Latest News

বিশ্বের একমাত্র মানুষ, একুশ ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন এভারেস্টের চূড়ায়, মর্মান্তিক মৃত্যু হিমালয়েই

The only climber who spent 21 hours on top of Mt Everest.

Everest 

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ছুলেমু গ্রামের বাবু

উত্তর-পূর্ব নেপালের সলু-খুম্বু জেলার তাকসিন্দু এলাকায় আছে শেরপা গ্রাম ‘ছুলেমু’ । সেই গ্রামেই ১৯৬৬ সালে জন্ম  হয়েছিল বাবু ছিরি শেরপার। বাবা লাকপা শেরপা, পেশায় ছিলেন কৃষক। কিন্তু তিনি সাক্ষী ছিলেন পর্বতারোহণের ইতিহাসের সবথেকে বড় সাফল্যটির । ১৯৫৩ সালে হওয়া ব্রিটিশ এভারেস্ট অভিযানে, পোর্টার হিসেবে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন  ১৫ বছরের লাকপা। ইতিহাস গড়া সেই অভিযানে, এভারেস্টের শীর্ষে  বিজয় পতাকা উড়িয়েছিলেন হিলারি ও তেনজিং। সবথেকে উজ্জ্বল সোনার পালকটি বসেছিল শেরপা জাতির মুকুটে।

বাবু ছিরি ছিলেন  লাকপা শেরপার ছোট ছেলে ছিলেন। এলাকায় কোনও স্কুল না থাকায়, পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি বাবুর। প্রতিবেশীর ইয়াক চরাতেন পাহাড়ে পাহাড়ে।  প্রায় সারা বছরই কাটতো বাঁশ দিয়ে তৈরি শেপার্ড হাট বা পাথরের গুহায়। ষোল বছর বয়সে বাবুকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল পাশের গ্রামের মেয়ে পুতি শেরপার সঙ্গে।

বাবুর গ্রাম ছুলেমু

১৯৮০ সাল থেকেই এভারেস্টের আঙিনায় নেমেছিল ট্রেকারদের ঢল। ট্রেকারদের একটি দলের পোর্টার হয়ে বাবু ছিরি গিয়েছিলেন আম্ফু লাপসা পাস ( ১৯১৭৬ ফুট)। ট্রেক শেষে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিলেন। খাওয়ার পিছনেই শেষ হয়ে গিয়েছিল উপার্জন করা সামান্য ক’টি টাকা। এরপর বাবু  দু’বছর কাটিয়েছিলেন কাঠমাণ্ডুতে। মালবাহকের কাজ করতেন।

গ্রামের রাস্তার পাশে স্ত্রী পুতি শুরু করেছিলেন ছোট্ট ‘টি হাউস’। গ্রামে ফিরে এসেছিলেন বাবু, পুতিকে সাহায্য করার জন্য। টি হাউসে আসতেন বিভিন্ন দেশের ট্রেকারেরা। রাঁধুনি হয়ে একটি দলে ঢুকে পড়েছিলেন বাবু।  ফিরেছিলেন কিছু টাকা নিয়ে। কারণ খাবার জন্য খরচ করতে হয়নি। বাবু ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন ট্রেকারদের কাছে।

বাবুর হিমালয়ে অভিযান শুরু এই মেরা শৃঙ্গ দিয়ে

ষাট থেকে আশি কেজি পর্যন্ত মাল বইতেন বাবু। রান্নার হাতও ছিল দারুণ। আগ বাড়িয়ে সাহায্য করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। এভাবেই একদিন পোর্টার হয়ে বাবু ঢুকে পড়েছিলেন এক পর্বতারোহী দলে। শিখে নিয়েছিলেন পর্বতারোহণের খুঁটিনাটি। শিখে নিয়েছিলেন ভাঙাভাঙা ইংরেজি। বাবু জানতেন উপার্জন বাড়াতে গেলে তাঁকে  ক্লাইম্বার শেরপা হতে হবে। না হলে তাঁকে সারা জীবন পোর্টার হয়েই কাটাতে হবে। ১৯৮৫ সালে এক বিদেশি পর্বতারোহী দলের সঙ্গে ২১ ২৪৭ ফুট উঁচু মেরা শৃঙ্গে আরোহণ করেছিলেন বাবু। ট্রেকিং পিক, তবুও শৃঙ্গে পৌঁছে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল বাবুর।

জীবনের মোড় ঘুরিয়েছিল ১৯৮৯ সাল

হাই-অল্টিচিউড পোর্টার হয়ে বাবু ঢুকে পড়েছিলেন এক সোভিয়েত অভিযাত্রী দলে। দলটি হিমালয়ে এসেছিল  বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা আরোহণ করার জন্য। একই অভিযানে কাঞ্চনজঙ্ঘার  বাকি চারটি শৃঙ্গ  আরোহণ করার স্বপ্ন ছিল দলটির। বাবুর আরোহণ দক্ষতা দেখে বাবুকে দ্রুত ক্র্যাশ কোর্স করিয়ে ক্লাইম্বিং শেরপা হিসেবে দলে নিয়েছিল রাশিয়ানরা।

শুরু হয়েছিল অভিযান। ক্যাম্প ফোরে পৌঁছনোর পর টেন্টগুলি হয়ে উঠেছিল হাসপাতাল। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বেশ কিছু রাশিয়ান আরোহী ও শেরপা। সুস্থ ছিলেন আটহাজার মিটারে প্রথম আসা বাবু ছিরি। প্রায় একলা হাতে সেবা শুশ্রষা করে, খাবার বানিয়ে দলটিকে চাঙ্গা করে তুলেছিলেন। সফল হয়েছিল রাশিয়ানদের অভিযান।

দলটির তিন সদস্য আরোহণ করেছিলেন কাঞ্চনজঙ্ঘার মূল শৃঙ্গে, এঁদের মধ্যে ছিলেন কাজাখাস্তানের প্রবাদপ্রতিম পর্বতারোহী আনাতোলি বুক্রিভ। বোতলের অক্সিজেন ছাড়াই ১৯৮৯ সালের ৫ মার্চ, রাশিয়ানদের সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘার শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন বাবু। আদায় করে নিয়েছিলেন গোটা সলু-খুম্বু এলাকার সমীহ।

everest
প্রবাদপ্রতিম এভারেস্ট আরোহী বাবু ছিরি শেরপা

হাতছানি দিয়েছিল এভারেস্ট

পরের বছরে ফরাসি পর্বতারোহী দল এসেছিল এভারেস্টে। দলনেতা ছিলেন মার্ক বাট্রাড। যিনি কয়েক বছর আগে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় এভারেস্টের শৃঙ্গে পৌঁছেছিলেন। এবার তিনি এসেছিলেন এক অবিশ্বাস্য লক্ষ্য নিয়ে। এভারেস্টের শীর্ষে বাট্রাড কাটাবেন আট ঘণ্টা। কিন্তু এভারেস্টের চূড়ায় (Everest Summit) আট ঘণ্টা তো দূরের কথা, দু’ঘণ্টার বেশি টিকতে পারেননি বাট্রাড।

অক্সিজেনের অভাব, অসহনীয় ঠান্ডা ও উন্মত্ত হাওয়ার দাপটে আতঙ্কিত বাট্রাড কোনও মতে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে এসেছিলেন সাউথ কলের ক্যাম্পে। চূড়ায় ফেলে এসেছিলেন তাঁর বহু অভিযানের সঙ্গী স্লিপিং ব্যাগ ও স্টোভ। সেটা জানার পর বাবু ছিরি বলেছিলেন, বাট্রাড অনুমতি দিলে তিনি চূড়া থেকে নিয়ে আসবেন স্লিপিং ব্যাগ ও স্টোভটিকে। স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন বাট্রাড। এভারেস্টে প্রথমবার এসেই বলে কী ছোকরা! একি রাস্তায় পড়ে থাকা জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে আসা!

কিন্তু বাবু ছিলেন নাছোড়বান্দা। বাধ্য হয়ে অনুমতি দিয়েছিলেন দলনেতা বাট্রাড। সেই দিন সন্ধ্যাতেই যাত্রা শুরু করে পরদিন বিকেলে বাবু দলনেতা বাট্রাডকে এনে দিয়েছিলেন তাঁর  স্লিপিং ব্যাগ ও স্টোভ। শৃঙ্গ আরোহণের উদ্দেশ্য ছাড়াই এভারেস্ট শীর্ষে আরোহণ করে ফেলেছিলেন বাবু। বাট্রাডের ফেলে আসা  স্লিপিং ব্যাগ ও স্টোভই ছিল বাবুর প্রথম এভারেস্ট আরোহণের অকাট্য প্রমাণ। কাকতালীয়ভাবেই এভারেস্টার হয়ে গিয়েছিলেন বাবু। এক লহমায় বাবুর উচ্চতা বেড়ে গিয়েছিল পর্বতারোহী ও শেরপাদের মধ্যে।

ক্লায়েন্টের ফেলে আসা জিনিস ফিরিয়ে নিয়ে আসার স্বার্থেই এভারেস্ট শৃঙ্গে উঠেছিলেন বাবু

এরপর বাবুকে আর পিছনে ফিরতে হয়নি। ১৯৯০ সালের পর, ১৯৯১, ১৯৯৩, ১৯৯৫ (দু’বার), ১৯৯৬, ১৯৯৭, ১৯৯৯ (দু’বার) ও ২০০০ সাল মিলিয়ে, বাবু মোট দশবার এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছিলেন বাবু। এর মধ্যে চারটি আরোহণ ছিল তিব্বতের দিক থেকে। চারবার আরোহণ করেছিলেন বোতলের অক্সিজেন ছাড়াই।  এভারেস্টের অঙ্গনে তাঁর  দুটি অসামান্য কীর্তি সাড়া ফেলে দিয়েছিল পর্বতারোহণের দুনিয়ায়। যা পর্বতারোহণের ইতিহাসে আজও লেখা আছে সোনার অক্ষরে।

আরও পড়ুন: মৃত্যু্র পর কেটে গিয়েছিল ২২ বছর, এভারেস্টের বরফে শুয়ে পথ দেখাতেন পালজোর

১৯৯৯ সালের জানুয়ারি

আমেরিকা থেকে এভারেস্ট বেসক্যাম্পে এসেছিলেন ‘মাউন্টেন হার্ডওয়ার’ কোম্পানির টেন্ট ডিজাইনার মার্টিন জেমিটিস। কোম্পানির তৈরি  বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট পরীক্ষা করার জন্য। সে জন্য জেমিটিস খুঁজছিলেন কিছু অভিজ্ঞ ক্লাইম্বার শেরপাকে। কথাও চলছিল কয়েকজনের সঙ্গে। একদিন হঠাৎ জেমিটিসের টেন্টে ঢুকে পড়েছিলেন পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির বাবু। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলেছিলেন,”আমি এভারেস্টের চূড়ায় রাত কাটাতে চাই।  আপনি আমার জন্য একটা  টেন্ট বানিয়ে দিন।” আকাশ থেকে পড়েছিলেন জেমিটিস, “বলো কি! ডেথ জোন (২৬০০০ ফুটের ওপরের অংশ) থেকে মানুষ প্রাণ বাঁচানোর জন্য দ্রুত নেমে আসতে চায়। আর তুমি সেখানে পুরো এক রাত কাটাতে চাইছো! এ তো আত্মহত্যা!”

চোয়াল শক্ত করে বাবু বলেছিলেন, তিনি তখনও পর্যন্ত সাতবার এভারেস্ট আরোহণ করে ফেলেছেন। একবারও অসুস্থ হননি। চারবার তিনি বোতলের অক্সিজেন ব্যবহার করেননি। বাবুর মানসিক দৃঢ়তা ও শক্তপোক্ত কাঠামো দেখে বাবুকে ফিরিয়ে দিতে পারেননি জেমিটিস। বিনাপয়সায় বাবুর জন্য বানিয়ে দিয়েছিলেন বিশেষ ধরণের টেন্ট , স্লিপিং ব্যাগ, ম্যাট্রেস ও  পোশাক। যেগুলি কার্যক্ষম থাকবে মাইনাস তিরিশ ডিগ্রি তাপমাত্রাতেও।

টিভিতে বাবুর স্মৃতি রোমন্থন করছেন মার্টিন জেমিটিস

জেমিটিস জানতেন বাবু যদি সফল হয়, তাহলে কোম্পানির শেয়ারের দর উল্কাগতিতে বৃদ্ধি পাবে। বাবুও জানতেন তিনি সফল হতে পারলে পাবেন স্পনসর ও পর্যাপ্ত অর্থ। যা দিয়ে তিনি গ্রামে গড়বেন প্রাইমারি স্কুল। এছাড়াও পর্বতারোহণের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে যাবে বাবু ছিরি শেরপার নাম। মাউন্টেন হার্ডওয়ার বাবুর অভিযানটির নাম দিয়েছিল “Sleep on Mt. Everest Summit”

ইতিহাস গড়েছিলেন বাবু ছিরি

১৯৯৯ সালের  ৫ মে, সাউথ কল ক্যাম্প থেকে বিকেলে রওনা হয়েছিলেন বাবু, বড়ভাই দাওয়া ও শেরপা নিমা দোর্জেকে সঙ্গে নিয়ে। ৬ মে সকাল সাড়্রে দশটার সময় তাঁরা পৌঁছে গিয়েছিলেন এভারেস্টের চূড়ায়।জায়গাটি টেন্ট পাতার জন্য মোটেই নিরাপদ নয়। তবুও ঢালু বরফ চেঁছে, কিছুটা জায়গা সমান করে তিনজনে পেতে ফেলেছিলেন জেমিটিসের দেওয়া ‘আমেরিকান স্কাই’ টেন্ট। টেন্টের ভেতরে ম্যাট্রেস ও স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে ঢুকে গিয়েছিলেন বাবু। এভারেস্ট শৃঙ্গ ও বাবুর কিছু ছবি তুলে নেমে এসেছিলেন দাওয়া ও নিমা।

এভারেস্ট শৃঙ্গে পাতা বাবুর সেই টেন্ট

চিকিৎসকেরা বাবুকে ঘুমাতে বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, এভারেস্টের চূড়ায় একবার ঘুমিয়ে পড়লে সে ঘুম আর ভাঙবে না। প্রতি দুই ঘন্টা অন্তর রেডিওর মাধ্যমে নিচের ক্যাম্পে খবর পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।  কিন্তু কেটে গিয়েছিল আট ঘণ্টা। বাবুর খবর পায়নি ক্যাম্প-টু। ক্যাম্পটিতে ছিলেন আমেরিকার পর্বতারোহী হেইডি হকিন্স, দাওয়া ও নিমা। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন দাওয়া। নিশ্চয়ই ভয়ানক কিছু ঘটে গেছে। নির্ঘাত ঘুমিয়ে পড়েছে ঘুমকাতুরে বাবু। জমে গিয়েছে ঠাণ্ডায়। নয়তো এভারেস্টের চূড়ার উন্মত্ত বাতাস টেন্ট শুদ্ধ বাবুকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে গভীর খাদে।

কিন্তু এভারেস্টের চূড়ায় বাবু ছিলেন মহানন্দে। ভুলেই গিয়েছিলেন দু’ঘণ্টা অন্তর দাদাকে খবর পাঠানোর কথা। দুটি রেডিও ছিল তাঁর কাছে। একটি বন্ধ করে অন্যটি দিয়ে বাবু তখন ব্যস্ত ছিলেন, তিব্বতের দিকে থাকা ক্যাম্পগুলির অপরিচিত আরোহীদের সঙ্গে ঠাট্টা মস্করায়। এভাবেই কেটে গিয়েছিল ৬ মে দিনটি। সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ বাবুর মনে পড়েছিল দাদাকে খবর দেওয়ার কথা। দাওয়ার ওয়াকি টকিতে ভেসে এসেছিল বাবুর গলা, “দাই, চিন্তা নাগারনুহোস, মা ঠিকা ছু।” আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলেন দাওয়া। চিন্তায় ফেলার জন্য বকেও দিয়েছিলেন ভাইকে।

বিকেলে বাবু টেন্ট থেকে বেরিয়ে কিছু ছবি তুলে আবার ঢুকে পড়েছিলেন টেন্টে। দাদা আবার মনে করিয়ে দিয়েছিলেন না ঘুমানোর কথা। তাই বাবু শুকনো ফল ও ফলের রস খেয়ে আবার রেডিওতে কথা বলা শুরু করেছিলেন। সন্ধ্যা নেমেছিল এভারেস্টের চূড়ায়। রেডিওতে অন্য কোনও দলের সঙ্গে যোগাযোগ হলে বাবু বলছিলেন, “আর দেরি কোর না। তাড়াতাড়ি উঠে এসো। আমি ফলের রস নিয়ে অপেক্ষা করছি।” বলেই শিশুর মতো হেসে ফেলছিলেন। সারা রাত ধরে কখনও দাদার সঙ্গে কখনও অন্য ক্যাম্পের আরোহীদের সঙ্গে ঠাট্টা ইয়ার্কি করেছিলেন বাবু।

তখন এভারেস্টের চূড়ায় রাত জাগছিলেন বাবু

একসময় প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়েছিল এভারেস্টের চূড়ায়। টেন্ট থেকে বেরিয়ে বাবু উড়িয়েছিলেন নেপালের জাতীয় পতাকা, গেয়েছিলেন জাতীয় সঙ্গীত। সঙ্গীতটি তিনি রেকর্ডও করেছিলেন নেপালরাজ বীরেন্দ্রকে উপহার দেওয়ার জন্য। ৭ তারিখ সকাল সাতটা পঞ্চান্ন মিনিটে টেন্ট গুটিয়ে বাবু নামতে শুরু করেছিলেন নিচের দিকে। বিশ্বের প্রথম মানুষ হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় গোটা একটি রাত কাটিয়ে। বোতলের অক্সিজেন ছাড়াই।

যমালয়ে ২১ ঘণ্টা কাটিয়ে বেঁচে ফেরা জীবন্ত মানুষ বাবু ছিরিকে দেখে ছুটে এসেছিল, বেসক্যাম্পে অপেক্ষা করা বিদেশি সংবাদ মাধ্যম। নেপালের জাতীয় নায়ক হয়ে গিয়েছিলেন বাবু। মাত্র কুড়ি দিন পর, ২৬ মে আবার আরোহণ করেছিলেন এভারেস্ট শৃঙ্গে । কাঠমাণ্ডুতে ফেরার পর বাবুকে দেওয়া হয়েছিল রাজকীয় সম্মান। বিশ্বরেকর্ড করা বাবুকে নিয়ে হয়েছিল বিশাল শোভাযাত্রা।

রাজার পাঠানো বিশেষ বিমানে লুকলা থেকে কাঠমাণ্ডু এসেছিলেন বাবু

পরের বছরই আবার বিশ্বরেকর্ড

বেসক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু করে এভারেস্টের শীর্ষে পৌঁছাতে সময় লাগে চারদিন। কম সময়ে এভারেস্ট আরোহণের রেকর্ড তখন ছিল কাজি শেরপার দখলে। ১৯৯৮ সালে মাত্র ২০ ঘণ্টায় এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন কাজি। পর্বতারোহণ জগতে ‘স্টান্ট ক্লাইম্বার’ খেতাব পাওয়া বাবু চেয়েছিলেন ‘স্পিড ক্লাইম্বার’ খেতাব দখল করতে।

২০০০ সালের ২০ মে, বেসক্যাম্প থেকে বিকেল পাঁচটায় যাত্রা শুরু করে, রাত আড়াইটের সময় বাবু পৌঁছে গিয়েছিলেন সাউথ কলের ক্যাম্পে। সেখানে পোশাক পালটে, সামান্য কিছু খেয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন শৃঙ্গের দিকে। তখন সাউথ কলের ওপর বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায়  ৯৩ কিলোমিটার। এই বিপজ্জনক আবহাওয়ার মধ্যেই, পরদিন সকাল ৯ টা ৫৬ মিনিটে বাবু পৌঁছে গিয়েছিলেন এভারেস্টের চূড়ায়। বেসক্যাম্প থেকে শৃঙ্গে পৌঁছাবার জন্য সময় নিয়েছিলেন মাত্র ১৬ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট। ভেঙে গিয়েছিল কাজি শেরপার রেকর্ড। স্পিড ক্লাইম্বারের খেতাবওটি ছিনিয়ে নিয়েছিলেন বাবু ছিরি শেরপা।

এভারেস্টের ইতিহাসের অন্যতম সেরা আরোহী বাবু ছিরি শেরপা

মর্মান্তিক মৃত্যু ভেঙে দিয়েছিল বাবুর শেষ স্বপ্ন

‘স্টান্ট ক্লাইম্বার’ ও ‘স্পিড ক্লাইম্বার’ আখ্যা পাওয়া বাবু চেয়েছিলেন সবথেকে বেশিবার এভারেস্ট আরোহণ করার রেকর্ড গড়তে। কারণ বাবু ছিরি শেরপা তখন এক ব্র্যান্ডের নাম। ঘুরে ফেলেছেন কানাডা, চিন, ইতালি, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও আমেরিকা। পর্বতারোহণ করেছিলেন সেসব দেশেও। তাঁকে স্পনসর  ও ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করার জন্য মুখিয়ে ছিল বিশ্বের বহু খ্যাতনামা সংস্থা। কাঠমান্ডুর থামেলে বাবু গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব সংস্থা ‘নোমাড এক্সপিডিশনস’। স্কুলের মুখ না দেখা বাবু, এগারো হাজার ডলার খরচ করে নিজের গ্রামে গড়ে তুলেছিলেন প্রাইমারি স্কুল। তিনি চাইতেন শেরপা শিশুরাও হোক কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।

সেই স্কুল আজও আছে, শিশুরা আছে, দরদী বাবুই শুধু নেই

প্রবাদপ্রতিম পর্বতারোহী আংরিটা শেরপার দশবার এভারেস্ট আরোহণের রেকর্ড ২০০০ সালেই ছুঁয়ে ফেলেছিলেন বাবু। তাঁর সামনে ছিলেন একমাত্র আপা শেরপা। আপা তখনও পর্যন্ত এভারেস্টে আরোহণ করেছিলেন ১১ বার । ২০০১ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হয়েছিল ‘কাঠমান্ডু মেট্রোপলিটন এভারেস্ট এক্সপিডিশন-২০০১’ । বাবু ছিলেন দলনেতা। বেসক্যাম্পে আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পর দল নিয়ে বাবু চলে গিয়েছিলেন ২০৯৯৭ ফুট উচ্চতায় থাকা ক্যাম্প-টুতে। অপেক্ষা করছিলেন শৃঙ্গ আরোহণের জন্য কয়েক ঘণ্টার উপযুক্ত আবহাওয়া বা ওয়েদার উইন্ডোর।

ক্যাম্প-টু

দিনটি ছিল ২৯ এপ্রিল। সকাল থেকেই প্রবল তুষারপাত হয়ে চলেছিল। চিন্তিত বাবু মাঝে মাঝেই ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এভারেস্টের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছিলেন। বিকেল চারটে নাগাদ থেমে গিয়েছিল তুষারপাত। গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে ক্যামেরা নিয়ে টেন্টের বাইরে বেরিয়ে ছিলেন বাবু। বিভিন্ন দিক থেকে ক্যাম্পের ছবি তুলছিলেন সোনালি বিকেলে। সবাই ছিলেন টেন্টের ভেতর। বাবুই ছিলেন বাইরে। বিকেল গড়িয়ে এসেছিল সন্ধ্যা। ফিরে আসেননি বাবু। উদবিগ্ন সহ আরোহীরা আলো নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন বাবুর খোঁজে। দলের এক সদস্য খুঁজে পেয়েছিলেন বাবুর পায়ের ছাপ। পায়ের শেষ ছাপটি পাওয়া গিয়েছিল একটি ছোট তুষার ফাটলের সামনে। মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল দলের সদস্যদের মুখ।

বাবুর পায়ের ছাপ থেমে গিয়েছিল এরকমই এক ফাটলের সামনে

ঝুরো বরফ ঢেকে রেখেছিল সংকীর্ণ তুষার ফাটলটি কে। সময় নষ্ট না করে, অসম্ভব ঝুঁকি নিয়ে, অ্যাঙ্কর করা রোপে নিজেকে বেঁধে তুষার ফাটলে নেমে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার পর্বতারোহী উইলি বেনেগাস। তুষার ফাটলের জমাট অন্ধকার সরে গিয়েছিল তাঁর হেডলাইটের আলোয়। অতি সন্তর্পণে ঝুরো বরফ সরিয়ে চলেছিলেন বেনেগাস। কারণ জোরে আঘাত করলে দেওয়ালের বরফ ধসে তাঁরই তুষারসমাধি ঘটবে। প্রায় দু’ঘণ্টা বরফ সরানোর পর দেখা গিয়েছিল একটি পা। বাবুর পা। শিউরে উঠেছিলেন বেনেগাস। দ্রুত উঠে এসেছিলেন ওপরে। ঘোষণা করেছিলেন বাবুর মৃত্যু সংবাদ।

পরদিন ভোরে, সূর্য ওঠার আগে, তিন ঘণ্টার দুঃসাহসিক চেষ্টায়, তুলে আনা হয়েছিল তুষার ফাটলে চিরনিদ্রায় শুয়ে থাকা বাবু ছিরি শেরপার দেহ। কাজ ফেলে বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে ছুটে এসেছিলেন ষাট জন শেরপা। কাঁদতে কাঁদতে বেসক্যাম্পে ফিরিয়ে এনেছিলেন শেরপা জাতির গৌরব, পঁয়ত্রিশ বছরের বাবু ছিরি শেরপার নিথর দেহ। স্থম্ভিত হয়ে গিয়েছিল বিশ্ব।

বাবুর মৃত্যুকে নেপালের জাতীয় বিপর্যয় বলে ঘোষণা করেছিল নেপাল। ১ মে, বাবুর পার্থিব শরীর নিয়ে আসা হয়েছিল কাঠমাণ্ডুতে। সেদিনও বাবুকে শেষ দেখা দেখবার জন্য এসেছিলেন কয়েক লক্ষ মানুষ। গোটা নেপালকে চোখের জলে ভাসিয়ে, সেদিন বিকেলে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন, এভারেস্টের রূপকথার অন্যতম নায়ক বাবু ছিরি শেরপা।

নেপাল আজও ভোলেনি জাতীয় নায়ক বাবু ছিরি শেরপাকে

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like