Latest News

মীরার কৃষ্ণপ্রেম আসলে সময়ের বিরুদ্ধে একা মেয়ের লড়াই

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: বাবা মায়ের সঙ্গে তীর্থে বেরিয়েছিল ছোট্ট মেয়েটা। পাঁচ বছর ধরে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছল এক সাধুর আশ্রমে। সাধুর উপাস্য দেবতা গিরিধারী। বাচ্চা মেয়ে সাধনভজন অত বোঝে না। কিন্তু তার ভারী পছন্দ গিরিধারীর মূর্তিটি। প্রায় কান্নাকাটি করে, আবদার করে বসে সে। নাছোড় শিশুর অবোধ দাবি মানবেন কেন সাধু! কিন্তু সেই রাত্রে স্বপ্নে স্বয়ং দেখা দিলেন ইষ্টদেবতা। ভক্তকে আদেশ করলেন মূর্তিটি তুলে দিতে ওই শিশুকন্যার হাতে। এবার আর আপত্তি করলেন না সাধু। স্বপ্নাদেশ মেনে ইষ্ট গিরিধারীকে তুলে দিলেন রতন সিংয়ের মেয়ের হাতেই।

সেই একটা ঘটনাই বদলে দিয়েছিল একটা মেয়ের জীবনপথ। গিরিধর গোপালের মূর্তিটিকে বুকে চেপে বাড়ি ফেরে সে৷ যেন নতুন খেলার সঙ্গী পেয়েছে৷ মেয়ের খামখেয়ালির দেখে কী জানি কী ভেবে মা বীরকুমারী সেই ছোট্ট মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলেন ওই কৃষ্ণমূর্তির সঙ্গে। হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, এভাবেই শান্ত করবেন মেয়ের পাগলামো। বাস্তবে হল ঠিক উলটো। দিন দিন গিরিধারীর প্রতি আসক্তি যেন বেড়েই চলল সে মেয়ের। সে এখন জানে গিরিধর লালা তার বর। তার সুখ দুঃখের একমাত্র সঙ্গী। বয়সের সঙ্গে সে ভাবনা দৃঢ় হল আরও। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের সীমায় তখন পা রেখেছে মেয়েটি। পুতুলখেলার বয়স পেরিয়ে পা রেখেছে প্রেমের বয়সে। তবু নাইতে-খেতে-ঘুমোতে এখনও গিরিধারী ছাড়া চলে না তার। সেই মেয়ে, নাগোর জেলার কুড়কি গ্রামের এক প্রেমোন্মাদিনী বালিকা, রাধার সঙ্গে এক পংক্তিতে উচ্চারণ হয় যার নাম, সেই মেয়ে মীরাবাঈ। (Meera Bai)

Image - মীরার কৃষ্ণপ্রেম আসলে সময়ের বিরুদ্ধে একা মেয়ের লড়াই

ক্ষত্রিয় রাঠোর বংশের এক রাজপুরুষের ঘরে জন্মেছিল মীরা। ভোরের সূর্যের মতো অপরূপ মুখশ্রী দেখে তার নাম দেওয়া হল মিহিরা বাঈ। সেই মিহিরাই আদরের ডাকে ধীরে ধীরে মীরা হয়ে গেছে। ছোট থেকেই মেধাবী মীরা। দুখিনীও বটে। মীরার যখন মাত্র ৫ বছর বয়স তখন সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে আঁতুড়ঘরেই মারা যান তার মা বীর কুমারী। মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধ কর‍তে গিয়ে প্রাণ দেন বাবা রতন সিং রাঠোরও। দাদু আর জেঠু রাও ভিরাম দেবের অভিভাবকত্বে বড় হয়ে ওঠে মীরা। দাদু দোর্দণ্ডপ্রতাপ দুদাজি সিং আদরের নাতনির পড়াশোনার যাবতীয় দায়িত্ব তুলে দেন রাজপুরোহিতের হাতে।

ধর্ম, রাজনীতি, দর্শনের থেকেও মীরাকে বেশি টানত রামায়ণ মহাভারতের গল্প, শ্রীভাগবত আর কৃষ্ণকথা। কিন্তু শত হলেও রাজপুত বাড়ির মেয়ে তো। দাদুর ইচ্ছানুসারে ঘোড়ায় চড়া, তলোয়ার ধরা, প্রশাসনিক কাজকর্ম সবই শিখতে হল মীরাকে। তালিম নিল গান আর শিল্পকলারও। (Meera Bai)

১৫১৬ সালে সবে আঠারোয় পা দেওয়া মীরার বিয়ে হয় মেবারের শিশোদিয়া বংশের রাজা রাণা সঙ্গার বড় ছেলে রাজপুত যোদ্ধা ভোজরাজ সিংয়ের সঙ্গে। বাপের ঘর ছেড়ে চলে আসতে হয় আরও দক্ষিণে, চিতোরে।

রাজস্থানের রাজপুত মেয়ে সে। বরের ঘর করতে এসে আপ্রাণ চেষ্টা করল মানিয়ে নেওয়ার। কিন্তু যে সম্পর্কে দুটো মনের মিলন নেই, আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো সে সম্পর্ক শিরোধার্য করে নিতে মন সায় দিল না মীরার। তথাকথিত নারীসুলভ সাংসারিক কাজে তার মন বসে না। ঘরকন্নার ছেলেখেলা ছেড়ে সমস্ত দিন সে বসে থাকতে চায় তার গিরধারী লালার কোলের কাছটিতে। মুখে মুখে প্রেমের কবিতা তৈরি করে। একতারা হাতে নিয়ে সুর বাঁধে। গান গায়। সাত পাকের সঙ্গীর প্রতি কোনও টানই যেন বোধ করে না সে। আনন্দ পায় পুজোআচ্চা আর সাধুসঙ্গে। (Meera Bai)

Image - মীরার কৃষ্ণপ্রেম আসলে সময়ের বিরুদ্ধে একা মেয়ের লড়াই

এসব ক্ষেত্রে যা হয়, মীরাকে নিয়েও কানাঘুষো শুরু হল রাজপরিবারে আত্মীয়-স্বজনমহলে। বিপদে পড়লেন ভোজরাজ। কুলমর্যাদা রক্ষা করতে কৃষ্ণপ্রেমে আত্মহারা বউয়ের জন্য ঘরেই তৈরি করে দিলেন ছোট্ট এক কৃষ্ণমন্দির । বললেন, তোমার যা কাব্য ও সঙ্গীতচর্চা, সব তুমি এখানেই কোরো।ঞ্চার দেওয়ালে বাঁধা পড়েও খুব একটা অসন্তুষ্ট হল না মীরা। তার সারাদিন কেটে যেত কৃষ্ণসেবায়। গিরধারী লালাকে সাজিয়ে গুজিয়ে, ভোগ দিয়ে, গান বেঁধে… এ দৃশ্য দেখে ক্রমশ অসূয়াপ্রবণ হয়ে পড়েন রাণা ভোজ। রক্তমাংসের প্রেমিক না হলেই বা কী, হাজার হোক, পরপুরুষ তো। যে ভালবাসা তার হকের ছিল, তা অযাচিত ভাবে পেয়ে যাচ্ছে অন্য কেউ! উপরন্তু যে রাজপরিবারের গৃহদেবী কালী, সেই পরিবারের কুলবধূ কী না মনপ্রাণ সঁপে দিচ্ছে বৈষ্ণব দেবতা কৃষ্ণকে! বিরূপ হলেও, মীরার ঐকান্তিক পুজো আর স্নেহকে অস্বীকার করতে পারেন না ভোজ। কিশোরী বউয়ের প্রতি কিছুটা স্নেহকাতরও হয়ে পড়েন।

১৫২৭ খ্রীষ্টাব্দে দিল্লিশ্বর আকবরের সঙ্গে যুদ্ধে মারা যান রাণা ভোজ। মীরার বয়স তখন মাত্র ২০। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখলেন মীরা। এই প্রথম সে উপলব্ধি করল মেয়েদের বৈধব্যজীবন কত লাঞ্ছনার। যে সময়ের কথা, তখন মরা স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যেতে হত রাজপুত নারীদের। প্রথা মেনে মীরার শ্বশুর রাণা সঙ্গাও আদেশ দিলেন মীরাকে সহমরণে যাওয়ার৷ রুখে দাঁড়াল মীরা। স্পষ্ট জানাল, স্বামী তার একজনই, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তিনি মৃত্যুর অতীত। স্বামী থাকতে তাই কীসের সহমরণ? স্বাভাবিকভাবেই এই বিদ্রোহের ফল ভালো হল না। পারিবারিকভাবে এসময় একের পর এক ষড়যন্ত্রের শিকার হয় মীরা। (Meera Bai)

রাজস্থানী শিল্পীর চোখে রাণা সঙ্গা

ততদিনে চিতোরগড়ের সিংহাসন বসেছেন রাজা ভোজের ভাই রাণা রতন সিং (দ্বিতীয়)। মীরাকে গোড়া থেকেই অপছন্দ ছিল তাঁর। বিশেষ করে, মীরা’র খ্যাতি, জনপ্রিয়তা, রাজপরিবারের মেয়ে হলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতাকে ঈর্ষা করত রতন সিং। বেশ কয়েকবার গোপনে বিষ খাইয়ে তাকে খুন করার চেষ্টাও হয় এইসময়। মীরা’র প্রতি বিরূপ ছিল তার ননদ উদাবাঈও। নির্লজ্জ, কুলত্যাগিনী-এসব বলে মীরার চরিত্রকে কলঙ্কিত করতে থাকে। (Meera Bai) এই নিয়ে কিছু জনপ্রিয় কিংবদন্তিও আছে। বিষ মেশানো শরবত পাঠানো হয়েছিল মীরার জন্য। সে শরবত খেয়েও কৃষ্ণের মহিমায় প্রাণে বেঁচে যায় মীরা। তাকে মারতে আবার ফুলের ঝুড়িতে করে পাঠানো বিষধর সাপ। কিন্তু সে সাপ বদলে যায় শালগ্রাম শিলা আর সুগন্ধি ফুলের মালায়।  

Image - মীরার কৃষ্ণপ্রেম আসলে সময়ের বিরুদ্ধে একা মেয়ের লড়াই
বিষ মেশানো শরবত পাঠানো হয়েছিল মীরার জন্য

ভালো না বাসলেও রাজা ভোজের প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত একটা টান ছিল মীরার। তাঁর মৃত্যুর পর খুব বেশিদিন আর চিতোরে মন বসল না। ষড়যন্ত্র আর কুৎসায় অতিষ্ঠও হয়ে উঠেছিল হয়ত। তাই সব ছেড়ে মীরাটে ফিরে আসেন মীরা। কিন্তু কাকা বিরামদেওয়ের অসূয়ায় বাপের বাড়িতেও ঠাঁই হয় না তার। অগত্যা সব ছেড়ে বৃন্দাবনের পথেই হাঁটা দেয় মীরা, গলায় নিয়ে যায় চিরকালের গান- পাইওজি ম্যায়নে রাম রতন ধন পায়ো
বস্তু অমোলক দিই মেরে সদগুরু

এসব লোককথার সত্যতা নিয়ে সংশয় থাকতে পারে, কিন্তু তৎকালীন হিন্দি ও রাজপুত সাহিত্যে এই নারীর অবদান নিয়ে সন্দেহের অবকাশটুকুও নেই। মীরাবাই শুধু এক প্রেমিকার নাম নয়, এক বিদ্রোহিনী কবিরও নাম। সমাজ-সংসারের খাঁচাকে বারেবারে অস্বীকার করেছে সে। পা রেখেছে রাজপুতানা নারীর সংস্কার আর কর্তব্যের বাঁধাধরা গণ্ডির বাইরে। সে সময়ে দাঁড়িয়ে এই বিদ্রোহ বড় কম কথা নয়।

পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের রাজপুতানার অন্যতম প্রধান মরমিয়া কবি মীরা। দয়িত শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে প্রায় পাঁচ হাজারের মতন ভক্তিগীতি লিখেছেন মীরাবাঈ। নিজের লেখা অধিকাংশ কবিতাতেই সুর বসিয়ে গানের রূপ দিতেন মীরা। তাই মীরাভজনে রাগের প্রাধান্যও সুস্পষ্ট। বেশিরভাগ গানই লেখা হয়েছে পিলু রাগে। উচ্ছ্বাস আর অস্থিরতার রাগ পিলু। এছাড়াও দেশ, সারং, ভৈরবী, ভীমপলশ্রী মিলিয়ে সত্তরের কাছাকাছি রাগে মীরার পদগুলি সুরারোপিত। বোঝা যায়, মীরার কাব্য ও সঙ্গীত দক্ষতা কতখানি সুদৃঢ় ছিল। আজও ভারতবর্ষের পথেপ্রান্তরে কৃষ্ণভক্তের কণ্ঠে শোনা যায় সে সব আশ্চর্য গান। ভক্তিমূলক গান বা ভজন হিসাবে আজও তার আবেদন মুগ্ধ করে সমঝদারদের। আবেগ আর দার্শনিকতার অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে সেই গানে…

আমাদের দেশে ভক্তি আন্দোলনের এক সুদীর্ঘ আর বিস্তৃত ইতিহাস রয়েছে। ভক্তিকে কেন্দ্র করে এক নীরব বিদ্রোহের সময়কাল সূচিত হয়েছিল পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতকে। দক্ষিণ ভারত থেকে শুরু হয়ে সপ্তম থেকে নবম শতকে এ আন্দোলন ক্রমে বিস্তার পায় ভারতের অন্যান্য প্রদেশেও। তামিলনাড়ু, কর্নাটক থেকে বাংলা হয়ে তা বিস্তার লাভ করে সমগ্র উত্তর ভারতে। ভক্তি আন্দোলনের সাধক-সাধিকারা বেশিরভাগই ছিলেন শিব ও কৃষ্ণের উপাসক। দক্ষিণে যেমন শৈব সাধকের সংখ্যা বেশি দেখা গিয়েছিল, পূর্ব ও উত্তর ভারতে তেমনই বৈষ্ণব উপাসকের আধিক্য। রামপ্রসাদ প্রমুখ শৈব সাধকেরা এসেছেন আরও কিছু পরে। সুরদাস থেকে তুলসীদাস, চৈতন্য থেকে মীরা, শ্রীকৃষ্ণের এহেন সাধকেরা কেউই কিন্তু মহাভারতে উল্লিখিত রথচালক যোদ্ধা কৃষ্ণের সাধনা করেননি। তাঁদের কাছে কৃষ্ণ মানে ভাগবৎ পুরাণের বিষ্ণুর অবতার, যে মানবশরীরে জন্ম নিয়েছিল মথুরায়।

মীরার কৃষ্ণপাগলিনী সত্তা আর তার বিদ্রোহী সত্তায় বিশেষ ফারাক নেই। দিনের শেষে মীরার প্রেম আসলে এক রাজপুতানা নারীর স্বাধীনতার লড়াই। সমাজ সংস্কারের ঊর্ধ্বে গিয়ে নিজের শর্তে নিজের পছন্দের জীবন, পছন্দের পুরুষ বেছে নেওয়ার লড়াই। আর সে লড়াইয়ের প্রধান অস্ত্রই ছিল আত্মত্যাগ, আত্মদান আর গান।

You might also like