Latest News

চিতার আগুন কখনও নেভে না এই ঘাটে, জড়িয়ে আছে হাজার কিংবদন্তি

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: প্রাগৈতিহাসিক এই শহরের বয়স কত, কেউ বলতে পারে না। মনে করা হয়, এই শহরের প্রথম বসতি গড়ে উঠেছিল ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। আর শহরের বয়স? তা ধরে নিন হাজার তিনেক হবে। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে মন্দির আর ঘাটের শহর কাশী বা বেনারসকে নিয়ে৷ পৌরাণিক কাহিনী সমৃদ্ধ বারাণসীতে রয়েছে গঙ্গার মোট ৮৮টি ঘাট। এক একটা ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরাণ, মিথ আর উপকথার অজস্র গল্প। তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই ৮৮টা ঘাটের মধ্যে তিনটে ঘাট’কে সবচেয়ে পবিত্র মনে করা হয়। এই তিনটে ঘাট হল যথাক্রমে – দশাশ্বমেধ ঘাট, পঞ্চগঙ্গা ঘাট আর মণিকর্ণিকা ঘাট৷ এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘাটটিই ‘মণিকর্ণিকা’। (Manikarnika Ghat)

Image - চিতার আগুন কখনও নেভে না এই ঘাটে, জড়িয়ে আছে হাজার কিংবদন্তি

সংস্কৃত ভাষায় কর্ণ কুণ্ডল বা কানের দুল’কে ‘মণিকর্ণ’ বলা হয়। এই ‘মণিকর্ণ’ শব্দ থেকেই ঘাটের নাম মণিকর্ণিকা। হিন্দুপুরাণ মতে এই ঘাটে দেবী সতীর কর্ণকুন্ডল বা কানের দুল পড়েছিল। বারাণসীর দশাশ্বমেধ ঘাট এবং সিন্ধিয়া ঘাটের মধ্যবর্তী এই ঘাটটি কাশীর সবচেয়ে প্রাচীন শ্মশান বা বার্নিং ঘাটও। সারাদিনই শবদেহের আসা-যাওয়া লেগেই থাকে এই ঘাটে। হিন্দু শাস্ত্রমতে এ ঘাটে চিতার আগুন কখনও নেভে না। (Manikarnika Ghat)

বারাণসীর এই মণিকর্ণিকা ঘাট নিয়ে অজস্র গল্প ছড়িয়ে আছে হিন্দু পুরাণে আর লোককথায়। এই ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দক্ষযজ্ঞ আর সতীর দেহত্যাগের গল্পও৷

ব্রহ্মার ছেলে প্রজাপতি দক্ষ দুচক্ষে দেখতে পারতেন না শ্মশানচারী শিবকে। এদিকে দক্ষের কন্যারূপে জন্ম নিলেন স্বয়ং মহামায়া। মেয়ের নাম রাখা হল সতী। অল্পবয়স থেকেই শিবের প্রতি অনুরাগ ছিল সতীর। বাবার ঘোর অমতেই তিনি বিয়ে করলেন মহাদেবকে।

Image - চিতার আগুন কখনও নেভে না এই ঘাটে, জড়িয়ে আছে হাজার কিংবদন্তি

এদিকে ভৃগু মুনির যজ্ঞে আমন্ত্রিত দক্ষকে সম্মান জানাতে দেবতারা সবাই প্রণাম করলেও অন্যমনস্ক মহাদেব প্রণাম করেননি৷ এতে আরও রেগে যান দক্ষ৷ যজ্ঞস্থলেই শিবকে অভিশাপ দেন। কিন্তু তাতেও রাগ পড়েনি দক্ষের। উলটে শ্মশানচারী জামাতাকে আরও বড় অপমান করার জন্য মনে মনে সংকল্প করেন।

প্রজাপতিদের রাজা হওয়ার আনন্দে বিরাট যজ্ঞের আয়োজন করেছেন দক্ষ। ত্রিভুবনের সবাই নিমন্ত্রিত তাতে। শুধু ডাক পড়েনি ছোটো মেয়ে সতী আর শিবের। নারদের মুখ থেকে এ কথা শুনে ভারি অবাক হলেন সতী। ভাবলেন হয়তো অহংয়ের বশে বাবা অকারণে ভুল বুঝেছেন শিবকে। তাছাড়া মেয়ে বাপের বাড়ি যাবে, তার আমার আমন্ত্রণ কীসের! শিবের অনুমতি নিয়ে নন্দীকে সঙ্গে করে তিনি চললেন দক্ষালয়ে বাবার ভুল ভাঙাতে। (Daksha yajna)

যজ্ঞ সবে শুরু হয়েছে, চলছে দারুণ শিবনিন্দাও। এসময় দূর থেকে সতীকে আসতে দেখলেন দক্ষ। মেয়েকে আদর-অভ্যর্থনা তো জানালেনই না; উপরন্তু তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে শিবকে ভিখারি, বেহায়া, নির্লজ্জ বলে গালাগালি করতে লাগলেন। পতিব্রতা সতী শিবের নামে এসব নিন্দাবাক্য কিছুতেই সহ্য করতে পারলেন না। কিন্তু তাঁর শত অনুনয়েও দক্ষ থামলেন না। পিতার এই আচরণে মনে দারুণ আঘাত পেলেন সতী। এত মানুষের ভিড়ে এই অসহ অপমানের পর বেঁচে থাকতে আর ইচ্ছে করল না তাঁর। তক্ষুনি সঙ্গে সঙ্গে যোগ-অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে সেই যজ্ঞস্থলেই সকলের সামনে প্রাণ বিসর্জন দিলেন তিনি। (Daksha yajna)

Image - চিতার আগুন কখনও নেভে না এই ঘাটে, জড়িয়ে আছে হাজার কিংবদন্তি
সতীর দেহত্যাগ

এমন চোখের নিমেষে ঘটনাটা ঘটে গেল, যে বাধা দেওয়ার সুযোগ পায়নি কেউ৷ নন্দীই প্রথম সর্বনাশ টের পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটলেন কৈলাশে। তাঁর মুখে এই দুঃসংবাদ শুনে শিব যেন পাগল হয়ে গেলেন। রাগে শোকে উন্মাদের মতো ছিঁড়তে লাগলেন জটার চুল। সেই ছেঁড়া চুল থেকেই জন্ম নিল বীরভদ্র। ভূতপ্রেত সঙ্গে নিয়ে সে চলল যজ্ঞভূমিতে, যেখানে পড়ে আছে সতীর শব৷

বীরভদ্র

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে শিবের অনুচরেরা লণ্ডভণ্ড করে দিল যজ্ঞভূমি। বীরভদ্র নিজেই ছিঁড়ে নিলেন দক্ষের মাথা। শিবের তখন হুঁশ নেই৷ সতীর দেহ কোলে নিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন তিনি। নিজেকেই ক্ষমা করতে পারছেন না৷ সতীকে পিতৃগৃহে আসার অনুমতি তো তিনিই দিয়েছিলেন। এত ভয়ানক তার পরিণাম!

সতীহীন জগৎ থাকা, আর না থাকা দুইই সমান। সতীর দেহটি কাঁধে তুলে উঠে দাঁড়ালেন ভোলানাথ। ধ্বংস হয়ে যাক সব। সারা শরীরে শোকের আগুন জ্বালিয়ে শুরু করলেন প্রলয়ের তাণ্ডব। আর বুঝি বাঁচানো যাবে না সৃষ্টিকে। মহাদেবের রোষানলে ধ্বংস হবে সব। ভয়ে আতঙ্কে দেবতারা বিষ্ণুর শরণ নিলেন। উপায় একটাই। সতীর শব নিশ্চিহ্ন করে দাও। কাঁধ থেকে শবভার নামলে যদি শান্ত হন দেবাদিদেব।

Image - চিতার আগুন কখনও নেভে না এই ঘাটে, জড়িয়ে আছে হাজার কিংবদন্তি
সতীর শব ত্রিশূলে গেঁথে তাণ্ডব- কাংড়া চিত্র

শিবকে শান্ত করতে বিষ্ণু নিজের সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেন। সেই খণ্ডিত দেহ যেখানে পড়ে সেখানেই প্রস্তরিভূত হয়ে যায়, গড়ে ওঠে শক্তিপীঠ। এভাবেই গঙ্গাতীরে বারাণসীতে এসে পড়ল দেবীর কর্ণকুণ্ডল। মণিকর্ণ পড়াতেই নাম মণিকর্ণিকা।

অন্য একটি মত অনুসারে, বারানসীর এই ঘাটে পড়েছিল দেবীর চোখের একটি মণি৷ কনীনিকা পড়েছে বলেই নাম মণিকর্ণিকা।দেবীর দিব্যচক্ষু সমগ্র বিশ্বকে দেখতে পায়, তাই দেবীর নাম এখানে বিশালাক্ষী। মণিকর্ণিকার শক্তিপীঠটি বিশালাক্ষীর মন্দির নামেও পরিচিত। এই পীঠের ভৈরবের নাম কালভৈরব।

কালভৈরব

মণিকর্ণিকার শ্মশানে আগুন নেভে না কখনও। সনাতন হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, এই ঘাটের শ্মশানে মৃতদেহ দাহ করা হলে মৃতের আত্মা মোক্ষ অর্জন করে, তাঁর আর জন্মান্তর হয় না। একারণে এই ঘাটটিকে প্রাচীন হিন্দুধর্মে একটি বিশেষ তীর্থস্থান হিসেবেও দেখা হয়। দূর দূর থেকে মানুষ ছুটে আসে এই বারাণসীর বুকে, জীবনের শেষ কটি দিন কাটাবে বলে! মৃত্যু এখানে শুধু সুলভ নয়, মৃত্যু এখানে কাঙ্ক্ষিতও।

You might also like