথাও জানত সারু।

Image - রূপকথার মতো, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে মায়ের টানে দেশে ফিরেছিল এই ছেলে
অস্ট্রেলিয় মায়ের সঙ্গে সারু

২০০৮ সাল নাগাদ সারু হঠাৎই জানতে পারে গুগল আর্থের কথা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ঘরহারা হয়েছে সে। অত ছোটবেলার স্মৃতি কি আর স্পষ্ট মনে থাকে! তবু সেই ভাসাভাসা স্মৃতিকে পুঁজি করেই সেদিন লড়াইয়ে নেমেছিল সারু। ভারতের মতো এক সুবিশাল দেশে কত মানুষ হারিয়ে যায় রোজ। সেখানে পাঁচ বছরের এক নামপরিচয়হীন বাচ্চার ঠিকানা খুঁজে পাওয়া এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কিন্তু হাল ছাড়েনি সারু। গুগল আর্থ, গুগল ম্যাপের মতো আরও কিছু উন্নততর টেকনিকের সাহায্যে শিকড় খোঁজার কাজ শুরু করে দেয় সে। তার মনে ছিল সেই অভিশপ্ত রাতে প্রায় ১৪ ঘণ্টা ট্রেনে আটকে ছিল সে। সে সময় কলকাতাগামী কোন কোন ট্রেন চলত, কতকাতা থেকে ১৪ ঘণ্টার দূরত্বে বা এরকম সময়ে কোথায় কোথায় যাওয়া আসা সম্ভব, কেমন ছিল ট্রেনের গতি— ইন্টারনেট থেকে এসব তথ্য খুঁজে বের করতে থাকে সে। অংক কষে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের বৃত্ত আঁকে কলকাতাকে কেন্দ্র করে। খোঁজার জায়গা ছোট হয়ে এলেও ১,২০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের বৃত্তও কম না। তারপরও মির‍্যাকল হয়। র‍্যান্ডম খুঁজতে খুঁজতেই একদিন হঠাৎ করে সে পেয়ে যায় খান্দোওয়ার নাম। স্মৃতি হাতড়ে গুগল আর্থের স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে খান্দোওয়ার চারপাশ, খুঁজে পায় গাণেশতালাই। তিন বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর প্রায় অসাধ্যসাধন করে খুঁজে পায় নিজের শেকড়ের সন্ধান। যদিও খান্দোওয়া নিয়ে তখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেনি সে। খুঁজতে খুঁজতে ফেসবুকে একটা গ্রুপ পাওয়া যায় খান্দোওয়া বিষয়ক। সেই গ্রুপের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে সারুর বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে এই খান্দোওয়াই তার জন্মস্থান, এখানেই সে কাটিয়েছে তার ছেলেবেলার অমূল্য পাঁচটা বছর।

অনেক আশা নিয়ে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সারু ফেরে ভারতে, প্রায় ২৫ বছর পর। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা গাড়ি নিয়ে চলে যায় খান্দোওয়ায়। খান্দোওয়ায় যাবার পর আর স্মৃতি হাতড়ে মেলাতে হয়নি তাকে। চারপাশ বদলে গেলেও এক সময়ের পরিচিত জায়গাগুলো চিনে নিতে আর ভুল করেনি সে।

গুগল আর্থের সাহায্যে শহর খুঁজে বের করলেও একটা ভয় আর সংশয় তখনও ছিল। যার জন্য এই পৃথিবী তোলপাড় খোঁজ, কেমন আছেন সারুর সেই মা? আধপেটা খেয়ে, অভাবের সঙ্গে লড়ে বেঁচে আছেন তো? বেঁচে থাকলেও ছিন্নমূল্ম স্রোতে ভেসে যাননি অন্য কোথাও তারই বা নিশ্চয়তা কী! দুশ্চিন্তা সংশয় শুদ্ধই সারু চলে যায় গাণেশতালাইতে। তার পরের ঘটনা তো গোড়াতেই বলেছি।

ছোটবেলার বাসাটি চিনতে ভুল করেনি সারু। কিন্তু ভাঙাচোরা সে ঘরের চারদিকে অযত্নের ছাপ, দরজায় মস্ত এক তালা। তবে কি সারুর আশঙ্কাই সত্যি হল! মা আর এখানে থাকেন না? কাউকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নেওয়ার উপায়ও নেই। এখানে কেউ সারুর ভাষা বোঝে না। ছেলেবেলা থেকেই অস্ট্রেলিয়ায় বড় হয়েছে সে। ছেলেবেলার দেহাতি হিন্দি ভুলে গেছে কবে! তাসমানি আর ইংরাজিতেই সড়গড় এখন। সে ভাষায় গাণেশতালাই-এর বস্তিতে কারো সাথেই মন খুলে কথা বলতে পারছিল না সারু। ছোটবেলার একটি ছবি ছিল তার সঙ্গে, সে ছবি দেখিয়েই ইশারায় জনে জনে জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করছিল, এই শিশুটির পরিবারকে কেউ চেনে কী না। ভাই-বোনদের নামও মনে ছিল তার, সেসব নাম দিয়েও জিজ্ঞাসা চালায়। শিকড় খোঁজার এই প্রাণপণ চেষ্টার সামনে বোধহয় সেদিন অদৃষ্টও হার মেনেছিল। বেশ কিছুক্ষণ পর একজন হাতের ইশারায় অপেক্ষা করতে বলেন সারুকে। কয়েক মিনিট পর তিনি তাকে নিয়ে যান এক মহিলার সামনে।

Image - রূপকথার মতো, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে মায়ের টানে দেশে ফিরেছিল এই ছেলে

প্রায় ২৫ বছর আগে যখন শেষবার সারু মাকে দেখেছিল তখন তার মা ছিলেন ৩৪ বছরের তরুণী। এতোগুলো বছর পর মায়ের বয়স যে বেড়ে যাবে এটা এতদিন সারুর চিন্তাতেই আসেনি। তরুণ সারুর সামনে এতদিন পর যিনি এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি ষাট ছুঁইছুঁই এক প্রৌঢ়া। সময়ের ব্যবধান যতই থাক, বলিরেখা আর বয়স কি মাকে ভুলিয়ে দিতে পারে? এতদিন পরেও গর্ভদায়িনী মাকে চিনতে এক মুহূর্তের বেশি সময় লাগেনি সারুর। বড় হয়ে যাওয়া ছেলেকে চিনতেও কষ্ট হয়নি মায়ের। রক্তের টান যাবে কোথায়! হারিয়ে যাওয়া ছেলের হাত ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে মা। তিনিও যে অপেক্ষাতেই ছিলেন। শত কষ্টেও এলাকা ছেড়ে কোথাও যাননি, একদিন না একদিন হারিয়ে যাওয়া ছেলে ফিরে আসবে এই বিশ্বাসে।

মায়ের সাথে দেখা হলেও মা ছেলের যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ভাষা। মা যেমন ইংরেজি বলতে বা বুঝতে পারেন না, হিন্দি ভুলে গেছে ছেলেও। কিন্তু আবেগের কাছে ভেসে যায় ভাষার কাঁটাতার। ইশারাতেই একে অন্যের সঙ্গে কথা বলেন মা-ছেলে। তবে মায়ের সাথে দেখা হবার আনন্দের মাঝেই একটা মনখারাপ করা খবরও মেলে। জানা যায়, ১৯৮৬ সালের সেই অভিশপ্ত রাতে একা সারু হারিয়ে যায়নি, তার সঙ্গে তার ভাই গুড্ডুও হারিয়ে গিয়েছিল। সহায়সম্বলহীনা মা দুই ছেলেকে খুঁজতে পাগলের মতো ঘুরেছেন এ দরজায় ও দরজায়। ঘটনার এক মাস পর গুড্ডুর লাশ সনাক্ত করে পুলিশ। পুলিশের ধারণা অনুযায়ী সেই রাতে গুড্ডু কোনও চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গিয়েছিল কিংবা কেউ ট্রেন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল তাকে। এত আনন্দের মাঝেও দাদাকে হারানোর কষ্ট কাঁটার মতো এসে বেঁধে সারুর বুকে।

Image - রূপকথার মতো, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে মায়ের টানে দেশে ফিরেছিল এই ছেলে
দুই মহাদেশের দুই মায়ের সঙ্গে সারু

মায়ের সাথে দেখা হওয়ার পর তাঁকে অস্ট্রেলিয়া নিতে যেতে চেয়েছিল সারু। কিন্তু সারাজীবন ভারতের একটা ছোট্ট শহরে থাকা, লেখাপড়া না জানা মা এই শেষ বয়সে আর গাণেশতালাই ছেড়ে যেতে চাননি কোথাও। গাণেশতালাই-এর সেই জরাজীর্ণ বাসাটি কিনে নিয়ে, মেরামত করে মাকে উপহার দিয়েছে সারু। প্রতি মাসে নিয়ম করে ১০০ ডলার হাতখরচ পাঠায় মায়ের জন্য, মাকে যাতে আর মাঠে কাজ করতে না হয় তার ব্যবস্থাও করেছে সে। ২০১২ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত ১৫ বার মায়ের সাথে দেখা করতে এ দেশে এসেছে সারু, সঙ্গে নিয়ে এসেছে তার অস্ট্রেলিয়ান মাকেও। তার এই আশ্চর্য জীবনকাহিনি নিয়ে লেখা হয়েছে বই। তৈরি হয়েছে সিনেমাও। সারুর মতে ‘‘আমার অতীত ঘাঁটার মধ্যে কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে কোনও অতৃপ্তি ছিল না, এমন নয় যে ছোটবেলার পৃথিবীটায় ফিরতে চেয়েছিলাম আমি। কিন্তু আমার দুঃখিনী মায়েরও তো জানার অধিকার ছিল, তার ছেলেটার সঙ্গে কী ঘটেছে! বাঁধা গতের ধর্ম-সংস্কৃতি মানি না আমি। আমার ভারতীয় পরিবার, অস্ট্রেলিয়ার মা-বাবা— সবাইকে নিয়েই বাঁচতে চাই!’’

  • ছবি ঋণ- saroobrierley.com

You might also like