Latest News

মেহেরুন্নেসার ভারতবর্ষ

হামিরউদ্দিন মিদ্যা

দিঘিটার একটা অন্য নাম থাকতেও পারত। এ-গাঁয়ের মানুষ আর কোনও নতুন নামকরণ করেনি। সেই কোনকাল আগে নাকি দামোদরের বান ধেয়ে এসেছিল, আর বানের পানি খুবলে নিয়েছিল নদীপাড়ের অনেক জমির মাটি। পরে পলির চর ফেলে ফেলে নদীটা অনেকদূর পিছিয়ে গেলেও, মল্লিকবাবুরা কয়েকটা জমির খাল আর বুজোয়নি। বরঞ্চ গাঁয়ের যত মুনিষজন ছিল, সবাইকে কাজে লাগিয়ে, ঝপাঝপ কোদাল চালিয়ে, ঝুড়ি ঝুড়ি মাটি তুলে খালগুলো সংযোগ করে নিয়েছিল। সেই থেকেই খালের পানিতে মাছচাষ হয়ে আসছে। এখনও সবাই বলে খালপাড়।
খালপাড়ের লাগোয়া করম আলীর ভিটেমাটি আগলে আশি ছুঁইছুঁই মেহেরুন্নেসার বাস। বুড়ির এক ছেলে নওশন, সে-ও বুড়োতে গেল। নাতি আর নাতবউকে নিয়ে চারজনের ঘরসংসার।
নাতিটাকে নিয়েই এখন বুড়ির যত চিন্তা। পাগল হয়ে গেল নাকি! কোথা থেকে কী শুনেছে কে জানে! কেরালা থেকে ট্রেন ধরে পড়িমরি করে ছুটে এসেছে। বাড়ি ফিরেই নাওয়া-খাওয়া ভুলে কাগজপত্র হাতড়ে বেড়াচ্ছে।
নাতিটাই বুড়ির সবেধন নীলমণি। অল্পবয়সে মাকে হারালে মেহেরুন্নেসাই কোলেপিঠে বড় করেছে। নওশনকে অনেকেই আবার বিয়ে করার কথা বলেছিল। ছেলেটা রাজি হয়নি। যুক্তি দিয়েছিল, বিয়ে করলে বউ পাব, কিন্তু আমার মতিবুল কি উয়ার মাকে ফিরে পাবেক?
সেই মতিবুল আজ জোয়ান হল। বিয়ে করে ঘরে বউ আনল। সংসারের পুরো হালটাই এখন নিজের কাঁধে নিয়েছে। মাসপাঁচেক আগেই কেরালায় রাজমিস্ত্রির কাজে গেছিল।
যেদিন মতিবুল কেরালায় কাজে যাবার কথা জানাল, সেদিন মেহেরুন্নেসা বাধা দিয়ে উঠেছিল।
—খেতি না পেলে লোকের দুয়োরে ভিখ মাগব, তবুও তুকে অ্যাত দূরে কাজে যেতি হয় না।
মতিবুল বলেছিল, ঘরে বসি বসি কুন রাজকাজটা উলটাব শুনি! খাবি কী? কচুপোড়া!
—ক্যানে! গাঁয়ে যারা আছে, তারা কি খেতি পায়নি? না খেয়ি আছে?

—তুর ত্যাঁদড়-ব্যাঁদড় কথা শুনে আমার চলবেকনি দাদি। গাঁ-ঘরে আছে কী! চাষেবাসে খাটা আমার দ্বারা হবেকনি। এখানে যা মোষের মতন খাটালি, এমন কাজ বাইরে করলে ইয়ার থেকেও ঢের টাকা।
মেহেরুন্নেসা আর কোনও কথা খুঁজে পায়নি। তবুও শেষ-তিরটা ছাড়তে ভুলেনি।
—সবে বিয়ে করলি বাপ, নতুন বউকে ছেড়ে কুন বিদেশ-বিভুঁইয়ে কাজে যাবি? বছর ঘুরুক, তার পর না হয় যাবি।
মতিবুল আরও একধাপ উপরে। বলেছিল, উয়ার সাথে আমার সব কথা হয়ে গেছে দাদি।
মেহেরুন্নেসা হতাশ হয়। আজকালকার ছেলেমেয়ের মতিগতি মাথায় ঢুকে না। কী মেয়ে রে বাবা! মরদটা এত দূরে কাজে যাবেক, তা এত সহজে মেনে নিল? কোনও টান নাই?
দাদিকে মুখগোমড়া করে থাকতে দেখে মতিবুল বুঝিয়েছিল, তুই একদম চিন্তা করিস না দাদি। ভবিষ্যতের কথা না ভেবে, ড্যাং-ড্যাং করে খেয়ে-মেখে পার করলি তো চলবেকনি। যারা বাইরে গেছে, তাদের অবস্থা কেমন ফিরেছে, সব তো নিজের চোখেই দেখতি পাচ্ছিস।
কথাটা অবশ্য ফেলে দিতে পারে না মেহেরুন্নেসা। আজকাল গাঁয়ের কোনও জোয়ান ব্যাটাছেলেই ঘরে বসে নেই। সব বাইরে খাটতে যাচ্ছে। বুড়ির নিজের চোখেই দেখা, বছর-বছর মাটির ঘরগুলো কেমন ধুপধাপ পড়ে দালানবাড়ি গজিয়ে উঠছে। সবই শুকনো টাকার দৌলতে। তবুও নাতিটাকে চোখছাড়া করতে মন চায় না।
আগে নওশন চাষের সিজনে টুকিটাকি কাজ করত। যতদিন মতিবুল রোজগার করতে শিখেছে, ততদিন সংসারের পুরো হালটাই ছেড়ে দিয়েছে। খালপাড়ের দেখভালের জন্য এখন কোনও শরিকই আর টাকা দেয় না। যখন জাল পড়ে, তখন শুধু খাবার মত দু’-একটা মাছ দেয়।

মতিবুল যেদিন কেরালা থেকে বাড়ি ফিরল, সেদিন পুরনো সিন্দুক, বাক্সপ্যাটরা সব ধা করে ফেলে, জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তছনছ করল।
নাতির কাণ্ডকারখানা দেখে ভয়ে মুখ দিয়ে কোনও কথা সরল না মেহেরুন্নেসার। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখল। নাতবউ বাপের ঘরে। সেই মেয়ে এখন ঘরে থাকলে নির্ঘাত তুলকালাম করত। সব কিছু গোছগাছ করে, সাজিয়েগুছিয়ে রাখে সে।
জোরগলায় কিছু বলার সাহস মেহেরুন্নেসার নেই। নাতিটাকে ওইভাবে পাগলের মত বাক্সপ্যাটরা হাতড়াতে দেখে আর স্থির থাকতে পারল না। দরজার পাশ থেকে সরে এসে নাতির পিছনে এসে দাঁড়াল। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, এমুন করে কী খুঁজিস বাপ? পাগল হয়ি গেলি নাকি?
মতিবুল একরাশ বিরক্তি উগরে দিল— হঁ, হঃ, পাগল হয়ি গেছি। শালার বুড়োটা কাগজ-পত্তর কিছুই রেখে গেছে! সারাদিন মোষের মত খেটেচে, আর খেইচে। এবার মজা দেখাবেক।
মেহেরুন্নেসার মনে পড়ল কিছুদিন আগেই গাঁয়ের ইস্কুলঘরে দেখেছিল, মানুষের লম্বা লাইন। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছিল, ‘ডকুমেন’ না কী যেন ঠিক হচ্ছে। কেউ তাকে ভেঙে-ফুটে আর বলেনি। তা হলে কি নাতিটা সেই জন্যেই ছুটে এসেছে? বুড়ি আর বিস্ময় চেপে রাখতে পারে না।
—কী হয়িছে, একটুকুন খুলে ক’দিনি বাপ। কে মজা দেখাবেক?
মতিবুল সহজ করে বুঝিয়ে দেয়— এই যে ভিটেমাটি, যার উপর দাঁড়িয়ে আছিস, খাচ্ছিস-শুচ্ছিস। এগুলো সব কার?
—কার আবার! আমাদের।
—সেটা তো গোটা গিরামের লোকে জানে। সরকার জানবেক কী করে? পুরনো কাগজ-পত্তর কিছুই বাগিয়ে রেখেচিস! কতদিন বাস করচিস এখানে?
মেহেরুন্নেসা বলল, সে কি আজকালকার কথা রে! তুর দাদোর বাপ ছিল খালপাড়ের রাখা। খালের মাছ কেউ যেন চুরি না করে, দেখভালের জন্যি মল্লিকবাবুরা রাখা রাখলেক। খোরপোষের জমি দিলেক। ভিটে তুলার জায়গা দিলেক। তুর দাদো, তুর বাপ সবাই ওই কাজ করে এইচে।
—তুর ও সব ছেঁদো কথায় কিছু কাজ হবেকনি দাদি। দ্যাশে নতুন আইন হচ্চে। শুনিস নাই কিছু! সারাদিন কুথায় থাকিস? তুই যে এই দ্যাশের নাগরিক, কাগজ দেখিয়ে তা প্রমাণ দিতে হবেক। অন্য দ্যাশ থিকেও তো লুকিয়ে ঢুকে পড়তি পারিস। এই দ্যাশের জমি-জায়গা দখল করি থাকতি পারিস। কাগজ-পত্তর না থাকলি হবেক ক্যানে!
মেহেরুন্নেসা নাতির মুখে এমন কথা শুনে তাজ্জব বনে গেল। গলায় দ্বিগুণ জোর এনে বলল, বলিস কী রে! আমার ভিটে, আমার মাটি— আবার আমাকেই পমাণ দেখাতি হবেক? কে পমাণ লিবেক? আসুক দিনি আঁটকুড়োর ব্যাটারা! ঝেঁটিয়ে মুইয়ের বিষ ভুঁইয়ে নামিই দুবো।

বাক্সের তলায় হাতড়াতে হাতড়াতে পাওয়া গেল একটা পেতলের কাজললতা, দুটো শুকনো হরীতকী, আর একটা সুপুরি কাটার জাঁতি। জিনিসগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে থাকল মতিবুল।
মেহেরুন্নেসা বলল, এগুলো আমার বিয়ের সময় তুর দাদো লগনের বাক্সে দিয়েছিল। ফেলিস না বাপ। যত্ন করে রেখে দে। দেখবি একদিন ঠিক কাজে লাগবেক।
মতিবুল দাদির কথা শুনে তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। বলল, মুখে যতই চাবুলি মার কেনে দাদি, কাগজ ছাড়া কুনু কাজ হবেকনি। আজকাল কাগজই সব।
মেহেরুন্নেসা এবার ঝাঁঝিয়ে উঠল, রাখ তুর কাগজ! কাগজের নিকুচি করেছে! নিজের কাজে-পাটে মুন দে দিনি। হই দেখ, খালপাড়ের দখিনে খেজুরগাছটার তলায় শুইয়ে আছে তুর দাদো করম আলী। মাটি খুঁড়ে হাড়-পাঁজরাগুলো দেখিই দুবো।

মতিবুলের মন কিছুতেই মানে না। দিনকে দিন পাগলের মত হয়ে যাচ্ছে। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই। সারাদিন এ-অফিস, ও-অফিস ছোটাছুটি। তা দেখে নওশন একদিন উঠোনে পা ঠুকে বলল, শালার রাজা-মন্ত্রীর যুগটা এখনও গেলনি! কীসের স্বাধীনতা? এই দ্যাশটা কারও একলার নাকি!
ছেলের মুখে এমন কথা শুনে মেহেরুন্নেসার ভয়টা আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেল। ছোটবেলায় রাজার আমলের দিনকাল দেখেছে সে। গাঁ-ঘরের মানুষদের কত অভাব ছিল তখন! পিন্ধনের কাপড় জুটেনি। প্যাটে ভাত পড়েনি। বাপটা রাতদিন খেটেখুটেও মাঠের ধান ঘরে তুলতে পারত না। ধারদেনা-সুদ দিতেই বাঁয়ে আনলে ডানে ফুরাত। কী কষ্টের দিনকাল! সেই যুগটা আবার ফিরে এল নাকি! হায় আল্লাহ! এবার কী হবেক গো!
এখন যেখানেই যায় বুড়ি, সবখানেই একই কথা কানে আসে। পুকুরে চট জাল নামিয়ে যেভাবে আগাছা মাছগুলো তুলে ফেলা হয়, তেমনি সারাদ্যাশ জুড়েই নাকি জাল ফেলা হবে।
প্রথমে মেহেরুন্নেসা ভেবেছিল, নাতির মাথায় কোনও ব্যামো-ট্যামো হয়েছে। এখন সে দেখে, সবার মাথায় একই ব্যামো। তা হলে নাতির মাথার ব্যামোটা গোটা গাঁয়ের মানুষগুলোর মাথায় ঢুকে গেল নাকি! নাওয়া-খাওয়া মাথায় তুলে সবাই যে ছুটছে। নিজেকে জাতমাছ হিসাবে প্রমাণ দেওয়ার জন্য মরিয়া।
বুড়ি নিজের ভেতরে নিজেই হা-হুতাশ করে উঠে— ও নওশনের বাপ, তুমি আমাদের কুথায় থুইয়ে গেলে গো! এ কী বেপদে পড়লাম!

খালপাড়ের দক্ষিণ পাড়ে গ্রাম ষোলআনার জমির ওপর গোরস্থান। বুড়ির কান্নার আওয়াজ সেখানে পৌঁছয় না। কান্নাটা বড়জোর খালপাড়ের কিনারা ছুঁয়ে ঘুরতে ঘুরতে, টুকরো-বিটুকরো হয়ে খালের পানিতে ভেঙে পড়ে। পানির তলায় মাছেরা বুড়বুড়ি কাটে। সেগুলো আগাছা মাছের, নাকি জাতমাছের, তা ডাঙার জীব মেহেরুন্নেসার মালুম হয় না।
টিভিতে, রেডিওয়, কাগজে সবখানেই আগুন জ্বলার খবর। সারাদেশ উত্তাল! রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মেহেরুন্নেসা একবার ঘরে ঢুকে, তো পরক্ষণেই ঘরের পিঁদাড়ে এসে খালপাড়ের দখিনপানে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু শুধু কি আর দাঁড়িয়ে থাকে বুড়ি! কারও জন্যে অধীর প্রতীক্ষা করে থাকে। যেন খেজুরগাছের নীচে ঝোপঝাড়ের তলায় চাপাপড়া কবরের মাটি ফুঁড়ে, কয়েকশো বছরের পুরনো দলিল হাতে উঠে আসবে বুড়ো করম আলী।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

You might also like