Latest News

সহযাত্রী

সুন্দর মুখোপাধ্যায়

আমার পাশে বসে এতক্ষণ ঝিমোচ্ছিল যে লোকটা, স্টেশন আসার আগে ধড়মড় করে উঠে বলল, “চলে এল?”
আমি ব্যাগটা কাঁধে নিতে নিতে ঘাড় হেলালাম। লাস্ট লোকাল ফাঁকা, দরজার মুখে আগে থেকে যাবার দরকার নেই। বাইরে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে মাঝে মাঝে, বিদ্যুতের আলোয় বোঝা যাচ্ছে বেশ মেঘ করেছে। স্টেশনের আলোগুলো দেখা যেতেই সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। লোকটার কোনও হেলদোল নেই। সদ্য ঘুমভাঙা চোখে দু’পাশের জানালা দিয়ে স্টেশনটা ঠাহর করে নিয়ে বসেই রইল চুপচাপ।
বললাম, “নামবেন না?”
লোকটা বলল, “আমি! না না, এখানে নয়…।”
তারপর বোধহয় খানিক রসিকতা করার ইচ্ছে হল তার। হাসি হাসি মুখে বলল, “লাস্ট ট্রেনের প্যাসেঞ্জার, নামব লাস্ট স্টেশন।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “তাহলে জিজ্ঞেস করলেন যে, স্টেশন এল কিনা?”
সেও বিস্মিত হয়ে বলল, “কই না তো…। ও হো, ওটা আমার জন্য নয়, আপনার এল কিনা জিজ্ঞেস করছিলাম।”
অবাক কাণ্ড। উঠে থেকেই দেখছি ঘুমোচ্ছে, এতক্ষণ একটাও কথা হয়নি। আমি নামব কি পেরিয়ে যাব তার কী…।
ট্রেনটা থামব থামব, আমি দরজার মুখে। লোকটা চেঁচিয়ে বলল, “সব ঠিকঠাক নিয়েছেন তো… ব্যাগ, মোবাইল…?”
আমার যেন কনফিডেন্স চলে গেল। বুকপকেটে হাত দিয়ে দেখলাম মোবাইল ঠিকই আছে। হিপ পকেটে থাবড়া মেরে দেখি মানিব্যাগটাও রয়েছে। তবু কেমন যেন একটা সন্দেহ নিয়ে ট্রেন থেকে নামলাম।

লাস্ট লোকাল পৌঁছনোর কথা এগারোটা পঁয়ত্রিশ, এল দশ মিনিট লেট করে পঁয়তাল্লিশে। গঞ্জ স্টেশনটা ঝিমিয়ে আছে। নামল কয়েকজন মাত্র প্যাসেঞ্জার, উঠল না বোধহয় কেউ। আমি চেপেছিলাম শেষের দিকে। মেন গেট স্টেশনের মাঝামাঝি। তবে সেখান দিয়ে গেলে আমার সুবিধে হয় না। বরং প্ল্যাটফর্ম পার করে বাঁদিকে ভাঙা রেলিং দিয়ে গলে গেলেই রাস্তা। রিকশাস্ট্যান্ডটাও সেখানে। এত রাতে রিকশা পাওয়া যায় না। হেঁটে গেলে বাড়ি আরও আধ ঘণ্টা। আমার এত দেরি হত না, মাস দুয়েক হল চাকরির পাশাপাশি ছোট ব্যবসা শুরু করেছি, তাতেই দেরি হয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে।
প্রাইভেট ফার্মের চাকরি। রোজগার যা হোক কিছু হয়, তবে নিশ্চয়তা কিছু নেই। শালাবাবু বুদ্ধিটা দিল, বলল, “পেন্সিলের সারাবছর স্টেডি মার্কেট আছে, আমি ধারে মাল দেব, আপনি সেলসের কাজটা যদি করতে পারেন, দু’পয়সা দেখতে পাবেন।”
সেইমতো অফিসের পর আমি এখন দু-তিন ঘণ্টার বেচুবাবু। তাই মাঝেমধ্যে ফিরতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। রিকশা না পেলেও দু-এক দিন ভ্যানরিকশা পাওয়া যায়। শেষ ট্রেন চলে গেলে জমা হওয়া ভেন্ডারদের বড় বড় ঝাঁকা নিয়ে তারা ফেরে। তাদের কেউ চেনা বেরিয়ে গেলে বলে ফেলে, “উঠে পড়ুন দাদা।”
অন্যদিন দু-এক কদম হাঁটতেই ট্রেন চলতে শুরু করে। আজ প্রায় মাঝামাঝি চলে এলাম, মেন গেটের কাছে, তবু দেখছি সিগন্যাল লাল। স্টেশনমাস্টারের ঘরের সামনে যে কম্পার্টমেন্ট সেখান থেকে কেউ জিজ্ঞেস করল, “কী হল মাস্টারমশাই… ভুলে গেলেন না কি?”
ততক্ষণে আমি স্টেশনমাস্টারের ঘরের সামনে। খাকি পোশাকের একজন পোর্টার বেরিয়ে এসে বলল, “এ গাড়ি এখন যাবে না। দেরি হবে… সামনে তার ছিঁড়েছে…।”
সামান্য যে ক’জন শুনতে পেল তারা হুড়মুড়িয়ে নেমে এল প্ল্যাটফর্মে। আমি থমকে দাঁড়ালাম। অভ্যাসবশে বুকপকেট থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়েই হেসে ফেললাম। ধুস, চলেই তো এসেছি, ট্রেন বন্ধ না চালু— কাকে আর খবর দেব। আজকাল এই হ্যাবিটটা হয়েছে, কিছু ঘটলেই মোবাইল চলে আসে হাতে।
ঠিক তখনই নজরে পড়ল ব্যাগের চেনটা খোলা। স্টেশনের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ব্যাগ হাতড়ে দেখি সব ঠিকই আছে— জলের বোতল, টিফিনকৌটো, গার্ডার দিয়ে বাঁধা আধখানা মুড়ির প্যাকেট, গামছা। সাইড পকেটে পেন্সিলের স্যাম্পেল বাক্স ক’খানাও আছে। কেবল ছাতাটা নেই। শালা, মেরে দিল না কি?

আকাশ দেখে বোঝার উপায় নেই মেঘ কতটা জমেছে। তবে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ঘনঘন। ছাতা না হলেই নয়। বুকপকেট থেকে মোবাইলটা ব্যাগে চালান করে আমি ফের পেছনের কম্পার্টমেন্টের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। দেখি, যদি উদ্ধার করতে পারি।
গার্ডের একটা বগি পরেই আমি ছিলাম। যতদূর মনে পড়ছে, আমার সেই সহযাত্রী ছাড়া দু-একজন মাত্র ছিল সেই কামরায়। তাও তারা ঘুমে কাদা। ছাতাটা থাকা উচিত। তবে লোকটা যদি ঝেড়ে দেয় তো অন্য কথা। তখন কিছু একটা ফন্দি বের করতে হবে।
বগির পেছন দিকে সবে হেঁটেছি, বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হল। দৌড়ব কিনা ভাবতে ভাবতেই ভিজে গেলাম অনেকখানি। শুরু হল মেঘভাঙা তুমুল বৃষ্টি। দৌড়ে এসে কম্পার্টমেন্টে পা দেওয়া মাত্র বিকট শব্দে বাজ পড়ল। মুহূর্তে ট্রেন ও স্টেশন অন্ধকার। এতক্ষণ ট্রেনটার একটা গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছিল। সেটাও বন্ধ হয়ে গিয়ে সব কিছু একেবারে নিস্তব্ধ।
ব্যাগ থেকে গামছা বের করে মাথা মুছে নিচ্ছিলাম। এখন অন্ধকার খানিকটা যেন চোখে সয়েছে। বিড়ি বের করে দেশলাই জ্বালতেই লোকটা আমায় দেখতে পেল। খুব অবাক হয়ে বলল, “আপনি! ফিরে এলেন?”
আমি দাঁতে বিড়ি চেপে বললাম, বটে “না… মানে হ্যাঁ…”, তবে সে কিছু বুঝল বলে মনে হল না।
না বুঝুক, আমি কেবল আমার সিটের দিকে তাকাচ্ছি। হয়তো ভেবেছে, নেমেই যখন গেছে, ছাতাটা ওখানেই থাক। নামার সময় টুক করে নিয়ে নিলেই হল।
লোকটা শশব্যস্ত হয়ে বলল, “আসুন ভাই… বসুন…।”
যেন আমি তার ড্রইংরুমে এসেছি! বিড়ির প্রথম ধোঁয়াটা ছেড়ে এসে বসে পড়লাম।
সে বলল, “এটা আপনার স্টেশন নয়! ভুল করে নেমেছিলেন?”
আমি সন্তর্পণে সিটের চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। নাঃ, কোথাও নেই। ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছে তার মানে। আমার জবাব না দেওয়াটাকে লোকটা সম্মতি ধরে নিল। বলল, “হয়, হয়… মাঝে মাঝে এরকম হয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। ভুল স্টেশনে নেমে পড়তে অনেককে দেখেছি…।”
আমি হেসে বললাম, “না, মশাই, ওটা হয় না। অ্যাবসার্ড। আমারও হয়নি।”
লোকটা মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “তাহলে তো বলতে হয় আপনি খুব সজাগ লোক। আসলে… দেখেছেন, স্টেশনগুলো সব একই রকম— একটা টিনের শেড, কৃষ্ণচূড়া গাছ, স্টেশনের নাম লেখা বোর্ডের কাছের বাতিটা ঝাপসা— একই রকম, লক্ষ করেছেন?”
আমি বললাম, “সে বলতে গেলে একই রকম দেখতে অনেক গ্রামগঞ্জও পাবেন। এমনকি মানুষ…।”
ভীষণ শব্দ করে একটা বাজ পড়ল। আমরা দু’জনেই একটু কুঁকড়ে গিয়ে ফের সোজা হয়ে বসলাম।
লোকটা বাইরের প্রবল বৃষ্টি দেখতে দেখতে স্বগতোক্তি করল, “মুশকিল হল… ছাদের ঘরের দরজাটা ভাঙা, সারাব ভেবেও সারানো হয়নি। এতক্ষণে নিশ্চয়ই হুহু করে জল নামছে সিঁড়ি দিয়ে। বন্দনা খেয়ে ফেলবে একেবারে। তবে ওরই বা দোষ কী…।”
ভীষণ অবাক হয়ে বলে ফেললাম, “সিঁড়ির দরজা!”
অতিরিক্ত বিস্ময়ে কথাটায় একটু উচ্ছ্বাস যোগ হয়ে গিয়েছিল বোধহয়, যেন আমার খুব আনন্দ হয়েছে। সামাল দিতে তাই তাড়াতাড়ি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “কাকে বলছেন! আপনার তো রিপেয়ারিং, আমার দরজাটাই লাগানো হয়নি। মাপজোক নিয়ে গেছে। এই রোববার ডেলিভারি দেবার কথা…।”
রিপেয়ারিংয়ের কথায় তার বোধহয় মনে পড়ল, উঠে গিয়ে জানালায় কাচখানা একটু উঠিয়ে, দড়াম শব্দে নামিয়ে, ফের এসে বসল। তারপর বলল, “কিছু মনে করবেন না, আপনাকে তো আগে এই ট্রেনে দেখিনি।”
বললাম, “কেন, রোজই যাতায়াত আমার। তবে সন্ধের ট্রেনটা। সাড়ে সাত-আটটার মধ্যে ফিরতে হয়। না হলে…।”
লোকটা মৃদু হেসে বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো ফিরতে হবেই। ছোটটাকে অঙ্ক দেখাতে হয়, বড়টাকে ইংরেজি…।”
খুব অবাক হয়ে বললাম, “কী করে জানলেন?”
সে বাইরের ঝমঝম বৃষ্টি দেখছিল। একরকম বৃষ্টি, তবু কীসের আগ্রহে দেখেই যাচ্ছে। আমার বিড়ি শেষ। এতক্ষণ তবু বিড়ির আগুনটা ছিল। এখন একেবারে ঘন অন্ধকার। দু’জনে পাশাপাশি বসে আছি অথচ কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না, কেবল ঠাহর করছি। লোকটা আমার প্রশ্নের জবাব দিল না, নাকি প্রয়োজন মনে করল না, কে জানে। বদলে খানিকটা ক্লান্ত অবসন্ন স্বরে বলল, “তবে আমার এই শেষ লোকাল আজ তিরিশ বচ্ছর… দৌড়তে দৌড়তে ধরি।”
সেই অন্ধকারে তার গলায় স্বরটা কেমন যেন পেন্সিলের দাগের মতো মনে হচ্ছিল। আবছা। যখন-তখন মুছে দেওয়া যায়।
মুছে দিলও লোকটা। এবার আর অবসন্ন গলায় নয়, যেন একটা মজার কিছু বলছে সেইভাবে বলল, “লাস্ট ট্রেন ধরার একটা চার্ম আছে বুঝলেন, দেন ইট ইজ মোর দ্যান আ ট্রেন, প্রতিদিন মনে হয়, ভাগ্যিস পেলাম। বিশ্বাস করুন, রোজ মনে হয়…।”
তার কথা শেষ হবার আগেই কম্পার্টমেন্টের আলোগুলো জ্বলে উঠল। সেই গোঁ গোঁ শব্দটাও ফিরে এল আবার। সামনের সিটে দু’জনের ব্যাগদুটো পাশাপাশি রাখা। দুটোর কোনও একটা থেকে মোবাইলের রিং শোনা যাচ্ছে।
বললাম, “নিশ্চয়ই বাড়ির ফোন। দেরি হচ্ছে দেখে…।”
সে বলল, “আপনারটা বাজছে নাকি! আমি তো ভাবলাম আমার, রিংটোনটা একই রকম।”
ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কলটা রিসিভ করতেই সুপর্ণা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় গো?”
“এই তো, স্টেশনে।”
সুপর্ণা বলল, “যাক, চলে এসেছ। তুমি তো ভুলে ছাতা ফেলে গেছ। ভিজতে যেয়ো না, এসেই যখন পড়েছ, একটু দাঁড়িয়ে যাও। মনে হচ্ছে বৃষ্টি এবার ধরছে।”
ফোনটা রেখে লজ্জিত হয়ে স্বগতোক্তি করছিলাম, “এঃ হে, ছাতাটা নিয়ে বের হইনি, শুধু শুধু…।”
লোকটা বলল, “কিছু বলছেন?”
আমার একটু সাহস হল। সন্দেহ যে করেছিলাম সে তো বলিনি, লোকটা জানবে কী করে? লজ্জাটজ্জা ঝেড়ে বললাম, “নাঃ, কিছু না।”
বাইরে এবার যেন সত্যিই বৃষ্টি ধরে এসেছে। ছাতার ব্যাপারটা মিটে যখন গেল, আর এখানে বসে থাকার কোনও মানে হয় না। ওঠবার আগে বললাম, “মনে হয় আপনার দেরি হবে… তার ছিঁড়েছে…।”
লোকটা খুব একটা হা-হুতাশ করল না। কেবল বলল, “তাই নাকি! এই তো গত হপ্তাতেও ছিঁড়েছিল। ফিরলাম রাত দুটোয়। অত রাতে বাড়ি যাওয়া যায় না, রাতটা স্টেশনেই কাটিয়ে দিলাম। ভাগ্যিস ছিলাম, বেশ মজার একখানা ঘটনা দেখলাম, জানেন!”
ব্যাগ কাঁধে এগিয়ে গিয়েও কথাটা শোনার জন্য দাঁড়াতে হল।
সে বলল, ‘দেখলাম, বেকার আমরা শুরু-শেষ নিয়ে ভাবি… এই লাস্ট ট্রেনটাই দু’ঘণ্টা পর ফার্স্ট লোকাল হয়ে ছেড়ে গেল।”
ধুস, এই মজা! দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললাম, “এতে অবাক হবার কী আছে, তাই তো হয় রোজ।”
কথাটা বলে এক রাতে একই ট্রেন থেকে দ্বিতীয়বার নেমে পড়লাম। যথারীতি পেছন থেকে লোকটা বলল, “সব কিছু ঠিক ঠিক নিয়েছেন, ফেলে গেলেন না তো কিছু?”
আমি হেসে ফেললাম। লোকটা সব কিছু ছাঁচে ঢেলে নেয়। এবং রিপিটেশন পছন্দ করে। তাতেই তার আনন্দ। বলা যায় না, রাতটুকু এর সঙ্গে কাটিয়ে দিলে ভোরে হয়তো বলে বসবে, কী মজা! সূর্য উঠছে… দেখুন, দেখুন…।

বৃষ্টি ধরেছে। রেলিংয়ের ফাঁক গলে রাস্তায় পৌঁছে দেখি ভাগ্য ভাল। এত রাতেও একখানা রিকশা রয়েছে। আমাকে দেখে রিকশাওলা গামছা দিয়ে সিটটা মুছে দিচ্ছিল। তারপর বলল, “বসুন।”
রাত নিঝুম। স্টেশনের বাঁকটা পার করে আরও প্রায় মিনিট পাঁচেক যাবার পর মিত্তিরদের পুকুরের কাছাকাছি এসে হঠাৎ রিকশা সাইডে দাঁড় করিয়ে রিকশাওলা বলল, “নামুন, এবার করে নিন, আরাম লাগবে।”
বললাম, “কী করে নেব?”
সে বেশ অবাক হয়ে বলল, “কেন, আপনার পেচ্ছাপ পায়নি? অনেকক্ষণ চেপে বসে আছেন না?”
“ধুস, কে বলল!”
রিকশাওলা কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থেকে লজ্জিত মুখে বলল, “ও, আমারই তো পেয়েছে…।”
তারপর প্রায় দৌড়ে সামনের অন্ধকার গলিতে কর্মটি সমাধা করে ফিরে এল। ফের রিকশায় চেপে ধীরেসুস্থে দু’প্যাডেল মেরে বিড়বিড় করে বলল, “ক’দিন থেকে এটা হচ্ছে স্যার। আমার খিদে পেলে মনে হচ্ছে দুনিয়ার সব লোকের খিদে পেয়েছে। ঘুম পেলে ভাবছি সওয়ারিও বোধহয় ঢুলছে। আপনার এরকম হয় না কি স্যার?”
শুধু বলতে পারলাম, “আমার…!”
তারপরই ব্যাগে মোবাইল ফের বেজে উঠল। তাড়াতাড়ি সেটা বের করে কানে নিতেই সুপর্ণা বলল, “এখন কোথায় গো?”
“এই তো, চলে এসেছি।”
সুপর্ণা খানিক অভিমানের স্বরে বলল, “একটু আগে আসতে পারো না, সেই লাস্ট ট্রেন! ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে একা একা ফিরছ, আমার চিন্তা হয় না!”
তাকে কোনও প্রবোধবাক্য বলার আগেই ফোনটা কেটে গেল। তাকিয়ে দেখি, পিঠে চাঁদের আলো ও মেঘের খেলা নিয়ে রিকশাওলা যেন আমারই পেন্সিল দিয়ে আঁকা একটা আবছা স্কেচ। ইচ্ছে হলে মুছে ফেলা যায়, আবার রেখে দিলেও ক্ষতি নেই। অদৃশ্যের কোনও দৃশ্যে মানুষটা যে আচ্ছন্ন ও উদগ্রীব বুঝতে পারছিলাম। সে ফের জিজ্ঞেস করে বসল, “এরকম হয় না কি স্যার?”
তবে আমার ভুলও হতে পারে। প্রশ্নটা শুনলাম ঠিকই কিন্তু রিকশাওলাই যে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করেছে, তা জোর দিয়ে বলতে পারব না।
আর মিনিট কয়েকের রাস্তা। হাতে মোবাইলটা ধরাই আছে। অধৈর্য সুপর্ণা ফের ফোন করতে পারে। তবে এবার ফোন এলে আমি বেশ জোর দিয়েই বলব— শুধু শুধু ভেবে মরছ, আমরা একা নই গো…।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

You might also like