Latest News

মদে আকণ্ঠ ডুবে থাকা, দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী, তবু অটুট ছিল তাঁর রসবোধ

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: মৃত্যুর বহু আগেই তিনি লিখে গিয়েছিলেন নিজের সমাধিলিপি। মৃত্যুর পনেরো বছর পরে তাঁর সমাধিক্ষেত্রে উৎকীর্ণ করা হয় সেই কবিতা। চরম দারিদ্র্য, অনাহার, অনটন এবং চিকিৎসার অভাবে এমনই এক বর্ষার দিনে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়েছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার প্রথম মহাকবি, নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর মৃত্যু আজও লজ্জা দেয় আমাদের। মাথা নীচু হয়ে আসে লোয়ার সার্কুলার রোডে তাঁর ঘুমন্ত শেষ শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে। যেখানে কবির আবক্ষ মূর্তির ঠিক নীচেই লেখা আছে তাঁরই স্বরচিত এপিটাফ-
“দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে
( জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম ) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত
দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!…”

হ্যাঁ, তিনিই দত্তকুলোদ্ভব কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। (Michael Madhusudan Dutt)

Image - মদে আকণ্ঠ ডুবে থাকা, দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী, তবু অটুট ছিল তাঁর রসবোধ

১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে এক জমিদার বংশে তাঁর জন্ম। বাবা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার একজন প্রতিষ্ঠিত উকিল। মা জাহ্নবী দেবী ছিলেন একাধারে স্নেহশীলা, অন্যদিকে অত্যন্ত কড়া প্রকৃতির মানুষ। তাঁরই তত্ত্বাবধানে শিশু মধুসূদনের পড়াশোনা শুরু হয়। প্রথমে তাঁকে ভর্তি করা হয় সাগরদাঁড়ির পাঠশালায়। পরে সাত বছর বয়সে কলকাতার খিদিরপুর স্কুলে ভর্তি হন মধুসূদন। সেখানে বছর দুয়েক পড়ার পর ১৮৩৩ সালে তৎকালীন বিখ্যাত হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষা শেখেন। মধুসূদনের জীবনের পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে হিন্দু কলেজ ও সেই কলেজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর একটা বড় ভূমিকা রয়েছে।

ছেলেবেলা থেকেই মেধাবী আর উদ্ধত ছিলেন মধুসূদন। কিন্তু তাঁর প্রতিভার যথার্থ বিকাশ ঘটেছিল হিন্দু কলেজেই। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ, যাঁরা পরবর্তী জীবনে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এঁদের মধ্যে গৌরদাস বসাক ছিলেন মধুসূদনের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। (Michael Madhusudan Dutt)

বন্ধু গৌরদাস বসাক

হিন্দু কলেজে পড়ার সময় থেকেই কাব্য রচনায় হাত পাকিয়েছিলেন মধুসূদন। লিখতেন মূলত ইংরাজি ভাষায়। Bengal Spectator, Literary Gleamer, Calcutta Library Gazette, Literary Blossom, Comet, জ্ঞানান্বেষণ প্রভৃতি তখনকার কলকাতার বিখ্যাত সাহিত্যপত্রিকাগুলোতে ছাপা হত সেসব কবিতা। একদিন কলেজের আড্ডার ফাঁকে মধুর লেখালিখির প্রসঙ্গ উঠতেই এক বন্ধু একটু ঠেস দিয়ে বলে ওঠে, ‘মধু, তুই বাংলায় কাব্য চর্চা করিস না কেন? পারিস না বলে?’

চাইলে মধুসূদন পারে না, এমন কিছু আছে না কি! বন্ধুর সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে তক্ষুনি খাতাকলম খুলে বসলেন মধু। খসখস করে লিখে ফেললেন ‘বর্ষাকাল’ নামে আট পঙক্তির একটা কবিতা। খাঁটি মাতৃভাষায় লেখা সেই কবিতাটা কেমন ছিল জানেন?

“গভীর গর্জ্জন সদা করে জলধর,
উথলিল নদনদী ধরণী উপর।
রমণী রমণ লয়ে, সুখে কেলি করে,
দানবাদি দেব, যক্ষ সুখিত অন্তরে।
সমীরণ ঘন ঘন ঝন ঝন রব,
বরুণ প্রবল দেখি প্রবল প্রভাব।
স্বাধীন হইয়া পাছে পরাধীন হয়,
কলহ করয়ে কোন মতে শান্ত নয়॥” (বর্ষাকাল, মাইকেল মধুসূদন দত্ত)

কবিতা লেখা শেষ করে আড্ডার মধ্যেই উচ্চৈস্বরে পাঠ করে শোনালেন মধুসূদন। বন্ধুদের তো ততক্ষণে মুখ চুন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। পাঠ শেষ করে মধুসূদন হাসতে হাসতে বন্ধুদের ডেকে বললেন, ‘মিলিয়ে দেখো, প্রতিটি চরণের প্রথম বর্ণ নিয়ে আমার বন্ধু গৌরদাস বসাকের নাম হয়।’ শুধু প্রতিভা নয়, রসবোধেও সার্থকনামা ছিলেন মধুকবি। (Michael Madhusudan Dutt)

Image - মদে আকণ্ঠ ডুবে থাকা, দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী, তবু অটুট ছিল তাঁর রসবোধ
তৎকালীন হিন্দু কলেজ

বিলেত যাওয়ার ইচ্ছে তাঁর অনেকদিনের। স্বপ্ন দেখতেন বিদেশের মাটিতে সাহিত্যচর্চা করে শেক্সপিয়ার, মিলটন প্রমুখের মতো খ্যাতিমান কবি হয়ে উঠবেন। এমনিতে বাবা রাজনারায়ণের সঙ্গে ছেলের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। একসঙ্গে গড়গড়া টানতেন, এমনকি মদও না কি খেতেন দুজনে। কিন্তু কলকাতার নব্য ইয়ংবেঙ্গলদের সঙ্গে মধুর বেশি বেশি মেলামেশায় শঙ্কিত হলেন রাজনারায়ণ। ছেলে অল্প বয়সেই বিপথে যাচ্ছে এমন আশঙ্কা থেকে মধুসূদনের বিয়ে দেবেন বলে মনস্থির করেন তিনি। মনমতো পছন্দ করে আনেন পরমাসুন্দরী পাত্রী। এদিকে সে খবর কানে যেতেই রেগে আগুন মধুসূদন পালানোর ফিকির খুঁজতে থাকেন। শেষমেশ একেবারে চরম সিদ্ধান্তই নিয়ে নেন, ঠিক করেন ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়ে যাবেন।

শিল্পীর কল্পনায় কিশোর মধুসূদন

১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মাত্র উনিশ বছর বয়সে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নিলেন তিনি। শ্রীযুক্ত বাবু মধুসূদন দত্ত হয়ে গেলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। অবশ্য এ ব্যাপারে মধুসূদনের জীবনীকারদের কেউ কেউ ভিন্নমতও পোষণ করেন। কারও কারও মতে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে দেবকীর প্রতি গোপন প্রেমমুগ্ধতা ছিল মধুসূদনের। তাঁকে পাওয়ার ইচ্ছাতেই না কি তিনি ‘খ্রিস্টান’ হয়ে যান।

ঘটনা যাই হোক, এই ধর্মত্যাগের ফল ভালো হয়নি। খ্রিস্টান হওয়ার অপরাধে হিন্দু কলেজ ছাড়তে হয় তাঁকে। এদিকে বাবাও টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেন। জমিদারের ছেলের তাঁবেদারের অভাব ছিল না। কিন্তু অর্থকষ্ট দেখা দিতেই সেসম আত্মীয় বন্ধুরা একে একে ছেড়ে চলে যায়। কিছুদিন বিশপ্স কলেজে পড়াশোনা করেন বটে, কিন্তু টাকার অভাবে সেখানেও বেশিদিন থাকা হয় না। শেষমেশ চাকরির খোঁজে বাংলা ছেড়ে সুদূর মাদ্রাজে যাওয়াই মনস্থ করেন মধুসূদন।

Image - মদে আকণ্ঠ ডুবে থাকা, দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী, তবু অটুট ছিল তাঁর রসবোধ

১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬, সুদীর্ঘ আট বছর মাদ্রাজে ছিলেন মধুসূদন। স্কুলে ছাত্র পড়িয়েছেন, করেছেন সাংবাদিকতাও৷ মাদ্রাজে থাকাকালীন ‘টিমোথি পেনপোয়েম’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতে শুরু করেন মধুসূদন। ‘ম্যাড্রাস সার্কুলার’ পত্রিকার জন্য ‘ক্যাপটিভ লেডি’ লিখে কবি হিসাবে পরিচিতি ও সমাদরও লাভ করেন। লেখেন ‘ভিশনস অব দ্য পাস্ট’। মাদ্রাজ-বাসের এই আটবছর মাইকেলের জীবনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে থাকাকালীন ১৮৪৮ সালে রেবেকা থমসন নামে এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানকে বিয়ে করেন তিনি। প্রেমের বিয়ে। চার ছেলেমেয়েও জন্মায়। কিন্তু সে বিয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি৷ প্রেমে পড়েন এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া নামে এক ফরাসি তরুণীর। ১৯৫৬ সালে স্ত্রী সন্তান ফেলে মাইকেল পালিয়ে আসেন কলকাতায়। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েই কলকাতায় ফিরেছিলেন মাইকেল। কিছুদিন পর মাদ্রাজ ছেড়ে এমিলিয়া হেনরিয়েটাও এসে পড়েন তাঁর কাছে। রেবেকা পর্ব মুছে ফেলে শুরু হয় জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। বাকি জীবন মাইকেলের সুখে দুঃখে, চূড়ান্ত অভাবেও তাঁর পাশে অটল থেকেছেন দ্বিতীয় স্ত্রী এমিলিয়া।

কলকাতায় আসার পর, তিনি প্রথমে পুলিশ আদালতে কেরানি এবং তারপর দোভাষী হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন জার্নালেও লেখা প্রকাশ করতে শুরু করেছেন তখন। মদ্যপানের অভ্যেস ছিল প্রায় কিশোরবেলা থেকেই। হিন্দু কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের নিয়ে মাত্রাছাড়া পান করতেন প্রায়ই। কিন্তু আকণ্ঠ মদের নেশা ঘিরে ধরল এ সময় থেকেই।

ইংরাজি ছেড়ে মধুসূদন বাংলায় কাব্যরচনা শুরু করুক, এমন একটা গোপন ইচ্ছে লালন করতেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। একদিন হঠাৎ করেই বন্ধু গৌরদাস বসাক তাঁকে নিয়ে গেলেন পাইকপাড়ার রাজার কাছে। পরিচয় ঘটল যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সঙ্গে। এই সময় সংস্কৃত ‘রত্নাবলী’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করছিলেম মধুসূদন। এই অনুবাদ বেলগাছিয়া রঙ্গালয়ে শিক্ষিত ব্যক্তিদের সামনে অভিনয়ের ফলে মধুসূদন পরিচিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু তার থেকেও বেশি যা ঘটল তা হল- সংস্কৃত নাটকের রীতি ও দোষগুণ ভালো করে বুঝতে পারলেন তিনি। নতুনভাবে বাংলা নাটক রচনার উৎসাহও জাগল। ১৮৫৮ সালে লিখলেন প্রথম নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’। বেলগাছিয়া রঙ্গালয়ে দিনের পর দিন মহা সমারোহে অভিনীত হতে থাকল সে নাটক। এরপর গ্রিক পুরাণকাহিনি অবলম্বন করে লিখলেন ‘পদ্মাবতী’ (১৮৬০)। তারপর ‘কৃষ্ণকুমারী'(১৮৬১)। ‘কৃষ্ণকুমারী’কে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠ নাটক বলা হয়ে থাকে। প্রথমে এর নাম ছিল ‘ভগ্নশিব মন্দির’। এর পাশাপাশি লিখেছেন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নামের দুটি প্রহসনও।

যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর

১৮৬৩ সালে, তিনি ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে যান, সেখানে দুই বছর অবস্থান করেন। ফ্রান্সে থাকা অবস্থায়, তিনি পেত্রার্ক ছন্দে বাংলায় সনেট লিখতে শুরু করেন। তাঁর এই সনেটগুলো ১৮৬৬ সালে চতুর্দশপদী কবিতা হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল। মধুসূদন ১৮৬৫ সালে ভার্সাই থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। ১৮৬৬ সালে, তিনি ব্যারিস্টার হন। তিনি পরের বছর কলকাতায় ফিরে আসেন এবং আইন চর্চা শুরু করেন। দেশে ফেরার পরেও সাহিত্যসৃষ্টি থেমে থাকেনি তাঁর। কাব্য রচনার পাশাপাশি প্রায় ১২ বছর পর ১৮৭৪ সালে বেঙ্গল থিয়েটারের জন্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে লেখেন শেষ নাটক- ‘মায়া কানন’।

আইনব্যবসা নতুন করে অর্থোপার্জনের পথ খুলে দিয়েছিল মধুকবির সামনে। এ প্রসঙ্গে একটা মজার গল্প প্রচলিত আছে। স্বভাব দরাজ মধুসূদন হাইকোর্টে ব্যারিস্টারি করার সময় খুব উঁচু গলায় কথা বলতেন। তার বাগ্মীতাও ছিল শোনার মতো। তবে সওয়াল-জবাব চলাকালীন প্রায়ই তিনি প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে উঠতেন। গলার স্বর চড়ে যেত আরও কয়েক পর্দা। একবার জজ জ্যাকসনের এজলাসে মধুসূদন খুব উঁচু গলায় বক্তৃতা দেওয়ায় জজ বিরক্ত হয়ে বললেন, The Court orders you to speake slowly. The Court has ears.

বিচারক বলেই তাঁকে তোষামোদ করে তুষ্ট করার পক্ষপাতী ছিলেন না মধুসূদন। তিনিও তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন, But pretty too long, My lord. এমনই ছিল তাঁর রসবোধ।

Image - মদে আকণ্ঠ ডুবে থাকা, দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী, তবু অটুট ছিল তাঁর রসবোধ
লোয়ার সার্কুলার রোডের সমাধি

১৮৬১ সালে, বিদেশ যাওয়ার আগেই তিনি লিখে ফেলেছেন বাংলা সাহিত্যে প্রথম মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। রামের বদলে রাবণ যে কাব্যের নায়ক। তাঁর সৃষ্ট অমিত্রাক্ষর বাংলা কবিতার গতানুগতিক ধারায় নিয়ে এল এক বিপুল বিপ্লব। ‘পদ্মাবতী’ নাটকেই তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। কিন্তু তার মহিমাময় রূপটিন সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেয়েছে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এই। কবি চলে গেছেন, কিন্তু আজও আধুনিক বাংলা কবিতার মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মধুসূদনের অমর সৃষ্টি, অমিত্রাক্ষর।

You might also like