Latest News

উড়ো পাখি

রাজা মুখোপাধ্যায়

বিয়ের পর মাস-ছয়েক কাটতে না-কাটতেই অশান্তি শুরু হল সংসারে। সংসার বলতে শুধু আমি আর আমার বউ। কাজের সূত্রে বাইরে থাকা তাই অভিভাবকের তদারকি নেই আর কী। কিন্তু থ্রি বিএইচকে এই ফ্ল্যাটটিতে নতুন অশান্তি, আমার বউ নাকি আর পাখি দেখতে পাচ্ছে না।

বউ আমার সুন্দরী, স্বাস্থ্য ভাল, মনটাও বেশ নরম, আমার ভালই খেয়াল রাখে। শরীর ও মনে তার আমার জন্য প্রেমও যথেষ্ট। কিন্তু দিনকয়েক যাবৎ ওই এক নতুন ঘ্যানঘ্যান শুরু হয়েছে, বিয়ের পর থেকে সে নাকি আর পাখি দেখতে পাচ্ছে না। দেখা তো দূর, পাখির ডাক অবধি নাকি তার কানে আসেনি এই ছ’মাসে। গুগলের যুগে স্মার্ট লাইফে জিন্স-টপ পরা মেয়ের কাছে পাখির ডাক শোনার ক্রাইসিস! প্রথমে তো আমি রিয়্যাক্ট করেই ফেলেছিলাম, কিন্তু নতুন বউ তো তাই…।

আমি একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের কালেকশন ম্যানেজার। কোম্পানির নন-পারফর্মিং অ্যাসেটের কালেকশন দেখি। বিয়ের আগেই পোস্টিং হয়েছে কলকাতা থেকে আরামবাগে। ট্রান্সফার আমার কাছে কোনও নতুন ঘটনা নয়, যেখানেই কোম্পানির এনপিএ বেড়ে যায়, প্রথম পছন্দটাই হই আমি। বছরখানেকের ভেতর প্রমোশন নিয়ে আবার নতুন জায়গায়। ব্যাঙ্কিংয়ে রিটেল বিজনেস বেশ প্রফিটেবেল। সেই রিটেলের অটোমোবাইল লেন্ডিং ইন্ডাস্ট্রির আমার ফোকাস প্রোডাক্ট– ট্রাক। জনা-ছয়েক ছেলে নিয়ে আমার টিম। তবে টিম মেম্বাররা আমায় ভাল চোখে দেখে না। শুনেছি আড়ালে-আবডালে বলে বেড়ায়, আমার নাকি জন্মলগ্নে কোনও অজ্ঞাত কারণে ৭৩৬টা শকুন মারা গিয়েছিল, যদিও তাতে আমার কিচ্ছুটি যায়-আসে না। ঈশ্বরের কৃপায় আমার স্যালারি যেমন মোটা অঙ্কের, তেমনই আরও মোটা অঙ্কের ইন্সেন্টিভ।

আমার বউ আর্ট কলেজের ছাত্রী। খুব ভাল ছবিও আঁকতে পারে। দেখতে-শুনতে বেশ বলে সামান্য মধ্যবিত্ত ঘর দেখেও আপত্তি করিনি। কিন্তু কোনওদিন যে এ-রকম গেরোয় পড়তে হবে, তা অবশ্য আন্দাজ করিনি। যে অ্যাসেট পারফর্ম করে না, তাকে প্রফিট দেখিয়ে দিই। যে কাস্টমারের বিষ খাওয়ার পয়সা থাকে না, তার থেকে ইএমআই আদায় করা আমি নিজের একমাত্র বউটাকে সামান্য পাখি দেখাতে পারব না?

কলকাতার তুলনায় আরামবাগ অনেক বেশি সবুজ। কালেকশনের জন্য আমায় মাঝেমাঝেই অনেক দূরে যেতে হয়, কিন্তু শেষ কবে নিজে পাখি দেখেছিলাম তাই আর মনে করতে পারছি না। আর প্রপার টাউনে ওই থ্রি বিএইচকে-র এসি রুমে সে কী করে দেখবে? রাতে কথাটা বলেই ফেললাম বউকে। ওর উত্তর শুনে চমকে উঠলাম।

রোজ ভোরে নাকি সে ১৪ তলা ফ্ল্যাটের ছাদে ওঠে পাখি দেখার জন্য, কিন্তু মাসের পর মাস ঘুরে গেছে, তবু পাখি ওর নজরে আসেনি। ফ্ল্যাট আমার স্মার্ট সিটি হাউসিংয়ে, চারদিক গাছ দিয়ে ঘেরা। আমি অফিসে থাকাকালীন ও গাছ দেখতে বেরয়। পাতাগুলো দিনদিন হলুদ হয়ে যাচ্ছে ওর চোখে। এসি-তে সবুজ খুঁজবে এতটা ছোটও তো সে নয়। তবে সবুজ কেন হলুদ হয়ে উঠবে ওর চোখে! অবশ্য ঘরে তো সে সব কিছু ঠিকঠাকই দেখতে পায়। দেওয়ালে যে উড়ে যাওয়া পাখির প্রিন্টটা রয়েছে, সেটাও তো প্রথমদিনের মতোই এখনও।

ব্যাপারটা খুব ভাবাচ্ছে আমাকে। আজ ভিজিটে বেরিয়ে গাড়ির কাচ নামিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বহুদিন পর আকাশ দেখছি। গাড়ি ছুটে চলেছে আর আমিও খুঁজে চলেছি একটা চড়ুই কিম্বা একটা শালিক। প্রবলেম আমার মতো একটা কর্পোরেট পার্সনকে খুব একটা কাবু করতে পারে না। পাখির দেখা পেলাম, টিয়া-ময়না-কাকাতুয়া সব একসাথে। তবে আকাশে নয়, খাঁচায়। বউয়ের জন্য দুটো কথা-বলা ময়না আর বদ্রী কিনে নিয়ে গেলাম বাড়িতে। সে তো বেজায় খুশি। বউয়ের ওপর প্রেম বাড়ল আমারও। আজকালকার মেয়ে, স্মার্টফোন ছেড়ে পাখিতে মজলে আমার জন্য ভাল আর কীইবা হতে পারে।

কিন্তু দিন-কয়েক যেতে না-যেতেই বউয়ের মুখ পুনরায় বেজার। পাখি ডাকা বন্ধ করে দিয়েছে। খাবার খাঁচায় পড়ে থাকে আর তারা দিনদিন না খেয়ে-খেয়ে খিঞ্জিবি হয়ে পড়ছে। রাতে বউ আমার কাছে আর শুতে আসছে না। সারারাত পাখিগুলোর দিকে চেয়ে বসে থাকে। আজ সকালে পাখিগুলোকে উড়িয়ে দিয়েছে আকাশে। রাতজাগা চোখ, চোখের নিচে জমাট বাঁধা কালি। ফর্সা গালের সে চকচকে ভাবটাও উধাও। কনসাল্ট করলাম ডাক্তারের সাথে।

ডাক্তারের সাজেশন-– ‘একটু বেশি করে সময় দিন ওয়াইফকে। ভোরে ওনাকে নিয়ে একটু হাঁটতে বেরন। উনি দেখতে পাচ্ছেন না তো কী হয়েছে, আপনি দেখে ওনাকে দেখান। তার পর একসাথে দেখুন। দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে।’

‘হোয়াট আ ফাকিং সাজেশন!’ এখন আমিও আর এসি অন করি না। গাড়ির কাচ নামিয়ে আকাশের দিকেই তাকিয়ে থাকি। বিলিভ মি, একটা সিঙ্গেল পাখিও আমার চোখে পড়েনি। কিন্তু আরামবাগের মতো একটা জায়গায় চোখে পাখির দেখা নেই, মে বি সাইকোলজিস্ট সাজেস্ট করত তাই এড়িয়ে গেলাম।

অনেকদিন পর আজ ভোরে উঠলাম। হাঁটতে বেরলাম বউকে নিয়ে। নভেম্বর মাস। এদিকে শীতের আমেজও শুরু হয়ে গেছে, চারিদিকে কুয়াশার পাতলা চাদর। হাঁটছি, কিন্তু মামনের মুখে কথা নেই। আজকাল বড়ই বেশি শান্ত ও। বেঞ্চ দেখে একটা চায়ের দোকানে বসলাম আমরা। চমকে উঠলাম। এটা তো মঙ্গল মুর্মু। আগে দেখলে বসতাম না, কিন্তু এখন আর উঠি কী করে। মঙ্গলের চোখে কিন্তু আমার জন্য ঘৃণা দেখতে পাচ্ছি না। ধোঁয়া ওড়া দুটো মাটির ভাঁড় নিয়ে এগিয়ে এল আমাদের দিকে। ‘ভাল আছেন স্যার? নমস্কার মেমসাহেব।’

মাস-তিনেক আগের কথা। লোকটাকে স্পষ্ট মনে আছে আমার। ড্রাইভারি করতে-করতে নিজেই একটা ছয় চাকার লরি কিনেছিল লোন নিয়ে। কুড়ি লক্ষ টাকার লরিতে লাখ-চারেক ডাউন পেমেন্টও করেছিল সে। ইন্সুরেন্স, রেজিস্ট্রেশন মিলিয়ে আরও লাখখানেক। লোন অ্যাকাউন্টের কাস্টমার হিস্ট্রিতে লেখা ছিল বছর-দশেক খালাসি করার পর যখন স্টিয়ারিং হাতে পেল সেদিনই সে বলেছিল নিজেই লরি কিনবে। মালিক হবে নিজেই। বছর-দুয়েকের মধ্যেই পৈতৃক সম্পত্তির কাটা-ছয়েক ধানিজমি বেচে ডাউন পেমেন্টও জমা করেছিল। চারবছরের লোন টেনিওরের বছর-তিনেক খুব ভালই চালিয়েছিল। কিন্তু তার পর একদিন নিজের হাত ভাঙল, কিছুদিন পর ছেলেটাও জন্ডিসে হসপিটালে ভর্তি হল। গাড়িটা টেনে নিয়েছিলাম, কোম্পানির মোটা অঙ্কের লাভ হয়েছিল। আমার ইনসেনটিভও এসেছিল প্রায় হাজার-পঁচিশ। কিন্তু এমন তো হবার কথা নয়। জীবনের সবটুকু পুঁজি হারিয়েও লোকটার মুখে হাসি! সম্বিত ফিরল মামনের কথায়।
‘চা খুব সুন্দর হয়েছে দাদা। এলাচ চা আমার খুব প্রিয়।’ মঙ্গলের মুখে অমলিন হাসি। চায়ের ভাঁড়ে আলতো চুমুক দিয়ে মামন আবার বলে ওঠে– ‘এত ভোরে দোকান খুলে ফেলেন? বাড়ি নিশ্চয়ই কাছাকাছি?’
‘আজ্ঞে, ওই কানা নদীর পিছন পারে। সাহেব তো গিয়েছিলেন আমার ঘরে…।’

‘আর কয়েকটা দিন সময় দিন স্যার। গাড়ি লোড হয়ে গেছে, ছেলেটা আমার মরতে বসেছে। পূর্ণিয়া পৌঁছাতে আর তিনটে দিন লাগবে। মাল খালি করে টাকা হাতে পেতে মাত্র দিন-চারেক। ভাঙা হাত নিয়েই খালাসি করছি। গাড়িটা গেলে আমার যে সব শেষ হয়ে যাবে।’

লরিটা দেখে আমার চোখ চকচক করে উঠেছিল। লোন টেনিওরের ৭৫ ভাগ অলরেডি কভার হয়ে গেছে। এ-সময় গাড়িটাকে টেনে অকসনে বেচতে পারলেই কোম্পানির প্রফিট মোটা অঙ্কের।

‘ছেলে তো আজ মরতে বসেছে মঙ্গল, আগের দু’মাস কী করছিলে? তোমাদের নাটক অনেক দেখেছি।’

‘স্যার, ডান হাত ভেঙে তিন টুকরো, পাত লাগাতে হয়েছে। দু’মাসে গাড়ির চাকা এতটুকু ঘোরাতে পারিনি। এই টিপটা যে কীভাবে পুরো করছি সে শুধু আমিই জানি।’

খুব কাঁদছিল সেদিন মঙ্গল, ভেঙে পড়েছিল। কাস্টমারের চোখের জল দেখলে আমার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। ওকে বলেছিলাম-– ‘লোন নেওয়ার সময় কি ব্যাঙ্কের সাথে তোমার এ-রকম কথা হয়েছিল নাকি যে, হাত ভাঙলে, ছেলে মরতে বসলে মাসের পর মাস কিস্তি দেবে না। আর যদি সত্যিই তোমার ছেলে মরে যায়, তা হলে শ্রাদ্ধ-শান্তিতে যা খরচ আছে মাল খালি করার টাকা তো সে-দিকেই চলে যাবে, কিস্তিতে তো আর ঢুকবে না…।’

‘যা হয়েছে ভালই হয়েছে স্যার। ছেলেটাকে যমের ঘর থেকে ফিরিয়ে এনেছি, নয়তো জন্ডিস পাকলে সহজে কেউ বাঁচে? এখন সকালে চা, একটু পর থেকে ঘুগনি-মুড়ি আর বিকেলে চপ, ব্যাস…।’

‘মঙ্গল মুর্মু ইস আ হাই রিস্ক প্রোফাইল। গাড়িটাকে আমরা ফেলে রাখতে পারি না। ওর ছেলে হসপিটালে অ্যাডমিটেড। খবর আছে গাড়িটা কাটাইতে দিয়ে টাকা যোগাড়ের চেষ্টা করছে ও। ইমিডিয়েট স্ট্যাব না করতে পারলে বাকেটে বড়সড় হিট খেতে হবে।’– এই কথাগুলোই সেদিন অডিটকে জানিয়ে সিনিয়র বসেদের কাছ থেকে অনেক আপ্রিসিয়েশন পেয়েছিলাম।

‘ভাঁড়টা ফেলবেন না মেমসাহেব, আর একটু নিন।’ মঙ্গল মুর্মু কেটলি নিয়ে এগিয়ে এল। মামন কোনওরকম ইতস্তত না করে ভাঁড়টা এগিয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করল– ‘এখন ভাল আছে তো ছেলে?’

‘আজ্ঞে, দশবছর বয়স, খুব দুরন্ত আর পাখির নেশা। সারাদিন ওদের নিয়েই থাকে। কোথা থেকে দুটো ময়না ধরে এনেছে। ঘরের কাছে গেলেই পাখির ডাকে আপনি…।’

মঙ্গল বলে চলেছে আর ওর চোখে নিষ্পলক চেয়ে রয়েছে আমার স্ত্রী মামন। ভাঁড়ের ধোঁয়া মিলিয়ে যাচ্ছে কুয়াশায় কোথাও। জানি না ও এই এক দৃষ্টিতে কীই বা দেখতে পাচ্ছে মঙ্গল মুর্মুর দিকে চেয়ে, আমি শুধু দেখছি মঙ্গলের চোখে পাখির ডানার ছায়া।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

You might also like