Latest News

স্বাধীনতা আন্দোলনের এক বিস্মৃত নায়ক, ফাঁসির দড়ি যাঁর কাছে ছিল জয়ের মালা

শাহজাহানপুরের এই কবি হাতে তুলে নিয়েছিলেন মাউজার পিস্তল।

Martyr Ashfaqullah khan

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ব্রিটিশ আমলের ইউনাইটেড প্রভিন্স বা আজকের উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরের ব্রাহ্মণ যুবক ছিলেন রামপ্রসাদ বিসমিল। তিনি ছিলেন স্বদেশপ্রেমের বিখ্যাত কবিও। হিন্দি ও উর্দুতে লিখতেন বুকের রক্তগরম করে দেওয়া কবিতা। কবিতা লেখার পাশাপাশি শাহজাহানপুরের যুবকদের নিয়ে বিসমিল তৈরি করেছিলেন ‘মাতৃবেদী’ নামের এক বিপ্লবী সংগঠন। শাহজাহানপুরের অন্যান্য যুবকের মতই বিসমিলের কবিতা আগুন ধরিয়েছিল এক মুসলিম যুবকের বুকে। বয়সে তিনি ছিলেন বিসমিলের থেকে তিন বছরের ছোট। নাম আসফাকুল্লা খান। তিনিও উর্দুতে খুব সুন্দর কবিতা লিখতেন। তাঁর পাঠকের সংখ্যাও কম ছিল না।

Martyr Ashfaqullah khan
আসফাকুল্লা খান ( Image source -mythicalindia.com)

ছয় ভাইবোনের মধ্যে আসফাকুল্লা ছিলেন সব থেকে ছোট। বাবা সফিকুল্লা খান ও মা মজরুন্নিসা বেগম ছিলেন তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী। তারই প্রভাব পড়েছিল আসফাকুল্লার ওপর। বুকে জ্বলতে থাকা আগুন দাবানলে পরিণত হয়েছিল রামপ্রসাদ বিসমিলের কবিতাগুলি পড়ে। সদ্যযুবক আসফাকুল্লা বিসমিলের সঙ্গে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলেন। ‘মাতৃবেদী’ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন আসফাকুল্লা। কিন্তু ১৯১৮ সালে ঘটে যাওয়া মৈনপুরী ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী বিসমিল তখন ফেরার। ব্রিটিশ পুলিশ হন্যে তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।

রামপ্রসাদ বিসমিল (Image source- readersdigest.in)

অবশেষে দেখা হয়েছিল দুজনের

১৯২০ সালে শাহজাহানপুরে ফিরে এসেছিলেন বিসমিল। এক বন্ধুর সঙ্গে আসফাকুল্লা পৌঁছে গেছিলেন বিসমিলের গোপন ডেরায়। বিসমিল বিশ্বাস করেননি মুসলিম যুবক আসফাকুল্লাকে। ভেবেছিলেন পুলিশের চর। চোখা চোখা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন যুবক আসফাকুল্লার দিকে। মাথা উঁচু করে বিসমিলের চোখে চোখ রেখে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন আসফাকুল্লা। একসময় কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা বিসমিল বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন আসফাকুল্লাকে। ধর্মের প্রাচীরকে খান খান করে দিয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রাম। আসফাকুল্লা তখন বিসমিলকে জানিয়েছিলেন তাঁর দাদা রিয়াসাতুল্লা বিসমিলেরই সহপাঠী ছিলেন।

আসফাকুল্লাকে আর্য সমাজের মন্দিরে দেখা করতে বলেছিলেন বিসমিল। কারণ মন্দিরের একটি গোপন ঘরে বিসমিল থাকতেন। নির্দিষ্ট দিনে পৌঁছে গেছিলেন আসফাকুল্লা। তাঁর সঙ্গে সেদিন অনেকক্ষণ কথা বলেছিলেন বিসমিল। মাতৃবেদীর সদস্যও করে নিয়েছিলেন। এরপর আসফাকুল্লা নিয়মিত যেতে শুরু করেছিলেন আর্য সমাজের মন্দিরে। স্থানীয় মুসলিম সমাজ ভেবেছিল হিন্দুধর্ম নিতে চলেছেন আসফাকুল্লা। তাই তাঁদের কাছে কাফের হয়ে গেছিলেন আসফাকুল্লা। কিন্তু সে সব কানেই তুলতেন না আসফাকুল্লা। তাঁর কাছে পাখির চোখ বৃটিশ মুক্ত ভারত। ধীরে ধীরে নিষ্ঠাবান মুসলিম যুবক আসফাকুল্লা এক কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতার অভিন্ন হ্রদয় বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন।

শাহজাহানপুরের আর্য সমাজ মন্দির (Image source-aryasamajghaziabad01.blogspot.com)

আত্মপ্রকাশ করেছিল হিন্দুস্থান রিপাবলিকান আর্মি

১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়েছিল গান্ধীজির ডাকা অসহযোগ আন্দোলন। আসফাকুল্লা বিসমিলকে বলেছিলেন কংগ্রেসে যোগ দিতে। ১৯২১ সালে দুই বন্ধু যোগ দিয়েছিলেন কংগ্রেসে। কিন্তু ১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, গোরক্ষপুরের চৌরিচোরায় ঘটে গেছিল সেই ভয়াবহ ঘটনা। একটি বড় জমায়েতের ওপর ব্রিটিশ পুলিশ চালিয়েছিল গুলি। মারা গেছিলেন তিন ভারতীয়। বদলা নেওয়ার জন্য ক্রুদ্ধ জনতা আক্রমণ করেছিল থানা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল বাইশজন পুলিশকে। অহিংসায় বিশ্বাসী গান্ধীজি, ১২ ফেব্রুয়ারী প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন অসহযোগ আন্দোলন। ভেঙে দু’টুকরো হয়ে গেছিল কংগ্রেস।

প্রতীকী ছবি ( Image source -timesofindia.indiatimes.com)

ততদিনে বিসমিল বিখ্যাত হয়ে গেছিলেন, মৈনপুরীর ঘটনা ও কংগ্রেসের যুবকদের নিয়ে লখনৌ শহরে বিশাল এক মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। লখনউতেই বিসমিলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল চরমপন্থায় বিশ্বাসী কিছু বাঙালি যুবকের সঙ্গে। তাঁরা বিসমিলকে অনুরোধ করেছিল একটি বৃহত্তর সংগঠন গড়ার জন্য। ১৯২৪ সালের ৩ অক্টোবর লালা হরদয়াল, ডঃ যাদুগোপাল মুখার্জি ও শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, শচীন্দ্রনাথ বক্সী, যোগেশ চন্দ্র চ্যাটার্জির তত্ত্বাবধানে কানপুরে তৈরি হয়েছিল ‘হিন্দুস্থান রিপাবলিকান আর্মি’। সেই সংগঠনে যোগ দিয়েছিলেন প্রচুর বাঙালি ও অবাঙালি যুবক যুবক।

শাহজাহান পুরের দায়িত্বে ছিলেন বিসমিল নিজে, তাঁর প্রধান সেনাপতি ছিলেন আসফাকুল্লা। সংগঠনের অস্ত্র জোগাড়ের দায়িত্ব ছিল বিসমিলেরই কাঁধে। কিন্তু অস্ত্র কেনার জন্য চাই টাকা। কিন্তু কীভাবে আসবে এত টাকা! একদিন শাহজাহানপুর থেকে ট্রেনে করে লখনৌ যাচ্ছিলেন বিসমিল। তিনি দেখেছিলেন প্রত্যেক স্টেশনে গার্ডের কামরায় টাকার বস্তা তুলে দিচ্ছিলেন স্টেশন মাস্টারেরা। কিন্তু গার্ডের কামরায় কোনও প্রহরী থাকে না। এরপর ১৯২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের বামরৌলি, ১৯২৫ সালের ৭ মার্চ বিচপুর ও ২৪ মে দ্বারিকাপুরে হয়েছিল বিপ্লবীদের গোপন বৈঠক।

কাকোরি স্টেশন ( Image Source -aajtak.in)

১৯২৫ সালে ৯ আগস্ট

আট নম্বর ডাউন শাহজাহানপুর-লখনউ এক্সপ্রেস এগিয়ে চলেছিল কাকোরি স্টেশনের দিকে। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। দ্রুত নিঃঝুম হয়ে আসছিল অরণ্যঘেরা পরিবেশ। আচমকা দাঁড়িয়ে পড়েছিল ট্রেনটি। দ্বিতীয় শ্রেণির কামরাতে চেন টেনেছিলেন বিপ্লবী রাজেন্দ্র লাহিড়ি। সঙ্গে ছিলেন আসফাকুল্লা ও শচীন্দ্র বাগচী। বাকি কামরাগুলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়েছিলেন রামপ্রসাদ বিসমিল, চন্দ্রশেখর আজাদ, ঠাকুর রোশন সিং, কেশব চক্রবর্তী, বনোয়ারীলাল, মুকুন্দিলাল ও মন্মথ গুপ্ত।

কোন কামরায় চেন টানা হয়েছে তা বোঝার জন্য রেললাইনে নেমে পড়েছিলেন গার্ডসাহেব। মুহূর্তের মধ্যে তাঁকে মাটিতে শুইয়ে ফেলেছিলেন দুই বিপ্লবী। তাঁরা বলেছিলেন, “মাথা তুললেই গুলি খেতে হবে।” ঠিক সেই মুহূর্তেই ট্রেনচালকের মাথায় তাঁর মাউজার পিস্তল ঠেকিয়েছিলেন আসফাকুল্লা। সঙ্গে ছিলেন মন্মথ গুপ্ত। বাকি বিপ্লবী ট্রেনের কামরাগুলিতে ঘুরে ঘুরে বলতে শুরু করেছিলেন, “আপনারা ভয় পাবেন না। আমরা স্বাধীনতার লড়াই লড়ছি। তবে দয়া করে বাইরে কী হচ্ছে তা দেখতে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। বিপদ হতে পারে।”

আরও পড়ুন: গোদাবরী অরণ্যের সন্ন্যাসীরাজা, গেরিলা যুদ্ধে কাঁপন ধরিয়েছিলেন ব্রিটিশদের বুকে

চারজন বিপ্লবী এরপর গার্ডের কামরা থেকে মাটিতে নামিয়ে এনেছিলেন টাকার বস্তাভর্তি সিন্দুক। কিন্তু ড্রাইভার ও গার্ডের কাছে সিন্দুকের চাবি ছিল না। পাথরের ঘা মেরে সিন্দুকের তালা ভাঙার চেষ্টা করছিলেন বিপ্লবীরা। কিন্তু কিছুতেই তালা ভাঙা যাচ্ছিল না। সময় চলে যাচ্ছিল, ক্রমশ বাড়ছিল ধরা পড়ার ঝুঁকি। চালকের কামরা থেকে এই দৃশ্য দেখেছিলেন দলের সবথেকে শক্তিশালী সদস্য আসফাকুল্লা। মন্মথ গুপ্তার হাতে পিস্তলটি দিয়ে তিনি দৌড়েছিলেন গার্ডের কামরার দিকে। ছ’ফুট উচ্চতার আসফাকুল্লার লাথির আঘাতে ভেঙে গেছিল তালা। সিন্দুকে থাকা বস্তাগুলি নিয়ে একে একে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিলেন বিপ্লবীরা। এই সময় ঘটেছিল এক দুর্ঘটনা। বিপ্লবীদের বারণ সত্ত্বেও চুপিসাড়ে মহিলা কামরার দিকে এগিয়ে চলেছিলেন এক যাত্রী। কারণ সেখানে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। বিপ্লবী মন্মথ গুপ্ত অন্ধকারে ভেবেছিলেন পুলিশ এসে গেছে। গর্জে উঠেছিল মন্মথ গুপ্তের পিস্তল। নিহত হয়েছিলেন নিরীহ যাত্রীটি।

এখানেই ঘটেছিল ঘটনাটি ( Image Source -YouTube)

ঘটনাটি কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশদের। শুরু হয়েছিল অভূতপূর্ব তল্লাসি অভিযান। আগ্রা, ওরাই, এটাওয়া, বেনারস, হরদোই, জব্বলপুর, কানপুর, মেরঠ, সাহারানপুর, পুনে, লাহোর, বাংলা থেকে একে একে ধরা পড়েছিলেন প্রায় চল্লিশ জন বিপ্লবী। যদিও অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন মাত্র দশ জন। সন্দেহভাজন বিপ্লবীদের তালিকা থেকে ব্রিটিশদের ভুলেই বাদ পড়ে গেছিল চন্দ্রশেখর আজাদের নাম। ওই বছর ২৬ সেপ্টেম্বর সাহারানপুর থেকে ধরা পড়েছিলেন রামপ্রসাদ বিসমিল। কিন্তু তাঁর প্রধান সেনাপতি আসফাকুল্লার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ছদ্মবেশী আসফাকুল্লা চলে গেছিলেন বেনারস হয়ে কানপুর। গণেশ বিদ্যার্থীর ছাপাখানার কর্মী হিসেবে প্রায় দশমাস কানপুরে কাজ করার পর আসফাকুল্লা চলে গেছিলেন রাজস্থান। সেখান থেকে দিল্লি।

কাকোরির ঘটনায় ব্যবহৃত মাউজার পিস্তল (Image Source-Wikipedia)

বেইমানি করেছিল এক পাঠান বন্ধু

ভারত থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য আসফাকুল্লা সাহায্য চেয়েছিলেন তাঁর পূর্ব পরিচিত এক পাঠান বন্ধুর কাছে। কিন্তু পুরস্কারের অর্থের লোভে ১৯২৬ সালের ১৭ জুলাই, সেই পাঠান বন্ধুই আসফাকুল্লাকে তুলে দিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশের হাতে। অবাক হয়েছিলেন আসফাকুল্লা। কারণ তিনি জানতেন পাঠানরা বেইমান হয় না। সেই সময় দিল্লি পুলিশের প্রধান ছিলেন তাসাদ্দুক খান। তিনি খেলেছিলেন সাম্প্রদায়িক তাস। তিনি আসফাকুল্লাকে বলেছিলেন, “আমিও মুসলিম, তোমার গ্রেফতারে আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি। তবে আমি তোমায় বাঁচাবার ব্যবস্থা করব, যদি তুমি আমার পরামর্শ শোনো।” এরপর তাসাদ্দুক খান বলেছিলেন, “তুমি বরং রাজসাক্ষী হয়ে যাও। কাফের বিসমিলের লক্ষ্য হিন্দু ভারত। তুমি তার সাথে যেও না।”

মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে উঠেছিল আসফাকুল্লার চোয়াল, কেটে কেটে আসফাকুল্লা বলেছিলেন, “আমি হিন্দু ভারতেই মরতে চাই, ব্রিটিশদের রাজত্বে নয়। পন্ডিতজির একমাত্র লক্ষ্য ভারতের স্বাধীনতা। তিনি আমার ভাই। তুমি তাঁকে কাফের বললে! সামনে থেকে সরে যাও। নাহলে আমার নামে আর একটা খুনের মামলা শুরু হবে।”

গ্রেফতার হওয়া বিপ্লবীরা, ছবিতে নেই আসফকুল্লা (Image Source -thescribe.in)

বিপ্লবীদের বাঁচানোর জন্য তৈরি হয়েছিল কমিটি

কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মোতিলাল নেহেরু। সদস্য ছিলেন গোবিন্দ বল্লভ পন্থ, জওহরলাল নেহেরু, আচার্য নরেন্দ্র দেব, চন্দ্রভানু গুপ্ত ও শ্রীপ্রকাশ। বিপ্লবীদের হয়ে আদালতে সওয়াল করবার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন গোবিন্দ বল্লভ পন্থ, মোহনলাল সাক্সেনা, চন্দ্রভান গুপ্তা, অজিত প্রসাদ জৈন, বিকে চৌধুরি, গোপীনাথ শ্রীবাস্তব, আরএম বাহাদুরজি, কৃপা শঙ্কর হাজেলার মত নামী উকিলেরা।
সরকার পক্ষের উকিল ছিলেন লখনউ হাইকোর্টের প্রথম সারির উকিল জগত নারায়ন মুল্লা। সম্পর্কে তিনি ছিলেন নেহেরুদের আত্মীয়। তবুও তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বিপ্লবীদের হয়ে সওয়াল করার প্রস্তাব। কারণ রামপ্রসাদ বিসমিল ছিলেন তাঁর চক্ষুশূল। মৈনপুরী মামলাতেও তিনি সরকার পক্ষের উকিল হয়ে বিসমিলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।

সরকার পক্ষের উকিল জগত নারায়ন মুল্লা (Image Source-Wikiwand.com)

বিচার শুরু হয়েছিল ১৯২৬ সালের ১ মে

প্রমাণের অভাবে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল ১৯ জন সন্দেহভাজনকে। ২১ জনের নামে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে প্রমাণের অভাবে মুক্তি পেয়ে গেছিলেন শচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস ও লালা হরগোবিন্দ।  ব্রিটিশদের ফাঁদের পড়ে রাজসাক্ষী হয়ে গেছিলেন বনোয়ারীলাল ও গোপীমোহন। মূলত বনোয়ারীলালের সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেই খুন, ষড়যন্ত্র ও ডাকাতির মামলাটি হয়েছিল। তাঁর সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়েছিল কাকোরি ঘটনাটির পিছনে ছিল হিন্দুস্থান রিপাবলিকান আর্মির সদস্যেরা।

মামলার প্রথম রায়টি এসেছিল ১৯২৭ সালের ৬ এপ্রিল। হত্যা, ষড়যন্ত্র ও ডাকাতির দায়ে রামপ্রসাদ বিসমিল, ঠাকুর রোশন সিং ও রাজেন্দ্র লাহিড়ির ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। বাকিদের যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড হয়েছিল। সবথেকে কম সাজা হয়েছিল রাজসাক্ষী বনোয়ারীলালের, মাত্র তিন বছরের জেল। মামলাটির দ্বিতীয় রায় এসেছিল ২২ অগস্ট। এই রায়ে আসফাকুল্লাকে দেওয়া হয়েছিল মৃত্যুদণ্ড, শচীন্দ্রনাথ বক্সীর হয়েছিল দ্বীপান্তর। বিপ্লবীদের ফাঁসির হুকুমে উত্তাল হয়েছিল দেশ। মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার জন্য পিটিশন পাঠানো হয়েছিল ভাইসরয়ের কাছে। কিন্তুস তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ভাইসরয়।

বিসমিল, আসফাকুল্লা, রাজেন্দ্র লাহিড়ি, রোশন সিং (Image Source -hastakshepnews.com)

বিপ্লবীরা ছিলেন নির্বিকার

গোরক্ষপুর জেলে বসে রামপ্রসাদ বিসমিল নিশ্চিন্তে লিখে চলেছিলেন তাঁর আত্মজীবনী। সেখানে তিনি লিখে ছিলেন, কীভাবে আসফাকুল্লা হয়ে উঠেছিলেন তাঁর নয়নের মণি। বিসমিল আসফাকুল্লাকে লিখেছিলেন ,”আমার ভাই, যে মাতৃভূমির জন্য জন্য নিজেকেই বলি দেয়, তার কাছে ফাঁসির দড়ি মানে জয়ের মালা।” এই কথাটি জানতেন ও মানতেন আসফাকুল্লাও। তাই তিনিও ছিলেন নির্বিকার ও অচঞ্চল। তিনি জানতেন কী লেখা আছে তাঁর অদৃষ্টে। তাই ফৈজাবাদ জেলে নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছিলেন আসফাকুল্লা। নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে ছিলেন পবিত্র কোরানে। দাড়ি রেখেছিলেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। রমজানে রোজা রাখতেন। আর লিখতেন ডাইরি।

ডাইরির এক পাতায় আসফাকুল্লা লিখেছিলেন, “আমার জন্য হয়ত আমার দেশের ভাইবোনেরা কাঁদবে। কিন্তু আমি কাঁদছি স্বাধীনতার প্রতি ভাইবোনদের নিস্পৃহ মনোভাব দেখে। কেউ কেঁদো না। আমি ভালোবেসেই আপন করেছি সব যন্ত্রণা। চোখের জল মোছো। আমি অমর। আমি অমর।” মৃত্যুদণ্ড রদের শেষ চেষ্টা হিসেবে ১৯২৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আবেদন করা হয়েছিল লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে। সেই আবেদন ভারতের ভাইসরয়ের অফিসে ফেরত পাঠিয়ে বলা হয়েছিল, ১৯২৭ সালের ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে চারজন বিপ্লবীকে ফাঁসি দিতেই হবে।

১৮ ডিসেম্বর রাত

গোরক্ষপুর জেলে বসে মা’কে শেষ চিঠি লিখছিলেন রামপ্রসাদ বিসমিল। চোখে মুখে আতঙ্কের লেশমাত্র ছিল না। ঠাট্টা তামাশা করছিলেন প্রহরীদের সঙ্গে। ঠিক তখনই তাঁর ডাইরির পাতায় জীবনের শেষ অক্ষরগুলি লিখে চলেছিলেন আসফাকুল্লা। তিনি লিখেছিলেন, “বিসমিল হিন্দু, সে বলে আমি আবার ফিরে আসব। ভারতকে মুক্ত করবই বিদেশিদের হাত থেকে। আমিও একই কথা বলি। কিন্তু আমি মুসলিম। আমি পুণর্জন্মে বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমার সঙ্গে যদি মহান আল্লাহর দেখা হয়। আমি তাঁকে বলব আমার ‘জন্নত’ চাই না। আর একবার আমাকে ভারতবাসী হয়ে জন্ম নেওয়ার সুযোগ করে দিন। আমি নিজের চোখে ব্রিটিশ মুক্ত ভারতকে একবার দেখতে চাই।

১৯ ডিসেম্বর, ১৯২৭

সূর্যের আলো তখনও পৌঁছয়নি ভারতের বুকে। ‘বন্দেমাতরম’, ‘ভারত মাতা কি জয়’ ধ্বনিতে জেল কাঁপিয়ে  ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে চলেছিলেন তিন সিংহহৃদয় বিপ্লবী। গোরক্ষপুর জেলে রামপ্রসাদ বিসমিল, নৈনি জেলে ঠাকুর রোশন সিং এবং ফৈজাবাদ জেলে আসফাকুল্লা খান। ফাঁসির দড়িতে চুমু খেয়ে আসফাকুল্লা পড়েছিলেন ‘কালেমা শাহাদাত’। কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে দিয়ে ম্যানিলা রোপের ফাঁস গলায় পরিয়ে দিয়েছিল জল্লাদ। চিৎকার করে আসফাকুল্লা বলেছিলেন, “আমার হাত মানুষের রক্তে কলঙ্কিত নয়। আল্লাহ ন্যায় বিচার করবেন। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।” হাত থেকে রুমাল ফেলেছিলেন জেলারেরা। হাতল টেনেছিল জল্লাদেরা। দুদিকে সরে গেছিল পাটাতন। ফাঁসির মঞ্চের নীচে থাকা জমাট অন্ধকারে হারিয়ে গেছিলেন আসফাকুল্লা, রামপ্রসাদ বিসমিল ও ঠাকুর রোশন সিং। গোণ্ডা জেলে রাজেন্দ্র লাহিড়িকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল দু’দিন আগেই, ১৭ ডিসেম্বর।

শহিদ আসফাকুল্লা খান (Image Source-Heritage Times,
Twitter)

ফাঁসির মঞ্চে হাসতে হাসতে জীবন দিয়ে সাতাশ বছরের যুবক আসফাকুল্লা প্রমাণ করে দিয়ে গেছিলেন, ভারতবাসী যে কোনও ধর্মমতে বিশ্বাস রাখতে পারেন। তবে দেশকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করাই হবে তাঁর প্রথম ও সর্বোচ্চ কর্তব্য। আজও তাই আমরা ভুললেও তাঁর প্রিয় সন্তান আসফাকুল্লাকে ভোলেননি ভারতমাতা। আজও তাঁর চোখের জল বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে শাহজাহানপুরে থাকা আসফাকুল্লার সমাধিতে। সেখানেই শুয়ে আছেন তাঁর এই দামাল সন্তান। যিনি তাঁর জীবন ও মৃত্যুকে অর্ঘ্য হিসেবে সাজিয়ে দিয়েছিলেন ভারত মায়ের পায়ে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like