Latest News

হাড়ের বাঁশি (সপ্তত্রিংশতি পর্ব)

আশ্রমের ঘরে বন্যার তন্দ্রায় কতগুলি অস্পষ্ট দৃশ্য ভেসে উঠল। খুব যে পরিচিত এমন নয় আবার অপরিচিতও বলা যায় না। ক্ষণিকের জন্য পৃথ্বীশের মুখ এসে অস্ফুট স্বরে দু-একটি কথা বলল, আবার পরক্ষণেই শ্যাম তালুকদারের হাসিমুখ ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল মাঈ-কি-বাগিয়ার পুরনো আমলকি গাছের পাতায়। বন্যার দু’চোখে একটি শহরের ঝিলিমিলি, কবেকার এক বাড়ির ছাদ, ছাদের একপাশে হাওড়া ব্রিজ আর অন্যদিকে দ্বিতীয় হুগলী সেতু দোলা খায়। মাঝে মাঝে মেঘের ছায়া এসে ঢেকে দেয় দুজনকেই। তার নীচে ছোট ছোট ঘর বাড়ি, পুরনো ছাদে ওঠার লোহার প্যাঁচানো সিঁড়ি, যুবক বটের চারা হাত পা নেড়ে খেলা করে দেওয়ালের কিনারে।রাস্তা দিয়ে বয়ে যায় কত মানুষ, সাদা ট্যাক্সি, হলদে-লাল মিনি বাস কত হাতে টানা উঁচু রিক্সা। নতুন রঙ করা হগ সাহেবের বাজারের চূড়ো ছাড়িয়ে আরও ওপরের ওই পাবের ছাদে বসে থাকে দুজন অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে। সেই ছাদ যার দুদিকে দুটো ব্রিজ, কবেকার জলধারা পেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা। বিয়ারের গ্লাসে ফেনা ওঠে আর চিকেন ল্যাট মে কাইএর গন্ধ ছেলেমেয়ে দুটোর শরীরে ছুঁয়ে ভেসে বেড়ায় এক অলৌকিক শহরের আকাশে। ওরা গল্প করে, কে কবে কাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল তার গল্প, কে এখনও ছেড়ে যেতে পারছে না সেই পুরনো কিসসা শোনায় পরস্পরকে। একসময় শেষ হয় গল্প। দুজন নেমে আসে নীচে পড়ে থাকা এবড়ো খেবড়ো রাস্তায়। জমে থাকে জল, বন্ধ দোকান বাজার, শ্রাবণের আকাশ ভারী মেঘের বাক্সে বন্দি, চুঁয়ে চুঁয়ে নেমে আসছে জলকণা, রাস্তার হলুদ আলো তাদের চারপাশে। সে সব পার হয়ে মেয়েটির কানের ঝুমকো কিনতে হেঁটে চলেছে দুজন! পুরনো এক শহরে বেজে ওঠে অদৃশ্য স্যাক্সাফোন। শুনশান সদর স্ট্রি ট। অসময়ের ছাতিম ফুটেছে কোথাও ? আততায়ীর মতো তখনই ধেয়ে আসে বৃষ্টি। বঙ্গোপসাগর থেকে এতদূর পাড়ি দিয়েও অক্লান্ত ভিজে বাতাস। জল ও বাতাসের আসন্ন এই দ্বৈরথে একটা ছাতা সম্বল করে ওরাই বা কতদূর যাবে! 

 

ওদের মনে নেই, একদিন সেই কার্তিকের জ্যোৎস্না আর ভুতুড়ে কুয়াশা সম্বলিত ভুলোর চরে সনাতনের গোরুর গাড়ি, আবছা চারকেঁচের আলো, সেই বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা, কিছুই মনে নেই।

 

ঘাটে ঘাটে বয়ে যাওয়া পানসি, সিরাজগঞ্জের ঘাট, সারাদিন ধরে কত বিকিকিনি, মাছ বিক্রি করে দিনান্তে ভেসে যাওয়া ক্লান্ত বৈঠা বেয়ে, ছইএর তলায় গরম ভাত আর কাঁচা লঙ্কা-কালো জিরে ফোড়নের গন্ধ মেশা নদীর দামাল বাতাস, সব বিস্মৃত হয়েছে ওরা।

 

কিছুই মনে থাকে না মানুষের, বারবার ভুলে যায়। মাটির দাওয়া, লাল রাস্তার শেষে একখানি খোড়ো চালের ঘর, ধূ ধূ মাঠ বেয়ে ধেয়ে আসা পৌষের রুখু বাতাস সব বিস্মৃত হয়। 

 

তারপর একখানি ছাতা সম্বল করে হেঁটে যাচ্ছে একজন অচেনা মানুষ, পৃথ্বীশ কি? ওই যে গির্জার ঘন্টা শোনা যাচ্ছে, মারাঠা ডিচ খালের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রাস্তা, গ্যাসের বাতি জ্বলে উঠছে রাস্তায়, জানবাজারের মুখে বেলফুলওয়ালা বিক্রি করছে তার কুসুম, জুড়ি গাড়ি বাবুদের নিয়ে ছুটে যাচ্ছে হাড়কাটা, প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রি টে, স্টার থেট্যারে বেজে উঠল ক্ল্যারিওনেট, চৈতন্য লীলার পালা আজ, কত বিনোদিনী দাসী আর তিনকড়ি দাসীদের চোখের জল আজ আশ্রয় নিয়েছে মেঘের ওপারে….

 

লোকটি হেঁটে চলেছে, গঙ্গার ঘাট পার হয়ে, ঘোলা জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে, আরও উত্তরে, বারাণসীর আরতি দেখা যায় ওই যে, আরও উত্তরে, গঙ্গা যেখানে সমতল স্পর্শ করল, আরও ওপরে, ওই যে তুষারাবৃত হিমালয়….কোন যুগের বাতাস বয়ে আসছে।

 

ওই বাতাসই কি চৈত্রে অন্যরূপ নেয়? ধু ধু চোত মাসের রোদপোড়া মাঠ। কান্নার শব্দের মতো ঘুরে ঘুরে বেড়ায় রুখু বাতাস। আগুনের হলকা তার শরীরে। ফ্যাকাশে নীলরঙা আকাশ। দিকচক্রবাল রেখার ওপর তিরতির করে যেন কাঁপছে অস্পষ্ট গাছপালা। ছেলে বিয়োনো মায়ের মতো রক্তশূন্য মাঠ খাঁ খাঁ করছে। জলের অভাবে ধুঁকছে গাছের দল। বড় অশ্বত্থ গাছটার ছায়াও কেমন যেন ম্লান। মাটি ফুটিফাটা। বাকুলি গ্রামের সীমায় দু চারঘর বাগদিদের বাস। খোড়ো চালের ঘর। চালার খড় শুকিয়ে আমসি। রাঢ়দেশের তীব্র চৈত মাস। আর একটু এগিয়ে বড় মায়ের পুকুর। বাকুলি গাঁয়ে তিন মা। বড়, মেজ আর ছোট মা।তিন ভিনু দুর্গা পুজো। মায়ের কাঠামো সারাবছর একই থাকে। শুধু পুজোর আগে নতুন মাটি চাপে। রঙ পড়ে। পালদের পুজো। পালদের ছেলেমেয়েরা সব বাইরে। সম্বৎসর পুজোর সময় দেশে ফেরে। কিন্তু সে শরৎ কালের গল্প। এখন সবে চৈত মাস। বড় মায়ের নামে মানত করা পালদের পুকুর পার হলেই আরেকটা ছোট পুকুর। বউ ডুবির পুকুর। কোনকালে হাঁড়িদের সোমত্ত আইবুড়ো মেয়ে নাকি পুকুরে ডুবে মরেছিল।এই ভরা খরা মাসেও বড় মায়ের পুকুরে জল টলটল করে। বউ ডুবির পুকুরের জল ঘোলা, তলানিতে পড়ে আছে। তার পাশেই এক প্রকাণ্ড তাল গাছ। হেলে পড়েছে পুকুরের ওপর। বিশ্বাস বাড়ির মেজ ছেলে তরুণ কদিন ধরেই এই রোদে ওই পুকুর পাড়া বসে থাকে। ওর কাকা তিনবছর হল ওই গাছেই গলায় দড়ি দিয়েছিল। এমনই চৈত মাস। বেলা আন্দাজ তিনটে হবে। গলা ঝুলে বুক অবধি নেমে এসেছিল।চোখের সাদা মণি ফোটে রক্তের ধারা। মুখে গ্যাঁজলা। ঘাড় ভেঙে নেতিয়ে পড়েছিল একপাশে। পুলিশ এসে বডি নিয়ে গিয়েছিল। দড়িটাও নিয়েছিল। পাকা হলুদ রঙা দড়ি। শুকনো ছাল ওঠা। যেন কেউ হলুদ আগুনে পুড়িয়েছে দড়িটাকে। এমন গাঁয়ে ওই দড়ি কোথা থেকে এসেছিল কেউ জানে না।

 

বিশ্বাস-বাড়ি পার হলেই পথ দেখা যায়, অনেকদূরে বয়ে-যাওয়া পথ, থোকা থোকা আকন্দ ফুলে ভরে আছে চারপাশ। রোগা ধুলোয় ঢাকা পথ তাদের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে এক ভাঙা দেউলের দিকে। শ্যাওলার সর পড়া পুকুর একদিকে। তারপর যতদূর চোখ যায় খয়েরি রঙা মাঠ। ফ্যাকাশে আকাশের নীচে সবুজ ধানি জমি। মন্দিরের পিছনে আঁশশ্যাওড়ার ঘন জঙ্গল। ছোট ছোট বটগাছের শিকড়ে ছেয়ে আছে দেউলের গম্বুজ। পুরনো বাংলা ইঁটের ওপর থেকে খসে গেছে পলেস্তরা। এক প্রকাণ্ড বটগাছ ফাল্গুন মাসের খর রোদ্দুরেও ছায়া বিছিয়ে রেখেছে পরম মমতায়। শুকনো পাতা, বটফল খসে পড়ছে নিজের মনে। মাঝে মাঝে হাহাকারময় বাতাস ছুটে আসছে ওই মাঠ পার হয়ে। পাক খেয়ে উঠছে ধুলো। বিবাগী সে-হাওয়ায় বিগত শীতকালের স্মৃতি স্পষ্ট। শুকনো গা-হাত-পা চড়চড় করে ওঠে তার স্পর্শে। ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে রক্ত ঝরে স্নেহের অভাবে। বন্যা পায়ে পায়ে ভাঙা দেউলের দিকে এগিয়ে গেল।

 

মধ্যবয়সী এক মানুষ বসে আছেন মন্দিরের চাতালে। জীর্ণ রক্তাম্বর। দীর্ঘ জট চুলে। একমুখ দাড়ি।রুপোলি রঙ ধরেছে সেখানে।যদিও চওড়া কাঁধ আর বলিষ্ঠ বাহু জুড়ে ফেলে আসা যৌবনের পদধ্বনি স্পষ্ট শোনা যায়।পা ফেটে চৌচির।একদৃষ্টে চেয়ে আছেন সামনের দিকে। কাঠকুটো জড়ো করে আগুন জ্বালিয়েছেন। তিনটে পাথরের টুকরোর ওপর সেই আগুনে বসানো কালো মেটে হাঁড়ি। জল ফুটছে। গরম বাস্পের ভেতর দিয়ে তিরতির করে কাঁপছে দেউল।পাশে আরেকটা মাটির সরায় পাঁচ মেশালি চাল, দুটো বেগুন, একফালি কুমড়ো, কয়েকটা আলু। বুড়ো শিব থানের সিধে। ভোগ নিবেদন করে ওই সন্ন্যাসী প্রসাদ পাবেন। দু একটা বেলপাতা, গঙ্গাজল, একমুঠো আকন্দ ফুল আর ওই হবিষ্যি, বড় সামান্য উপচার। ফাল্গুনের রোদ আর তীব্র হবে তখন।গরম ভাপ উঠবে মাঠের ওপর থেকে। জ্বলতে থাকবে শুকনো বাতাস। কিন্তু কী শীতল এই ভাঙা দেউলের প্রাঙ্গন। চাতালে হয়তো বিশ্রাম নেবেন ওই সন্ন্যাসী। কত পুরনো বাস্তুসাপ খেলা করে যাবে তাঁর নিদ্রিত শরীরের কাছে। খসে পড়বে বটফল। দেউলের কোটরে বসে থাকা শ্বেত প্যাঁচা প্রস্তুত হবে আসন্ন সন্ধ্যার জন্য।ক্ষুধার জন্য। শিকার ধরার লড়াইএর জন্য আরও একবার। 

 

ওই সন্ন্যাসীর কি তখন মনে পড়বে তাঁর ফেলে আসা গৃহের কথা ? তাঁর বৃদ্ধ বাবা মায়ের কথা ? এতদিনে তাঁরা হয়তো মারা গেছেন! স্ত্রী পুত্র ছিল ? সেই কোন কাঁচা বয়সে হয়তো ঘর ছেড়েছিলেন। এমনই কোনও মধুমাসে। কোনও মঠে ছিলেন তিনি ? তারপর হয়তো বেরিয়ে এসেছেন মঠ থেকে, এই ভ্রাম্যমান অনিকেত জীবনকে ভালোবেসে। পথকে ভালোবেসে। তাঁরই তো এই ধুলায় ঢাকা দ্বিপ্রহরে এমন জীর্ণ দেউলে উপাসনা করার কথা ছিল। বন্যার তন্দ্রায় মনে প্রশ্ন ভেসে উঠল, পেলেন তাঁর ইষ্টকে ? একবারের জন্যও ? পরক্ষণেই ভাবল, কে জানে! হয়তো পেয়েছেন সেই অসীম অলৌকিক করুণা স্পর্শ। হয়তো পাননি, রুক্ষ বাতাসের মতো শুকনো হয়ে উঠেছে জীবন। ভালোবাসাহীন এক অভিশপ্ত জীবন।

 

           চিত্রকর: শুভ্রনীল ঘোষ                                  পরের পর্ব :  পরবর্তী শনিবার

সায়ন্তন ঠাকুর, গদ্যকার, সরল অনাড়ম্বর একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত। পূর্বপ্রকাশিত উপন্যাস নয়নপথগামী ও শাকম্ভরী। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, বাসাংসি জীর্ণানি।

 

 

 

হাড়ের বাঁশি (ষটত্রিংশ পর্ব)

You might also like