Latest News

প্রয়াত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী গোরা সর্বাধিকারী, সলিল চৌধুরীর সংগীত পরিচালনায় রেকর্ড করেন প্রথম রবি-গান

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বছরের শুরুতেই পরের পর অনেক শিল্পীর দেহাবসান মন বিষণ্ণ করে তুলছে। শাঁওলি মিত্র, বিরজু মহারাজ, নারায়ণ দেবনাথ, কবি প্রভাত চৌধুরীর পর এবার গোরা সর্বাধিকারী।বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গত হলেন ১৯৪১ সালে। সেই বছরই ২৯ জুলাই ঝাড়গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ছেলেটি। নবজাতকের নাম রাখা হল গোরা। ধবধবে ফর্সা গায়ের রং, তাই নাম গোরা।
কে জানত রবীন্দ্র-কাহিনির নায়কের নামে নাম রাখা ছেলেটির সারা জীবন কেটে যাবে রবীন্দ্রনাথের আশ্রয়েই। তিনি গোরা সর্বাধিকারী৷ একসময়ের জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। মেনস্ট্রিম রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের পরিমণ্ডলে তিনি হয়তো সে অর্থে জনপ্রিয়তা পাননি, কিন্তু শান্তিনিকেতনে ‘গোরাদা’ জনপ্রিয় নাম ছিল চিরকাল।

গোরা সর্বাধিকারী, ঋতু গুহ, নীলিমা সেন ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

গোরা মনেপ্রাণে ছিলেন রবীন্দ্র সাধক। ছোট থেকেই রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্র-ভাবনার উপর তাঁর অমোঘ টান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান শিখতে সুদূর জার্মানি যাওয়ার মোহ ছেড়ে শান্তিনিকেতনে চলে এসেছিলেন তিনি। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রবেশিকা পরীক্ষা হচ্ছে শুনে ইন্টারভিউও দিয়ে দেন। পাশ করেন এবং সঙ্গীতভবনে শান্তিদেব ঘোষের অধীনে ভর্তি হন গোরা। সেই শুরু পথা চলা। শান্তিনিকেতনকেই আপন জগত করে নিয়েছিলেন তিনি আজীবন।

রবীন্দ্রসঙ্গীত লেজেন্ড কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোনও রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, একটা সময় গোরাই ছিলেন তাঁর এবং তাঁদের পরিবারের বিশ্বস্ত সঙ্গী। মোহরদির নজরে পড়েন গোরা। মোহরদির সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় বন্ধুতা। ‘মোহরদি’র স্মৃতিকে সন্তর্পণে সঙ্গী করে শান্তিনিকেতনে শিল্পীর ‘আনন্দধারা’ বাড়িতেই নিভৃত প্রহর কেটেছে গোরা সর্বাধিকারীর। একটা সময় এমন ছিল কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কেউ দেখা করতে গেলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হত গোরাদার। গোরাদা মানেই শ্বেতশুভ্র পাজামা-পাঞ্জাবি পরা সৌম্যকান্তি চেহারার রবীন্দ্রসাধক। শান্তিনিকেতনের প্রাণ ছিলেন তিনি।

প্রাক্তন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা অনুশীলা বসুর প্রতিষ্ঠান ‘কলাভৃৎ’-এর অনুষ্ঠানে গোরা সর্বাধিকারী ও মোহরদি

তাঁর কেরিয়ারের সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল তাঁর সঙ্গে কিংবদন্তি সুরকার সলিল চৌধুরীর কানেকশান। সলিল চৌধুরীর করা সংগীত পরিচালনায় প্রথম রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ড করেছিলেন তিনি। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের গানে মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট করলেন সলিল চৌধুরীও। এই একবারই মাত্র সলিল চৌধুরী রবি-গানে সংগীত পরিচালনা করেছিলেন, যা সত্যি বিরল ঘটনা। গোরা সর্বাধিকারীর কণ্ঠে রেকর্ডের প্রথম গানটি ছিল “হাসি কেন নাই ও নয়নে”।

২০ বছর বয়স থেকে বিশ্বভারতীতে থেকে যান তিনি৷ হয়ে ওঠেন বিশ্বভারতীর প্রাণপুরুষ। পরবর্তীকালে বিশ্বভারতীর সঙ্গীতভবনের অধ্যক্ষ হন৷ সেই সঙ্গে বিশ্বভারতীর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক কর্মসমিতির সদস্যও ছিলেন তিনি।

 

শুধু গান নয়, অভিনয়েও দক্ষ ছিলেন শিল্পী। নিয়মিত নাটকও করতেন শান্তিনিকেতনে। গোরা সর্বাধিকারী খুবই রসিক মানুষ ছিলেন। একবার নাকি শখ করে ঘোড়াও কিনেছিলেন। এছাড়া একবার বাজপাখি পুষে বিপদেও পড়েন। আজব নেশায় মেতে থাকতেন তিনি।

বিগত পাঁচ বছর ধরে অ্যালজাইমার্স রোগে ভুগছিলেন। অসুস্থ হয়ে ভুলে গেছিলেন তাঁর প্রাণদেবতা রবীন্দ্রনাথকে। কখনও সখনও ছোটবেলার স্মৃতি থেকে গেয়ে উঠতেন রবীন্দ্রনাথের গান। বহুদিন পরিচিত জনদের দেখে চিনতেও পারতেননা। মৃত্যুতে যেন মুক্তি পেলেন শিল্পী। ১৯ শে জানুয়ারি বুধবার বিকেল ৪.২০ তে বোলপুরের এক নার্সিংহোমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

শিল্পীর প্রয়াণে বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি আশ্রমিক ও প্রাক্তনীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর চলে যাওয়া রবীন্দ্র গবেষণার ক্ষেত্রে এক বিরাট ক্ষতি। তবু রোগ জরার হাত থেকে মুক্তি পেলেন গোরা সর্বাধিকারী।

 

You might also like