Latest News

প্রেমের জন্য সিংহাসন ছেড়ে পথের ভিখিরি, কে এই বিতর্কিত রাজা?

শাশ্বতী সান্যাল

আধুনিক বিজ্ঞান যতই অ্যাড্রিনালিনের তত্ত্ব কপচাক, প্রেম আজও এই পৃথিবীর অন্তিম বিস্ময়। সেই কত যুগ আগে চণ্ডীদাস বলেছিলেন, ‘এক মরণে দুজন মরে প্রেমের কাছে হার মানি’, সেই কথারই প্রতিধ্বনি তুলেছে নানা দেশে নানা সময়ের প্রেমিক-যুগলেরা। ভালোবাসার জন্য যুগে যুগে অসম্ভবকে সম্ভব করেছে মানুষ। সাতসমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে, কাঁটাতার ভেঙে কখনও পাড়ি দিয়েছে সুদূরে, ফাঁসির মঞ্চে নির্ভীক দাঁড়িয়ে গেয়েছে জীবনের গান, কখনও বা প্রেমের পায়ের কাছে মণিমুক্তোখচিত তাজ নামিয়ে রেখে মিশে গেছে পথের ধুলোয়। লায়লা-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট বা শিরি-ফরহাদের প্রেমকাহিনি তো মিথ হয়ে গেছে। কিন্তু এর বাইরেও রয়েছে ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের অনেক অজানা রোমাঞ্চক গল্প। তেমনই এক রক্তমাংসের প্রেম, যা একসময় নাড়িয়ে দিয়েছিল রক্ষণশীল ব্রিটিশ রাজপরিবারের (King) ভিত।

আভিজাত্যের সঙ্গে প্রেমের সংঘর্ষ পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন নয়। দুর্দান্ত প্রভাবশালী, নাকউঁচু ব্রিটিশ রাজপরিবার ‘হাউস অব উইন্ডসর’কেও একাধিকবার সংকটে পড়তে হয়েছে শুধু ‘প্রেমের কারণে’। এমনকি সেই প্রেমের আকর্ষণের কাছে নিমেষে ফিকে হয়ে গেছে সিংহাসনের লোভও। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সেসব গল্প আজ বিশ্বজুড়ে আলোচিত। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের জীবন যেন তেমনই এক রূপকথার গল্প। নীলরক্তের অধিকারী হয়েও এক সাধারণ নারীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য যিনি স্বেচ্ছায় ত্যাগ করেছিলেন সিংহাসন। পায়ে ঠেলেছিলেন ঐশ্বর্য ও বিপুল ক্ষমতালাভের সব সুযোগ। অথচ যার জন্য এত কিছু করেছেন, তিনি কোনও অসাধারণ সুন্দরী, রূপে-গুণে অদ্বিতীয়া ডানাকাটা পরি নন। রাজকন্যা নন। অভিজাত বংশগৌরবও নেই তাঁর। নিছকই এক সাধারণ ঘরের বউ। তবু সেই পরস্ত্রীকেই ভালোবেসে মহাপরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সিংহাসন ছেড়ে মাটির পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন এক রাজা। তিনি অষ্টম এডওয়ার্ড।

পরকীয়া, সমকাম নানা বিতর্কে বর্ণময় এই সুলতান, কেমন ছিলেন বাস্তবের খিলজি

১৮৯৪ সালের ২৩শে জুন ব্রিটিশ রাজপরিবারে জন্ম হয় এডওয়ার্ডের। রাজা পঞ্চম জর্জ ও রানি মেরির সন্তান রাজপুত্র এডওয়ার্ড ছিলেন সুদর্শন আর অভিজাত। তাঁর সোনালি চুল, নীলাভ চোখ আর মায়াবী চেহারার জাদুতে আকৃষ্ট হত যে কেউ। যে কোনও নারীর আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। প্রথম জীবনে প্রচুর নারী এলেও এডওয়ার্ডের জীবনে কেউই পাকাপাকি জায়গা করে নিতে পারেনি। একসময়ের ‘প্লে বয়’ আখ্যা পাওয়া এই এডওয়ার্ডের জীবনকেই এক ধাক্কায় নাড়িয়ে দিয়েছিল মধ্যবয়স্কা এক নারী, যার নাম ওয়ালিস সিম্পসন।সেটা ছিল ১৯৩১ সালের ১০ই জানুয়ারি, সপ্তাহ শেষের এক বিকেলে এডওয়ার্ড গেছেন তাঁর তৎকালীন প্রেমিকা লেডি ফারনেসের কান্ট্রিহাউসে। শহর থেকে দূরে উইকএন্ড নৈশভোজের হইচই আর ভিড়ের মধ্যেই তাঁর চোখ আটকে যায় এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীর উপর। কেতাদুরস্ত পোশাক, সাজসজ্জা আর এটিকেটে ততক্ষণে অনেকেরই নজর কেড়েছেন সেই নারী। জন্মসূত্রে মার্কিন এই মহিলার নাম বেসি ওয়ালিস ওয়ারফিল্ড, বিবাহসূত্রে বেসি ওয়ালিস সিম্পসন। বেসি ওয়ালিস জন্মেছিলেন আমেরিকার বাল্টিমোরের মেরিল্যান্ড শহরে। উনিশ শতকের মধ্যভাগ, সারা আমেরিকা জুড়ে তখন দাস ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত। এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে সেসময় বেশ ভালো পরিমাণ কাঁচা টাকাপয়সার মালিক হয়ে উঠেছিল এই ওয়ারফিল্ড পরিবার। ওয়ালিস যখন ছোট, সেসময় হঠাৎ যক্ষ্মায় মারা যান তাঁর বাবা। আচমকা দুর্ঘটনায় টলোমলো সংসার। ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে তাঁর মা চলে আসেন ওয়ালিসের এক কাকার আশ্রয়ে। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ পরিচারিকা, ম্যানেজার ও কর্মচারীদের সঙ্গেই বড় হয়ে ওঠে বেসি। রূপসী বলতে যা বোঝায়, তেমনটি না হলেও চেহারায় একটা আলগা চটক ছিল বেসি সিম্পসনের, ছিল আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন, শিষ্টাচার আর ফ্যাশন সচেতনতা। বেসি ওয়ালিসের স্বামী আর্নেস্ট সিম্পসনের ছিল জাহাজের চাকরি। সেই চাকরিসূত্রেই ১৯২৮ সালে আমেরিকা থেকে প্রথমবার লন্ডন আসেন ওয়ালিস। আর্নেস্ট সিম্পসন ছিলেন ওয়ারিশের দ্বিতীয় স্বামী। এর আগে পেশায় নেভি পাইলট আর্ল উইনফিল্ড স্পেনসারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল ওয়ালিসের। দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে লন্ডনে আসার পর মেফেয়ার অঞ্চলে বড় একটা ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন আর্নেস্ট ও ওয়ালিস। তার কিছুদিন পরই লেডি ফারনেসের কান্ট্রিহাউসে সেই বিখ্যাত নৈশভোজ, যাতে প্রথম দেখাতেই বেসি ওয়ালিশের প্রেমে পড়েন যুবরাজ এডওয়ার্ড। এডওয়ার্ড তখন প্রিন্স অব ওয়েলস। ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী, বিপুল ক্ষমতা আর সম্মানের শীর্ষে। অথচ ওয়ালিসের কাছে সেসবের যেন কোনও মূল্যই ছিল না। তাঁর এই পাত্তা না দেওয়ার ব্যাপারটাই এডওয়ার্ডকে আরও বেশি আকৃষ্ট করেছিল। যুবরাজ এডওয়ার্ডকে পাত্তা না দিলেও মানুষ এডওয়ার্ডকে মনে ধরেছিল ওয়ালিস সিম্পসনেরও। দুজনের এই পারস্পরিক ভালোলাগা কিছুদিনের মধ্যেই ভালোবাসায় পরিণত হয়। পারস্পরিক আকর্ষণ বিকর্ষণের খেলায় আরও শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে দুজনের সম্পর্কের বাঁধন। কয়েক বছর পর এডওয়ার্ড ওয়ালিসকে বাকিংহাম প্যালেসে নিয়ে আসেন, পরিচয় করিয়ে দেন রানি মেরি সহ রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে। এইসময় থেকেই দুজনকে ঘিরে হাওয়ায় উড়তে থাকে নানা জল্পনা-কল্পনা ও গুজব। মুখে মুখে খবর পৌঁছয় ওয়ালিসের দ্বিতীয় স্বামী আর্নেস্ট সিম্পসনের কাছেও। স্বাভাবিকভাবেই ওয়ালিসের সঙ্গে তাঁর স্বামীর দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে এইসময়। মতান্তর মনান্তরের পর ধীরে ধীরে ডিভোর্সের মামলার দিকে এগোয় তাঁরা। এদিকে এডওয়ার্ড আর ওয়েলিশের প্রেম তখন মধ্যগগনে। ওয়ালিসকে একের পর এক দামি উপহারে ভরিয়ে দিচ্ছেন যুবরাজ। উদ্দাম ভালোবাসা এমন জায়গায় পৌঁছয় যে সমাজ-সংসারকে ফুঁৎকারে উড়িয়ে একটি দুর্গে সেসময় পুরো এক সপ্তাহ একান্তে কাটান দুজনে। কিন্তু সেই নির্ভীক ভালোবাসাই কাল হয়ে দাঁড়াল।

এই সেই দুর্গ যেখানে একান্তে এক সপ্তাহকাল কাটিয়েছিলেন দুজনে

১৯৩৬ সাল নাগাদ রাজা পঞ্চম জর্জের মৃত্যুর পর প্রথা অনুযায়ী রাজা হন তাঁর ছেলে এডওয়ার্ড। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, যেখানে সূর্য কখনও অস্ত যায় না, সেই বারোশ বছরের পুরোনো, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সিংহাসনে বসলেন অষ্টম এডওয়ার্ড। কিন্তু সিংহাসনে মন ছিল না তাঁর। রাজ্যাভিষেকের কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল সেটা। এক দিন বাকিংহাম প্যালেসে প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলি বল্ডউইনকে ডেকে এডওয়ার্ড বলেন, তিনি ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করতে চান, শুধু আর্নেস্টের সঙ্গে ওঁর বিবাহবিচ্ছেদের অপেক্ষা করছেন।

প্রবল আপত্তি তুলল ব্রিটিশ সরকার ও চার্চ। আইনগত জটিলতাও তৈরি হল বিস্তর। ওয়ালিশের সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় স্বামী সিম্পসনে তখন ডিভোর্স হয়নি, সবেমাত্র মামলা উঠেছে আদালতে। এবং তারও আগে নিজেওর প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়েছেন ওয়ালিশ। একাধিক বিবাহ এবং বিবাহভঙ্গের কলঙ্ক যে মহিলার উপর, তাঁকে রাজবধূর স্বীকৃতি দিতে একেবারের অরাজি ছিল উন্নাসিক ব্রিটিশ রাজপরিবার। এমনকি সাধারণ মানুষও এই সম্পর্ককে সহজভাবে নেয়নি। সবদিক বিচার করে প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলি বল্ডউইন সাফ জানিয়ে দিলেন এই বিয়ে কোনওভাবেই রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বীকৃতি পাবে না।

প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলি বল্ডউইন

দেশের আইন অনুযায়ী ইংল্যান্ডের রাজা শুধু দেশের প্রধান নন, গির্জারও প্রধান। আর সেই সুবাদে তিনি এমন কোনও নারীকে বিয়ে করতে পারেন না যাঁর দু’বার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে, এমনকি যাঁর প্রাক্তন স্বামীরা জীবিত। স্ট্যানলি এটাও বলে রাখলেন যে এডওয়ার্ড যদি নিয়ম ভেঙে বিয়ে করেন তাহলে তিনি বাধ্য হবেন পদত্যাগ করতে। সেক্ষেত্রে আবার নতুন করে নির্বাচন হবে, নিরপেক্ষ রাজা হিসাবেও কোনও গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না এডওয়ার্ডের।
ওয়ালিসকে বিয়ে করলে পরিণতি কী হতে পারে তা ভালোই বুঝতে পারছিলেন এডওয়ার্ড। সিংহাসন তো হারাবেনই, এমনকি জনরোষে সর্বসমক্ষে অপমানিতও হতে পারেন। “তবু প্রেম কিছুতে না মানে পরাভব”… এডওয়ার্ড মনস্থির করেছিলেন, দরকার পড়লে তিনি সিংহাসন ছাড়বেন, কিন্তু প্রেমিকা ওয়ালিসকে ছাড়বেন না। এডওয়ার্ডের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে না কি একমত ছিলেন না ওয়ালিস নিজেও। সমস্ত জানার পর তিনি এডওয়ার্ডকে প্রবল ভৎসনাও করেছিলেন বলে জানা যায়। প্রশাসনিক চাপ, প্রিয়জনদের অনুনয়, প্রেমিকার ভৎসনা- কিছুতেই এক ইঞ্চি টলানো যায়নি হিজ হাইনেসকে। সমস্তরকম চাপের মধ্যেও নিজের সিদ্ধান্তে আগাগোড়া অনড় ছিলেন রাজা এডওয়ার্ড।১৯৩৬ সালের ১১ ডিসেম্বরে সেই চরম সিদ্ধান্ত নিলেন এডওয়ার্ড। সিংহাসন ত্যাগ করবেন মনস্থির করেছিলেন আগেই। সেই অনুযায়ী ঝোড়ো সিদ্ধান্ত নিলেন এবার। দেরি না করে ১১ তারিখ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নিজের পদত্যাগপত্র বা ‘অ্যাবডিকেশন’ জমা দেন হিস হাইনেস। প্রেমের জন্য সিংহাসন ত্যাগ, বাস্তবে এমনও হয়! সারা বিশ্বে প্রায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সেই আশ্চর্য বার্তা। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সেদিন কী বলেছিলেন রাজা? বলেছিলেন, ‘‘রাজা হিসেবে আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা বহন করা আমার পক্ষে অসম্ভব, যদি না আমি সেই নারীর সমর্থন ও সাহায্য পাই, যাঁকে আমি ভালবেসেছি।’’  ইংল্যান্ড সহ গোটা বিশ্ব চমকে উঠেছিল এডওয়ার্ডের এই ঘোষণায়।

সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার মুহূর্তে রাজা এডওয়ার্ড অষ্টম

ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কম মেয়াদি রাজার তালিকার শীর্ষে রয়েছে রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের নাম। বাবা পঞ্চম জর্জের মৃত্যুর পর ১৯৩৬ সালের ২০ জানুয়ারি রাজা হয়েছিলেন এডওয়ার্ড। মাত্র ৩২৬ দিনের মাথায় সিংহাসন ত্যাগ করেন তিনি। রাজত্বলাভের একবছরের মেয়াদ ফুরোনোর আগেই সরে আসেন ক্ষমতা দখলের খেলা থেকে।
পদত্যাগের পরের দিনই ইংল্যান্ড ছেড়ে অস্ট্রিয়ায় চলে যান এডওয়ার্ড। ১৯৩৭ সালের ৩ জুন ফ্রান্সের এক দুর্গে খুব গোপনে সাধারণভাবে বিয়ে সারেন এডওয়ার্ড ও ওয়ালিস। বিয়ের দিন ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের কেউই উপস্থিত ছিলেন না। রাজা ষষ্ঠ জর্জের কড়া নির্দেশ ছিল, এডওয়ার্ডের বিয়েতে যেন রাজপরিবারের কেউ উপস্থিত না থাকেন। রাজপরিবারের জাঁকজমক থেকে বহু দূরে শুভদৃষ্টি সম্পন্ন হয় প্রেমিকযুগলের। এরপর সারাটা জীবনই প্রেমিকাকে নিজের মতো করে কাছে পেয়েছেন, আগলে রেখেছেন এডওয়ার্ড। ওয়ালিস সিম্পসনও আগের দুই স্বামীকে ডিভোর্স করলেও বাকি জীবনটা স্বচ্ছন্দে কাটিয়ে দিয়েছেন উদ্দাম প্রেমে, তাঁর প্রিয় পুরুষ তথা তৃতীয় স্বামী, অষ্টম এডওয়ার্ডের সঙ্গেই।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like