Latest News

প্রাণের স্রোত চলেছে প্রয়াগপানে

শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য, প্রয়াগরাজ

গঙ্গাসাগর থেকে উজানে স্রোত বয়ে চলেছে প্রয়াগে। শুধু গঙ্গাসাগর কেন, সারা ভারতের মহামানবের স্রোত এখন প্রয়াগরাজ অভিমুখী। মকর সংক্রান্তির পুণ্য দিনে সারা ভারত জুড়ে স্নান আর উৎসব। এলাকা বিশেষে তার কত নাম। এই বাংলায় সবচেয়ে বড় মেলাটি ( গঙ্গাসাগর ) তো এই মকর সংক্রান্তির দিনে। উজানে তো সত্যি স্রোত বয়েছিল, মা গঙ্গা উজানে অজয় নদ ধরে দেখা দিয়েছিলেন পরম ভক্ত জয়দেবকে। সেই দিনটাও ছিল মকর সংক্রান্তির দিন। উজানে মা গঙ্গা, জয়দেব কেন্দুলির কদম্বখণ্ডির ঘাট অবধি এসেছিলেন। জয়দেব সেখানে স্নান করেছিলেন। তাকে ঘিরেই এই মকর সংক্রান্তিতে বহু কাল ধরে মেলা চলে আসছে। এমনই হাজারো উৎসব ছেড়ে মকর সংক্রান্তিতে যাওয়া হয়ে ওঠে না ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের। সারা ভারত জুড়ে যে হাজারো উৎসব, কুম্ভমেলার মকর সংক্রান্তির দিনে তাই অনেকেরই যাওয়া হয়ে ওঠে না। তাছাড়া এ বছর প্রয়াগরাজে অর্ধকুম্ভ, চলবে তিন মাস, স্নানের যোগও অনেকগুলি। তাই মকরের স্নান মিটিয়েই চলেছেন অনেকে। সহজ ও সরলভাবে স্রোত তাই প্রয়াগ অভিমুখী। আমিও চলেছি হাওড়া থেকে যোধপুর এক্সপ্রেসে এলাহাবাদ।

গঙ্গাসাগর মেলার পর হাওড়া স্টেশনে এখনও সাধারণ মানুষ ও সাধু-সন্ন্যাসীতে পরিপূর্ণ। কেউ বাড়ির পথে, তবে বেশিরভাগই কুম্ভের পথে। যোধপুর এক্সপ্রেস মানে রাজস্থানের বহু মানুষ এতে চলেছেন। চুরু থেকে পুরো পরিবার নিয়ে এসেছেন শর্মাজী। নিজেই উদ্যোগ করে অনেক আগে থেকেই টিকিট কেটেছিলেন। পেশায় ব্যবসায়ী শর্মাজীর কথায়, “প্রতি বছর তো বেরনো হয় না। তাই স্ত্রী, বড় ছেলে-বউমা, নাতি-নাতনি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। মেজো ছেলে এখন ব্যবসা দেখছে।” পুরিতে জগন্নাথ দর্শন করে, গঙ্গাসাগরে স্নান সেরে এ বার চলেছেন কুম্ভে। তারপর বাড়ির পথে।

আকাশ পরিষ্কার। কুয়াশা নেই। তবু যোধপুর এক্সপ্রেস ছ’ঘণ্টা লেটে ছুটছে। সারা পৃথিবী জুড়ে যে মেলার সুনাম, সেই মেলায় পৌঁছানোর গতির খবর বড় ধীর। হাওড়া থেকে আসার পথে এতো ছোট-খাটো স্টেশনে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। ফলে নানান যাত্রীতে কামরা পরিপূর্ণ হয়েছে। বসার জায়গা, করিডর সব পরিপূর্ণ। তার মাঝে গানের কলি ভেসে আসে-

“হর দেশ মে তু, হর বেশ মে তু

তেরি নাম অনেক, তু একই হ্যায়”

পায়ে পায়ে এগিয়ে আলাপ করি। নাম সুদর্শন সাউ। দেখতে ভালো না হলেও গলাটি ভারি মিষ্টি। আরা স্টেশন থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে ওনাদের গ্রাম। গ্রামের জনা কুড়ি মানুষ দল বেধে চলেছে কুম্ভ স্নানে। নানান প্রশ্ন করে যেটুকু জানতে পারি, তা শুনে রীতিমতো চমকে উঠি। “বেশি জানার চেয়ে বিশ্বাসটা বেশি বাড়ানোর চেষ্টা করছি”, এটা ছিল সুদর্শনের উত্তর।

যে মানুষ শুদ্ধ মনে প্রয়াগ কুম্ভমেলার সময় স্নান করবেন, তিনি রাজসূয় যজ্ঞ ও অশ্বমেধ যজ্ঞের সমান ফল লাভ করবেন ও রাহুমুক্ত চন্দ্রের মতো পাপমুক্ত হয়ে মুক্তি পাবেন।

এই যে কাতারে কাতারে মানুষ, পুঁটুলি মাথায়, বোঁচকা নিয়ে দলে দলে ভক্তির স্রোতে চলেছে, এরা কি জানে কোন গ্রহ কোন রাশিতে অবস্থান করলে কুম্ভযোগ হয়। এই মানুষগুলো দলে দলে স্নানে আসলেও এরা রাজসূয় যজ্ঞ ও অশ্বমেধ যজ্ঞের কথা জানেন না। আর জানলেও তাঁরা এই লাভ আশা করেন না।

কুম্ভে উপস্থিত হওয়া মানুষের শতকরা ২০ ভাগ মানুষ গ্রহ-নক্ষত্র-রাশির হিসাব কষে যোগে স্নান ও স্নানের পরের পুণ্য লাভের আশায় হিসাবপত্র করেন। বাকি শতকরা ৮০ ভাগ যান বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও পরম্পরায় ডুব দিতে। সেখানে চাওয়া-পাওয়ার হিসেব বড় কম। সেখানে বেশিরভাগটা জুড়ে আছে শুধু ভক্তি।

সব তীর্থের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো প্রয়াগ, এ কথা যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন ঋষি মার্কন্ডেয়। প্রয়াগে গঙ্গা, যমুনা ও অন্তঃসলিলা সরস্বতীর মিলন ঘটেছে। প্রয়াগে প্রতি ১২ বছর অন্তর পূর্ণকুম্ভ হয়। কুম্ভে যেতে পারলেই পুণ্য সঞ্চয়, এটাই বেশিরভাগ মানুষের বিশ্বাস। তাই এই তিন মাস ধরে যে মেলা চলবে তাতে কোটি কোটি মানুষের উপস্থিতি তারই জানান দেয়।

বৃহস্পতির মেষরাশিতে অবস্থানের সময় রবি ও চন্দ্র মকর রাশিতে অবস্থান করলে অমাবস্যা তিথিতে কুম্ভযোগ হয়ে থাকে প্রয়াগে। এলাহাবাদ অর্থাৎ অধুনা প্রয়াগরাজ ছাড়া হরিদ্বার, উজ্জয়িনী ও নাসিকে কুম্ভমেলা হয়ে থাকে। কুম্ভমেলা তিন প্রকারের হয়ে থাকে। পূর্ণকুম্ভ, অর্ধকুম্ভ ও মহাকুম্ভ। এ বছর এখানে অর্ধকুম্ভ। সব রীতিনীতি মেনেই জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত চলবে মেলা। প্রথম শাহি স্নান হয়ে গেল মকর সংক্রান্তির দিন। আমি চলেছি ২১ জানুয়ারি অর্থাৎ ৬ মাঘ, পৌষী পূর্ণিমার দিন শাহি স্নানে। এরপর শাহি স্নান চলবে ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ২০ মাঘ পৌষী অমাবস্যার দিন। ১০ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ২৬ মাঘ শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমীর দিন, ১৯ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ৬ ফাল্গুন মাঘী পূর্ণিমার দিন এবং ৪ মার্চ অর্থাৎ ১৯ ফাল্গুন মহাশিবরাত্রির দিন।

 

ট্রেনে আলাপ হলো হুগলি জেলার অরূপ ঘোষের সঙ্গে। পেশায় ডাক্তার। বড় বড় ক্যামেরা ও লেন্স নিয়ে কুম্ভে চলেছেন বন্ধুদের সঙ্গে। জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনার কুম্ভে যাওয়ার উদ্দেশ্য কি ছবি তোলা?” উত্তর এল, “না, মানুষ দেখা। ছবিটা মুখ্য ব্যাপার নয়।” ফের প্রশ্ন করি, “আপনি কি ধর্ম-কর্ম সম্বন্ধে বিশাসী?” ডাক্তার উত্তর দিলেন, “আমি নাস্তিক নই। আবার প্রচলিত গোঁড়া ধার্মিকও নই। এত মানুষের উপস্থিতি, এত আনন্দ, এত মেলামেশা, সব নিয়ে আমি মানবধামে আছি।”

You might also like