Latest News

ওজন যাই হোক, আপনি সুন্দর, বলছেন এই প্লাস সাইজ মডেল, জানুন তাঁর জীবনযুদ্ধের গল্প

ওজন বেশি বলে মনঃকষ্টে ভুগছেন! পথেঘাটে শুনতে হচ্ছে টোন টিটকিরি! সমালোচনা করতে ছাড়ছেন না বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজনেরাও! এ অবস্থায় যা হয়, নিজেকে অসুন্দর ভেবে হীনম্মন্যতায় ভোগে মানুষ। আত্মবিশ্বাস কমতে কমতে ঠেকে তলানিতে। যেকোনও কাজ শুরু করার আগেই নিজেকে ‘হেরো’ মনে হয়। ‘তন্বী শ্যামা শিখরদশনা’ নন বলে ভালবাসতে ভুলে যাবেন নিজেকে? না কি নাকানিচোবানি খাবেন, অস্বাস্থ্যকর ডায়েট আর জিমের জাঁতাকলে! তার চেয়ে আসুন না, নিজের জীবন নিজের শর্তে বাঁচা যাক। সুন্দরের যে কোনও শরীরী সংজ্ঞা হয়না, সে কথাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন নেহা পারুলকরের মতো কিছু মানুষ। নেহা পারুলকরের নাম জানেন তো! ভারতের প্রথম প্লাস সাইজ এই মডেলের জীবন আজ অনেক মানুষের প্রেরণা। (Neha Parulkar)

Image - ওজন যাই হোক, আপনি সুন্দর, বলছেন এই প্লাস সাইজ মডেল, জানুন তাঁর জীবনযুদ্ধের গল্প

বিষয়টা খুব সহজ ছিল না, বিশেষ করে ভারতের মতো দেশে। যেখানে এখনও ছিমছাম চেহারা আর ফর্সা গায়ের রঙ না হলে সেই মেয়েকে সুন্দরী বলে বিবেচনাই করা হয় না! যেখানে এখনও হাসি মজার ছলে অনায়াসে চলে বডিশেমিং। সৌন্দর্যের সংজ্ঞা অনেকদিন আগে থেকেই একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল পাশ্চাত্যের দেশগুলোয়। শরীরের কোনও পূর্বনির্ধারিত মাপ নয়, বডি পজিটিভিটিই সেখানে গ্ল্যামারের আসল কথা। কিন্তু ভারতের কথা আলাদা। এখানে এখনও বিয়ের বিজ্ঞাপনে নির্লজ্জভাবে লেখা থাকে গৌরবর্ণা, সুশ্রী, রোগা মেয়ের দাবি। কালো হওয়ার অপরাধে পুড়িয়ে মারা হয় গৃহবধূকে। এ দেশের মানুষের মতোই এ দেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিও সৌন্দর্যের কিছু পুরোনো বস্তাপচা ধারণাকে আঁকড়ে রেখেছে আজও৷ সেখানে একজন সো-কল্ড ‘মোটা’ মানুষের নিজেকে মডেল হিসাবে প্রমাণ করার লড়াইটা সহজ তো নয়ই,বরং বলা চলে আর পাঁচজনের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।

২০১৬য় এ দেশের বুকে প্রথম এক অভিনব ফ্যাশন শো’র আয়োজন করা হয়। এদেশের চিরাচরিত সৌন্দর্যের ধারণাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সেদিন রানওয়েতে হেঁটেছিলেন নারী পুরুষ মিলিয়ে জনা ১০ প্লাস সাইজ মডেল। নেহা পারুলকরেরও (Neha Parulkar) সেই প্রথম র‍্যাম্পে হাঁটা। ওজনজনিত শ্লথতা নয়, তাঁর উচ্ছ্বল আনন্দমুখর শরীরের ভাষা সেদিন উজ্জীবিত করেছিল অনেক মানুষকে। সেই শুরু, আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি নেহাকে। জীবনের রানওয়েতেও অবলীলায় হাসতে হাসতে পেরিয়ে এসেছেন অজস্র হার্ডল।

Image - ওজন যাই হোক, আপনি সুন্দর, বলছেন এই প্লাস সাইজ মডেল, জানুন তাঁর জীবনযুদ্ধের গল্প

অবশ্য সমালোচনাও পিছন ছাড়েনি নেহার। তিনি জানতেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই সোসাইটিতে নিজেকে মেলে ধরা। সৌন্দর্য সম্পর্কে মানুষ এখনও কিছু পূর্ব নির্ধারিত ধ্যানধারণার খাঁচায় বন্দি থাকতেই ভালোবাসেন৷ তাঁদের কাছে মডেল মানেই ছিপছিপে গ্ল্যামারাস কম ওজনের কেউ। ওজনই যে মানুষের একমাত্র পরিচয় নয়, সে কথা অনেকেই বুঝতে পারেন না, বা বুঝেও অস্বীকার করেন। এমনকি দেশের ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোও প্লাস সাইজের মানুষদের জন্য পোশাক বানানোকে প্রায়োরিটি দেয় না। নামীদামি ব্র্যান্ডের ফ্যাশন পোশাকের যে সম্ভার, সেখানেও প্লাস সাইজ মানুষের প্রবেশাধিকার প্রায় নেই বললেই চলে। যেন ওজন বেশি হলে ফ্যাশনেবল পোশাক পরারও অধিকার থাকে না মানুষের! এই অসাম্যের বিরুদ্ধেও প্রথম মুখ খোলেন নেহা।

‘ট্রাবল চাইল্ড’ হিসাবে জন্ম। হ্যাঁ ছোটোবেলা থেকেই স্বাভাবিকের তুলনায় ওজন বেশি ছিল নেহার। অতিরিক্ত ওজনের পাশাপাশি ওই দুধের বয়স থেকেই লড়তে হয়েছে সমালোচনা আর নেতিবাচক মন্তব্যের বিরুদ্ধেও। দিনের পর দিন বডিশেমিংয়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কত প্রাণঘাতি হতে পারে, রোজ রোজ সমালোচনা কীভাবে একটা হাসিখুশি বাচ্চাকেও বদলে দেয়, বিষণ্ণতা আর ডিপ্রেশনের শিকার করে তোলে, তা জানেন নেহা। ওজন কমানোর জন্য চেষ্টা কম করেননি নেহা। সমাজের চোখে সুন্দর হতে গিয়ে একসময় খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন নিয়মিত জিমে যাওয়াও। কিন্তু কিছুতেই কোনও ফল হয়নি।

এই গল্প শুধু নেহার নয়, ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে আমাদের দেশের কয়েক লক্ষ মানুষ এভাবেই বডিশেমিংয়ের শিকার হন প্রতিদিন। পথেঘাটে, সোশ্যাল মিডিয়ায় সর্বত্র চলে টোন টিটকিরি। এদের সঙ্গে এক হয়েও নেহার গল্পটা কিন্তু সামান্য আলাদা।

রোজকার টানাপোড়েন আর মানসিক লড়াই ভিতরে ভিতরে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং আর জেদি করে তুলেছিল নেহা পারুলকরকে। একটা অসম অন্যায় লড়াইয়ে নেমেছেন বুঝেছিলেন। বুঝেছিলেন, অন্যের কাছে নিজেকে ঠিকঠাক প্রমাণ করার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি নিজেকে ভালবাসা৷

Image - ওজন যাই হোক, আপনি সুন্দর, বলছেন এই প্লাস সাইজ মডেল, জানুন তাঁর জীবনযুদ্ধের গল্প

প্রথম যখন সিদ্ধান্ত নেন মডেল হবেন বাড়ির লোকজন এমনকি বন্ধুবান্ধবেরাও হাসাহাসি করতে ছাড়েনি। ১০০ কেজি ওজন নিয়ে মডেলিং! এও কি সম্ভব! সম্ভব কী না, র‍্যাম্পে দাঁড়িয়েই সেকথা প্রমাণ করেছেন নেহা পারুলকর। এ মুহূর্তে দেশের অন্যতম হট এন্ড হ্যাপেনিং প্লাস সাইজ মডেল তিনি। নামীদামি সমস্ত ফ্যাশন জার্নালে বেরিয়েছে তাঁর ছবি, ইন্টারভ্যিউ। নিজের স্বপ্নকে সত্যি করার পথে কোনও হার্ডলই থামিয়ে দিতে পারেনি তাঁকে।

একটি সাক্ষাৎকারে ভারতের এই প্রথম প্লাস সাইজ মডেল দুঃখ করে বলেছিলেন, “এখনও এমন একদিনও যায়না, যেদিন নিজের শরীর নিয়ে কথা শুনতে হয়নি আমায়।
বিশেষ করে ভার্চুয়াল মিডিয়ায়। মানুষের অনুভূতির বিশেষ দাম নেই এই ভার্চুয়াল জগতে।” অপমানিত হলেও ভেঙে পড়ার বা হার মানার মেয়ে নন নেহা পারুলকর। সমাজের স্টিরিওটাইপ ভাবনাচিন্তার বিরুদ্ধেই তো তাঁর আসল লড়াই। তাই সমাজের এই সো কল্ড ঠিক-ভুলকেই চ্যালেঞ্জ করে বসলেন নেহা। সুইমস্যুট পরে এবার একের পর এক ছবি তুললেন তিনি। সেসব ছবি প্রকাশ পেল একাধিক ফ্যাশন ম্যাগাজিনে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও। কে বলেছে মোটা হলে পরা যাবে না বিকিনি বা সুইমিংস্যুটের মতো খোলামেলা পোশাক! নেহা দেখিয়ে দিলেন সাইজ নয়, মনের জোরটাই আসল কথা। চিরাচরিত সৌন্দর্য সচেতনতার বিরুদ্ধে এ এক নীরব প্রতিবাদ, যা আজ প্রভাবিত করছে আরও অনেককে।

Image - ওজন যাই হোক, আপনি সুন্দর, বলছেন এই প্লাস সাইজ মডেল, জানুন তাঁর জীবনযুদ্ধের গল্প

চেহারা যেমনই হোক, তা নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। কারণ আপনার চেহারাই আপনার একমাত্র পরিচয় নয়। নিজের ভিতরের পজেটিভ এনার্জি বাড়িয়ে তুলুন। এই ছোট্ট জীবনে অন্যের চোখ দিয়ে নিজেকে বিচার না করে নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের মতো করে আনন্দে বাঁচুন প্রত্যেকটা দিন, নিজের যাপন দিয়ে রোজ আমাদের এ কথাই শেখাচ্ছেন নেহার মতো বিদ্রোহিণীরা।

You might also like